সন্ধ্যার শরীরে বিকেল দৌড়াচ্ছে

শিমুল মাহমুদ তথাকথিত পণ্ডিতগণের একাডেমিক ট্র্যাশ থেকে ঘোষণা দিয়েই দূরে রেখেছেন নিজেকে; অস্বীকার করেছেন যাবতীয় লিঁয়াজো-নির্ভর পুরস্কার ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক পিঠচাপড়ানো। তিনি আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে তিন দশক যাবৎ সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের কাগজ কারুজ। এ পর্যন্ত তাঁর গ্রন্থসংখ্যা: ২৫। জন্ম ১৯৬৭ সালের ৩ মে। পেশা এবং নেশা: অধ্যাপনা। কর্মস্থল: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। পছন্দ: পাঠগ্রহণ, ভ্রমণ ও একাকিত্ব। অপছন্দ করেন মঞ্চলোলুপ আঁতলামো।

শশ্মান

বৃষ্টিরা নেমে এসেছে রাস্তায়।
বৃষ্টিদের দিকে হাঁটতে হাঁটতে
ঢুকে গেলাম চড়ুই পাখির ডানায়।
চড়ুইয়ের ডানার ভিতর লুকিয়ে ছিল
শিশুকাল : শরৎ-বৈশাখ-বর্ষা।

এই বর্ষা, যাইবা?
কই যাইবেন?
শিশুবেলাপুর।

একটা মা-পাখি শিশুকাল ঠোঁটে নিয়ে
উড়ে যাচ্ছে শশ্মানের দিকে।

কোভিড ১৯ থেকে শৈশবের দিকে

গৃহে থাকুন। শৈশবে থাকুন।
তালপুকুরের জলে
সবুজ জলের নিচে
গজার মাছের কাছে জমা রেখে আসা
শৈশবগুলোর মৃত্যুহার সব থেকে বেশি।

মায়ের দিকে ফেরা

মৃত্যু নিকটে এলো। ফিরে যাই মায়ের কাছে।
জরায়ুর ভিতর। মায়ের জরায়ু।

মা-ধ্বনির আওয়াজে জেগে থাকতে চাইছি।
পারছি না। তলিয়ে যাচ্ছি। আর তখন
প্রাচীন একটা গজার মাছ
সবুজ জলের প্রেসারে উগলে দিলো আমাকে।
প্রেসারবিদ্ধ। ভাসছি। খাবি খাচ্ছি। সময় বিহীন।

জন্মপরম্পরা

সেলাই শেষে সুইয়ের ফুটোয়
গেঁথে রেখে চলে গেছো।

আমি অতিরিক্ত সুতো।
ঝুলে আছি সুইয়ের ফুটোয়। মা-বিহীন।

শৈশব-কলম

আগুন-দুপুরে আমাকে একটি কলম দিয়েছিলে।
বিয়ের পর থেকে ওটা দিয়ে আর লিখতে পারছি না।
কলমটাকে এখন বোঝাতে হচ্ছে
আমাদের বিয়ে হয়নি, যাপন করছি প্রাকবিবাহ শৈশবজীবন।

আত্মহত্যার নাম হয় ক্ষুধা

ধানগাছ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ধানগাছের নাম হয় আত্মহত্যা। আত্মহত্যার নাম হয় ক্ষুধা। আমি ক্ষুধার দিকেই হাঁটছিলাম। আমি ক্ষুধাকে চুমা খাইতে খাইতে আত্মহত্যার দিকেই ছুটছিলাম। আমি ট্রেনে চইড়া ক্ষুধার দিকেই দৌড়াচ্ছিলাম। ট্রেনের দুলুনিতে আত্মহত্যা বোধ করছি। ব্যবহার করছি না চোখ। চোখ ক্ষুধার নিয়ামক। আকাশ বলিয়া কিছু নাই। অথচ চোখেরা আকাশের দিকে তাকায়া ক্ষুধার্থবোধ করছে। এসো খানিকটা সময় আকাশের ওপর হাত ধরাধরি করিয়া নাচি। মহাকাশে ধানচাষ নাই : নদী পুকুর মাছচাষ নাই। অথচ চাঁদরাতের চামড়ায় এক ফালি আত্মহত্যা ঝুলে আছে। নির্বিকার।

সন্ধ্যার শরীরে বিকেল দৌড়াচ্ছে

বৃষ্টিতে, বিকেল ডুবছে। গন্ধ ছুটছে। জলগন্ধ হাসিগন্ধ স্মৃতিগন্ধ হাঁটাগন্ধ হাওয়াগন্ধ। বৃষ্টির পেটের ভিতর পাখি। পাখি ভিজছে। হাওয়া ভিজছে। মায়ের পেট খালাস হচ্ছে। স্মৃতি খালাস হচ্ছে। মায়ের পেটের ভিতর বাচ্চা ডাকছে : স্মৃতি ডাকছে। সন্ধ্যার শরীরে বিকেল দৌড়াচ্ছে : জন্ম ডাকছে। বৃষ্টির ভিতর জিহ্বা দৌড়াচ্ছে : ক্ষুধা ডাকছে। মায়ের পেটের ভিতর ক্ষুধা বসে আঙুল চুষছে।

অ্যাডাল্ট

ডিমকে শরৎকাল বলা যাচ্ছে না। না-শরতে, না-বসন্তে লাফাচ্ছে যৌনতা। ডিমকে উসকাচ্ছে যৌনতা। ভাতের ওপর ডিম যৌনতা বিছিয়ে রেখেছে। শর্করা এবং আমিষ, পরস্পর বিপরীত লিঙ্গ। উসুল করে নিচ্ছে হাড়মাংস। নেংটো মানুষ দুটো খাচ্ছে। ডিম থেকে কুসুম। স্তন থেকে ক্ষুধা। ক্ষুধা মাত্রই অ্যাডাল্ট।

ক্ষুধাফুল

ব্যাঙগুলান লাফায়। হুদাই লাফায়। ইসরাত জাহান চোখ থেকে এক চিমটি বর্ষা তুলে নিয়ে ফেলে দিল ড্রেনের ভিতর। ব্লাউজ থেকে এইমাত্র এক ঝাঁক ক্ষুধাফুল খসে পড়ল। দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করার পর ওরহান পামুক তাঁর ‘স্নো’ উপন্যাসে লিখলেন, মিডিয়ার কথায় বিশ্বাস করবেন না।

ড্রেনের ভিত্রে তখনও ব্যাঙগুলান লাফায়। দ্য বুক অব ফেইথ। তখনও ড্রেনের গোয়া দিয়া ক্ষুধাফুলগুলান হাইটা যাইতেছে।

ভাত খাওয়ার শব্দ

ভাত খাওয়ার শব্দের ভিতর লুকিয়ে ছিল আদিগান। নারীপুরুষ মিলিয়া মিশিয়া আদিগান গাহিতেছে। নারীপুরুষ মিলিয়া মিশিয়া ভাত ঠাপাইতেছে। দৌড়াইয়া যাইতেছি ভাতের দিকে। দৌড়াইয়া যাইতেছি ক্ষুধার দিকে। চোদনের বাপের নাম হইল ‘ভাত’। পুরুষটি ভাত খাইতেছে। মেয়েটি ভাত বিছাইয়া শুইয়া রহিয়াছে। মেয়েটি ছেলেটিকে মাখাইয়া মাখাইয়া খাইতেছে। জুয়েলারি ফর দ্য সোউল। শোনা যাইতেছে ভাত খাইবার শব্দ।

শিমুল মাহমুদ


জন্ম- ১৯৬৭ সালের ৩ মে। 
পেশা এবং নেশা: অধ্যাপনা। কর্মস্থল: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। 
আগ্রহ – কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস
সম্পাদনা - কারুজ

প্রকাশিত গ্রন্থ- 

কবিতা - মস্তিষ্কে দিনরাত্রি (কারুজ : ১৯৯০), সাদা ঘোড়ার স্রোত (নিত্যপ্রকাশ : ১৯৯৮), প্রাকৃত ঈশ্বর (শ্রাবণ প্রকাশন : ২০০০, নাগরী সংস্করণ ২০১৯), জীবাতবে ন মৃত্যবে (শ্রাবণ প্রকাশন : ২০০১), কন্যাকমলসংহিতা (ইত্যাদি : ২০০৭), অধিবিদ্যাকে না বলুন (ইত্যাদি : ২০০৯), আবহাওয়াবিদগণ জানেন (চিহ্ন : ২০১২), বস্তুজৈবনিক (নাগরী : ২০১৬), কাব্যকথা কাকবিদ্যা (অনুপ্রাণন : ২০১৬), সমূহ দৃশ্যের জাদু (চৈতন্য : ২০১৮), ভাষাদের শস্যদানা (বেহুলাবাংলা : ২০১৯), দেশভাগ হইল একফালি নকশাদার লাল তরমুজ (বেহুলাবাংলা : ২০২০)

গল্প -ইলিশখাড়ি ও অন্যান্য গল্প (নিত্যপ্রকাশ : ১৯৯৯, নাগরী সংস্করণ ২০১৭), মিথ মমি অথবা অনিবার্য মানব (পুন্ড্র প্রকাশন : ২০০৩, চৈতন্য সংস্করণ ২০১৮), হয়তো আমরা সকলেই অপরাধী (গতিধারা : ২০০৮), নির্বাচিত গল্প (নাগরী : ২০১৬), মনোবিকলনগল্প (নাগরী : ২০২১)

উপন্যাস - শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনি (ইত্যাদি : ২০০৭, কলকাতা সংস্করণ ২০১৪, চৈতন্য সংস্করণ ২০১৬)
সুইসাইড নোট (নাগরী : ২০১৯)

প্রবন্ধ - কবিতাশিল্পের জটিলতা (গতিধারা : ২০০৭, চৈতন্য সংস্করণ ২০১৭), নজরুলসাহিত্যে পুরাণ প্রসঙ্গ (বাংলা একাডেমি : ২০০৯), জীবনানন্দ দাশ : মিথ ও সমকাল (গতিধারা : ২০১০), বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধারার কবিতা (গতিধারা : ২০১২), মিথ-পুরাণের পরিচয় (রোদেলা : ২০১৬), মিথ-ঐতিহ্য সমাজ ও সাহিত্য (নাগরী : ২০১৭)
ইমেইল: shimul1967@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: