যতিচিহ্নের বাইরে রাখো পা

জীবন সংক্রান্ত অভিমত

জীবন এক বিষন্ন সন্ধ্যা!
কখনও আকাশের কোণে ঝুলে থাকা চাঁদ
কখনও জোনাক
অতীতের উঠোন জুড়ে নিরবতা ভেদ করে
জেগে থাকা দখিনা হাওয়া।
কখনও পায়েহাঁটা পথ
কখনও শূন্য-বেদনাহত এক টুকরো বারান্দা
বারান্দায় বসত করে বাসিন্দা
সে আমার পড়শি, কাছে থেকেও অনেকদূরে
তবু তার পাখোয়াজ মন
আমার চারপাশে ঘুরে-ফিরে

অচীনকালের মহাযাত্রার সকরুণ সুর
আমাদের কণ্ঠকে বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে গেছে
পথ তবু পরে থাকে পথে
বিষন্ন সন্ধ্যারা ঘুড়ি হয়ে উড়ে
উড়ে যায় উত্তর হতে ক্রমশ দক্ষিণে!

বারান্দায় জমে থাকে ধূলো
ধূলোর সংসারে স্মৃতিদের অবিরাম আসা-যাওয়া।

যতিচিহ্নের বাইরে রাখো পা

যতিচিহ্নের বাইরে রাখো পা
তোমায় দেবো প্রেমের মানচিত্র
লাবণ্যমাখা নীল খাম আর কফির পেয়ালা
ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেগে থাকুক সারল্য নিয়ে।
ভূগোল দিতে পারি
টারশিয়ারি যুগের দিগম্বর নৃত্য,
জলসাঘরের বেলোয়ারি ঝাড় দৃষ্টির বাইরে রেখে
কবির সম্মুখে এসে মাথা নত করো
দেখবে, ঈশ্বর আর কবিতে কোন ব্যবধান নেই

প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বন্ধনিতে আটকে থাকে না জীবন
অনন্ত নির্যাস থেকে উঠে এসে
জেগে থাকে পয়ারবিহীন পদ্যের স্বাধীনতায়

যতিচিহ্নের দেয়াল ডিঙিয়ে প্রশস্ত আঙিনায় দাঁড়াও
তোমার হাতে তোলে দেব
জীবন ঘনিষ্ঠ গল্পের ধারাবাহিক পরিক্রমা।

এইসব কবি

পূর্ণিমাস্নাত খড়ের বারান্দা থেকে দু’কদম সামনে এগুলে
অমরাবতীর স্পর্শ খুঁজে পায় এইসব কবি
ওরা মূলত নিসর্গপাঠক, বর্ষীয়ান প্রাণেও গজিয়ে উঠে
কঁচি-কঁচি আম্রমুকুল
এবং হাওয়া ছুটে আসে কবিতার অদৃশ্য দরিয়া থেকে
জড়িয়ে থাকে সেথায় বনমহুয়া
আতরদানির বিন্দু-বিন্দু জল।
কলমের ডগা লাউয়ের ডগার মতো সবুজ হয়ে উঠে
ফলবতী অবারিত মাঠ হয়ে উঠে কবিতার পাতা

জ্যোৎস্না আর প্রজ্জ্বলিত মঙ্গলপ্রদীপের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই
দুটোই পরিশুদ্ধ করে পৃথিবীর প্রাণ
যেমন বেদমন্ত্র আর কবিতার সবুজাভ উচ্চারণ
এক ও অভিন্ন লাগে।

গণিতশাস্ত্রেও কবিতা থাকে

মার্কারপেন আর হোয়াইটবোর্ডে
ঝুলে থাকে গণিতশাস্ত্র
মোটা চশমাধারী শুভ্র চুল একগুচ্ছ মাথায়
দাঁড়িয়ে থাকেন লেকচারটেবিলের সামনে
তাঁকে এড়িয়ে ত্রিকোণমিতির দিকে নজর যেতেই
কবিতা হয়ে উঠে আঁকাবাঁকা নদী
উপবন, চিনামাটির পাহাড়, হা-মুখো হাওরের জল

গণিতশাস্ত্রে দুর্বল যেজন
কাব্যশাস্ত্রে তার নিবিড় বিচরণ
লাগে না এতটুকুও খাপছাড়া

ধনুকধারী হাতে ধরে শেখায়নি তীর নিক্ষেপের কৌশল
আপনিই তীরন্দাজ হয়েছি মনীষার বক্ষে
রাসলীলার আসরে স্ফীত যৌবন
কৈবর্তপাড়ায় গিলে খায় মদ
গন্ধ লেগে থাকে শরীরের ’পর

গণিতশাস্ত্রেও চাষাবাদ চলে
কিশোরীর মতো রাশি-রাশি কবিতা
ক্লাসরুমের আড়াল থেকে উঁকি মারে
যেন দীর্ঘদেহি কেউ একজন
চক, ডাস্টার আর ব্ল্যাকবোর্ডে এঁকে চলেছে
স্বপ্নের চেয়েও অধিক ব্ল্যাকহোল-মহাকাশ।

কবিতা কিংবা চৈত্রের কোরাস

কবিতা থেকে ধূপের ঘ্রাণ আসে
যেমন মন্দির থেকে, সন্ধ্যার তুলসীবেদি থেকে
শবদেহের চারপাশ থেকে ভেসে আসে তীব্র আর প্রখর
একই ঘ্রাণ; অথচ ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন লাগে।

তুখোড় চৈত্রে পাই মাটিপোড়া ঘ্রাণ
এই ঘ্রাণ মিশে যায় পিতামহের দীর্ঘ দেহের
কোমল কোঠায়-কোঠায়
মন্দিরের চাতালে বসে যেখানে পিতামহী
তালবাখড়া হাতে ঘন-ঘন শ্বাস ছাড়ে
তার শূণ্য ঘরে হঠাৎ হানা দেয় দিনের ডাকাত!
মাটি কি তবে কবিতার সহাবস্থান পেয়েছে আজ?

দারুণ ত্রাসে বাতাস গিলছে সীমাবদ্ধ ভাঙচুর
তৈজসপত্রের গা থেকে শুরু করে
উঠোনে বিছানো হলদে খড়ের মিশ্র গন্ধ
আমাকে দূরন্ত স্বপ্নের দিকে ঠেলে দেয়
আসন্ন গ্রাম্যমেলায় পিতার হাত ধরে
আমি কি তবে ফেরি করব আবার কবিতার স্বপ্ন!

নিভে গেল তার সহস্র বছর

অতঃপর নিভে গেল তার সহস্র বছর
টারশিয়ারি পাথর ভিজে গেল সমুদ্রস্নানে
দ্বিধান্বিত সময়, তবে আজ কোন পথে যাবে?
কোন মহা জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে
নতুন করে জাগাবে প্রাণ, প্রাণের কদম
শুধাও একবার অন্তত আড়ালে চলে যাওয়া
অফুরন্ত প্রাণের ভাণ্ডার!

আদি বৃক্ষের ডালপালা ভেঙেছে বলে
জপ-তপহীন কাঙাল পথের ধূলায়
মিশে গেছে প্রেমহীনতার মধ্যগগন

তবে কেন আর হেঁটে যাও কবি
মেঘবালিকার আঁচল ছোঁবে বলে
বৃথা কেন কবিতার গায়ে নখাগ্র আঁচড় হানো…

বসন্ত উড়ে না

বালু নদীর তীরে জেগেছে জনপদ
তবু আজ বসন্ত উড়ে না
সন্ধ্যার বাতাসে ভাসে না জলডাহুকের গান

পাহাড়ের উচ্চতা ঢেকে রাখা কুয়াশা
তোমার সামন্তদিনের ইতি টানবে কবে?
পাতার বরিষণ শেষে রঙের সাম্পান
বাসন্তি উৎসবে হৃদয়ের একান্ত দীনতায়
জাগাবে জীবনের সাথে জীবনের যোগ

নদীতে সাঁতার কাটতে জানো যারা
দুরন্ত দিনের সুন্দর ওগো
আমার চোখ থেকে নামাবে কি কঠিন পাথর?
ভাটিয়ালি সুরে করবে কি রাত্রিযাপনের আয়োজন?

অসীম আচার্য্য

অসীম আচার্য্য

জন্ম ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৮৪ পাথরাইল, দেলদুয়ার, টাঙ্গাইল। 

পেশায় কলেজে শিক্ষকতা (ধলা স্কুল এন্ড কলেজ, ত্রিশাল)

আগ্রহ কবিতা ও গানে।

সম্পাদনা- বৈঠক

প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থ-
চোখে তার দাঁড়কাক বেঁধেছে বাসা(২০১৮)
শব্দপাঠ কিংবা সমুদ্র আবাহন(২০১৫)
ঢেউয়ের ভিতর আমাদের প্রণয়(২০১৩)

ইমেইল- asimacharjee1984@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: