ভাববাড়ি // মোস্তফা হামেদী

ভাববাড়ি

বাঁকা কোনো রাস্তা দেখলেই মনে হয় বাড়ির পথ।
সেখানে যথারীতি:

পটচিত্রের মতো
গভীর ঘন ধানক্ষেত থাকে—ছোট ছোট ফুলের ঝাড়,
সাধারণ কোনো জবা: কারো নামও হতে পারে।

মাথা তোলা গাছের ফাঁকে আধাপাকা ঘর:
গিরস্থালি-গোয়াল— পুকুরের ঝাঁ চকচকে বুক।

আমার মন আচমন করে ওঠা রোদে ধোয়া থাকে সব;
বহু পুরানা আলাপ জমে থাকে বরই পাতার থোপে,
ভেঙে পড়ে থাকা ঘাটলায়;

সেখানে যাব না আমি—
দূরে দূরে থেকে যাব আর
ভাববিহ্বল হব কেবল।

পানির রূপে সাজাই 

পানির রূপ দিয়ে তাকে সাজাই—
এই দেহদুনিয়ার ভিতর ছোট ছোট মেঘে বিস্তার করে আছে;
নীরব খালের বুকে শান্তিনামানো পানাফুল যেন
পুকুরের নামে সে চোখ, টলমল করে প্রেমে
হাঁসের পায়ে তার শরীর জাগে
মীনেরা ঘুমায় রুহরূপে গভীরে
সে যেন দরিয়া নাম— প্রভুর গহন অন্তর
পাহাড়ের ওলান হয়ে ঝরনা বহায়,
ধ্যানরত দরবেশের মুখ বিরাজিত হ্রদ নামে গাছালির ফাঁকে
পালিত হয় ঘুম তার রুহের ডালায়
চোখে চোখে শান্তি বহায়—
কলুষ ধারণ করে পোড়ে নিজ মনে
তাকে পানির রূপে জানি—
যে তাকে আদর করে, সে জানে সুন্দর!

সুখে

যখনই সুন্দর ভাবতে বসি, ঝঞ্জাট এসে হাজির হয়,
কারো ঘর ভেঙে গেছে, শুনি। ছায়ার মাঝে কোনো নতমুখী গাছ হাওয়ায় আছড়ে মরে, ভিতরে।

বহুবার মরে মরে লোকে আসল মৃত্যুর জন্য পাকা হয়,
বিচ্ছেদ মরণেরই সংকেতবাহী,
নিপাট দিন বলে কিছুর দেখাই পাই নি,
ফলে আনন্দ হলেই আতঙ্কে পেয়ে বসে—

খারাপ বার্তাগুলি আনন্দেরই অভিঘাত যেন,
কচু পাতার মুখ মনে পড়ে, বর্ষণের সমস্ত গঞ্জনা সয়েও
অনাবিল হয়ে থাকা,

বন যেমন উড়িয়ে বাঁচে হাওয়ার আঁচ
বাইরে তেমনই আছি ঠাঁট রেখে, সুখে আমাদের শরীর ভরে আছে।

উপস্থিতি

নিজেকে সরালে যে বস্তু পাই, তার নাম হতে পারে— ভিজা জোছনা

ছাতিম গাছের নিচে আমার ঘ্রাণ ঘনিয়ে উঠছে,
নাই ধরে নিয়ে যে দুনিয়া ভাবি, সে দুনিয়া কেমন?

লুকিয়ে থাকতে চাই বলে মথের রূপক ধরি;

সে সব নিশ্চুপ এলাকায় কী কী ঘটে
যেখানে আমি যাই নাই?—

দেখা সমস্তই আসল নয়, চেনা সব অনুষঙ্গ পার হয়ে
কোনো দুষ্প্রাপ্য ফলের দিকে মন ছুটে গেছে,

ধীর কল্পনায় আলোকে নদীতে উপুড় হওয়া নৌযান মনে হয়,

আমি সেখানে বসে পড়ি, নিজের জায়গা থেকে সরে

কিছু কম্পনের পর পানা আগের স্থানেই ফিরে আসে,
ফাঁক সারিয়ে তুলে নিশ্চিহ্ন করে দেয় আমার উপস্থিতি।

পানার ভিতর

পোনা কইমাছ হয়ে লুকায়ে থাকি পানার ভিতর—

ঠান্ডা সে মহাল
ঠুমরির বাজনার মতো বিষ্টি ঝরে যায় দিনভর
ছোট অতি ছোট পাতার ওপর;

কচি শাকের মতো সবুজ শরীরে দৌড়ে বেড়াই
কচি জিভ যেন আমার নরম হয়ে থাকা
লালাপিচ্ছিল লেজ—তিলছিঁটে ফোঁটা;

দূরপ্রসারী বিলে আমি এক জলবিচ্ছুরণ যেন—
হাওয়ায় নেচে উঠি,

সামান্যই দম আমার, সরিষা দানার মতো হৃদয়
বেন্ধে রাখি হাহাকার, আয়ু পরম্পরা
সামনে খোলা দুনিয়া, আসমান উত্তল
আমাকে দেখে রাখে ফেরেশতারা—

রাতে, নিকষ ঘন রাতে
কাদায় মিলায়ে থাকি—যেন সময়ের গভীরে মর্মরিত গান;

আমি হীন প্রাণ—এ ভরা বিলে,
হেঁয়ালে-খামখেয়ালে দিন গোঁয়াই,
আনন্দে, পরমানন্দে আমাকে রেখেছেন সাঁই।

সম্পাদক

শাহীন তাজ 
ইমেইল- mrshaheentaj@gmail.com, sohojat2019@gmail.com
মোবাইল- ০১৮৭৮-৩৫৩৫৮৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: