ভালোবাসার শুদ্ধ বীজ

ভালোবাসার শুদ্ধ বীজ

মাটি ও বৃক্ষের ভালোবাসা বুকে নিয়ে
পিতা যেদিন নক্ষত্র হলেন,
আমি পৃথিবীর আঙুল ধরেছি মাত্র
মায়ের আঁচল তখন একমাত্র নিরাপদ ভূমি।

মনে পড়ে পিতা আমাকে রাত্রির অন্ধকার
দেখিয়ে, আলো ও সাহসের কথা বলেছিলেন,
ছেঁড়া মশাড়ির ভেতর সারারাত নির্ঘুম থেকে
দু’হাতে যুদ্ধ করছিলেন ‘জীবনের স্রোত ভালোবেসে’।

জানিনা বাবা কেন একদিন মাটিতে হাত রেখে
ভীষণ কেঁদে ছিলেন। কিছুই বুঝিনি সেদিন,
তাতানো সময়ে হেঁটে আজ তার অর্থ জেনেছি
কথাটা মনে হলেই প্রিয় মাটিতে শ্রদ্ধায় নত হই।

অতঃপর মার আঁচল যেদিন গোটা পৃথিবী হলো
মা আমাকে যুদ্ধ ও কঠিন কবিতা শেখাতেন,
শেখাতে শেখাতে মা আমার প্রিয় মাটিকে
আলিঙ্গন করে বাবার মতই দূর নক্ষত্র হলেন।

আমিও গোলাপের শুদ্ধ ভালোবাসা পেতে চেয়েছি
তার আগে রক্তের ভেতর বেজেছে জন্মভূমির গান,
শত কোটি যোদ্ধার ভিড়ে আমি কি শুধুই একা
জানি সঙ্গী আমার দৃঢ় আত্মার মাটি ও আকাশ।

পিতা শোন, আজো আমি রক্তের বিশ্বাসে যুদ্ধ করছি
তোমার মতো ভালোবেসে মা ও প্রিয় মাতৃভূমিকে,
মা শোন, আজো আমি তোমার সাহসে যুদ্ধ করছি
আমার জনক ও তার প্রাণের মাটিকে ভালোবেসে!

দূর থেকে শুধুৃ তোমাদের দ্যুতিতে আলোকিত করো
আমার রক্ত যেন আমৃত্যু সেই শব্দই উচ্চারণ করে,
যে উচ্চারণে প্রবাহিত হয় পদ্মা মেঘনা আর যমুনা
আমার শিরায় বুনে গেছো যে ভালোবাসার শুদ্ধ বীজ।

আদিম কোরাস

আমার অঙ্কুর বিনষ্ট ফসলের উত্তপ্ত বুকে
সরস জোছনায় যখন কোন নারীর মুখ
মানুষের আদিম কোরাস গায়
তখন আমি এক গুচ্ছ নক্ষত্রের কাছাকাছি
স্বযত্নে হৃদয়টা রেখে দেই।

জেনে গেছি ফুলের মসৃণ পাপড়িতে
বড় বেশি অন্ধকার
ওখানে শুধুই জীবনের সমুদ্র সঙ্গীত বাজে
তবুও তাকিয়ে থাকি নদীর তীরে তীরে
নিখাঁদ ভালবাসার হৃদছায়া বনে।

কি উত্তর দেবো তার কাছে

অপেক্ষায় আছি একটি স্বপ্ন প্রভাতের,
পায়ে পায়ে গড়ালো আঁধার স্রোত;
সাঁতার কেটে ওপারে যাবার ইচ্ছে হয়,
ডেকে যায় মেহদী হাতের ছায়া বনতল।

এতো সুরের বেনুজল নেমে আসে চোখে,
যেন স্থিরচিত্র হয়ে দাঁড়িয়ে আছি সাঁকোতে;
ওখানে যতসব দুঃখ সমুদ্রের ভাসে ফেনা,
থামে না তবু অন্ধ রাগিনীর অন্ধ বাঁশি।

কোথায় জেগে ওঠে শেষ নক্ষত্রের প্রেম,
বার বার দেখায় দিক চিহ্নের রেখা গুলো;
দৃঢ় বিশ্বাসে ছুটে যেতে চাই ওইখানে,
সেই তো দেখাবে সবটুকু হৃদতৃষ্ণার ছবি।

দীর্ঘ নদীর দীর্ঘ ক্লান্তি নামে বুক জুড়ে,
জেগে থাকি, ও যদি এসে- যায় ফিরে;
ফুরাবেনা তখন স্বপ্নপ্রভাতের দীর্ঘ কান্না,
আহা! আমি কি উত্তর দেবো তার কাছে?

কাঞ্চনজংঘা প্রভাত

তবে কি কাঞ্চনজংঘা দেখা শেষ হলো
আসলে কি তাই? হয়তো তা নয় শুধু
ক্লান্তির সহস্র দিন ঝরে পড়ার দৃশ্য ভাসে।

ভোর হলে স্বপ্ন কবুতর ঝাঁক ঝাঁক উড়ে আসে
কেন একদানা শস্যের খুঁজে মাঠে যাই,
কার মুখ অরূপ আলোয় একাকি ভেসে বেড়ায়।

‘জীবনের স্রোত ভালোবেসে’ ভাসালাম শত ডিঙি
পাড়ে বৃক্ষের মৃত্যু ভীষণ ক্ষত করেছে ভেতর,
তার পরও তো সুবাসিত পুষ্পের মায়াবী বনপথ
দেখিয়েছে আত্ম-প্রণয়ের বোধের স্বর্ণ বিকেল।

যেতে যেতে কে যায়, চুরি করে সবটুকু আকাশ
রাতপাখির আর্তকণ্ঠ আঁধারে কান্না করে বার বার
তবে কি ওর কাছে পুনর্বার প্রার্থনার বিষয়
একটি গ্রহের এক বিন্দু আলোর শিশির প্রভাত।

সত্য ফুলের জন্য প্রার্থনা

আমাদের আঙিনায় দিন দিন অনায়াসে
ভুল বাগানের জমিতে হলো আবাদ,
ভুল পুষ্পেরা মেলেছে চোখ চারদিক;
উঠোনের প্রিয় বৃক্ষে কোকিল এসে
গেয়ে গেলো ভুল কণ্ঠের গান,
তাকিয়েছি আমরা মিছে ভুল আকাশে।

কখনো কখনো আঙুলে আঙুল রেখে
দুজনেই গেছি প্রিয় নদীটির কাছাকাছি
শুনেছি তার স্রোতের প্রণয় সুর,
তবু আমাদের হৃদয় কাব্যে থাকলো ভুল
হেঁটে হেঁটে গড়ালো কষ্ট শ্রমের সূর্য
বুকের ভিটায় বেঁধেছি ভুলের ঘর বাড়ি।

ও পৃথিবীর দীর্ঘ সময় নদী তোমাকে বলি
সমুদ্রে যাবার সামান্য আগে ক্ষণিক ঘুরে,
ওই খানে ফেরাও তোমার স্রোতের বাঁক;
শেষ ঠিকানায় সত্য ফুলের মিলবে দেখা।

উল্টো পাটাতনে

দিনগুলো কলাপাতা ঘর
ধূলি চাল রান্না খেলা
পাতার নৌকো বাতাসে উড়ে,
ধান কাটা ক্ষেতের বাতরে
বানানো রেল লাইন
স্মৃতির ট্রেন হুইসেল দিয়ে
ফুল খেলার ষ্টেশনে
ফিরে আসা।

সাহানা, নাসরিন, বকুল সাথী
দিন, পলান পলানি সন্ধ্যা,
ঋতুর ডিঙিতে উঠে
দূর ছবি-পিঠ হয়ে পালালো।

আহা দিনগুলো কানামাছি
গোল্লাছুট, আয়মন গাঙে সাঁতার,
বসে আছি তবু
সময় স্রোতের উল্টো পাটাতনে।

মন্থন

সহজে হাতটা মহাকাশ করে
চোখের সম্মুখে ধরে রাখি,
কাক পেঁচা ডাকে
জাগতিক বিষয়সমূহ
মুহূর্ত সময় স্থির হয়ে যায়।

সহজে হাতটা পৃথিবীর তিন ভাগ
সমুদ্র করে মন্থনে নামি,
উত্তাল ঢেউ থেমে যায়
তলদেশে দেখি খুঁজি ধুলা
মানিক জহর সভ্যতা জীবন।

পৌঁছে যাবো

একটি মুখের ভেতর জেগে ওঠা
একটি স্বপ্নের প্রভাত
তার জন্য অনুক্ষণ অপেক্ষায় থাকি,
অন্ধকার প্রাচীর ভেঙে যাবে
যুদ্ধ শেষে ফুটবে আলোর দ্যুতি
ও আসবে এক পৃথিবী হাসি নিয়ে।

শ্রমের কঠিন মুর্হূত পাড় হয়ে
ঘামে ও বিশ্বাসে
সেই মুখটিই হবে জোছনার রাত,
আকাশ ও প্রকৃতির খুব কাছে
বুক খুলে দাঁড়িয়ে
শুনবো একটি সভ্যতার ইতিহাস।

সকল দুঃখ সড়ক হেঁটে হেঁটে একদিন
পৌঁছে যাবো তার পাপড়ির মসৃণ ছায়ায়।

এক প্রভাত শুভেচ্ছা

যে ভাবে হাসলে চলে যেতে যেতে
বিদায় অথবা বরণের শব্দ খোঁজে পেলাম না,
শুধু শেষ খেয়ায় দাঁড়িয়ে অবাক হলাম
যেন কোন দুঃখই ছিলনা তার বুকে
এই দীর্ঘ সময়ের আঙুল ধরে হাঁটায়।

এতো উল্লাসের তরঙ্গ চতুর্দিকে ওঠে
ভেতরে পাথর কান্না লুকালে সন্তর্পনে
প্রতি মুহূর্তে অনুভূতির করতল ছুঁয়ে
আঁধার সমুদ্র থেকে আলোর পথ পাবার
কত কঠিন তোমার প্রানান্তকর সন্তরণ।

বিদায়ের শেষ চোখ দূর সড়ক সীমায়
সূর্যের শেষ সাহসে ভীষণ লাল হলো,
মাঝে মনুমেন্ট হয়ে দাঁড়ালো সহস্র ইতিহাস
তার ভাষা গোপনে হৃদয়ে করেছি উচ্চারণ।

যাও তুমি অতল বিবর-স্রোতের কৃষ্ণ-বাসরে
গেয়ে যাবো দিন রাত্রির স্মৃতি-রাগিনীর গান,
অপেক্ষায় তবু মাল্য হাতে প্রতিটি বাঁকে
যে আসছে পৃথিবীর গ্রহে হাসি মেখে
আকাশপাড়ার নক্ষত্র গীত গেয়ে, প্রথমত তাকে
এক প্রভাত নতুন আলোর শুভেচ্ছা দিলাম।

গিটার কন্যা

কতখানি গহীন উচ্ছ্বাসে সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে
আত্মার বসন্ত বাগান সাজাও যত্ন করে
কে জানে দূরের শেষ গোধূলি সূর্যের প্রেম
ধরে রাখতে কেন দুজন মুখোমুখি হয়
রক্তজবার জমাট রঙ
কোন সাধে আকাশ জমিনে মাখে
তখন কি পদ্মকোলে পৃথিবী গোপনে বসে
বেদনার নদীগুলো ছায়ার কাছে গচ্ছিত রাখে

গিটার কন্যা তুমি কি জানো ভেতর বাহির সব
যেমন মায়ার আলিঙ্গনে ছয়টি তারের সুরে
প্রেম মেখে নাও হৃদয় মমতা দিয়ে
ফুল পাখি কাছে রেখে পাঁচটি আঙুলে শুধু
খেলা করে যাও একটি একটি পৃথিবীর তাবৎ সুরের

এই বুকে ত্রিকাল মাটির ভালোবাসা, তবু
কুয়াশার মাঠে শুধু পাথর জমাট হয়
আমৃত্যু যে ছবির শরীরে নিভৃতে অদৃশ্য তুলি
বহুকাল রঙ মেখে যায় সবকটা খেয়াঘাটে
গিটার কন্যা তোমার হৃদয়ে কি আছে তার অলীক খবর।

মাহমুদ আল মামুন

জন্ম: ২৭/০২/১৯৫৭ ইং সিরাজগঞ্জ (পিতার কর্মস্থল) 
বসবাস: কবিতা কুটির, ২৭৫, গলগন্ডা স্কুল রোড, খলিফা বাড়ি, ময়মনসিংহ-২২০০। 
লেখালেখির সময়	: ৭০ দশকের মাঝামাঝি 
প্রকাশিত গ্রন্থ: কাব্য - জোসনা নেই বৃক্ষ নেই, যে ছবি মানচিত্র সমান, কেমন আছো প্রণয় বিকেল, নীলখাম বাতিঘর, বনভোজন ও জয়নুলের কাক, ধুলিতে পাখির পা, পিতা তোমার রক্তের ইতিহাস, মৃত্তিকা ও পূর্বপুরুষ, সভ্যতার কানে কানে ও সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ, কাব্য ডিঙা-১, ২, ৩, ৪।
প্রকাশিতব্য কবিতাগ্রন্থ - কবি ও কবিতার দেশ
সম্পাদনা- কোরক সাহিত্য পত্র, বদ্বীপ সাহিত্য পত্র ও কাব্যডিঙা যৌথ কাব্যগ্রন্থ।
প্রাপ্ত পুরষ্কার - আন্তঃধর্মীয় সংলাপ কমিশন সম্মাননা-২০০০, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী সাহিত্য পদক-২০১২, সিরাজগঞ্জ, মহীয়সী সাহিত্য পদক-২০১৪, পাবনা, শ্রেষ্ঠ কবি সাহিত্য পদক-২০১৫, পাবনা, গাংচিল সাহিত্য পদক-২০১৫, রাজশাহী, অগ্নীবীণা সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদ পদক-২০১৬, ঢাকা, পল্লী কবি জসীম উদ্দীন পদক, বগুড়া-২০১৭।	
মোবাইল - ০১৯১১-৬১৭৮৬০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: