হে অমর কবি বঙ্গবন্ধু

বুলেট নাকি কবিতা, কার শক্তি বেশি? স্বভাবতই উত্তর হবে কবিতা। বুলেটের চেয়ে কবিতার শক্তি অনেক বেশি, তার কারণ কবিতার মাঝেই রয়েছে বুলেটকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার অব্যর্থ ক্ষমতা। কবিতাই পারে বুলেটের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, নিশ্চিহ্ন করে দিতে অশুভ শক্তির অপতৎপরতা। কবিতাই জাগরূক রাখতে পারে সত্য প্রাণের বাতিঘর। কবিতার কথা ও বাণীতে প্রতিষ্ঠা পায় সত্য প্রাণ।

ঘাতকের থাবায় যা কিছু সুন্দর শোভন, যা কিছু মঙ্গল ও কল্যাণময়, তাকে দলিত মথিত করলেও তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে একমাত্র কবিতা। সেই পথে কবি হলেন আশারী, কবিতা হলো তার আশাবরী। মশিউর রহমান তেমন এক কবি, তার কবিতা যেন প্রাতঃকালে গেয় সংগীতের রাগ। তিনি তার কবিতা ‘অমর কবি বঙ্গবন্ধু’-তে সেই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি জাতির পিতার প্রতি ভালোবাসা থেকে সদম্ভ উচ্চারণ করেছেন-

“তোমাকে হত্যা করা যাবে
শুধুমাত্র সেইদিন~
যদি কোনদিন হত্যা করা যায়
সমগ্র বাংলাদেশ।”

সত্যিকারার্থে জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে তার স্মৃতি, তার অবদান মুছে ফেলার যে অপচেষ্টা করা হয়েছিলো স্বাধীন বাংলাদেশে; তা স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিরা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কারণ কবিরা তাদের কবিতার লেখনিতে বারবার উচ্চারণ করেছেন সেই অজর অক্ষয় নাম, স্মরণ করেছেন তার অবদান। কবি সেই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তার কবিতাতেও। বলেছেন ততদিন উচ্চারিত হবে জাতির পিতার নাম, যতদিন বেঁচে থাকবে বাংলাদেশ নামক বদ্বীপ।

কবি মশিউর রহমান তার কবিতায় দেশমাতৃকার কথা বলেন। তার কবিতায় সুকুমার বৃত্তির কথা উচ্চারণ করেন। মা-মাটির প্রতি মমতা থেকে ভালোবাসার কথা উচ্চারণ করেন। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথা বলেন। তিনি বিশ্বাস করেন এ দেশের পতাকা ও ঈমানদার ব্যক্তির জায়নামাজ, দুটোই এক পবিত্র আসন। পার্থক্য শুধু ব্যবহারে, জায়নামাজে স্রষ্টার আরাধনা করা হয় এবং পতাকা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতির ধ্বজা উড়িয়ে রাখে। এ কারণেই কবি উচ্চারণ করেন-

“পতাকা ও জায়নামাজ কেবল একটুকরো কাপড় নয়
জায়নামাজ একটি পবিত্র আসন
একটি পৃথিবী, একটি জগত…
……
পতাকাও তেমন পবিত্র এক ধন- আমার কাছে
কেবল একটুকরো কাপড় নয়
লাল সবুজের পতাকা- একটি পৃথিবী”

মশিউর রহমানের কবিতায় দেশমাতৃকার কথা ছাড়াও নিজের একান্ত ব্যক্তিগত সুখ দুঃখ, অখন্ড যাপিত জীবনের কথাও উঠে এসেছে। ব্যক্তির যাপিত জীবনকে তিনি দেখেন পরাধীনতা হিসেবে, যেখানে নিজের সখ আহ্লাদ বায়নাক্কা পূরণ ব্যক্তির ইচ্ছাধীন নয়। তাকেও নির্ভর করতে হয় কারো না কারো উপর। একারণেই মেঘকে পরাধীন বলেছেন, নিজেকে তুলনা করেছেন সেই পরাধীন মেঘের সাথে।

“জগত সংসারে আমি-
বিপন্ন ছেঁড়া এক খন্ড পরাধীন মেঘ”

মানব জীবনের নিগূঢ়তম সত্যগুলো মশিউর রহমান তার কবিতায় সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেন। তিনি প্রাত্যহিক যাপিত জীবন এবং অভিজ্ঞতা থেকে নেন তার কবিতার রসদ। তার কবিতায় ফুটে উঠে সেই জীবন বাস্তবতার কথাও-

“মানুষই অভ্যাস গড়ে- তাই জানতাম
অতঃপর হয়ে যায় তার দাস”

মাহমুদ আল মামুন
কবি, সম্পাদক

হে অমর কবি বঙ্গবন্ধু

হে অমর কবি বঙ্গবন্ধু
আমার প্রাণের জন্মভূমি-
বাংলাদেশ- তোমার অমর কবিতা
আর তুমিই বাংলাদেশ।

পরম পূজনীয় হে আমাদের পিতা,
এ পৃথিবী রবে বেঁচে যতদিন
অমর সূর্য রূপে রবে তুমি-
চির উন্নত, রবে চির অমলিন।
বাংলাদেশের মাটির গন্ধে
ফসলের সোনালি আভায়
প্রকৃতির সুনিপুণ কারুকার্যে
মন মাতানো দারুণ ঘ্রাণে
খালে বিলে সবুজে প্রান্তরে
সতত আমাদের রক্ত প্রবাহে
জনম জনম ধরে হৃদয়ে অন্তরে;
বিনম্র শ্রদ্ধায়, গভীরতম ভালবাসায়
চেতনায়- জাগরণে কিংবা নিদ্রায়
নয় শুধু এই জনমে, জনম জন্মান্তরে
অসীম প্রেরণা, অগাধ স্বপ্ন আধার-
কবি তুমি আমার নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে।

তোমাকে হত্যা করা যাবে
শুধুমাত্র সেইদিন-
যদি কোনদিন হত্যা করা যায়
সমগ্র বাংলাদেশ।
আমাদের মানচিত্র, আমাদের পতাকা
বাংলাদেশের বন নদী খাল বিল
গাছ মাটি ফসল যত তৃণদল
আর আমাদের সকলকে-
অর্থাৎ তোমার সমস্ত বংশধর।

হে পরম পূজনীয় পিতা!
তোমার স্নেহের গভীর পরশ
ভরাট কণ্ঠস্বর, উদাত্ত আহ্বান
ধ্রুপদী রাগ সঙ্গীত

রক্তে জাগায় সুতীব্র অনুরণন
কাঁপায় এখনও আমাদের-
সংগ্রামদীপ্ত প্রতিদিন প্রতিক্ষণ।
আমরা তোমার অতন্দ্র প্রহরী
হে পিতা, আছি জেগে- জেগেই রব
দিবস রজনী সারাক্ষণ সারাজীবন।

যতদিন প্রাণ রবে
পরম পূজনীয় হে আমাদের পিতা!
এ জীবনে শপথ মোর একটিই জানি-
শুধু তোমার যোগ্যতম সন্তান হবো।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য এবং অলঙ্ঘনীয় কর্তব্য

পতাকা ও জায়নামাজ কেবল একটুকরো কাপড় নয়
জায়নামাজ- একটি পবিত্র আসন
একটি পৃথিবী, একটি জগত
যেখানে প্রবেশ করে অবলীলায়
আমি ঝাঁপ দিয়ে পড়ি
সৃষ্টিকর্তার বিরাট বুকে
নিজেকে সঁপে দেই অগাধ অসীমে
পরম ক্ষমার, পরম দয়ার
পরম মমতার- সীমাহীন এক গভীর আশ্রয়ে
নিভৃত নিদ্রাহীন- চির জাগ্রত এক অদৃশ্য সত্তায়
জায়নামাজে- সুমহান সৃষ্টিকর্তার গন্ধ মেলে
যেভাবে শিশু নিঃশ্চিন্তে ঝাঁপ দেয়- মায়ের বুকে
গন্ধ শুঁকে শান্ত হয়- নির্বিঘ্ন নির্ভরতায়।
পতাকাও তেমন পবিত্র এক ধন- আমার কাছে
কেবল একটুকরো কাপড় নয়
লাল সবুজের পতাকা- একটি পৃথিবী
পুরো একটি জমিন
যেখানে- আমার জন্ম, মৃত্যু
জেগে ওঠা, বেড়ে ওঠা
যেখানে আমার হাসি-কান্না, সুখ-দুখ
আমার নিঃশ্বাস, আমার বিশ্বাস- সব
এবং আমার কবরও-
মৃত্যুর পরেও আমার শেষ আশ্রয়
যেখান থেকে হয়েছে আমার সৃষ্টি
যেখানেই আমি মিশে যাব অনাদি ঘুমে
যেখানে থেকেই আবার- হবে আমার উত্থান একদা।

তেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি
কেবল নিথর নির্বাক একটি ছবি নয়
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য কখনও একটি মূর্তি নয়-
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য- আমার কাছে
একটি পতাকা, একটি যুদ্ধ
একটি স্বাধীনতা, একটি বিজয়
একটি দেশ- বাংলাদেশ:
আমার মাতৃভূমি, আমার দেশ
একটি মা- আমার মা
একটি অজর কবিতা
আর- বঙ্গবন্ধু সেই পতাকার, সেই যুদ্ধের
সেই স্বাধীনতার, সেই বিজয়ের
সেই মায়ের- আমার মায়ের
এবং সেই অনবদ্য কবিতার-
স্বভাবকবি এবং কারিগর।

যে হাত উদ্ধত আজ- দুঃসাহসে
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙবার
সে তো স্পষ্ট ছিঁড়তে চায়-
পতাকা ও জায়নামাজ আমার
সে তো দেশদ্রোহী- রাজাকার
কৃতঘ্ন বেজন্মা জানোয়ার
সে হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়াই-
অলঙ্ঘনীয় কর্তব্য আমার।

ছেঁড়া মেঘ

জগত সংসারে আমি-
বিপন্ন ছেঁড়া এক খন্ড পরাধীন মেঘ।
রোদে পুড়ে হাওয়ায় ভেসে
উড়ে চলাই আমার কাজ
চাইলেই আমি পারি না-
উঠতে আরও উপরে
কিংবা পারি না হতে- জল
মুখর বৃষ্টির জল-
ঝরে ঝরে নিঃশেষ হয়ে
জমিনে খুঁজে পেতে আশ্রয়
অতঃপর- বেমালুম হারিয়ে যাবার।

দিক দিগন্তহীন আকাশে সাগরে
গন্তব্যহীন শুধুই ভেসে ভেসে
অনির্দিষ্ট কাল অনির্দিষ্ট পথে
বিরামহীন উড়তে থাকাই
আমার পরম নিয়তি নিশ্চয়!

আনকোরা এক নতুন পৃথিবী

টুকরো টুকরো মেঘ জমিয়ে
আমি একদিন গাঢ় অন্ধকার নামাবো
আর নিমিষে ঢেকে দিব
তোমার গোটা আকাশ
অতঃপর সহসা প্রচন্ড প্রবল
ঝড়-বৃষ্টি হয়ে আঁছড়ে পড়ব
সুতীব্র খরাদগ্ধ- তৃষ্ণার্ত
বিহ্বল তোমার মাটির বুকে
হঠাৎ প্লাবন নিদ্রা ভেঙে
তুমি যখন উঠবে জেগে
উর্বর অবারিত সবুজ
ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠ হবে-
তোমার অবাক দুটি চোখ
আর সদ্যস্নাত সেই-
জলে ভেজা আঁখি মেলে
নয়নভরে দেখবে তুমি-
শরৎ সুনীল- নবীন আকাশ
আনকোরা এক নতুন পৃথিবী!

সেল্ফি কথন

প্রতিদিন- কারণে অকারণে অনবরত
যেখানে সেখানে যখন তখন
সুযোগ পেলেই তুমি সেল্ফি তোলো-
বেশ হাসি হাসি মুখ করে
কখনও ভাবে, কখনও হেলে
নানান কায়দায়, নানান ঢঙে
নানান রঙের সাজপোষাকে
বেশ সুখেই আছো-
সকলকে তাই দেখাতে!

ফেইসবুকের জমিন জুড়ে
ছড়িয়ে দিয়ে সেই- সেল্ফি
ভাবছো গর্বে- দেখাও ভেল্কি!
সেল্ফিতে দেখা যায়
বেশ বড়- শুধু তোমার ছবি
আর যত সব- ক্ষুদ্র অতি!
এসব করে নিজের নিঃসঙ্গতা
কিংবা গোপন যত দুঃখ গাঁথা
যায় কি ভোলা- যায় কি ঢাকা?

সেল্ফিরা সব- নিরেট ঝরাপাতা
বলে শুধুই তোমার গোপন কথা
প্রকাশ করে তোমার মনের
অঢেল একাকীত্ব আর বিষণ্নতা
এবং জনারণ্য মাঝেও-
কত বিপুল তোমার নিঃসঙ্গতা!
কখনও তুমি- বুঝো কি তা?

মানুষ অভ্যাসের দাস

মানুষই অভ্যাস গড়ে- তাই জানতাম
অতঃপর হয়ে যায় তার দাস
এই যে যেমন আমি এখন-
সহসা আর পাই না সূর্যোদয়ের ঘ্রাণ
ভোরের শিশির কাড়ে না আমার মন
কিংবা দমকা হাওয়ায় হাসে না- ভাসে না সুখে
হয় নাকো আমার মন আর বাউল উচাটন
নতুন কেনা বই কিংবা নবান্নের ঘ্রাণ
মাতাল আমায় করে নাকো আর-
শত দুঃখেও আর ভাঙে না হৃদয়
আসে না চোখে বিন্দুমাত্রও- নোনা জল

না খেলেও- যখন তখন লাগে না আর ক্ষুধা
পোলাপও আমায় টানে না কখনও- বরং এখন
আগুনেও আর পোড়ে না শরীর কিংবা মন
ভীষণ ঝড়ে শিকড়সহ উপরে গেলেও আমি
টিকে থাকি বেশ- তবুও তো আসে না যে মরণ!

কেউ আসবার কথা দিয়ে- না আসলেও পাই নাকো ব্যথা
কারও যে ছিল কখনও আসার কথা- শ্রেফ মনেই পড়ে না
আঁধারে আমার ভয় করে না আর অথবা নেই ভয় ডর
পৃথিবীতে- বলতে পারেন- এখন আমার চেয়ে বড়
নেই কেউ আর- বেশ অপদার্থ কিংবা ভীষণ স্বার্থপর।

ভালোবাসা

পাহাড় কেটে কেটে মানুষেরা
যেভাবে- রাস্তাঘাট ঘরবাড়ি বানায়
অনেকটা সেভাবেই
বুকের ভিতর উষ্ণতার
অক্লান্ত বুলডোজার চালু রেখে
হিম কুয়াশা পর্বত কেটেকুটে
ভেঙেচুরে একদম তছনছ করে
নিঃশ্বাসের গরম ধোঁয়া উড়িয়ে
জীবন সংসারের
ক্লান্তিহীন অবুঝ ব্যস্ততা চলে
কি আলো এবং কি আঁধারে!
আর নিরন্তর ছুটে চলে
সব বয়সের পথিকেরা
সবকিছুর পরেও
কিছু কুয়াশা তবু
অলক্ষ্যে রয়ে যায় ভিতরে
ভিতরে নিভৃতে নিঃশব্দে গড়ে উঠা
এক অনড় প্রাচীর যেন!
ভালবাসা- একমাত্র ভালবাসা ছাড়া
কে আর আছে- এ ভৌগলিক প্রাচীর
পাসপোর্ট ভিসা ব্যতিরেকে
অবলীলায় টপকাতে পারে?

মশিউর রহমান

জন্ম - ০১ জানুয়ারি ১৯৭০ খ্রীষ্টাব্দে রংপুর জেলার সদর উপজেলার আরাজী গুলাল বুধাই গ্রামে
পেশা- সরকারি কর্মকর্তা  (২১তম বিসিএস, বর্তমানে ‘বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়, ময়মনসিংহ’ যুগ্ম নিবন্ধক)
আগ্রহ - কবিতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: