মিছিলের মুখ – মো: জিল্লুর রহমান

কবি মোঃ জিল্লুর রহমান কাব্য ভুবনের অচেনা মানিক। কবিতার একজন নিপুণ শব্দ কারিগর। তিনি শব্দের সৌধে নির্মাণ করেন যাপিত-তাপিত জীবন, প্রেম ও ভালোবাসা, মানবিক সত্তার জাগরণ। তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য দেশপ্রেম ও দ্রোহ। তিনি বিশ্বাস করেন ত্যাগে, বিশ্বাস করেন সংগ্রামে, বিশ্বাস করেন গণতন্ত্রের চূড়ান্ত অঙ্গিকার। কবিতায় তিনি নির্মাণ করেন চেতনার এক মানচিত্র। যেই মানচিত্র হাজার বছরের বিদগ্ধ সংগ্রামের ইতিহাসে তৈরি। ভূগোলের পরতে পরতে লেগে আছে রক্তের দাগ, আমাদের মা ও মাটির শপথের চিহ্ন। তাকে বলা যেতে পারে দেশপ্রেম, বলা যেতে পারে দেশপ্রেমের মতো অনন্য সংবেদনশীল অনুভূতির নির্মাণ। যা মূলত একটি ভূ-খণ্ড, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও তার অপরাপর বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। জিল্লুর রহমানের কবিতা তারই প্রতিরূপ। তিনি যখন উচ্চারণ করেন, “প্রতিবাদী মিছিলের সম্মুখভাগে ছিলে তুমি, / তোমার দৃঢ় এক গ্রীবা থেকে মাটি ছুঁই ছুঁই / নেমে পড়েছিল নীল ওড়না, / অন্য গ্রীবা থেকে একই অবস্থায় লাল চাদর, চেতনার গহীনে লালন করা অধিকার আদায়ের মিছিলে / দ্রোহের রঙে তোমার আপেল রাঙা মুখ / হয়ে উঠেছিল অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত।”

জিল্লুর রহমানের কবিতায় দেশ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী খেটে খাওয়া মানুষ। শীত বস্ত্রহীন সখিনার মা, মালোপাড়ার ষাটোর্ধ্ব নেপাল মাঝি, লাস্যময়ী ফারিহা কিংবা কোন এক অনাথ কিশোর। তিনি বিশ্বাস রাখেন তাদের উপর। বিশ্বাস রাখেন তারাই রক্ষা করবে গণতন্ত্র। তারাই কবির মিছিলের অগ্রমুখ। তিনি তাদেরকেই জানান অভিবাদন। কবি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন দ্রোহের সমান্তরালে প্রেমের সঞ্চার নিশ্চিত করবে বিশ্বাসের হাত, গণতন্ত্রের অঙ্গিকার। তাইতো বলেন, “তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা / সাড়া দাও একটি বার ”

একই সমান্তরালে তার কবিতায় রয়েছে মানবিক প্রেম। সেই প্রেমের ভেতরে রয়েছে সূক্ষ্ম বিরহের স্পর্শ। সেটিই মূর্তমান হয়, “তুমি ছাড়া একটি দিন / দিন তো নয় রাতের বীণ / তুমি ছাড়া একটি রাত / হাজার ভাবনার ধারাপাত।”

বলা যায়, জিল্লুর রহমান কবিতায় জীবন যাপন করেন। কবিতায় তিনি বাধেন ঘর। কবিতাকে পাশে রেখে বুনন করেন স্বপ্ন। তার স্পর্শ পাওয়া যায় তাঁর প্রত্যেকটি কবিতায়। তাঁর প্রেমের অনুকাব্যগুলো সে কথাই বলে। আমরা তাঁর সুন্দর কাব্যিক জীবন কামনা করি।

শাহীন তাজ
কবি, লেখক ও সম্পাদক

মিছিলের মুখ

প্রতিবাদী মিছিলের সম্মুখভাগে ছিলে তুমি,
তোমার দৃঢ় এক গ্রীবা থেকে মাটি ছুঁই ছুঁই
নেমে পড়েছিল নীল ওড়না,
অন্য গ্রীবা থেকে একই অবস্থায় লাল চাদর,
চেতনার গহীনে লালন করা অধিকার আদায়ের মিছিলে
দ্রোহের রঙে তোমার আপেল রাঙা মুখ
হয়ে উঠেছিল অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো।
নাজিমের আকাশের পাখির মতো,
সমুদ্রের মাছের মতো অগণন
মানুষের অধিকার আদায়ের
অনুচ্চারিত শব্দমালা তোমার কণ্ঠে
জেগে উঠেছিল সালাম-বরকতের প্রতিবাদী কণ্ঠসম।
প্রতিবাদী ব্যানারে তোমার হাতের স্পর্শ
নিপীড়িত জনতার সব বঞ্চনা- বেদনাকে
স্পর্শ করেছিল, পতাকা শোভিত মিছিলে
তুমি হয়ে উঠেছিলে ন্যায্যতার প্রতিক।
তুমি তোমার নুপুরহীন দুটি পায়ে
যখন সামনে এগুলে এই জনপদের
সব মানুষের প্রত্যাশা আশায় ভর করে
তোমার সাথে হাঁটতে থাকলো
ভালোবাসার সান্নিধ্যে হাজার মাইল
ক্লান্তিহীন হাঁটতে থাকা প্রিয় সাহচর্যের মতো
আর তুমি হয়ে উঠলে আশা-আকাঙ্ক্ষার
প্রতিক সব মানুষের
যেমন আমার আকাঙ্ক্ষা শুধু
তোমাকে ঘিরে, শুধু তোমাকে
অভিবাদন প্রিয়তম!

গণতন্ত্র

তোমার জন্য কত আয়োজন,
সব বাহিনী আজ অতন্দ্র প্রহরী
সব চোখ দেখছে তোমাকে,
তীব্র শৈত্য প্রবাহে শীত বস্ত্রহীন সখিনার মা,
মালোপাড়ার ষাটোর্ধ্ব নেপাল মাঝি আর
সাহসী যৌবনের লড়াকু লাস্যময়ী ফারিহা
বীজের অলক্ষ্যে অঙ্কুরোদগমের মতো
একটি গোপন কক্ষে সীল মেরে তোমাকে
জন্ম দেবে বলে আরও অনেকের সাথে লাইনে দাঁড়িয়েছে।

আজ বিকেল চারটার পর তোমার আগমন
গোপন অভিসারে প্রত্যাসিত প্রিয়তমার
মতো আকাঙ্ক্ষিত, প্রেমাংশুকে জয় করার মতো
বিজয়োল্লাসে যখন চারপাশ নাচবে
তখন তুমি তোমার জন্ম ভ্রুণে স্পর্শিত
বিজেতাকেও ধ্রুপদী ভালোবাসায় সিক্ত করো,
সূর্যের উত্তাপ আর উষ্ণতা থেকে
যেমন বঞ্চিত হয়নি সুকান্তের রাস্তার পাশে
শীতে কাঁপতে থাকা কিশোর, জনতার সূর্যোদয়েও
যেন উষ্ণতা পায় জনপদের বাসিন্দা সব।

তখন আমার উষ্ণতার চাদরে ঢেকে যাবে
সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপতে থাকা
আমার প্রেম, প্রিয় স্বদেশ আমার।

তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা

তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা
সাড়া দাও একটি বার
আমি এমন ব্যবস্থা করব
চন্দ্র-সূর্যের যৌথ আকর্ষণের তীব্রতার মতো
তোমার প্রতি আমার আকর্ষণে
দেশের সব নদীতে বান আসবে
জনতার বাঁধভাঙা উল্লাসের মতো
তোমাকে অভিবাদন জানাতে।
আমি এমন ব্যবস্থা করব
কুহু কুহু রবে ডেকে উঠবে সব কোকিল
তোমার ঘুম ভাঙাতে
যে চোখে তুমি কখনো দেখোনি আমাকে
যেমন অনেক উপরে জেট বিমানে
উড়ে যাওয়া রাষ্ট্রপ্রধানদের চোখে পড়ে না
নিচের কুঁড়েঘরের পিপীলিকাসম মানুষেরা।
আমি এমন ব্যবস্থা করব
সুন্দরবনের বাঘেরা নত হয়ে
বিড়ালের মতো বসে থাকবে তোমার সম্মুখে,
আর তুমি অবলীলায় বাঘের লেজ দিয়ে
তোমার দুটি কান চুলকাতে পারবে
স্বৈরাচারী শাসকের কানে জনতার দাবী
না ঢোকার মতো যে কানে
কখনো ঢুকেনি আমার আহবান।
আমি এমন ব্যবস্থা করব
সাদুল্লাপুরের সব গোলাপ চাষী
সারি সারি দাঁড়িয়ে যাবে গোলাপ হাতে
তোমাকে অভিবাদন জানাতে
বারুদের গন্ধে ডুবে থাকা যে নাকে
কখনো ঢুকেনি গোলাপের ঘ্রাণ!
তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা!
শুধু তোমাকেই!

তুমি ছাড়া

তুমি ছাড়া একটি দিন
দিন তো নয় রাতের বীণ
তুমি ছাড়া একটি রাত
হাজার ভাবনার ধারাপাত।

তুমি ছাড়া সমুদ্র দেখা
মরুভূমির বালুরেখা
তুমি ছাড়া চলতে থাকা
পিছনপানে টানতে থাকা।

তুমি ছাড়া স্বপ্নদেখা
সব ভাবনার মৃত্যুরেখা
তুমি ছাড়া জীবন আমার
প্রাণহীন শূন্য খামার।

তুমি

তুমি যদি হও সাথী ঐ পথ চলতে
মন চায় মনখুলে সবকথা বলতে
দূর পথ হয়ে যায় চেনা ছোট গন্ডি
তব মনে মম মন হয়ে যায় বন্দি।

তুমি যদি থাক পাশে সব বাঁধা নস্যি
নির্ভার থাকি আমি তুমি এক দস্যি
যতক্ষণ থাক পাশে চনমনে এ প্রাণ
বাতাসে ছড়াতে থাকে কবিতার সুঘ্রাণ।

প্রেমের অনুকাব্য

(১)
যদিও আছে লকডাউন মানছে না তা কেউ
অফিস পাড়ার সাহেবরা- আমজনতা সেও
সবখানেতে শিথিলতা গ্রাম-গঞ্জ-টাউন
শুধু তোমার হৃদয়টা একশ ভাগ লকডাউন।

(২)
যায় না দেখা তবুও আছে সবখানেতে করোনা
তোমার দিকে হাত বাড়াতেই তুমি বলো ধরোনা
ঠোঁট মেলাতে তোমার ঠোঁটে যেই বাড়ালাম মুখ
বললে তুমি মুখে আমার মাস্ক দেখছনা উজবুক!

(৩)
লকডাউনে বন্ধ অফিস বন্ধ বাজার ঘাট
বন্দিঘরে পার করছি সকাল-দুপুর-রাত
দেখতে তোমায় আসতে বলে যেই করেছি ফোন
বললে তুমি তা হবে না চলছে লকডাউন।

(৪)
মন খারাপের দেশে কষ্ট কিছু নিও
মনের মাঝে জমলে মেঘ বৃষ্টি ঝরায়ে দিও
কষ্ট রাঙা বৃষ্টি জলে ভিজব তোমার সাথে
তোমার মাঝে বিলীন হবো বৃষ্টিস্নাত রাতে।

(৫)
তুমি যদি বলো কথা হয় তাহা কাব্য
তুমি যদি ওঠো নাওয়ে নদী হয় নাব্য
তুমি যদি চেয়ে থাক খেলা করে ভাবনা।
ভুলে যাই তোমাকে পাবো কিংবা পাবো না।

মো: জিল্লুর রহমান

মো: জিল্লুর রহমান

জন্ম ০৬ জুন ১৯৭৪ খ্রীষ্টাব্দ যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার নেহালপুর গ্রামে ।
পিতা- মোঃ জামাল উদ্দীন বিশ্বাস, মাতা- মিসেস মালেকা বেগম। 
পেশা: সরকারি কর্মকর্তা (২১তম বিসিএস, বর্তমানে ‘সমবায় অধিদপ্তর, প্রধান কার্যালয়, ঢাকা’ কর্মরত) 
আগ্রহ মূলত কবিতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: