শাদা বক উড়ে যাবার দৃশ্য

অনুপম স্মৃতিরা

শৈশবের নদী ;
শাদা বক উড়ে যাবার দৃশ্য পাঠ
পান কৌড়ির নান্দনিক ডুব সাঁতার
কৈশরের ভালোবাসা, মাধবীর টোল পড়া গাল

ইলিশের কানকো নড়ার স্বরবৃত্ত ছন্দ
পাল তোলা নাও;
পদ্মার করুণ চাহনি, হেঁটে যাওয়া মাধবীর
নিতম্বের মাত্রাবৃত্তে উঠানামা —

গঙ্গা ফড়িং, প্রজাপ্রতির ছন্দময় উড়াউড়ি
লালঘুড়ি, মার্বেল, ডাংগুলি গোল্লাছুট;
প্রাইমারি ইস্কুল; অনুপমা ম্যাম, ভুল বানানে মাধবীকে লেখা প্রথম চিঠি –
আশুতোষ স্যারের রক্তজবা চোখ, নির্মম কানমলা –

চোখ বুঝলেই ;
সেই সব অনুপম স্মৃতিরা হেঁটে হেঁটে পার হয়
পুরনো মনের নড়বড়ে সাঁকো !

শতশত বিকেল, সকাল, দুপুর-সন্ধ্যে
শিশুদের নির্দোষ, নির্মল কোলাহল, আমজাদ চাচার
সু-মধুর আযানের ধ্বনি, কালীসন্ধ্যেয় রাঙা ঠাম্মার
উল্লুধ্বনির ছন্দময় জ্বিব নড়ার মুগ্ধ দৃশ্যপাঠ!

ধল প্রহরে; লাঙল জোয়াল কাঁধে ফেলে
পালানের দিকে হেঁটে যাওয়া বাবার পায়ের
অস্পষ্ট শব্দের অনুরণন!

মায়ের জায়নামাজ, তসবিহ- বাবার চশমা- টুপি
ভাপ উঠা ভাঁপা পিঠা ;
উনুনের পাশে বসা মায়ের পবিত্র ধূমায়িত মুখ…

সবই আজ বর্ণময় অনুপম স্মৃতি!

শেষ ট্রেন – শেষ খেয়া

প্রথম প্রহর কেটে গেল –
লাল ঘুড়ি লাটাইয়ের সাথে সখ্যতা গড়তে গড়তেই-
ডাংগুলি ডানপিটে ছিলো ওরা, খুব কাছাকাছি
এভাবেই চলে গেলো, মধুময় সকাল বেলাও হায়!

তারপর শুরু হলো ধারাপাত, নামতা সুদ কষা
ঐকিক সিঁড়ি ভাঙার সংগ্রামী পাঠ-
সে কি ক্লান্তিকর অনুশীলন- উফ!

অবহেলা অবহেলায় চলে গেলো দ্বিপ্রহর
ভুলভাল অভিমান নিয়ে মধ্যাহ্নও একা একা হাঁটছে এখন উলটো পথে –
সময়ের কাঁধে ভর দিয়ে, সারাগায় স্মৃতিজ্বর নিয়ে ।

পথ বলে তাড়াতাড়ি আয়, পা ফেলে হাঁট
শেষ খেয়া ছেড়ে গেলে
আর তো হবে না যাওয়া, ফেরাও তো হবে না আর
পেছনের পথে!

পথকে অনুনয়ে বলি, বড্ড তাড়াহুড়ো তোর –
এখনও বাঁকি আছে শেষ প্রহর, বাঁকি সিলেবাস
যাক না খেয়া, ধীরে ধীরে হাঁটি –
পরের খেয়া ফিরে আসা দেরি আছে ঢের–

তোর যদি তাড়া থাকে দৌঁড়া-দৌঁড়া সময়ের পিছে
না হয় আমি, বাঁকি সিকিটা প্রহর আনন্দের সাথে
গপ্পে গপ্পে আস্তে আস্তে -হাঁটি –।

তোর যদি পাঠ টাঠ, সিলেবাস শেষ হয়ে যায়
পরীক্ষার জন্যি তুই প্রস্তুতি নে
আমার এখনো বাঁকি শেষ অধ্যায়
পাঠ পর্ব শেষ না হলে, কি করে পরীক্ষা
দিতে যাই বল-?

শেষ হোক শেষ সিলেবাস, পড়ুক না পরীক্ষার ডেট
বই খাতা পেন্সিল গোছগাছ করি
যা-না তুই, তোর মতো আমার তাড়াহুড়ো নেই
শেষ খেয়া ধরার…।

হেঁসে খেলে শেষ করি, জীবনের শেষ সিলেবাস
তারপর উঠবো না হয়
শেষ ট্রেন-শেষ খেয়া যেটা আগে আসে…

বিচিত্র ক্ষুধা

গদ্যময় বিশ্ব জুড়ে ক্ষুধার বিচিত্র হা-মুখ!
ক্ষমতা, বিত্ত বৈভব ;
কারো কারো নিরন্তর খ্যাতির ক্ষুধা!

ক্ষুধাই ঈশ্বর ;
ক্ষুধার কোন ধর্ম-টর্ম নেই, নেই কোন ভাষা-সংস্কৃতি
জাতি, গোষ্ঠী সম্প্রদায়;
দেশ, মহাদেশ, রাষ্ট্রসংঘ কিচ্ছু নেই!

ক্ষুধা এক সর্বগ্রাসী হা-মুখো ক্ষুধার্ত হা ঙ র
ক্ষুধা অনিবার;
যুক্তি তর্কের ধারেনা সে ধার !

দেশ-কাল-মহাকাল ন্যায়-অন্যায় কিচ্ছুই
কেয়ার করেনা হা-মুখো দানব
ইচ্ছে হলেই;
লহমায় গিলে ফেলে, দেশ-মহাদেশ-রাষ্ট্রসংঘ
মা ন চি ত্র প তা কা !

সিঁড়িতে ঠ্যাং তুলে, হা- করে বসে থাকে
বিচিত্র ক্ষুধা;
দরোজা খুললেই, অনুমতি ছাড়াই ঘরে ঢুকে
বসে পরে অসুস্থ চেয়ারে;

সুযোগ বু ঝে ই ঢুকে পরে শূন্য ভাঁড়ারে
তৈজস পত্র নেড়ে চেড়ে দেখে
অতপর: শূন্য হা ড়ি ই- চাটতে থাকে
কু ৎ সি ত জ্বিব বের করে —!

ঈশ্বর ছাড়া জানেনা কেউ

ঈশ্বরের রথ এসে নামবে উঠোনে-
ঈশ্বর রথ থেকে নেমে
নি:শব্দে ঘরে ঢুকবেন; বসবেন কাঠের অসুস্থ চেয়ারে

তাকাবেন চোখ তুলে শুধু একবার;
মুখ না তুলেই বলবেন, রথে উঠে বস-
বরাদ্দ সময় শেষ! আমি সুবোধ বালকের ভঙিমায়
রথে উঠে বসবার আগে; অনুনয়ে বলবো
দু’মিনিট সময় কি বরাদ্দ হবে, শুধু মাকে বলে আসবো-
ঈশ্বর মৃদু স্মরে বলবেন ;
ঈশ্বরের আইনে সময় বরাদ্দের কোন বিধান নেই!

ঈশ্বর নিজেই সারথী, আমি অধম যাত্রী –
রথ যাবে সপ্তক আসমানে;
ঈশ্বরই স্বর্গ নরকের মালিক, আমাকে কোথায় রাখবেন
ঈশ্বর ছাড়া জানেনা কেউ…

ঈশ্বর রাগি না শান্ত স্বভাবের একদমই বোঝা যাবেনা!
মালিক ঈশ্বরের দু’টোই খোয়ার, স্বর্গ ও নরক –
পূণ্যার্থীরা যাবে স্বর্গে, পাপিরা নরকে
ঈশ্বরের বিধান সেটাই বলে; আমি যে কোন দলে
ঈশ্বর ছাড়া জানেনা কেউ —–!

ভাঁটফুল

(প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ শ্রদ্ধাস্পদেষু)

আহা! কী নির্মম নিয়তী তোমার –
রাস্তাতেই জন্ম, রাস্তাতেই নিদারুণ মৃত্যু!
সৌখিন পুষ্প প্রেমিকের সখের বাগানে,
নিতান্তই বেমানান, অচ্ছুৎ ম্লেচ্ছ তুমি…!

আকাশ সমান অনাদর- অবহেলায় বেড়ে উঠা পুষ্পশিশু ;
কত কত সূর্যোদয়- সূর্যাস্ত, অমাবস্যা-পূর্ণিমা
দেখেছো তুমি; দেখোনি বলো?

তোমাকে কেউ কি দেখেছে দু’চোখ মেলে?
সুশোভন-সুবেশ পথিকেরা যায়-আসে আপন খেয়ালে
কেউই চায়না ফিরে তাচ্ছিল্য ভরে!

পুজোর বেদীতে আজীবন নিষিদ্ধ- তুমি!
দেবতার নৈবেদ্যেও অস্পৃশ্য –
একজন সুশোভন রমণীও আদর- সোহাগে
খোঁপায় পড়েনি তোমায়! পড়েছে কি?

জীবনানন্দ ছাড়া, কে তোমায় এতোটা ভালোবেসে
মনে রেখেছে? রাখেনিতো কেউ!
নিরব- নিভৃতেই অগোচরে ফুটে ফুটে
গন্ধ বিলিয়ে বিলিয়ে, অলক্ষেই ঝরে ঝরে ধূলায় গড়াগড়ি খাও!

জীবনানন্দের পূর্বে কেউই এভাবে আদর করে
স্নেহমাখা কণ্ঠে নাম ধরে ডাকেনি তোমায় –
ডেকেছে কি? ডাকেনি…!

দু’একজন বুলবুলি, খঞ্জনা, দোয়েল শালিক-
কৌতূহলী কিশোর- কিশোরী কৌতূহল বশত: হয়তো
স্পর্শ করেছে তোমায়…
বনদেবির পুজোর থানে, হরিজনেরা
হয়তো কখনো সখনো বনদেবীর পদমূলে
পুষ্পার্ঘে অঞ্জলি দিয়েছে তোমায়, এর বেশি কিছু নয় —
“বারমাসের তের পার্বণেও “-অস্পৃশ্য তুমি!

ভুলেও কারো সুশোভন ফুলদানীতে ওঠোনি
দুর্গা, চণ্ডী, লক্ষী- স্বরসতী শিব মন্দিরেও অচ্ছুৎ ম্লেচ্ছ তুমি!

তাচ্ছিল্য ভরে কেউ ডাকে ঘেঁটু, কেইবা ভাঁটিয়া -ভাঁটি!
জীবনানন্দ যেদিন তোমাকে আদর করে ডেকেছিলো -ভাঁটফুল –

সেদিন হতেই ভাঁটিয়া থেকে তুমি ভাঁটফুল…

সাব্বির রেজা

সাব্বির রেজা

জন্ম:- ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, ভাউডাঙ্গা, পাবনা। 

পেশা-কলেজ শিক্ষক (অবঃ)

আগ্রহ- কবিতা, ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধ

সম্পাদনা - অদ্বৈত (শিল্প ও সাহিত্য বিষয়ক ছোট 
কাগজ)

প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ-
মাধবী লতায় বৃষ্টি
কষ্টের উঠোনে রোদ

ইমেইল- sabbirreja57@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: