স্মৃতির লোবানে ভাসে – মোহাম্মদ আনোয়ার

কাব্যখেয়ার নবীন মাঝি মোহাম্মদ আনোয়ার। তবে কবিতার অন্ধিসন্ধি সম্পর্কে তাঁর চেতনালোক ঋদ্ধ। নির্মেদ কবিতার শৈল্পিক নির্যাস তাঁর কাব্যসত্তার চমৎকারিত্বের ঘোষণা দেয়। আনোয়ারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ স্মৃতির লোবানে ভাসে। তবে দীর্ঘদিনের গোপন প্রস্তুতি তাঁকে ভেতরে ভেতরে করছে শিল্প নির্মাণের প্রত্যয়ী সৈনিক।

নগর সভ্যতার তথাকথিত রুচি আর সংস্কৃতির যেনো বৈরি মানুষ তিনি। জীবনানন্দীয় বেদনা যেনো অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরে তার মর্মলোক। ফলে তিনি সেইসব যন্ত্রণাদগ্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তি চান। তিনি চান মৃত্তিকাসংলগ্ন মায়াবী গাঁয়ের স্নিগ্ধ ছায়া সৌন্দর্যের বাতায়ন। যে বাতায়ন পথে দেখা যায় শান্তি আর সৌহার্দের রিয়েল জীবন। সঙ্গতই তাঁর কবিতা বাণীবদ্ধ হয় কৈশােরে দেখা অকপট সৌন্দর্যের নরম আলোকপ্রভায়। যেমন- ‘হাসনাহেনার সৌরভ মুখরিত পবিত্র ঘ্রাণ কুড়াই/ সন্ধ্যার আকাশে উদ্ভাসিত হলুদ রঙ (খিরো নদীর বাঁকে)।

মানবিক আধুনিক মানুষ অব্যক্ত ব্যথার শ্বাসাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় লোকচক্ষুর অন্তরালে। মানবিক আধুনিক মানুষের সহজাত এই বৈশিষ্ট্য মোহাম্মদ আনোয়ার শানিত চেতনার শৈল্পিক চাকুয় করেছেন পোস্টমর্টেম। এখানেই তাঁর শিল্পসত্তা স্বমহিমায় উদ্ভাসিত- ‘দুঃখ আমার সহজ প্রেম/ দুঃখ ভালোবাসি’ (দুঃখ) সময় আর সমাজের নষ্ট উল্লম্ফনে কাতর বোধসম্পন্ন মানুষ তো শেষ পর্যন্ত বিবর ভুবনে একা হয়ে যায়- একথা উজ্জ্বল সত্য।

মোহাম্মদ আনোয়ারের স্মৃতির লোবানে ভাসে কাব্যগ্রন্থের প্রায় প্রতিটি কবিতাই জীবনের অতলস্পর্শী। সঙ্গতই সংশয়হীন বলা যায়, দিন আসবে তাঁর কাব্যগ্রন্থ কাব্য পিয়াসীদের কাছে হবে অনেক বেশি সমাদৃত।

আসাদ উল্লাহ
কবি, প্রাবন্ধিক

ভ্রান্তির নিঃশ্বাস

তোমার বাড়ির দক্ষিণে জানালা আজ আর
খোলা থাকে না
মনের ভিতর হাঁটাহাটি করে অর্থবিমুখ কৌতুহল
কেউ কি কাঁদে, কাঁদে কি কেউ আড়ালে!

জনম তো কেটে গেলো ঢের, ফুল ফুটে না
গোলাপ আঁকা চোখ দেখিনা
বেলোয়ারি দিন কাটাকাটি হলো নখের উপর।

বেলা যায়, বেলা গেলো কালো করে রোদ
আমাদের উঠোনে দলা পাকিয়ে নামে রাত
লেবুতলা থেকে আসে সুরভিত ভ্রান্তির নিঃশ্বাস
পিছন ফিরে দেখি ফাঁকা প্রান্তরে গড়াগড়ি করে
সকালের হাহাকার।

দূর নক্ষত্র

অবশেষে একদিন কানাকানি ফিসফাসে
বিভ্রান্তির গোলক ধাঁধায়
তুমি অনেক দূরের মানুষ হলে
যেনো দূর নক্ষত্রের আড়ালে আরো দূর নক্ষত্র।

এখন কথার কাকলি নেই
গান নেই কোকিলের, বাগান নেই অজস্র ফুলের।

গাঙচিল উড়া জলের মোহনায় ঝরা পালক
আর পার্কের নির্জন ছায়ায় শুকনো পাতার মর্মর
দূর থেকে ভেসে আসে ভাঙা বাঁশির ক্রন্দন।

তোমার চলে যাওয়ার পথ থেকে সমস্ত ধুলি আর অন্ধকার
উড়ে উড়ে গড়াগড়ি করে আমার বিছানা বালিশে
উড়ে ক্ষরিত হৃদয় হতে আহত প্রেমের শব্দাবলী।

‘গেছে যেদিন একেবারেই গেছে’
দেখা হবে না আর বেলোয়ারি দিন
অথবা কোন পূর্ণিমায় ব্যাকুল রাতের সুখ!

রোদ হেসে উঠুক ভোরের শিশিরে

কেনো এতো হাহাকার বুকে
কালো মেঘ ঘিরে আছে আকাশ

বৃষ্টি কোন সত্যের ঘোষণা হতে পারে না
বৃষ্টি ভেজাতে পারে না কোন কোন আগুন
তবু মানুষ কাঁদে।
ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ, মরক
কখনো কখনো পাড়ায় পাড়ায় নগ্ন পা ফেলে নাচে
তবুও পৃথিবী চোখ ভরা উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়িয়ে হাঁটে!

জেগে উঠো দিগন্তের পাড় ভেঙে
কালো ফণার মতো ঢেউ মথিত করো
মাঠে-মাঠে ফলাও সোনা
রূপালী শস্যদানা।

বাঙালি পারে না কী?
রক্তের সাগরে স্বাধীনতা ও মুক্ত মৃত্তিকার গান শোনাতে পারে
অনায়াসে নিতে পারে হাতের মুঠোয় পাহাড়
বাঙালি অদম্য দুর্বার।

নিয়ে এলাম তপ্ত হাঁপর

মাত্র একশত টাকা মুঠোফোনে রিফিল কোন
বিষয় হতে পারেনা
কখনো কখনো আনন্দ কুড়িয়ে আনে
আমি নিয়ে এলাম তপ্ত হাঁপর।
অভিমান তো জীবনে সুখ ফিরে পেতে হোঁচট খাবেই
হীরে কিংবা জহরত অথবা নকল মণিমুক্তা
চিনেই বা ক’জন।

তুমি চাইলে আমার একটা চোখ
যদি বলো কিডনি অথবা হৃদপিন্ডটা দিয়ে দিবো।

যদি অভিমানে হারিয়ে যাও তো আমার জন্য হবে
দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ভেজা শরীর তৃষ্ণার্ত মন
গভীরে ঝর্ণা জলে বহুতা নদী।

ছলনার চরে এতোটা নীলের নির্যাস
ভূমিতে চাষাবাদ অনন্তকাল ধরে কথার ফুলঝুরি
বন উজাড় এখন, পাখিদের অভয়ারণ্য ছিল,
কোন কোন পাখি নিঝুম রাত্রির অন্ধকারে কাঁদে
কে রাখে কার খবর।

বসন্তে কোকিলের উড়াউড়ি ফাগুনের গান
আগুন লাগা দুপুরে কে যেনো মুখ লুকায় পাতার আড়ালে-
আকাশে কতো তারা ও চাঁদের খেলা
অথচ কখনো ছুঁয়ে দেখা হয়নি লাজুক ঠোঁটের কম্পন
রাখা হয়নি হাত কারো গোপন হাতে।

চলে যায় ভুল ঠিকানায়

মানুষ ভুল করে চলে যায় ভুল ঠিকানায়
মিশে যায় আলো অথবা অন্ধকার যেনো সরল পথ।
ভুলে যায় পৃথিবী, স্বজন-শুভার্থী চেনা মুখ
নিজস্ব হোলডিং সুখ।

ভাসে ঘোলা জলে খড়-কুটো
মনে হয় এই তো আরেকটু পথ-
তারপর সবুজ গ্রাম, মাখামাখি ভালোবাসা
তবে পথ কতো দূর গেলে আর?

ভেসে থাকে প্রিয় চোখ, জল ছলছল
সেইসব সোনালী দিন
আহা! সেইসব সোনাঝরা দিন
কতো দূর আর কতো দূর!
বৃক্ষছায়া, জান্নাতি আঁচল সৌরভ মুখরিত দিন
জেগে থাকে প্রাণের স্পন্দনে,
ভেতরে ভেতরে তবু দহনের ছোবল
খোলা সুনীল আকাশ, শ্বেতকপোত উড়াউড়ি
ভাঙা গড়া বহু রঙ লীলা
কোন বাঁকে কোন পথে- হুহু করে মন।

ফিরে পেলে হারানো সিকির মতো
কালের খেয়ায় রাখা যাবতীয় কিছু
তখন পূর্ব পথে আসে ব্যথাহত মানুষের আলোর টনিক।

স্মৃতির লোবানে ভাসে

সাগরে ঢেউয়ের মাতন উচ্ছ্বাস নয়
আছে ঘাত-প্রতিঘাত।
টাপুর-টুপুর ছন্দ মাখা শব্দ যেনো কাঁটার আঘাত।
আছে শুধু মায়াবি স্নিগ্ধতা, আড়ালে ব্যথা-
ভালোবাসার কালো রাত অপরূপা
আছে সবুজের ভেতর দীর্ঘশ্বাস।

জীবন তো নশ্বর
জীবন তো বহতা নদী।
এই যে এতো পুড়ে
এই যে এতো দাহ চৈত্রের
তবু দেখি দূরে দৃষ্টি ফেলে
দেখি উর্ধ্বাকাশে কোটি কোটি
ভাসমান নক্ষত্রের ভীড়।

তারার ছোঁয়া পেলে মন বলে আকাশ জেগে উঠে
পাখা মেলে উড়ে উড়ে কাঁদে পাখি এক একলা একা,
বাঁচার স্বাদ বড় বেসামাল
খোঁপা খুঁজে নিতে চায় বেলির ঘ্রাণ
কোন রঙধনু বিকালে হেঁটে হেঁটে যেতে চায়
পুরনো ভাঙা ঘাটে-
যেখানে ঝরাফুল স্মৃতির লোবানে ভাসে।

মোহাম্মদ আনোয়ার

জন্ম ১৯৭০ সালের ৫ জানুয়ারি গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার মুলাইদ গ্রামে।
পেশায় সরকারি চাকরিজীবী।
আগ্রহ মূলত কবিতায়।

প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ-
স্মৃতির লোবানে ভাসে (২০২১)

ফোন: 01716-623169
ইমেইল: sianwar444@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: