হযরত শাহ্ মিসকিন শাহের পবিত্র মাজার শরিফ

যুগে যুগে ধর্ম ও শান্তির বাণী প্রচারে অনেক অনেক মহা-মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের হাত ধরেই পৃথিবীতে শান্তির ধর্ম পেয়েছে প্রাণ। তাদের সেই শান্তির বার্তা যাদের হাত ধরে পরম্পরায় টিকে আছে তারা সেসব মনীষীদের একান্ত আপনার জন, ভালোবাসার মানুষ। বিভিন্ন ধর্মে তাদের বিভিন্ন পরিচয়ে অভিহিত করা হয়। আমাদের পবিত্র ধর্ম ইসলামে তাদেরকে পীর আউলিয়া বুজুর্গ হিসেবে অভিহিত করি। উপমহাদেশে তাদের হাত ধরেই প্রচারিত হয়েছে দ্বীন ইসলাম। তাদের ঘিরে রয়েছে নানা ধরণের লৌকিক কাহিনী। হযরত শাহ্ মিসকিন শাহ তেমনি এক বুজুর্গ ব্যক্তি। তাকে ঘিরে শীহট্ট বা সিলেটসহ নানা জায়গায় নানা লৌকিক কাহিনী প্রচারিত আছে। আমাদের ময়মনসিংহেংর গফরগাঁও থানার মুখীতে তেমন অলৌকিক সব বিশ্বাস ও কাহিনী এখনো কিংবদন্তি।

জানা যায়, হযরত শাহ জালাল যখন শ্রীহটে আসেন তখন তার সঙ্গে শাহ মিসকিন শাহ নামে একজন সহচর ছিলেন। তিনি গফরগাঁও থানার মূখী ও তার পার্শ্ববর্র্তী এলাকা সমুহে ধর্ম প্রচার করার জন্য শাহজালাল (র:) কর্তৃক আদিষ্ট হন এবং এখানেই তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। এখানে তার মাজার শরীফ আছে।

শাহ মিসকিনের মাজারে প্রতিবছর ওরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয় ও সেখানে বিশাল বড় মেলা বসে। আর একে ঘিরেই রয়েছে নানা প্রচলিত মত।

গফরগাঁওয়ের মানুষ স্বভাবতই পীরভক্ত মানুষ। একারণে এখানে মাজারের সংখ্যা অনেকাংশে বেশি দেখা যায়। আমরা বিশ্বাস করি অলি আউলিয়ারা একান্তই আল্লাহ্ তায়ালার প্রিয় বান্দা ও বুজুর্গ ব্যক্তি। তারা নিঃসন্দেহে সম্মানীয় ও পবিত্র ব্যক্তি। তাঁদের ওসিলায় অনেক মানুষের অনেক সমস্যা থেকে আল্লাহ্ তায়ালা পরিত্রাণ করেন। মাজার কেন্দ্রিক ভুল ও সমস্যাগুলো যা করি তা আমাদের আমজনতা (মেঙ্গো পিপুল)’র সৃষ্টি। ইসলাম এক্ষেত্রে খুবই কঠোর। আমরা স্বভাবত আবেগপ্রবণ জাতি। তাই এসব বিষয়ে কথা বলাও বিপদজনক।

ব্যক্তিগত কারণে বেশ কিছুদিন আগে মূখী (গ্রাম – মূখী, ইউনিয়ন – মশাখালী, থানাঃ পাগলা, উপজেলাঃ গফরগাঁও) গিয়েছিলাম। সেই সুযোগে নামাজ পড়লাম মূখী শাহ্ মিসকিন (রাঃ)এর মসজিদে। উল্লেখ্য সেখানকার আশেপাশের সকল প্রতিষ্ঠানের নামই শাহ্ মিসকিন শাহ্ (রাঃ) এর নামে। তারপর মাজার শরীফ ঘুরে দেখলাম। বিশাল বড় এলাকা। অনেক মানুষের আনাগোনা। ভালোমন্দ সব মিলিয়েই সবজায়গা, এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। কেউ কেউ বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে মাজারে সেজদা করছে, সেটাও চোখে পড়লো। কয়েকজন পাগল (স্বাভাবিক দৃষ্টিতে আমরা যাদের পাগল বলি, বাকিটা আল্লাহ্ পাক ভালো জানেন) আশপাশে শুয়ে আছে। কেউ রান্না করছে, কেউ মাজারের চারপাশে ঘুরছে। কেউ কেউ আবার উৎসুখ হয়ে মানুষের কাজকারবার দেখছে; তাদের বেশির ভাগই দর্শনার্থী।

মসজিদ দেখতে খুবই সুন্দর। একটা গুম্বজ, একটা মিনার। আমার জানা মতে এত উঁচু মিনার ময়মনসিংহে আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না।বর্তমানে মাজারটির খেদমতে আছেন শাহ্ ফাহাদ ফকির। তার বাবা গত হওয়ার পর একমাত্র উত্তরসূরি হিসেবে তিনি এই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। মাজারের খেদমতের পরম্পরা এভাবে বংশপরম্পরায় চলমান। ফাহাদ ফকিরের বাবা ছিলেন শাহ্ দিলদার ফকির→ দিলদার ফকিরের বাবা ছিলেন শাহ্ ফিরোজ ফকির→শাহ্ মুসলেম উদ্দিন ফকির→শাহ্ খোদাবক্স ফকির। ফাহাদ ফকির এই পর্যন্তই জানেন।

তিনি জানান, সিলেটের ৩৬০ আউলিয়ার সঙ্গী সাথীদেরই একজন শাহ্ মিসকিন (রাঃ)। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩২ জায়গায় মিসকিন শাহ্ (রাঃ) আস্তানা রয়েছে। আর এখানে মাজার শরিফ। তার ভাষ্যমতে আল্লাহর অলিরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইসলামের প্রচারে দাওয়াত নিয়ে গেছেন। বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করেছেন। যেখানে তাদের বুজুর্গি প্রকাশ পেয়ে যেত সেখানে আর অবস্থান করতেন না। তারা অন্যত্র চলে যেতেন।

শাহ্ মিসকিন শাহ্ (রাঃ) সম্পর্কে কথিত আছে, তিনি সাপ, বাঘ নিয়ে খেলা করতেন। এসব হিংস্র প্রাণীরা তাঁর কথা শুনতো। আরো প্রচলিত আছে যে, তিনি রান্না করার চুলোয় লাকড়ি ও আগুনের পরিবর্তে নিজের পা দিয়ে বসে থাকতেন। এতেই তার রান্না হয়ে যেত। বৃষ্টির মধ্যে রান্না করতেন, তাও তার আগুন নিভতো না। শাহ্ ফাহাদ ফকির বলেন, বর্তমানেও মাজারে বৃষ্টি হলে রান্নাতে সমস্যা হয় না, এখনো নাকি বৃষ্টির মধ্যেও আগুন জ্বলে।

ঘুরতে ঘুরতে মাজারটা দেখলাম মন দিয়ে। সুন্দর দৃষ্টিনন্দন এক মাজার। মাজারের গেইটে টাইলস দিয়ে লেখা আছে ‘বিসমিল্লাহ্ হির রাহমানির রাহিম’। তারপর লেখা হযরত শাহ্ মিসকিন শাহ্ অলি আউলিয়া জয়নাল আবেদীন (রাঃ) পবিত্র মাজার শরীফ। এর নিচে লেখা- ‘গার বগোয়াম শেম্মায়ে যাঁ নোগমাহা জানেহা দূর বর্যানদ আয দখমাহা’ অর্থাৎ ওলীদের বাতেনি বাণীর কিঞ্চিতও যদি আমি বর্ণনা করি তবে (মৃত) আত্মাসমূহ কবর থেকে (জীবিত হয়ে) উঠে আসবে (তাদের আত্মায় আধ্যাত্মিক জীবনী শক্তি সঞ্চারিত হবে)।

চমৎকার একটি দিন কাটিয়ে পবিত্র এক অনুভূতি নিয়ে ফিরে আসি। মনের অজান্তে বিশ্ব মানবতা ও মানুষের জন্য মন হতেই মঙ্গল কামনা চলো এলো। হযরত শাহ্ মিসকিন শাহের পবিত্র আত্মার প্রতি ভালোবাসা জেগে উঠলো।

এম. আর. সুমন

এম. আর. সুমন

আগ্রহ লেখালেখি।
পেশা-শিক্ষার্থী (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)
ইমেইল - baumrsumon@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: