লালপাখি, ভাই তার নীলফুল

একটি নীলফুল, ভাই তার লালপাখি, যে-পাখি
যেকোনো অন্ধকার মুছে দিতে পারে, খ্যাতি আছে;

প্রায়ই সূর্যের সাথে বৈঠকে বসে।
সাক্ষাৎকারও নেয়। সূর্য একদিন প্রশ্ন করেছিল—
“তুমি একটি প্রশ্ন কেন?”

লালপাখি অন্য তথ্য দিলেন:
“আমাকে অনেকে জানে ধীরূজ—নিষ্কর্মা।
আমি তাদেরকে আলস্যের ভিতর থেকে ইন্টেলিজেন্স বের করে দেখাই।
তারা তাদের
নিজস্ব ভাষা মরে যেতে দেখে,
শুধু তাকিয়ে থাকে
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের দিকে;
বায়ুমণ্ডলে পায় তারা
সন্তানসম্ভবা মেহেদীগাছ”।

পাখিটিকে দেখানো হল:
এই ঘাস শাদা কালো জীবনের ভাই।
অন্ধকারাচ্ছন্ন পাখিরা তাদেরকে
হাসি দিয়ে যায় রোজ রাতে, সংগোপনে;
ভালবাসা অন্তরে থাকে যেসব পথিকের
তারা দূর্বাঘাসের গুণের পাশে কিছুক্ষণ বসেন,
কথা বলেন, বহুবিশ্ব তত্ত্বের সংসার
দেখতে পান। দেখেন ইউনিভার্স, আকাশগঙ্গা, পৃথিবী ও
সূর্যের চেয়ে কয়েক কোটি গুণ
বড় নক্ষত্র হয়
ছোট পিঁপড়ের ডিম।

হঠাৎ দেখা যায়
লালপাখি এসে
দূর্বাঘাস ও পথিক আঁকে অভিকর্ষে
এ্যাণ্ডি ওয়ারহলের বিড়াল আঁকে
সালভাদর ডালি আঁকে;

একদিন
কথা নাই বার্তা নাই, হঠাৎ
লালপাখি জেনে যায়,
“আপনার পাখিচেহারা এই দুনিয়ায় থাকছে না,
অন্য কোথাও থাকে
যেখানে জিনিস
ঠিক কীভাবে থাকে
মর্ত্যের মানুষ জানে না। তবে
গেট আপ ঠিক আছে, স্মার্ট বেশ,
মিল নেই
অদ্ভুত
কিন্তু চেহারা ও গেট আপ
দুই-ই টানে মানুষের ভিড়; শিশুদের তাকানো যেমন টানে
কিউরিয়াসলি।”

নীলফুল জানতে চায়, “মানে কি?
দুনিয়ার বাইরে থাকা চেহারা,
দুনিয়ার জিনিস কেমনে টানে?”
নীলফুলের প্রশ্নের উত্তর খোঁজে
চৌত্রিশ হাজার পিএইচডি পারসন;
দিন রাত গবেষণা করে তারা
দশ বছর বাদে
সিদ্ধান্ত দেন সেই প্রশ্নটিই—
“দুনিয়ার বাইরে থাকা চেহারা,
দুনিয়ার জিনিস কেমনে টানে?”

তাদের সিদ্ধান্ত দেখে
তলস্তয়ের কবরের পাশের
দুটি ছায়াবৃক্ষ হাসেন।

লালপাখিটি জানতে পেরেছে—
“সসীম আর অসীমের সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে না;
আপনার চেহারা কোথাও ডুবে থাকে;
না, সূর্য ডোবা নাহ্,
না, বন্যার কবলে ডুবে যাওয়াও না।
জিনিসের ভিতরে ডুব—থিংসের ভাবে ডুব;
যেমন আপেলের ভিতর সাঁতার কেটে
আপেল-যে গোলাপফুলের বংশধর, প্রিয় কুটুম
দেখতে পারেন বেশ।
চোখের ভিতর সূর্য নিয়ে
কোথায় কোথায় যান
কে কে জানে? কে জানে?”

আরও বলা হল—
“কিন্তু আপনি আপনাকে টানে,
কাছে টানে, দূরের দিকে টানে
দিকচক্রবালের দিকে
শিরিষতলার ছায়ার দিকে, টানে।
পোশাক আপনার নাই, তবু
এমন-কিছু পরেন, কিছুএকটা পরেন—
ক্লাসিক লাগে বৃক্ষ বলে,
ভালবাসায় ভিজে থাকা
ঘোড়ামাছের গানের মত ধরেন।”

লালপাখি বলল—
“চেহারা ও গেট আপ তারা দুই প্রাণ
গভীর গোপন লাভ এ্যাফেয়ার্সে আছে।
পোশাক পরে মাল্টিকালার
রুপ-সুরতের ঘ্রাণ”।

এই পর্যন্ত লালপাখি থামে,
রৈইদে পোড়ে ঘাসের মেলানকলি তাই
বর্ণমালার কুটুমিতা হয় অফ।

চেহারা ও গেট আপ নিয়ে বসে নীলফুল
শ্রোডিঙারের বিড়াল বাক্সের ভিতর হাসে
ওরা দেখে প্যারাডক্স
একসাথে উপলব্ধ জগতে
বিড়াল মৃত বিড়াল জীবিত
ইউনিভার্সের শাখায় শাখায়;
শ্রোডিঙার ঘড়ি দেখে
সকাল দুপুর সন্ধ্যা বুঝতেন;
বুদ্ধিজীবি, বিজ্ঞানী, দার্শনিক
ঘড়িতে সময় দেখে বোঝেন
ভোর হচ্ছে;
বিড়ালের জীবন চলে তার
দেহঘড়ির হিসাবে।

তারপর একদিন বৃহস্পতিবারের ভিতর
থেকে বুধবারের দিকে উড়ে যেতে দেখা গেল লালপাখিটি।
ডাক দিলে আসে, বসে
বলল—
শুক্রবারের সুবহে সাদেক ছিল,
মঙ্গলবারের হেমন্তও ছিল,
পৌষমাসের শৈশব ছিল
সংগীত জানা পাখির বাড়ি ছিল,
মাংস খায়-যে উদ্ভিদগুলো
তাদের কিছু ডিসকোর্স-ও ছিল।

একবার দেখে নিজের মাঝে
আজব তামাশা;
শনিবারকে লুকিয়ে রেখে
নিজের ভিতর, তার
চেহারা ও গেট আপ হল গায়েব,
খবর এল
খুঁজতে গেছে শীত,
গ্রীষ্মকালের কোলে, মেঘের পাহাড়ে।
চেহারা যদি কলহপ্রিয় হয়
যদি করে ফেলে আগুন অনুবাদ
তবুও তো ভালবাসাই ফোটে।
চেহারা-যে ঘুম পাড়াতে পারে,
চেহারা-যে ঘুম তাড়াতে পারে।”

“কার ঘুম?” জানতে চাইল যখন,
বলে দিল—
দুঃখ এবং ফুর্তিদের ঘুম
দুঃখ এবং ফুর্তিদের ঘুম।

একদিন একটি আগুনগাছ
প্রেমের গল্প বলে স্বর্গছোঁয়া হাসি দিয়েছিল লালপাখির সামনেই।
তখন তার পোশাকের ইমপ্রেশন
গান গেয়েছিল
শন শন হাওয়ার খাপে, ভালবাসার সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে;
এই গানের শিল্পীর অন্য নাম—
পোশাকের চেহারা।

তদুপরি
চেহারা ও গেট আপ
সম্মিলিতভাবে
বাসা বোনা শেষে বাবুই প্রেমিকার পরীক্ষা হয়।
টেকসই হলে কবুল
নইলে—
আই এ্যাম নট দ্য ওয়ান টু হুম ইট মে কনসার্ন।
বলে দ্যায় ষোলআনা আন্তরিক প্রেমিকা।

লালপাখি জানে—
একসাথে দুই হাতে নিয়ে দুই ‘আমি’
আগুন দিয়ে তমিস্রা
মুছে ফেলা যায় ফওরান।

শুধু এই লালপাখি বলেছিল—
“কয়েকটি আস্তো সরস বৃহস্পতিবার
রেখে দিয়েছি বন্ধুর জন্যে।
কারণ
পরিবর্তিত জিনিস বার বার পরিবর্তনের
গল্প বলে—যা বদলাও তা বদলে যাবে।
যেকোনো চেহারা ও গেট আপ
আসে — ফোটে — ভাসে — যায়।”

বলেছিল—
“রূপচান্দা মাছগুলো একেকটি
ভালবাসবার বাড়ি, সদানন্দ ফুল;
ঐদিকে তৃষ্ণার্ত গন্ধগোকুল।”

এইটুকু ছিল সেদিন আমাদের আলাপ
তারপর, আমার লালপাখি
অভিকর্ষের ভিতরের দিকে চলে যায়,
গায়েব হয়।
আমি অপেক্ষা করি তার ফিরে আসার।

সারওয়ার চৌধুরী

সারওয়ার চৌধুরী

কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও অনুবাদক, কলামিস্ট।
প্রাক্তন সিলেট প্রেসক্লাব সদস্য। সহকারী সম্পাদক দৈনিক জালালাবাদ।

ভাষা জানেনঃ বাংলা, ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, উর্দু। তেইশ বছর ইউএই প্রবাসী ছিলেন।
বাড়িঃ আজব নূর মঞ্জিল, নিজামপুর, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেট।

প্রকাশিত বই:
একমুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা, উপন্যাস, ২০০৬, শুদ্ধস্বর।
অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প, উপন্যাস, ২০০৭, শুদ্ধস্বর।
বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে, প্রবন্ধ সংকলন, ২০১২, আদর্শ।
শিশির ও ধুলিকণা মায়া, গল্প সংকলন, ২০১৪, শুদ্ধস্বর।
হারুকি মুরাকামির গল্প ও বচনামৃত, [অনুবাদ গল্প], ২০১৫, চৈতন্য।
ভালবাসার চল্লিশ নিয়ম, অনুবাদ উপন্যাস, মূলঃ এলিফ সাফাক ২০১৬, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০২০, চৈতন্য। 
সাক্ষাৎকার, [অনুবাদ, পাওলো কোয়েলো, হারুকি মুরাকামি, থিক নাট হান],  
সংগীতশিল্পী, [অনুবাদ, মূলঃ কাজুও ইশিগুরো], ২০১৮ চৈতন্য।
লৌকিক মায়া অলৌকিক সুন্দর, প্রবন্ধ সংকলন, অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানী,  ২০১৯, তলস্তয় ও সোফিয়ার সম্পর্কের সৌন্দর্য উদ্ধার ও অন্যান্য, গবেষণা; অগ্রদূত অ্যাণ্ড কোম্পানি, ২০২০। অক্টোপাসের বউ, কাহিনীকাব্য, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, ২০২০     
Email: sarwarch@gmail.com 

ইংরেজি রচনার সাইটঃ
http://www.poetfreak.com/poet/sarwarchowdhury
http://www.poemhunter.com/sarwar-chowdhury/
http://www.completeclassics.com/sarwar-chowdhury/poet-535000/poems/page-1/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *