লক্ষ্মীপেঁচার পায়ে

মহিষচরিত মানস

তুমি এমন সরল, বাতাসের বাথানে দাওয়াই!

তোমারে কষ্ট দিলে মনে হয়
ত্রিপিটকের একখান পাতা ছিঁইড়া ফেললাম!
তা-ও তোমারই মনে দাগ ফালাই।

ক্ষমাসুন্দর মনে দেইখো, এই মিনতি করি গো!

কাউরে কষ্ট দিতে না পারলে বাঁইচা থাইকা লাভ কী!
এককাপ চা না খাইলে তো
সকালটাই ম্যাড়মেড়ে লাগে, কী করুম কও?

তুমি উডানের কোণায় খাড়াইয়া আছো নিমগাছ
শুরুতে তুমি কিন্তু নিমগাছ আছিলা না
তুমি ছিলা ডেউয়া ফলের চারা।

ডেউয়া ফলে যে পানি থাহে
সেই পানি দিয়া আমি মুইচা দিচি হাসির দাগ,
ডেউয়া ফলে যেই না পানি মুচতে যাই
তুমি কও, আল্লা, আল্লা, পানি মুইচো না
তোমার পানির তিরাশ লাগবো,
লাগবোই খালি ঠাডামারা পানির তিরাশ!
চোখের পানি মায়ের আদর, বোইনের উমের চাদর!

একেএকে কতো পইখ পাখালি পাহাড় পর্বত
নদীনালা খাল বিল বাঘ বাঘালি হাত্তি সিংহ দেখলাম
কিন্তু আমার সবথাইকা ভাল্লাগে মহিষ!
আমার মনে হয়, একটা বোবা মেয়ের সবটা কথা,
রেল লাইনের পুরাটা সবুর মিলে হয় একটা মহিষ!

সব পক্ষী উইড়া যায়, বাঁশের আগায় কিচিরমিচির করে
সব খোঁয়াড়ের গবাদি গরুভেড়া চালাকচতুর হইয়া উডে
তামাম দুনিয়া নড়াচড়া করে,
খালি মাডি নড়ে না, কোনহানে যায় না-
জনম জনমভর একজায়গায় খাড়াইয়া থাহে,
আর নড়ে না মহিষ।

ধইরো, তুমিই আমারে মরণের পরেও ধইরো
তোমার কাঙখের কলসে আমি যমুনার জল হইয়া থাকুম,
তুমি কবরের লাহান শেষকথা, মহিষের সমান মেওয়া ফল।

ঘোড়াউত্রা গাঙ্গের কাছে কইচি, আমি
তোমার কথা কইচি!

কামরাঙা গুণাগুণ

প্রত্নের অধিক ওয়ারি বটেশ্বর তোমার দেহভ্রমর
কাজলমাটির নকশাকাটা বাঁক প্রতিমার কোমর।

মেঘ পরিধান কেমন ম্যাজিক ফুটিয়া থাকো টগর
তোমার মায়ায় টলমল করে শত পুণ্ড্রের নগর।

চকিতে নিথর পুরা ইতিহাস বিনাশের ডালপালা
নিদয়া হও ক্রিয়াবতী নারী গাঙ্গের ছলাকলা।

প্রথম মোহে মেলিয়া ধরো অবিশ্বাসের ময়ূর
ফোটাও পরান তামা রৌদ্রে নিত্য আগুনপুর।

শস্যগন্ধা পাখির প্রথা দূর নিশানার দিক
পানরাঙানি ঢেউয়ের সমন ফুলের কসম নিক।

ভাঙন দিনের রাজহংসী নৃত্যবতী আকার
ডুবো ডুবো সঙ্গোপনে মৌনপুরে যাবার।

নৃতাত্ত্বিক

প্রতীক্ষার কোন পাসপোর্ট লাগে না;
না লাগে ভিসা দরোজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাউগাছের ।

যদি ইচ্ছা করো- নালিশ করে রাখতে পারো জাতিসংঘের মাকুন্দ দহলিজের কাছে-
আমার কৃষিজীবী গমক আর গতিবিধির কথা;
আমি বুকের নাসায় তুলে রেখেছি
কদমফুলের ব্যাকুলতা বিজ্ঞান,
তাহার পা ধুয়ে দেবো বলে
করকমলে ধারণ করেছি বর্ষার প্রথম ভেষজ জল!

সব সুগন্ধি দিনশেষে লোবানের কাছে যায়,
সব জল কবরের জ্যোৎস্নায় করোটির
আর্তির গহ্বরে এসে মেশে;

প্রটোকলের দোকান এখনো আমাদের পাসপোর্টে
সিলমোহর মারেনি,
নিরাপত্তা অফিসে দেখিয়েছি আমি প্রজাপতি
আর একটি উন্মুক্ত জবাফুলের বিভা;

আমরা এবার তাহলে পাসপোর্ট জমা দেবো
একটি ডাকঘরের কাছে-
যে ডাকঘরের অধীনে কোন ঠিকানা প্রকল্প নেই;

নৃতত্ত্ব বাজায়, মনমাঝি শোনে বৃষ্টির তারানাখানি :
তানানা না, তানানা না ইতিহাসপূর্ব ঘরানার সিম্ফনি!

স্থিরচিত্র

আমি তোমাকে রোপন করি
দেহ, বিফলতা আর দোজখের শিখায়
তুমি আমাকে ডুবিয়ে দাও
ভারসাম্য, সফলতা আর নিরাপদ ডিঙায়!

আমি তোমাকে ভালবাসি
রূপকথা, বিজ্ঞান আর যাদুবাস্তবতায়
তুমি আমাকে ফিরিয়ে দাও
ঈশ্বর, সৌজন্য আর জাতিসংঘের কথায়!

লক্ষ্মীপেঁচার পায়ে

লক্ষ্মীপেঁচা মানুষেরই প্রকৃতি-
ঘুম পেলে সবার আগে পা জড়িয়ে আসে।

সব মানুষই হাওয়া, হাওয়ার দূরবীন
সব হাওয়াই লতাগুল্মের চুলের উপর নাচে
সব হাওয়াই যে ইস্পিরিঙের চাবি পোষে!

লক্ষ্মীপেঁচা তমসার, ভুবনডাঙা বেহুলা পাটক্ষেতে
সবুজ সবুজ উশের বাড়ি যায়,
বধুটি যে চুল খুলে উনুনের পাশে বসে
মন বিনোদিনী লক্ষ্মীপেঁচা তার আঁচলের গোছায়
ঝনাৎ ঝনাৎ সংসারের চাবি গুঁজে সই!

রাঙা বধুটির কৃষ্ণ আঁখিজোড় লজ্জাবতীর নদী
হেলানো বতুয়ার শাক, এক ছিটা নুনের গুণে
দুধে ভাতে মায়ায় বেঁধো- এই রাখি আমার
চাবির গোছা তোমার আকনমেন্দি হিয়ার কোঠায়!

নক্ষত্র ডাকে দূর আঙিনায়- বধু তোমার চোখে
কেন এতো অঘ্রানের উশ দুধের সরের নামে বসে,
যেতে হবে অন্তরীক্ষপুর- পা কেন ঘুমে জড়িয়ে আসে?

সুন্দরের সুইসুতা দড়াদড়ি

যা- কিছু সুন্দর, তা সবসময় কিছুটা ব্যথিত।

দিনান্তের সূর্য, শিশুর অনাবিল হাসি,গাছের খোঁপাখোলা চুলে হাওয়ার বিলোড়ন এতোটা চিত্তহর, কেননা তার মধ্যে চলে যাবার একটা পোঁচ লাগানো আছে; আকাশে নির্লিপ্ত গৃহীত চাঁদ কোন দিগন্তে ছড়িয়ে দেয় কেমন এক ছায়া- তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মনরে আমার! দা ভিঞ্চির মোনালিসা এতো মন টানে, কারণ আমরা দেওয়ালে টাঙানো মোনালিসার নামে আসলে দেখি ওই মোনালিসার আনন্দব্যথিত উৎকন্ঠাবিহ্বল ছবি যে চলে গ্যাছে দূর, বহুদূর!

কাঁচাপাকা ধানের গোছা বাতাসে হেলেদুলে তোলা ভরতনাট্যম কৃষকের চোখে এক সুতীব্র জঙ্গম সুন্দর, কেননা ওখানে প্রোথিত তার জীবন সংগ্রাম আর ধানের ন্যায্য দাম না পাবার আহাজারি ।

গাছের ডালে বসে থাকা একটা ময়না পাখি অপরূপ সুরের বর্ণেবর্ণেরচিত- খানিকক্ষণবাদেই সে উড়ে চলে যাবে দূর অজানার অসীমে।

জীবনের নানা কোটা আর পর্বের মধ্যে শৈশব সবচেয়ে রঙিন, যেহেতু সে চলে যায় দূরে ; বার্ধক্য আমাদের অতোটা টানে না- সে-যে চলে যায় তা দেখার সুযোগ আমরা পাই না।

যারাই নিজের হাতে ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করে তাদের সবার হাসি অসম্ভব সুন্দর।

যা-কিছু সুন্দর, তাতে সবসময়ই কিছু না কিছু ব্যথার পোঁচ লেগে থাকে!

তামাদি ভ্রমর

একটি বনসাই বৃক্ষের দিকে চাইলে
প্রথমেই খুঁজি দয়াবতী জননী কি আছো
অথবা ধারেকাছে হৃৎকমল রাধিকা আমার?

আমাকে এক গ্লাস জল দাও!

এতোগুলো আমি- একজন আমি বনসাই দেখি
কেন বটবৃক্ষ বুঝি সব কাটা পড়ে গ্যাছে,
কবন্ধ প্রেমিকের সাথে শুয়ে পড়েছে নাকি রেইনট্রির গাছ?

হরিণেরা জমা হয় এসে খালি আকাশের নিচে
ছায়া ছায়া মিলে যায় পাতাদের ক্লাব
ইতিহাস মুখ দেখে উটের গ্রীবায়
খুঁজে দেখো স্মৃতিকলে শকুন্তলা বন।

এযে আমি- বনসাই, কালের তামাদি ভ্রমর
টেনে ধরো পাতা কেটে ডালের দীঘল
চোখের একোরিয়ামে সেঁটে দাও ক্ষরিত স্বনন
হৃৎকম্পনের আয়নায় নির্ঘুম তারা।

পিপাসা, পিপাসা এমন ইতিহাসের কাটা তরমুজ
কে দিয়েছে কেটে আমার তিরতির মোরগের ঝুটি
জন্মের ভিতরে কেউ কি আছো রাধিকা আমার?

আমাকে এক গ্লাস জল দাও!

কাসান্দ্রা

যার সাথে দেখা হবে কথা ছিল, সে থাকে
নদীঘোরে শামুকের পাশে।

তোমার ধুলা মেশে তারাদের সনে, জল খোলে
হাওয়া প্রতিমায়, রাখালিয়া লখিন্দর আগুনেদুধে
ফোটায় যাত্রাপথের রেখা, তুমি জানো-
ঢালুর সামনে কেমন মৃত আকুতির বাড়ি!

তুমি সুফিয়া, কাসান্দ্রা তুমি
দেখো অনাগত কাল, স্মৃতি পদাবলী;
একা বয়ে যাও অ্যাপোলোর অভিশাপ ধ্বনি!

চোখে তোমার কাঁপে ডুমুর পাতা;
আমার আয়ুজুড়ে ছলাৎছল ভাসো কালো নৌকা,
শস্যের উপর পা মেলে বসো,
মরণ ও পানকৌড়ির পাখা ঝাপটাও অশ্রুসজল হেসে

যার সাথে কথা ছিল- সে থাকে নদীঘোরে
শামুকের পাশে।।

বদরুজ্জামান আলমগীর

জন্ম - ভাটি অঞ্চল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে। পড়াশোনা বাজিতপুরে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বহুদিন দেশের বাইরে- যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় থাকেন।
আগ্রহ – কবিতা, নাটক ও অনুবাদ।
বাঙলাদেশে নাটকের দল- গল্প থিয়েটার- এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; নাট্যপত্রের সম্পাদক। নানা পর্যায়ে আরও সম্পাদনা করেছেন- সমাজ ও রাজনীতি, দ্বিতীয়বার, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্ণপথিক, মর্মের বাণী শুনি, অখণ্ডিত।

প্যানসিলভেনিয়ায় কবিতার প্রতিষ্ঠান- সংবেদের বাগান-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

প্রকাশিত বই- 
আখ্যান নাট্য : নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে, আবের পাঙখা লৈয়া।
কবিতা : পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর, নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো, দূরত্বের সুফিয়ানা।
প্যারাবল : হৃদপেয়ারার সুবাস।
অনুদিত কবিতা : ঢেউগুলো যমজ বোন।
ছিন্নগদ্য : সঙ্গে প্রাণের খেলা।
প্রকাশিতব্য নিবন্ধ : আশ্চর্য বতুয়া শাক ও কাঁচা দুধের ডিসকোর্স।
ইমেইল- ecattor@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: