মৃৎফুলের নকশা

ছোটবেলা আমি আমাদের পুকুরে সাঁতার শিখেছি। যখন সাঁতার শিখতাম কেউ না কেউ ঘাটে বসে থাকতো। কিছুতেই একা ছাড়তোনা। এভাবে বহুদিন কেটে গেলো। কিন্তু আমার সাঁতার শেখা হলোনা। একদিন দুপুরে পুরো বাড়ি যখন ঘুমায় তখন আমি একাই ঝাঁপ দিলাম পুকুরে। ডুবে যেতে যেতে, পানি খেতে খেতে, প্রাণপণ হাত -পা ছুড়তে লাগলাম। অদ্ভূত এবং আশ্চর্যজনকভাবে আমি ভেসে উঠলাম। এবং পানিতে ভাসতে থাকলাম।

কবিতা আমার কাছে সেই প্রথম সাঁতার। জীবনের থৈ থৈয়ে আমি যখন ডুবু ডুবু তখন আমি কবিতায় আমার হাত – পা ছুড়ে দিই। ভেসে উঠি। যখন লিখতে পারি মনে হয় সাঁতার কাটছি। স্বচ্ছ জলের কোনও লেকে। আমার পাশে পাশে সাঁতারে বেড়াচ্ছে জলজ ফুল, অজস্র পানকৌঁড়ি। পাড়ের গাছের সবুজেরা আবেশে নুয়ে আছে আমাকে ঘিরে।
-অনুভব আহমেদ

ব্যাধ

জলের শরীর খুলে বেরিয়ে আসা রূপালি মাছ
তোমার কাছে পরাস্ত হয়ে কাঁদে আমার শিকারি পন্থা।

এই অবোধ কান্নার দিনে আমাকে দিতে পারো মুঠোভরে ভাঁটফুল?
এসে দাঁড়াও ইচ্ছের কাছে
তোমাকে গাইবে বৃষ্টি শেষের দুলতে থাকা হাওয়া
মানুষের অশেষ ক্লান্তি
আমাকে এঁকে ফেলার আগে
তোমার চিবুক ছোঁয়াও ডুবগামী রূপালি মাছ।

নেকরোফিলিয়া

প্রলেতারিয়েত হাঙরের দাঁতে ঘুমিয়ে পড়েছে শরৎ
ফ্যান্টাসি জুড়ে কালো রঙের মাইম, জোকার মঞ্চ
অস্তিত্বের ওপর ঝুঁকে আধোলীন
সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে থাকা অন্ধকারপ্রিয় জানালা
তোমার ভঙ্গিমা এড়িয়ে
ক্ষুধা আমাকে ফেরি করে পৃথিবীময়।

এখানে আধোছায়া
মাংসের মর্মরে ভাঙার আওয়াজ
ধাতুফলকের বিচূর্ণ রঙে উড়ে যাচ্ছি
কুহকে, অন্তরালে পালকের নরম কাটছে দাঘ্রিমা
তোমাদের শহরে আমার স্বাধীনতা মিথের পতাকা।

আগুন আর পোড়াচ্ছেনা
গড়ে নিচ্ছে কঠিন
এখন সকল আঘাতই ঝঙ্কার
তথাপি আমার শরীরে বিরহ খোদাই করে চলেছে যে কারিগর
সে বড়ই নিখুঁত।

ক্লাসঘরের নৈঃশব্দ্যহিমে আমাকে কাঁদে শিশুর মন
পেন্ডুলামের অশনিসংকেতে
দিকপালহীন বাড়ছি আমি

বেঁচে থাকার বেরসিক মেমব্রেনে।

ঘুঁটি

একদিন খুব ঝিঁঝিঁদের ডাক শুনে আমরা যে পথ ভুল করেছিলাম বাঁক বদলের মুখে সেখানে তল খুঁজে পায়না শিশুদের ঘুম।
হরফে লুকানো নির্জনতায় প্রলাপগুলো ক্ষণমাত্র!
আমাদের গাঢ় অভিসন্ধিগুলো গাছের পাশে উদ্ধত কুঠার
নিজেদের চোখে চোখ রাখা তীব্র বিষাদে
পথিকবর তুমি কোথায় চলে যাও?

তোমার চোখের বিষাদ আমি খুঁজেছি সমস্ত। জ্ঞাত অভিলাষে আর অভিলাপে তুমি চূড়ান্ত।
ইঙ্গিতের দিকে ডেকে অন্তিমের ছল। এভাবেও হয়!
প্রিয়, আমার সাবধানী নৌকা, আমিও শিখে গেছি ছল। মৃৎফুলের গলনাংকে এইবার তুমি চেলে দাও অগুনতি ঢেউ।

অন্ধকারের জার্নাল

ক্ষুধার পরিসরে ক্রমান্বয়ে ফুটপাত বদল করে মানুষের ভেতর মৃতবৎসা জীবন। কবর এক লৌকিক সমাপ্তি, যারও আগে নিভে যায় প্রাণ।


প্রত্যেক ভ্রমণ শেষে দাঁড়িয়ে থাকা একই দিকে। ঘুঙুরের শরীর জানে কতো আঘাতে তার ঝংকার। বাঈজির নিভৃতে মানুষের ব্যথার কী আশ্চর্য নিনাদ।


মেঘলা তরুণীর দিন ঝরে গেলো বৃষ্টির শরীরে। করোটির কালো শ্যাওলায় ছোট্ট বাড়ি। সূর্য ডুবে যায়।


চিনতে এতোটুকু ভুল হয়না। বরফক্ষেতে শুয়ে থাকা নিজস্ব দেহলিপি। আয়না আলাপে নিশ্চুপ, তোমারই তো মুখের কঙ্কাল।

দূরত্বে যখন শীতকাল নামছে

আমার দিনগুলোকে উইপোকার মতো কেটে ফেলছে যন্ত্রণা
ভেতর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাসগুলো ছোবল বসাচ্ছে বুক বরাবর। আর আমার দিকে তাকিয়ে খল হাসছে এ জীবন।
কিন্তু তুমি বিশ্বাস করো, পোতাশ্রয়ে ঝিমুতে থাকা জাহাজের মতো অতো ক্লান্ত হতে আমি চাইনি।

আমি চাইনি তোমার আত্মা থেকে আমার আত্মার দূরত্ব হোক মেশিনগানের মতো ভয়াবহ।
আমি চাইনি তোমার প্রতি আমার অপ্রেম মোরগের লাল ঝুঁটির মতো অহংকারী হোক।
আমি তোমাকে চেয়েছি ভোরভাঙা হুইসেলে
পেট্রলরেখা ধরে মুছে যাওয়া প্রতিটি মানুষের পায়ের চিহ্নে।

পুরো হেমন্তকাল জুড়ে ঝরে যাওয়া শিশিরের শরীরে পা ফেলে শীতকাল এসে দাঁড়াচ্ছে মৃতমুখোদের মতো
ক্রমেই আর্দ্রতা হারাচ্ছে আমাদের বিষণ্ন হৃদয়।

ফুলের কাছে প্রার্থনা

ফুল, তোমাকে পাই, যেনো দাঁড়িয়ে থাকা স্টেশন
পারাপার শেষে যাত্রীর ফেলে যাওয়া
বিচ্ছেদ নিয়ে বসি, পাশের চেয়ার চোখ তুলে জানতে চায় কেমন আছো?
আমি কেমন আছি ফুল?
আমি বুঝি বাতাসের দোলে কাঁপতে থাকা পাতার সর সর
দুধ দোয়ানোর আত্মভঙ্গিমা
এই যে নিরুত্তর ঝোপ হয়ে ছেয়ে আছো
উড়ো হাওয়া ঘ্রাণ এসে লাগে
আত্মার দ্বৈরথ হাঁটু গেঢ়ে বসে থাকে
আমার কোনো মুক্তি নাই ফুল?
অনেক মেঘের পর রোদকে হাসতেই হয়
অচেনা হাত ছুঁয়ে ফেলার আগে
তুমি একবার ফোঁটো ফুল
তুমি একবার ফোঁটো।

অনুভব আহমেদ

অনুভব আহমেদ

জন্ম : ৫ই নভেম্বর ১৯৯৩
আগ্রহ - কবিতা
প্রকাশিতব্য গ্রন্থ - মৃৎফুলের নকশা
ইমেল - onuvob96@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *