সিঁড়ি ও কয়েকটি কবিতা

কামনা

পাহাড় কেটে পাথর কেটে
সরাই মাটির টাল,
দুঃখ দিঘির এই পাড়েতে আমার বড়াই খাল।

এইখানেতে মাটির আঁচল
গন্ধ মাখা সোঁদা,
লেগে আছে লেগে থাকুক স্নিগ্ধ অনুরাধা।

এই আঙিনা ঝড়ের নাগাল
ঝরে যাবার দিন- তোমার প্রেমে নিত্যনতুন
বাড়ছে আমার ঋণ।

পাহাড় কেটে পাথর কেটে
রাস্তা নামাই বুকে
তীব্র ঢলে আছড়ে পড়ে গোপন কোন শোকে;
কে পেয়েছে ভালোবাসার হেমকান্ত ছাঁচ
খুব চেয়েছি লাগুক মনে- করাল প্রেমের আঁচ!

প্রিয় কোন সঙ্গীতে

ইহকাল ভেসে ভেসে গেলো
আধেক জীবন গেলো চুল খোলা খোপার মতো
আধেক জীবন গেলো হাট ভাঙা মচ্ছবে
কোন এক শঙ্খিনী স্রোতে, প্রিয় কোন সঙ্গীতে
জানা হলো না কেন গেলো, কই?

কারো কাছে রাখা হলো না
জমান হলো না প্রেম বিশ্বস্ত শাড়ির আঁচলে
যে আঁচল ঢেকে দিবে মেঘ
যে আঁচল মুছে দিবে কাদাজল ক্লেদ
যে আঁচল বৈরী হাওয়ায় হবে নিরাপদ আশ্রয়
কারো কাছে পাওয়া হলো না
প্রমাণ হলো না আর, প্রেম এক সত্য পাহাড়।

ইহকাল ভেসে ভেসে গেলো
এক তানে মশগুল, ভালোবাসা সেও অবহেলে।

সিঁড়ি

এই যোজনা পাড়ে দু’টি ফুল একটি পাখি
রাত হয় অমানিশা ঘোর
মহুয়ার বনে দ্যাখো- কালো কালো হাতের দঙ্গল
আর কিছু ছায়াদের নাচনকোঁদন
রিহা, নিজেকে সামলে নাও
সব সিঁড়ি ওদের দখল। রতি মেখে আসছে পশু।

ক্লান্ত চোখের পাতা
তামাক তামাক বিষে
যোজনা করি আমাদের শ্বাস
আমাদের বিশ্বাসগুলি অতিথি পাখি
ক্ষণজন্মা কাশবন-
রিহা, নিজেকে সামলে নাও
দ্যাশে দ্যাশে ফেরার ঈমান ভেঙেছে মসজিদ
সব সিঁড়ি ওদের দখল। রতি মেখে আসছে পশু।

এই পথে, দুকদম হাটছি রিহা…
যোজনার শপথ করে
পায়ে পায়ে অজস্র ধাঁধার পাহাড়
আজ দেখি, ধর্ষিত কথার বাগান
রিহা, নিজেকে সামলে নাও
দ্যাশে দ্যাশে ফেরার ঈমান
সব সিঁড়ি ওদের দখল। রতি মেখে আসছে পশু।

ক্রিটিক

সক্রেটিসের মতো হেঁটে হেঁটে গুনছি সিঁড়ি
জন্ম-মৃত্যু অসংখ্য ক্রিটিক দেখে।
প্রথম ও শেষ এই দুই সত্য জেনে
বাকিসব সিঁড়ির নাম রেখেছি অশেষ প্রতীক্ষা
সত্য বলছি- এখনো দেখিনি মানুষ।

আমাদের চূড়ায় উঠার কাল
একেকটা মনোটাইজ সিঁড়ি ভেঙে
গ্রানাইডের জঙ্গলে সওয়ার হই অশ্বরূপে
যে মেঘ শৈশবের আকাশে লড়ে-
পারতপক্ষে যৌবনেও থামে না সেই বাগ্মী ঘোড়া
তবুও মানুষের নাম অমানুষ
মানুষের স্বভাব দোষে তেলাপোকা।

আমাদের অহংগুলি ঝরছে দ্যাখো
যুদ্ধাস্ত্রে কেউ কেউ নমশূদ্র, আর কেউ কেউ ক্ষত্রিয় বলী
অবাক সত্য হলো- যৌবনের পানসি চাহে
মনোপলির নাচে ভাঙতে বার্ধক্যের সীমানাবলয় ছাঁদ ।

অথচ সব পাখি পারে না উড়তে, কেউ কেউ উড়ে
আর কেউ কেউ হাটতে হাটতে সক্রেটিস।
হেঁটে হেঁটে গুনছি সিঁড়ির তাল
পেরোচ্ছি, পা না রাখা পথের পানে আলসিনগর
জীবন, সে এক তুখোড় নেশার বটিকামাত্র
যেখানে মৃত্যুর লেবাস বড়োই সুন্দর
মানুষের নাম অমানুষ হয়ে গেলে।

নির্বাসিত প্রেমিক

আঙুলে আঙুল টিপে আসে রোশনাই ঘ্রাণ
খোশবু ছড়ায় প্রেম- ইতিহাসে লেখা সত্যবাখান।

সুরম্য উদ্যানে ঝুলে থাকে কতিপয় নিশাযামী অতৃপ্ত আত্মা
এ্যাবাকাসে দ্যাখো- কাচা চোখ অপলাপ কয়
কদাচিৎ সুরে মজে বাদশা বুলবুল-
‘আলগা করহে খোঁপার বাঁধন, দিল এয়্যি ম্যারা ফাসগায়ি, দিল… ফাসগায়ি’
আর এইখানে দিল ফাসতে ফাসতে কই যেন গন্ডগোল লাগে
আর ভেসে যাওয়া চুলে খুলে যায় দিলের ব্যারাক
সেখানে লেফট রাইট, লেফট রাইটে শব্দে
চাপা পড়ে মুখ- কৈর্বাতের বিদ্রোহী ফেরার সৈনিক।

আঙুলের ভাজে ভাজে যেখানে আকাশ রাখা
আকাশের একটু নিচে ঈভের গন্ধম লোভ,
সেখানে এডাম এক আহুতি প্রেম
যেখানে আকাঙ্ক্ষার প্রণয় বৃত্ত মানে না নিয়ম;
জানে না- প্রাচীন ফসিলে আপোষের ইতিহাস।

কদাচিৎ যারা প্রণয়ের সূত্র ভাঙে
তারা আর কেউ নয়, নির্বাসিত প্রেমিক- প্রাকৃতজন,
ঝিমিয়ে পড়া লতাটির মতো
তাদের হাত হাতের মুঠোয় সূর্য রেখে তারা সূর্যকে বুকে পুড়ে।

আর দ্যাখো এভাবেই গলে পড়ে তারা
কেটে গেলে ক্রান্তীয় রাত ইথারে শব্দ ভাসে
‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম…’
দ্যাখো হে প্রেমিক, মোয়াজ্জিন বড়ো তাড়াহুড়ো করে
দ্যাখো হে প্রেমিক, ঘুম ঘোরে স্বপ্নটুকু হয়নি পুরা।

তবু গোঙরিয়ে চলে শকট, নরম আলোর সাঝ-
ঝাপসা মোহন দিনে পূরবী আকাশ,
শুকতারা নির্বাসিত ভেবে খেলা করে রতি ও রমণ।

জাহান্নাম ভালো লাগে

পৃথিবী এক মিষ্টিগন্ধা সুগন্ধিনগর
পাপতাপ বিরহ মধুর
আর তুমি জ্বলন্ত আগুনের লকলকে আলজিব।

তবু তোমাকেই ভালোবাসি প্রেম
তবু তোমাকেই চেয়েছি আজন্মকাল
তোমাকেই চেয়েছি আমি নিপুণ কৌশলে
কোন এক শরবিদ্ধ দিনে তোমাকেই ভালোবাসি প্রেম
তোমাকেই চেয়েছি প্রেম বিষণ্ণ অসুখমাখা তমসা ঘোরে;
এভাবেই জাহান্নাম ভালো লাগে
আজকাল বড় বেশি ভালো লাগে বলে-
ছুটে যাই তোমার টানে কৃষ্ণচূড়া ফুটেছে যে বনে
লালে লাল চোখে সেখানেই চলে গোপন অভিসার।

তোমাকেই ভালোবাসি বলে কুড়াই অভিশাপ
ধেয়ে যাই তাপানলে বিষবাষ্পের পরশ নিতে
করবদ্ধ হাতের মুষ্টি খুলে যেতে যেতে যেই পথে হয়েছে অধীর
সেই জ্বালামুখে আমাদের আস্তানা
যেনো হে, পৃথিবী এক মিষ্টিগন্ধা সুগন্ধিনগর
পাপতাপ বিরহ মধুর
আর তুমি জ্বলন্ত আগুনের লকলকে আলজিব।

তোমাকেই চেয়েছি প্রেম
তবু তুমি তর্জমা করেছ সাত জাহান্নাম
আজকাল তাই জাহান্নাম ভালো লাগে
আজকাল তাই জাহান্নাম ভালোবাসি।

শাহীন তাজ

শাহীন তাজ

জন্ম ২ জানুয়ারি, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। 

পেশায় কলেজ শিক্ষক। আগ্রহ কবিতা, গান, ছড়া ও কথা সাহিত্য। 

ওয়েবজিন সহজাতের উদ্যোক্তা ও নির্বাহী সম্পাদক। 

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ- 
আমার প্রথমা (২০১৪)

কবিতাগ্রন্থ- 
সেলাইকল (২০১৮) 
স্মৃতিগন্ধনগর (২০২০)

মোবাইল- ০১৮৭৮-৩৫৩৫৮৮
ইমেইল- mrshaheentaj@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: