যে-জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের— মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা

প্রচলিত বলিউড মেলোড্রামার সমস্ত উপকরণ নিয়েও খুবই সাধারণ কিন্তু আত্মস্পর্শী গল্প বলার ভঙ্গি, নদীর মতো বয়ে যাওয়া শীতল গল্প, আর আচ্ছন্ন করে রাখার মতো অভিনয় নিয়ে সুজিত সরকারের অপ্রাপ্তির হাহাকারের আড়ালে এক দারুণ প্রেমের সিনেমা “অক্টোবর”। পাহাড়সম ভালোবাসা আর “পেয়েও না পাওয়া” এক দীর্ঘশ্বাসের সুনিপুণ বুননে অক্টোবর যেনো শীতের সূচনার মতো যে কারো মনে প্রেমের ঋতুর শুরু।

অল্প করে সিনেমার গল্পটা বলে নেই, দানিশ আর শিউলি হোটেল ম্যানেজমেন্টের দুই শিক্ষানবিশ। এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় শিউলি আর দানিশের মাঝে বিরল কিন্তু দারুণ সংবেদনশীল একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে। যে সম্পর্কে চাওয়া-পাওয়া নেই, দাবিদাওয়া নেই। আছে শুধু মুখোমুখি বসিবার হাজার বছরের নির্জন প্রেমের অনুভূতি। সিনেমার প্রথম দৃশ্য থেকেই ঘন কুয়াশা, নির্জন পরিবেশ, শীতল বৃষ্টি আর শিউলি ফুলের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যেকটি দৃশ্যে প্রত্যেক চরিত্রে।

অক্টোবর কি প্রেমের সিনেমা? বোধহয় হ্যাঁ, আবার হয়তো না। তবে রবীন্দ্রনাথের “তুমি রবে নিরবে” গানের মতো অক্টোবর সিনেমাটি যে কারো মনের নির্জনকোণে জায়গা করে নেবে। পরিণতির স্পর্শ না দিয়েও পুরো দেহ-মন জুড়ে তীব্র এক প্রেমের অনুভূতি ছড়িয়ে দেবে।

প্রচন্ড ব্যস্ততা, প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা আর ভয়াবহ আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার এই সময়ে নিখাদ ভালোবাসার গল্পই যেনো খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এখনকার দুনিয়ার প্রেমগুলোও যেনো সময়ের সাথে গতিশীল আর রগরগে। অক্টোবর কিন্তু সম্পূর্ণ তার বিপরীত দৃশ্য। এই গল্পে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। নেই কোনো প্রতিযোগিতা আর ব্যস্ততার ভান৷ আছে শুধু মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা শান্ত নদীর মতো না বলা ভালোবাসার গল্প।

অক্টোবর কি সবার জন্য? সিনেমার একটা দৃশ্যে একজন নিউরোসার্জন বলেন, “ধৈর্য ধরুন৷ আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা করছি।” এই সিনেমায় সেই ধৈর্যটাই প্রয়োজন। পরিচালক নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে আপনার অনুভূতির প্রত্যেকটি পরতে পরতে ছোঁয়া দিতে চেষ্টা করেছেন। সেই ছোঁয়াটা পেতে হলে আপনাকে ধৈর্য সহকারে ভালোবাসাটা বুঝতে হবে।

জুহি চতুর্বেদীর চিত্রনাট্যের আলাদাভাবে প্রশংসা না করলেই নয়। জুহিতো শুধু গল্পটা লেখেননি, তাতে দারুণ ভাবে জীবন দিতে সক্ষম হয়েছেন। মন ভুলানো হাসি আর বেদনার শব্দগুলোই যেনো সিনেমার কথারূপে আমাদের সামনে হাজির করেছেন। অক্টোবর সিনেমায় প্রচলিত অর্থে কোনো গান নেই। আছে গভীরভাবে বেঁধে রাখার মতো সুরের মূর্ছনা। শান্তনু মৈত্র যেনো গল্পের নৈঃশব্দতাকে আরো বেশি ছড়িয়ে দিয়েছেন আবহ সংগীতে। ভারুন ধাওয়ান, নবাগত বানিতা সাধুর নিখাদ অভিনয়ে মনেই হয় না কেউ অভিনয় করেছেন! সবটাই এত বাস্তব জীবনের তুলে ধরা ফ্রেম! অভিক মুখোপাধ্যায়ের দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি চোখের জন্য দারুণ প্রশান্তির সাথে গল্পের আন্তরিক রেশটাকেও ধরে রেখেছেন দারুণভাবে।

অক্টোবর সিনেমায় কোনো ত্রুটি নেই? সব সিনেমার বোধহয় সমালোচনা হয় না, হয় শুধু মুগ্ধতার আলোচনা৷ অক্টোবর আমাদের সম্পর্কগুলোকে নতুন করে সামনে এনে বলে, ভালোবাসার অনুভূতি এক পৃথিবীর ছায়ার সমান। সিনেমার শেষ হয়তো হয় কিন্তু আচমকা জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়া অক্টোবরের নির্জন ভালোবাসার যে কোনোদিনও শেষ হবার নয়।

“শুরু হলো অন্য এক জীবন। পড়ে থাক পিছনের ছায়া। ছায়াবৃত স্মৃতির মায়া। একদিন পৌঁছে যাবো, যেখানে যায় নি কেউ তোমারি খুঁজে। শুধু তুমি, আমি আর আজন্মের নিরবতা। – মুজিব ইরম ”

ইফতি চৌধুরী

জন্ম- ১৯৯৭
পেশা- শিক্ষার্থী
ইমেইলঃ toopuleela@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: