হলুদ রঙের বৃষ্টি // আসাদ উল্লাহ

ঘড়িটি ঘোড়া হয়ে গেলো

আমাদের একটা ঘড়ি ছিলো খুব ছিমছাম
ঘড়িটি হঠাৎ ঘোড়া হয়ে যায়, সে এক ভয়ংকর ঘোড়া!

একটি মাধবীলতা জানালা ধরে দাঁড়িয়েছিলো
তার কোমল আঙুলের ফাঁকে ছিলো দীর্ঘ সবুজ জিরাফের গলা,
ঘন গুল্ম ঘেরা পুকুর ঘাটে মা বাসন মাজতেন
মায়ের হাতে ছিলো কয়েকটি দোয়েলের স্নিগ্ধ ছায়া
কাসার থালা ও গ্লাসে ছিল ছায়াগুলোর নৃত্যকলা
ঘোড়া কী ভয়ংকর! তার খড়মে দলিত হলো সব।

ডাহুকের ডাকে খালে বিলে ধানের ক্ষেতে ছিল চঞ্চল সুখ
বেগানা স্পর্শে আঁচলে লুকাতো লাজুকলতার আনত মুখ,
আমাদের গাঁও-গেরামে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে অথবা
ফাগুন হাওয়ায় উঠোনে উঠোনে ছিলো যৈবতী কলরব,
শিশুদের কলাপাতায় ছিলো গাভীর নতুন ওলানের স্বাদ
পিতামহের প্রাণের সুরভিত উদ্যান, এবাড়ি ওবাড়ির পানপাতা প্রেম
গোঁয়ার ঘোড়ার লালসায় কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।

ঘোড়াটি দিনে দিনে আরো মারাত্মক হয়ে উঠছে
লাগামহীন দৌড়াচ্ছে যত্রতত্র, পার্কে বাজারে হোটেলে যখন যেমন ইচ্ছে
খেয়ে নিচ্ছে কুমারী মন মনুষ্যত্ব কেরোসিন দিন-
নগরে নারীর পাছায় কামর দিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে বেলাজ ঘোড়া
ঘোড়ার তান্ডবে জড়োসড়ো মানুষ, যেনো তারা অন্ধ অরণ্যে প্রত্যেকেই একা।

ঘোড়া ছুটছে ঘোড়া ছুটছে, ঘোলা করছে সুপেয় জল বিশুদ্ধ হাওয়ার মাঠ
ঘোড়া ছুটছে ঘোড়া ছুটছে, ঘোড়ার খড়মে মরছে শুভ্র শান্তি
কটি নাচিয়ে নেমে আসা চাঁদগলা গাঁও- তার স্নিগ্ধ স্নানে ফেরা ঘর।

আমাদের একটা ঘড়ি ছিলো খুব ছিমছাম
ঘড়িটি হঠাৎ ঘোড়া হয়ে গেল, সে এক ভয়ংকর ঘোড়া
তবুও ঘোড়ার পেছনে খুঁজি ছিমছাম পুরনো ঘড়ি।

সমুদ্র ও পাহাড়ের ছবি

অনেকদিন সমুদ্র দেখা হয় না এবং পাহাড়
ভাবছি একটি ছবি এঁকে নিবো
দুটিই থাকবে- সমুদ্র আর পাহাড়
পাহাড় বেয়ে ঝর্ণা, ঝর্ণার ভেতর আরো কিছু-
যেমন দুঃখের চোখ, বিরহের আগুন
প্রেমের প্রগল্ভতা, প্রজাপতির উড়াউড়ি
ঝর্ণায় থাকে জীবনের মাল্টি কালার।

কী নাম হতে পারে ছবিটির?
মাধবীই হোক
মাধবী আঁকলেই সমুদ্র পাহাড়।

কিছুক্ষণ সৈকতে দাঁড়িয়ে জুড়িয়ে নিবো তাপ-দহন
কয়েকটি ঝিনুকও বালিসুদ্ধ রেখে দিবো পকেটে
একাকি পথে কান পেতে শুনে নিবো মুক্তোর গান
যদিও থাকে না সব ঝিনুকে মুক্তো ঝরা গৌরব।
ঢেউয়ের ভাঁজে রেখে দিব সংগোপন কথা
জলের গহীনে ডুব দিয়ে তুলে আনবো হংস-মিথুন সুখ
জলধোয়া হাওয়া থেকে কুড়াবো প্রেমের সৌরভ
আহা, বহু বছর আগে মুখরিত সমুদ্র আর পাহাড়
এখন বুকের ভেতর চিন চিনে ব্যথা।

বাহ্ কী চমৎকার! মাধবী আঁকলেই সমুদ্র পাহাড়!

হলুদ রঙের বৃষ্টি

তোমার ছবির দিকে তাকালেই বৃষ্টি নামে
একা একা ভিজি, বেড়াই পথ থেকে পথে
দেখি তোমার খোঁপার খুশবো নিয়ে গাছে গাছে কদমফুল হাসে
মাধবীলতার মতো স্নিগ্ধ জলে খেলা করে হংস-মিথুন।

আজকাল বৃষ্টি হয়েছে নিলাজ
রীতি-নীতি সময় অসময় সংস্কার কিছুই বুঝে না
অমন বৃষ্টি কি হয় সব গাঁয়ে নগরে ও মনে।

আষাঢ় শ্রাবণে সাধারণত খামারগুলো দ্যুতিময় হয়ে উঠে
খিড়কীতে রাখাল বালকের মতো বাঁশি বাজায় সবুজলতা
নায়রি নাও নিয়ে বাদশাজাদীর মতো ঘাটে আসে ইস্টিকুটুম
যারা শাপলা দেখেনি তারাও মাথা ভর্তি জলের বোঝা নিয়ে-
বিল পাড়ে গোপনে মধুর সর্বনাশ ডাকে।

তোমার ছবির দিকে তাকালেই বৃষ্টি নামে-
দিকচিহ্নরহিত সে এক উদ্ভুত হলুদ রঙের বৃষ্টি।

রমণী হারালে রমণী রঙ

রমণী হারালে রমণীয় রঙ পৃথিবী মাতৃহীনা হয়ে যায়
অপ্রাপ্ত বয়স্ক ভুলের ঘোরে পড়ে থাকে বালক অথবা বালিকা,
খড়ের ছাউনির মতো হাওয়ায় উড়ে সমস্ত পথের ঠিকানা
মোরগের ডাকে যে গাঁয়ে সন্ধ্যা ও ভোরের উদয়
যে গাঁয়ে দিঘির জলে কলমিলতার মত সাঁতার কাটে কিশোরী
ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে কিশোর অজস্র বিকাল কুড়িয়ে
বগল বাজাতে বাজাতে ঘরে ফিরে
যে নগরে নিয়ন আলোয় প্রগতির পতাকা উড়ে
সে গাঁও ও নগর তলিয়ে যায় অনাথ শিশুর মত বিপন্ন বৃষ্টির জলে।

বনের ভেতর হাঁটতে গিয়ে দেখি কুঠারাঘাতে রক্তাক্ত সব বৃক্ষ
অথচ বৃক্ষ ফুল ফল ছায়া ও জ্বালানি দিয়ে গায় সভ্যতার বিজয়
অনেকগুলো শালিক বিবস্ত্র শিশুর মত ঘুমিয়ে আছে বিরান ভূমিতে
ভালোবাসার কর্ষণ ছাড়া লাঙলের ফলায় সবজি নয়, আসে পাথর।

রমণী হারালে রমণীয় রঙ পৃথিবী থাকে না পৃথিবীতে
প্রেমের প্রতাপ বিনষ্ট হলে থাকে না গোলাপের গৌরব।

পড়ে থাকে মৃত পৃথিবী

ফুল ফোটেনি পথে, এমনকি সূর্য কিংবা চাঁদ
আপাতত কাটুক সময় নির্জন মফঃস্বল স্টেশনে,
একটু ফর্সা না হলে তো আর হাঁটা যায় না
স্টেশন বলে কথা। ট্রেন আসবেই নিয়ম ধরে।

ট্রেন নির্জনতার বদলে স্টেশনে রেখে যায়
একদলা অন্ধকার-
মফঃস্বল শরীরের ভাঁঁজে ঝরে শুকনো পাতা।

কে যেনো হাঁটে লিকলিকে ছায়ার ঠোঁটে সিগ্রেট
সিগ্রেটে চায়ের দোকান পুড়ে, টিকিটঘর পুড়ে
সিগ্রেটে পুড়ে মাধবীর ছায়া তার কিশোরী প্রেম
সিগ্রেট গিলে খায় গাঁয়ের সোনালী হালট পাখিকলরব।

সিগ্রেটের আগুনে আসে না আলো ধূলি উড়া পথ
লেবুর দীর্ঘ বাগান উঠোনের ঘ্রাণ হংস সাঁতার দিঘি
মফঃস্বল স্টেশনে গোল হয়ে পড়ে থাকে মৃত পৃথিবী।

আসাদ উল্লাহ

জন্ম- ৩রা মার্চ ১৯৬৯, উথুরী, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। 
পেশায় কলেজ শিক্ষক।
আগ্রহ মূলত কবিতা ও প্রবন্ধ।
সম্পাদনা- আমাদের কাগজ, দেয়াল (শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক)
প্রকাশিত গ্রন্থ-
কাব্য- মেয়েটিকে দেখি না, বারবার মন বলে যাই, জলপতনের শব্দ
ই-মেইল: asad.deyal@gmail.com 

One thought on “হলুদ রঙের বৃষ্টি // আসাদ উল্লাহ

  • October 14, 2021 at 4:07 pm
    Permalink

    পরপর দুটো কবিতা পড়লাম। খুব ভালো লেগেছে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: