মৃত্যু প্রলাপ – শরীফ মল্লিক

আজ পনের দিন হলো আজিজ মিয়া আলাদা খায়। একই সংসারে থেকেও আলাদা বিষয়টা জানাজানি হলে পাড়াপড়শিদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়। সেদিন রিপনের দাদি আজিজ মিয়ার বৌকে পেয়ে বলল, ছিঃছিঃ রহিমা, এইডা কি হুনতাছি। বেকদিন পার কইরা অহন এই বুড়া বয়সে আলাদা খাও? এইডা তো ভালা না।

রহিমা একটু রাগান্বিত স্বরে উত্তর দিয়েছিল, হ অইছে অইছে। নিজের চিন্তা করুইন। মাইনসের চিন্তা না করলেও চলবো।
রিপনের দাদি ভিড়ভিড় করে কি যেন বলতে বলতে চলে গেল।

আজিজ মিয়ার মন খারাপ থাকে। সবসময় মন খারাপ থাকে। মনের ভিতর কিসের যেন হাহাকার, অচেনা বেদনাবোধ বাসা বেধেঁছে। দিনদিন সংসারের প্রতি বৈরাগ্যভাব তাকে সবার থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। আজিজ মিয়া ভাবে আহারে! সোনার সংসার, তোরে কত্ত কষ্ট কইরা গইড়া তুললাম। কার লাইগা করলাম? আজিজ মিয়ার গরীবের সংসার। ছেলে মেয়েরা ঢাকায় থাকে। টুকটাক টাকা পয়সা যাও পাঠায় তাও তাদের মায়ের হাতে। বাবা যেন পর পুরুষ, এ বাড়ির কামলা। মায়ের হাতেই সংসারের চাবি কাঠি। মায়েই তাদের সব কিছু। এত বড় ঘটনা ঘটলো নিশ্চয় হুনছে। হুনারই তো কতা। কিন্তু আমি যে আলাদা খাই এইডাও কি হুনছে? আমি রানদাবাড়া কইড়া খাই এইডা? প্রশ্ন উঁকি দেয় আজিজ মিয়ার মনে।

আজিজ মিয়া কি তার সন্তানদের এই কথা বলবে? ভাবে। নাহ, বাপ অইয়া কেম্নে কই! দরকার নাই।

রান্না এক আধবার করলে করে, না করলে নাই। বাড়ির পাশেই বাজার। বাজার থেকে রুটি কলা খায়। রাতে চিরামুড়ি। দিনের পর দিন যায়। রহিমা চায়া দেহে না। জিদ কমে না মাগীর। আজিজ মিয়ারও জিদ চাপে মনে, হে বেডি অয়া পারলে, আমি পারতাম না! যেদিন না পারাম, মইরা যায়াম।

ছেলে মেয়েরা কল দেয় না। বাপের খোঁজ খবর লয় না। ছোট ভাই বউ, কয়দিন ডেকে খাওয়াইছে, কয়দিন ডাহন যায়, তারও তো সংসার আছে। এখন আর খাওয়ায় না। এ বাড়ি থেকে, ও বাড়ি থেকে মাঝেমধ্যে দুয়েক বেলা খাওয়ায় কিন্তু আজিজ মিয়া চিন্তা করে, তার ত্রিরিশ বছরের সংসার করা বেডি তো তারে ডাহে না। হাত ধইরা টান দিয়া কয় না, যা অইছে অইছেই অহন আয়া পড়ুইন। আমিও বুঝবার পারি নাই। কই, কয় না তো। আজিজ মিয়া কয়েকদিনেই তো অপেক্ষা করছে, রান্নার সময় আড় চোখে চায়া দেখছে। কিন্তু না, তার বেডি তারে ডাহে না। জিগায়া দেহে না, কিইদ্দা খাইছুন।

ঝগড়ার পর থেকে আজিজ মিয়া আলাদা খায়, আলাদা থাকে। যে ঘরটিতে তিনি থাকেন তা বেশ পুরনো। পরিত্যক্ত। দরোজা জানালা নেই। একটা আধভাঙ্গা চকি। তাও মচমচ শব্দ করে। ঘরময় ধুলোবালি আর মাকড়সা জাল রাজ্য বিস্তার করে আছে। একটি পুরনো ঔষধের শিশিতে পাটের সলতা ঢুকিয়ে কুপি বাতি বানিয়ে নেয় আজিজ মিয়া। অল্প সময়ের জন্য তা জ্বালায়। তাছাড়া তেলের দামও কম না। হাতের টাকা ফুরিয়ে আসে। ফুরায়, ফুরাক, তবু বেডির কাছে টেহা চাইতাম না।

আজিজ মিয়ার মনে পড়ে ত্রিশ বছর আগে এই ঘরেই তাদের সংসার শুরু হয়েছিল।

একদিন রাতে আজিজ মিয়া ভাবে পাড়ার ফকির মিসকিনও তার চেয়ে ভালা আছে। তার সংসার আছে, সন্তান আছে, অথচ মূল্য নাই। সে খুব দুঃখ পায়। কাঁদে। শুয়ে শুয়ে বালিশের লগে কথা কয়। জীবন নিয়া হা হুতাশ করে। ভিড়ভিড় করে কথা বলে। আজ রাতে খাবে না। প্রায় রাতেই তো সে খায় না, তাতে কি হইছে, কিছুই না। খায়া কি অইবো? কিছুই না। বাঁইচা থাইকা কি অইবো? কিছুই না। আজিজ মিয়া ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলে, চিড়া তুই এনই থাহিছ। পাশের ঘর থেকে এই কথা তার ছোট ভাই মফিজ শুনে, শুনার পর মনে মনে বলে, এনে তো মানুষ নাই। ভাইজান কার লগে কতা কয়? তারপর আর বিষয়টা গ্রাহ্য করেনি মফিজ মিয়া।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মফিজের মন অস্থির হয়ে উঠলো ভাইয়ের জন্য। রাতের সেই কথা তার মনে ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো দোল খেতে লাগলো। ভাই তো এলহা থাহে, তাইলে কার লগে কতা কইচে? সে ছুটে যায় আজিজ মিয়ার ঘরে। না ঠিক আছে। মন মোচড় দেয়। না ঠিক নেই। তাকায়, ভালো করে তাকায়, লড়ে না, ছুয়ে দেখে সত্যিই লড়ে না। চকির কোণে রাখা চিড়াগুলোর দিকে তাকায়। মনের অজান্তেই চোখ থেকে ঝরে পড়ে জল।

সকাল সকাল খবর ছড়িয়ে পড়ে পাড়া থেকে পাড়া। মানুষ আসে, মানুষ যায়। কিন্তু প্রত্যেকেই কানাঘোষা করে- হাছুনের মা রফিজের মার লগে- রফিজের মা বারেকের বউয়ের লগে- কি যেন বলে তারা। মরা বাড়িতে কিসের জানি গন্ধ পাইছে তারা। ঐ গন্ধ পাড়ার লোক পাওয়ার আগে আরো দুজন লোক পেয়েছিল কিন্তু তারা তা চেপে যায়। তাদের একজন মফিজ মিয়া অন্যজন আজিজ মিয়ার বউ রহিমা।

শরীফ মল্লিক

জন্ম: ১৯৯৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার সূর্যপুর গ্রামে। 
পেশা: শিক্ষার্থী। 
আগ্রহ মূলত কবিতা। 
প্রকাশিত গ্রন্থ- হালুয়াঘাটের নির্বাচিত ছড়া ও কবিতা, ২০২০ (সম্পাদিত) 
ফোন-- 01947-644156
ইমেইল-sharifhaluaghat@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: