মৃত্যু ও মৃত্তিকা

গহিন প্রান্ত থেকে নেমে আসে আততায়ী চোখ ও সময়। যাত্রা কেন্দ্রাভিগামী…
ভিড়ের পাথরে ঢাকা মুখ― আরো বেশি… বিস্ময় মনীষা; হেমাভ পশ্চিমাকাশ
অপেক্ষমাণ যন্ত্রচালিত কিছু বাহন ও পশুপাখির দল, নৌকো
অতঃপর কেবল সারি সারি মানুষের দঙ্গল;
মানুষ প্রশ্ন করতে চায়―
কলকারখানার শ্রমিক, গাঁয়ের কৃষক, আদালত পাড়ার প্রবীণ উকিল
আর খ্যাতনামা জজসাহেব দাঁড়িয়ে যান এক কাতারে―
রোদ বালি ধুলো উপেক্ষা করে আসে―
শো-বিজ পাড়ার দগদগে সুন্দরী নায়িকা,
কোমল ঠোঁটের নায়ক, খলনায়ক― ইনসানে কামেলও
এবং পাঁড় রাজনীতিক, জনাকয়েক বিদুষী গণিকা; ভরে ওঠে মাঠ।
দিগন্ত বালিকার মুখে স্পষ্ট ফুটে ওঠে সূর্যের হাসি।
ধূর্ত কেউ একজন বলেন― ‘ভাইসব! সবাই কাতার হয়া দাঁড়াইয়া যান…’
দূরের আহ্বান! নেমে আসে আরো মানুষ―
জিজ্ঞাসা করে, ―অতঃপর কী হবে?
এবং তারপর কী হবে? আমরা কোথায় যাবো?
কে নিয়ে যাবে আমাদের? কোথায় নিয়ে যাবে আমাদের?

জনৈক শিক্ষক― উত্তর দিতে গিয়ে চমকে ওঠেন; তার সামনে সমুদ্র অন্ধকার!
তিনি কিছুই বলতে পারেননি।
জনৈক কবি, হ্যাঁ কবিই হবেন― তিনি এলেন, অবতারের ভঙ্গিতে,
মহামানবের অবয়বে― জাদুময় কথার ইঙ্গিতে
ডাকলেন: ভাইসব!
আবালবৃদ্ধবণিতা জানে না― আজ কোনো অতিথিদিবস কিনা?
কেন এতো মানুষ রাস্তায়, মেঠো পথে,
ওই যে নদীর ধার, সেখানেও।
পাহাড়গুলো কেঁপে উঠলো।
উটের গ্রীবার মতো গলা বাড়িয়ে খকখক কেশে একজন কথা বলতে চাইলেন―
কথা বেরোলো না। মানুষ কি অসহায় হয়ে উঠছে?
মানুষ কি নির্বাক জীব?
জনৈকা বৃদ্ধার কথায় ঘাড় ফিরিয়ে দেখে বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত এক তুখোড় তরুণ!
না, সে-ও কিছুই বলতে পারেনি।
কিছু কথা এলো ইথারে ভেসে ভেসে…
মানুষ আসমানের দিকে তাকালো।
জমিন ওপরে উঠে যাচ্ছে এমন ভাসমান মনে হলো নিজেদেরকে।
সেই কথা ও উচ্চারণ: ভাইসব! প্রিয় বোনেরা!
এবার নারীদেরকেও সম্বোধন করা হলো…
মলিন গৃহিণী মাথায় আঁচল তুলে উৎকর্ণ হয়ে শুনতে চাইলো কথাসমূহ…। সারিবন্দি মেঘদল; জন্মান্ধ মহাসড়ক ধনুকের মতো বেঁকে মোড় নিয়েছে―বন্ধ্যা ডুমুর সন্তানসম্ভবা। সংশয়ের আলনায় ঝুলে আছে শাদা কাফন। দগ্ধ সদর দরোজা খুলে যায়। বন্ধুহীন মিলনায়তনের চিমনি থেকে অজগরের মতো ধোঁয়া-কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে শাপগ্রস্ত দণ্ডকারণ্যে। কিছু মৃত মানুষ হেঁটে গেল… নিজেদের অতীত, বর্তমানকে ইঙ্গিত করে নিভে যায় সেদিন হাটবারের সবকটা জীবিত মানুষের কঙ্কাল! মহাজন কারবারি বিষাদের গামছায় বেঁধে রাখে অচল আধুলি সিকি আরো অসংখ্য ধাতব মুদ্রা…একবার যদি আসা যেতো ফের―এমন ধ্বনিতে বিগলিত হয় মানুষের কান। লজ্জাস্থান কেঁপে ওঠে। মানুষ কি অগ্নি পাথরের কোনো কামারশালা থেকে বেরিয়ে আসবে দলে দলে সঙ্গে নিয়ে বরফের চাঙর? কফিবীজের মতো নিটোল নিরীহ চোখ বেড়ালের… সে-ও দৌড়ে পালালো প্রভুর আস্তানা ছেড়ে।

দীর্ঘক্ষণ উদাস তাকিয়ে থেকে আহত ট্রেন ছেড়ে যায় নদী অভিমুখে…
মানুষগুলো এলোমেলো পড়ে থাকে যেন গলিত কমলালেবু,
বিদীর্ণ প্ল্যাটফর্ম; সূর্যাস্তের আগেই পৌঁছুতে হবে ব্যাগসমেত ছেঁড়াখোঁড়া স্মৃতিঘরে।
লালমোরগের ডাক শোনা যায়…মিশে যায় ট্রেনের হুইসেল।
অনেক অনেক মানুষ ও কাঠবিড়ালীর দল
পিঁপড়েদের সঙ্গে যুদ্ধ করে করে
ক্লান্ত চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বিকেলের শ্বাস ছেড়ে জুড়ে দেয়
রাজনীতির আলাপ; পরকথা, ন্যাংটো শৈশব এবং পরচর্চা…
জংধরা অতীত কেঁদে ওঠে; কাঁপে সহস্র বছরের পুরোনো পুরাণ!

আদিগন্ত সূর্যের আলো ভিজিয়ে দ্যায় সমস্ত গ্রাম; পিচঢালা সমাজ-সভ্যতা। ঘরের দুয়ার থেকে ঘুরে যায় ডাহুকির পালক, বকের ফইড়… একই কথা বলে বলে ঝুমবৃষ্টিতে ভিজে পাগলা সোনাই। সরল অতীত ফিরে পেতে যে খইফোটা দুপুরে জাম্বুরায় বানিয়েছিলো নিটোল বল…তার কোনো কিছু বোঝার আগেই ঈষাণ কোণে ঝড় ওঠে…ভাইসব! বলে কে একজন ডাকে; অতঃপর অতি পরিচিত কারো কণ্ঠস্বর―
সময়কে তিনভাগে ভাগ করে নাও…যেভাবে পৃথিবী বিভক্ত। একভাগ তোমার, দু’ভাগ অন্যের। নিজের ঝুলিতে রেখে দাও কিছু মৌসুমী ফুল, প্রীতির জলসোহাগ…বিদায়ের অন্তিম বেলায় চোখে জল এনো না―বলো হে প্রভু! তাকে রেখো ইল্লিনে। সভ্যতা ভাঙবে, অযুত টুকরো হবে জীবনের মহত্তম অনুভবের; আমাদের ঘরদুয়ার, ওই সিক্ত বালিশ কেবল কথা বলবে পাখির ডাকে― ঘুমন্ত পাখির লেজে যে প্রজাপতি এসে বসেছিলো তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলো না কখনো কোনোদিন…।
মানুষের সভ্যতম সৃষ্টি পোশাক;
করুণ পরিণতি বেআব্রু ন্যাংটো হয়ে ফের চলে যাওয়া। বন্ধ্যা সময়।
উজ্জ্বল করোটি। আদিম উনুনে খইয়ের ধান শ্মশানের নীরবতায় স্তব্ধ পথিক!
খণ্ডিত গালিচায় শুয়ে থাকে প্রভুভক্ত কুকুর।
মোড়ের দোকানে টুকটাক কেনাবেচা, মাকুর শব্দের মতো মানুষের গলার স্বর।
উড়তে থাকে স্বপ্ন, পট্টবস্ত্র, বিপণিবিতান…
শাশ্বত ক্রোধ প্রেমের কেরামতি বুঝে নাই কোনোকালে―
না মল্লিকা-মধুর, না বিরহ-বিধুর!

নিত্য বৈভবের কুট্মলিত বাগান থেকে থেকে কেশে ওঠে বুড়ো কাক। কোকিলের দরোজা বন্ধ। অঘ্রানের বিপুল মাঠে সোনালি কৃষক ভুলে যায় কিংবদন্তি হাসি। বিষাদের নোনাজল টপটপ করে ভিজিয়ে দ্যায় মুলোখেত, বিস্তীর্ণ টাল। আধ-শুকনো মান্দার কিনারায় দাঁড়িয়ে জনাকয়েক কৃষিবিদ উত্তরাধুনিক কবিতা নিয়ে কথা বলে…
বিদায় বন্ধু, সুহৃদ!
আচমকা জেগে ওঠে কিছু কথা…
প্রাণের অবকাশে জমা রেখো দুঃখের সুষমা।
সুখের ভরা মৌসুমে একাকী থাকার কষ্টকে মৌহূর্তিক বেদনার চাতালে দিও শুকোতে।
এখন এ-সময়ে সময় তোমাকে সবচেয়ে বিভ্রান্ত করে।
সময়ের গ্রীবায় বহমান নদী নাব্য থাকে চিরকাল।
জাগ্রত আকাঙ্ক্ষা বিনীত প্রেমের নৈবেদ্য নেবে না কখনো।
মানুষ বড়ো প্রতিজ্ঞাভঙ্গকারী। ওদের সামনে পেছনে প্রলুব্ধ মহাকাল!
ফুলের জখম নিঃসন্দেহে সাংঘাতিক। কিছু মানুষ থাকবে সিসিফাসের নিয়তি তাদের
ক্ষমা করো― ক্ষমার লিপিচিত্র ইগলের পাখায় ভর করে থেকে যাবে
সন্ন্যাসী সময়ের অভিমানী আরশিনগরে…
উদ্ভ্রান্ত মনঃপাঠ যাবে দীক্ষালাভের আশায় গুরুর বারামখানায়।
তরিকার সহস্র মত-পথ ভুলে যদি―
মানুষ মৃত্তিকা বই কিছু নয়।
মৃত্যু তার করুণ-পাঠ― সজল স্মৃতি আর স্বপ্নায়ুর বিজন সমর্পণ!

২৯ নভেম্বর ২০২১
ময়মনসিংহ

আল মাকসুদ

জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬, শৈলের কান্দা, জামালপুর। 

পেশায় সরকারি কলেজে অধ্যাপনা (সহকারী অধ্যাপক, বাংলা, আনন্দমোহন কলেজ)  

আগ্রহ গবেষণা, গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ।

প্রকাশিত গ্রন্থ-
কাব্য- এই নাও শঙ্খচাঁদ (২০১৬), এবং তার জন্য এ পঙক্তিমালা (২০১৭), কুমারী রাতের আশীর্বাদ (২০১৯)

প্রবন্ধ- কবিতা অকবিতা-কাব্যপাপ ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১৮) 

সম্মাননা- স্বতন্ত্র (শিল্প-সাহিত্যবান্ধব) লিটল ম্যাগ

মোবাইল: ০১৭১১-০৬০২৪২
ই-মেইল: almaksud12@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: