ভোররাতে, ভৈরবী // মোহাম্মদ জসিম

ভোররাতে, ভৈরবী

রাত ৩টা বা ৪টায় ফেরিঘাটের হুইশেল…

পল্লবী আসেনি, শুধু কিছু পুরনো বাসন আর আসবাব ফিরে এসে হল্লা করছে।
আসবাব পাহারা দিচ্ছে কয়েকটি জানালা।
দরজাটি দাঁড়িয়ে আছে যেভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একদমই অনুচিত।

তোমার চোখের আড়াআড়ি
আমার মনের ভাড়াবাড়ি…

পল্লবী আসবে না, হাঁড়িগুলো আজ খিচুড়ি রাঁধবে কিনা জানা যাচ্ছে না আপাতত। আগুন ফুরিয়ে গেছে। স্পর্ধা দেখাচ্ছে উনুন।

ভৈরবী গো, মনের ভাড়াটিয়া
ঘুম ভাঙাবো ফুলের টোকা দিয়া—

লেবুগাছ অসহ্য যদিও, টবে টবে পুরনো কঙ্কাল। কতিপয় গোলাপ ও গন্ধরাজ জুটে যাবে, ফলত পক্ষীবিহারও অসম্ভব নয়। রাত ৩টা কি ৪টা…

ভৈরবী গো, প্রেমের ফুল
তোমার নামে তিন কবুল…

দাহসূত্রে ছাই—একা পুড়ে যাই; পল্লবী আসে না শুধু কাচ ভাঙে বুকের ভেতরে, শুধু কাচ ভাঙে।

ভাঙা ভাঙা অক্ষরমালা

সনেট ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে অক্ষর ও আলো; গদ্যের ব্যক্তিটি বেড়িয়ে এলে জুতোহীন খালি পা পৃথিবীকে নমস্কার করে…

খ্রিষ্টাব্দ গুনতে গুনতে চলে যাচ্ছে গাছ… ছুঁয়ো না এখন…

লতিয়ে উঠেছো ছন্দের ডাল ও পাতায়,
একটি ছন্দ বৃত্তাকার (ঘুরেফিরে নিজের কাছে)
একটি ত্রিভুজ (ত্রিভূবন জুড়ে ব্যপ্তি)
অন্যটি চতুর্কোণ (অন্ধকারে ফোটে)

তরল নিজেই কাচ ও কাছের গ্লাসটিকে ডেকে নিয়ে গুম হয়ে যায়; এমন আহ্লাদী দিনে তোমাকে পেলে নিজেকে এ্যাকুরিয়াম ভাবতে ভাবতে লাল নীল প্রেম পুষতে পারি।

কনভিক্ট ওভারসীয়ার

গান এনো—বলতেই, ঝমঝমিয়ে নেমে এলো তাঁবুটি… তাঁবু নয়, ন্যাপথলিনের গন্ধ ভরা মেরুন কারাগার।

“চিত হয়ে শুইলাম…”

হাতকড়া ফিরে এসে গল্পে বসেছে—রুটি থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারেনি কয়েদির হাত। আঙুল খসে গেছে।

“কাত হয়ে শুইলাম…”

পুংজন্মের জোনাকিরা পরাগায়নের অপেক্ষায়; নদী নদী ভাব নিয়ে রমণীরা দেখা করে যায়। সে রাতে বকুল ঝরে।

“উবু হয়ে শুইলাম…”

দীর্ঘায়ু হোক অনিদ্রা—কারাগারের বসন্ত কখনও আমাদের হয়নি।

বিশ্বাস

একজন সামান্য পকেটমার, প্যারিস শহরে—আমার প্রথম শরীর নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। যদিও চেহারা দেখিনি, আমার বিশ্বাস—সে ছিলো মধ্যবয়সী, ফ্যাকাসে চোখের কোন অভাবী পুরুষ।

দ্বিতীয় শরীর আমি হারিয়েছি কলকাতায়—ছিনতাইকারীর হাতে। ধারালো ছুরিটিকে মনে আছে, মুখোশের আড়ালে আকাশী চোখের মনিতে গেঁথে থাকা ভয় আর অসহায়ত্বটুকু মনে আছে— লোকটিকে ভুলে গেছি।

শান্তিনগরে, ঢাকায়—তৃতীয়বারের মতো দু’টো চোখ, দু’টো কান ও একটি মাথাসহ খুব সাধারণ আরেকটি শরীর আমি হারিয়ে ফেলেছি, সম্ভবত দুই হাজার আটে। কালো মুখোশে ঢেকে ওরা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বছরভর অমাবশ্যা থাকে এমন এক পুরনো বাড়িতে।

এখন—খুব খুব সতর্ক হয়ে পা ফেলি। রাস্তার গাছ, ইট ও কাচের টুকরা এড়িয়ে—ডানে বায়ে খুঁজতে থাকি সন্দেহজনক কোন মুখ। তখন সেলিম মাষ্টারের কথা ভাবি—তিনি বলতেন, মানুষের ভীড়ে ভীড়ে লুকিয়ে আছে অসংখ্য ভূতপ্রেত।

বৃক্ষমানব

লোকটি গাছ হয়ে গেছে, এ খবর চাউর হলো সন্ধ্যার খবরে। বাতাসও বেসামাল, মানুষের কানে কানে ছড়িয়ে দিয়ে এসেছে এই সুসংবাদ। লোকটি গাছ হয়ে গেছে…

পরবর্তী সকালে, একজন আগন্তুক গাছটির নিকট সম্মুখে কুঠারের দোকান দিয়ে বসলো। বিকলের আগেই শ’খানেক কুঠার বিক্রি হলো তার।

প্রথমে এলো পাতাকুড়ানির দল, এরপর লাকড়ির ব্যবসায়ী—পাতা নিলো, কাটলো সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান শাখা। বিরোধিতা করলো ফলপ্রত্যাশী আত্মীয়রা। তারা চায়—গাছটি বাঁচুক, সুস্বাদু ফলে দেবে আগামী শীতের পর। কেউ যেন শুনেও শোনে না। এ তো স্বপ্নে পাওয়া গুপ্তধন! ডাল গেল, পাতা গেল—গেল সুন্দর শরীর। মানুষের কাঠের অভাব আছে, পাতার আগুনে ভাল সেদ্ধ হয় পুরনো দুঃখ।

গাছটি নিঃশেষ হলো, সপ্তাখানেকে—ছায়া ও শেকড়ের চিহ্ন সহ। লোকটি গাছ হয়ে গিয়েছিল—শুধু স্মৃতিটুকু আজও বনজ বৃক্ষরা শোনায় অবাধ্য পুত্রদের।

মোহাম্মদ জসিম

জন্মঃ ৩ এপ্রিল, ১৯৮৭, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল।
পেশাঃ চাকুরি
সম্পাদনাঃ পৃষ্ঠা, কফিন
প্রকাশিত গ্রন্থঃ 
১. ত্রয়োদশ দুঃস্বপ্ন, কবিতা, ২০১২
২. অসম্পাদিত মানুষের মিথ, কবিতা, ২০১৮
৩. মিথ্যেরা সাত বোন, কবিতা, ২০১৯
৪. তামাশামণ্ডপ, অণুগল্প, ২০২০
৫. কোলাহল চিহ্নিত, কবিতা, ২০২০
৬. অশ্বখুর ও অন্যান্য টগবগ, কবিতা, ২০২০
মেইলঃ m.jasim79@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: