বিড়ম্বিত ভাগ্যের পল গগ্যাঁ

পল গগ্যাঁ। চিত্রশিল্পের ভুবনে এক বিস্ময়কর নাম। জন্ম প্যারির এক খান্দানি পরিবারে। শিল্প যাকে ভালোবেসে আলিঙ্গন করেছে তার কাছে পারিবারিক খান্দান তুচ্ছ, নস্যি। গগ্যাঁর জীবনেও তাই ঘটেছে। পিতার মৃত্যুর সময় গগ্যাঁর বয়স মাত্র তিন। বড় বোন মারীর বয়স পাঁচ। গগ্যাঁর মা দূর সম্পর্কীয় এক ধনাঢ্য দাদার কাছে আশ্রয় নেন। নাম ডন পিউ।

ডন পিউ তাদের জন্য একটি বাড়ি ছেড়ে দিলেন। গগ্যাঁ ও মারীর দেখ-ভালের দায়িত্বও নিলেন। তাদের চোখে চোখে রাখার জন্যে নিয়োগ দেয়া হলো নিগ্রো গৃহপরিচারিকা। চীনা চাকরও দেয়া হলো একজন। মা, বোন ও আত্মীয়দের সাহচার্য অপেক্ষা চাকর-বাকরদের সঙ্গই পল গগ্যাঁর প্রিয় বেশি। আভিজাত্যের অহংকার নয়, তৃণমূলের অনভিজাত তার কাছে আরাধ্য হয়ে উঠে। সামাজ-সংস্কৃতির চোখে নিগ্রোরা ম্লেচ্ছ। এই ম্লেচ্ছ ছেলে-মেয়েদের সঙ্গই গগ্যাঁর প্রিয়।

নিগ্রো গৃহপরিচারিকার স্বভাব চরিত্র খুব ভালো ছিলো বলার সুযোগ নেই। তার কাছ থেকেই গগ্যাঁ অকাল যৌনশিক্ষা লাভ করেন এবং সমবয়সী এক আত্মীয়াকে বলাৎকার করে কৃত বিদ্যার বিজয় ঘোষণা করেন।

সখ ছিলো জাহাজের নাবিক হওয়ার। চেনা জাহাজও ছিলো। লুজিতানো। চাকরিও যোগাড় করলেন। সারেংয়ের সহকারী। লুজিতানো নোঙর করে আছে। আরো এক মাস থাকবে এভাবে। তারপর শুরু হবে যাত্রা। যাত্রাপথে যাত্রীদের গান শুনিয়ে বিনোদন দেয়ার জন্য আছে গায়িকা মাদাম আইমে। মাদাম আইমের রূপানলে মজে গেলেন গগ্যাঁ। যৌনতাও বাদ থাকলো না। জাহাজের কাপ্তেনের প্রেয়সীর সাথেও তার ভাব হলো। পল গগ্যাঁর রাশি কী ছিলো জানি না। মেয়েরা তার সাথে কথা বল্লেই প্রেমে নতজানু হয়ে যেতো। তবে সহজে কাউকে ধরা দিতেন না তিনি। জাহাজের কাপ্তেনের প্রেয়সীর সাথেও তার ভাব হলেও ধরা দেননি তাকে।

কয়েক বছর তার কেটে যায় জাহাজে। ১৮৭০ সাল। প্রুশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয় ফ্রান্সের। গগ্যাঁ নৌবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে দেখেন মা আর ইহলোকে নেই। বোন মারী এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করে চলে গেছেন দক্ষিণ আমেরিকায়। গগ্যাঁ অনেকাংশেই একা হয়ে যান। ঢুকেন শেয়ার বাজারে দালাল হয়ে। শেয়ার বাজারে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে সহকর্মী ক্লভ এমিল সুফোনেকার সাথে। ডাক নামে সুফ। সুফ একজন আঁকিয়ে। বলা চলে সখের শিল্পী। সুফের আঁকাআঁকি থেকেই গগ্যাঁর ছবি আঁকার সখ জাগে। তাঁর আঁকার জগত ছিলো কন্টকাকীর্ণ। ১৮৭৪ খ্রীস্টাব্দে প্যারিসে গড়ে উঠে ‘স্বাধীন শিল্পী গোষ্ঠী’। দলের নেতা পিশারো। মনে, সেজান, দেগা, রেনোয়া, রুশো, সীজালীসহ ৩১ জনের দল। গগ্যাঁ এইসব শিল্পীদের আড্ডায় তেমন পাত্তা পান না। প্রায়ই তাকে অপমান করা হয়। পিশারো, এদগার দেগা তাকে আমলে নিলেও অন্যেরা তাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চান। ‘স্বাধীন শিল্পীগোষ্ঠী’ ইমপ্রেশনিস্ট দর্শন থেকে ছবি আঁকেন। গগ্যাঁও এ কৌশল রপ্ত করে ফেলেছেন।

একদিকে ছবি আঁকেন আরেকদিকে নারী হৃদয়ের সারাৎসারে সাঁতার কাটেন। কোপেনহেগেন থেকে প্যারি বেড়াতে এসেছে দুই তরুণী। মারী হীগার্ড আর মেৎ সোফী গার্ড। তারা উঠেছেন শেয়ার বাজারের কাছে এক হোটেলে। এখানেই গগ্যাঁর সাথে পরিচয় হয় মেৎ সোফী গার্ডের। পরিচয় দ্রুত প্রণয়ে গড়ায় এবং পরিণয়ে। বিয়ের আগে মেৎ জানতেন না গগ্যাঁ আঁকিয়ে। যখন জানলেন তখন মেনে নিতে পারছিলেন না। বিয়ের এক বছর পর মেৎ প্রথম সন্তানের মা হন।

শেয়ার বাজারের দালালিতে ভালোই চলছিল সংসার। রক্তে যার শিল্প, অর্থের বৈভব তাকে আর কতক্ষণ ধরে রাখতে পারে বা পারবে? গগ্যাঁকেও পারেনি।

পিশারো ছবি আঁকায় গগ্যাঁকে নানান ভাবে প্রাণিত করেন। যে কারণে মেৎ পিশারোকে সহ্যই করতে পারতেন না। ইমপ্রেশনিস্টদের বিভিন্ন সময় প্রদর্শনী হয়েছে। পিশারোর অনুরোধ সত্বেও গগ্যাঁর ছবি সেসব প্রদর্শনীতে স্থান পায়নি। মনোবেদনায় গগ্যাঁ ছবি আঁকা ছেড়ে ভাস্কর্যে মন দেন। পিশারোর অনুরোধে আবার ফিরে আসেন। ইমপ্রেশনিস্টদের চতুর্থ প্রদর্শনীতে স্থান পায় তাঁর চিত্রকর্ম এবং নতুন উদ্দীপনা ফিরে আসে। বেশ আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেন তিনি। সে সময় বিবসনা বা ন্যুড ছবির বেশ কদর। গগ্যাঁও ন্যুড আঁকায় আগ্রাহান্বিত হয়ে উঠেন। ন্যুড আঁকার জন্য স্ত্রী মেৎকে মডেল হওয়ার প্রস্তাব দিলেন। মেৎ’র গর্ভে তখন চতুর্থ সন্তান। এ অবস্থায় বিবসনা হয়ে মডেল হতে রাজি হননি তিনি। ছেলে-মেয়েদের দেখা-শোনার জন্য ছিলো গৃহকর্মী জাস্টিন। জাস্টিনের বয়স একটু বেশি হলেও বেশ আকর্ষণীয় এক নারী। গগ্যাঁ গোপনে জাস্টিনের সাথে রাত্রিযাপন করতেন। ভোরে জাস্টিন শুয়ে আছে। একেবারে দিগম্বর। বিবসনা জাস্টিনকে আরো বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। গগ্যাঁ ছবি আঁকায় বসে পড়লেন। এই ছবির নাম দিলেন ‘এতুদদ্যনু’। জাস্টিনের সাথে গগ্যাঁর গোপন সম্পর্ক আর গোপন থাকেনি। মেৎ ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলেন।

গগ্যাঁ শেয়ার বাজার ছেড়ে দিলেন পুরোপুরি। মেৎ পঞ্চম বারের মতো সন্তান সম্ভাবনা। পরিবারটি এ সময় প্রচন্ড অর্থকষ্টে পড়ে যায়। আশ্রয় নিলেন শ্বশুর বাড়ি। শ্বশুরবাড়ির লোকজন গগ্যাঁকে একদম পছন্দ করেন না। এক শ্যালিকা গগ্যাঁকে প্রচন্ড অপমান করেন। গগ্যাঁ বুঝলেন এখানে থাকা তার কোনক্রমেই সম্ভব নয়। আবার প্যারি চলে আসেন। সাথে শিশু ছেলে ক্লোভী। ক্লোভীর খাবার সংগ্রহ প্রায়ই হয়ে উঠে না। উপোষ করতে হয় কখনো কখনো। ছেলেকে নিয়ে মাঝে মাঝে বন্ধু সুফের বাড়ি থেকে খেয়ে আসেন। সুফের স্ত্রীর কাছে অবশ্য বিষয়টি পছন্দের নয়। থাকার জায়গাও নেই। এক মহিলা থাকার সামান্য জায়গা দিয়েছেন তাকে। ছেলের ক্ষুধার কষ্ট মেনে নিতে পারছিলেন না পিতা। ক্লোভীকে বোন মারীর কাছে রাখতে চাইলেন, কিন্তু মারী ভাইপোকে ঝামেলা মনে করলেন। প্রচন্ড শীতে ক্লোভী এক কাপড়ে থাকে। এক জোড়া জুতাও কিনে দিতে পারেন না গগ্যাঁ। শীতে ঠকঠক করে কাঁপে ক্লোভী। সমালোচকের ভাষায়- ‘ ক্লোভীর দিকে তাকানো যায় না। অভুক্ত থেকে থেকে তার চোখ দুটো বসে গেছে। রাত্রে তোষক ছাড়াই কাঠের তক্তার উপর বাবাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে, তবু বাবার কাছে থাকতে পেরে সে খুশী’। পিতা-পুত্র প্রায়ই উপোষ থাকে। গায়ের জামা বিক্রি করেও খাবার কিনেছেন গগ্যাঁ। জীবনের কী করুণ চিত্র।

জীবন যেনো তার স্থির হওয়ার নয়। চলে গেলেন পানামায়। সে জীবন আরো কষ্টের হয়ে উঠে। মাটি কাটার কাজও করেছেন সেখানে। ভোর পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত এক টানা কাজ করেন। থাকেন নিগ্রো পল্লীতে। নিগ্রো মেয়েদের উপজীব্য করে ছবিও আঁকেন। পানামার জীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠে। আবার প্যারি চলে যেতে চান। পানামার কর্তৃপক্ষ তাকে যেতে দিতে রাজি নয়। তার অপরাধ- নিগ্রো মেয়েদের সাথে তিনি ফস্টি-নষ্টি করেছেন। অবশেষে শর্ত সাপেক্ষে তাকে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। প্যারিতে এসে আবার ছবি আঁকায় মাতেন। থাকেন বন্ধু সুফের বাড়ি। ছবিগুলো প্রশংসিতও হয়। সুফের স্ত্রী গগ্যাঁকে একদম সহ্য করতে পারেন না।

পৃথিবীখ্যাত আরেক চিত্রশিল্পী ভ্যানগঘ তার আগে থেকেই ভক্ত। একদিন ভ্যানগঘকে নিয়ে আসেন ছবি দেখাতে। সুফের স্ত্রী তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। গগ্যাঁ এখানে থাকা আর সমীচীন মনে করলেন না। ভ্যানগঘ তাকে আমন্ত্রণ জানান তার সাথে থাকার জন্যে। ভ্যানগঘ আরো বাউন্ডেলে, ক্ষেপাটে। থাকেন আর্ল-এ। তার সাথে থাকা বিপদজনক। তবু থাকতে হবে। বিকল্প নেই।

আর্ল-এ গিয়ে তিনি কিছুটা অবাক হন। চূড়ান্ত অগোছালো ভ্যানগঘ। খাওয়া-দাওয়া নিয়েও তার কোন ভাবনা নেই। রান্নার দায়িত্ব নেন গগ্যাঁ নিজেই। রাধবেন কী! গঘের টাকা পয়সা বলতে কিছুই নেই। ছোট ভাই থিও অবশ্য নিয়মিত মাসোয়ারা পাঠায়। তা পাঠালেই কী। গঘা সব খরচ করে ফেলেন ছবি আঁকার সাজ-সরঞ্জাম কিনে। কিছু দিনের মধ্যেই তাদের সম্পর্কে অবনতি ঘটে। কারণ আছে বৈকি। গগ্যাঁর সাথে মেয়েরা উপযাচক হয়ে আলাপ করতে আসে। ভাবও হয়ে যায় দ্রুত। বিষয়টি ভ্যানগঘের ভালো লাগে না। গগ্যাঁর প্রতি তিনি ঈর্ষাতুর হয়ে উঠেন। ভ্যানগঘের কাছে মেয়েরা আলাপ করতে আসে না, ভাব জমাতে আসে না। মেয়েরা গঘকে পাগল বলে জানে। বারবনিতারাও তার কাছে তেমন আসে না। কারণ, তিনি যৌনসম্ভোগে অনেকটাই অকেজো। এক মাত্র রেশেল ছাড়া তার কাছে আর তেমন কেউ আসে না। রেশেল আসে কিছুটা করুণা করেই। গগ্যাঁকে দেখলে মনে হয় না তিনি পাঁচ সন্তানের জনক। আর্ল-এ মদ, ছবি আর বেশ্যালয় নিয়েই কাটে তার সময়। শিল্প নিয়ে এক সময় ভ্যানগঘের সাথে তার মতানৈক্য ঘটে। চাকু নিয়ে একদিন মারতেও আসে গঘ। গগ্যাঁ এখানে আর নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন না। একদিন গগ্যাঁকে মদ ভরা গ্লাসও ছুঁড়ে মারেন গঘ। গগ্যাঁ আবার প্যারি চলে আসেন।

প্যারিতে এসে সুফের বাড়িতে উঠলেও বেশি দিন থাকা হয়নি। কারণ, সুফের স্ত্রী। তিনি খুব কম ভাড়ার একটি বাড়িতে উঠলেন। গগ্যাঁ তো দুবেলার খাবারই সংগ্রহ করতে পারেন না। বাড়ির ভাড়া দিবেন কোত্থেকে। বাড়িওয়ালা একদিন তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। জিনিসপত্র সব ছুঁড়ে ফেলে দেয় রাস্তায়।

হোটেলে খেয়ে পয়সা দিতে পারেন না। হোটেলওয়ালা প্রায়ই ছবি নিয়ে নেন। পরবর্তীতে এসব ছবি বিক্রি হয় লাখ লাখ ফ্রাঁ। উদ্ভ্রান্তের মতো কাটে সময়। থাকবেন কোথায়? থাকার জায়গা নেই। খাওয়ার জায়গা নেই। উঠলেন গিয়ে দ্য মঁফ্রেইর স্টুডিওতে। সেখানে পরিচয় হয় মডেল জুলিয়েৎ এর সাথে। জুলিয়েৎ এক সন্তানের জননী। জুলিয়েৎ এর সাথে চলে তার বেশ কিছুদিন রাত্রিবাস।

ভ্যানগঘের আত্মহত্যার পর ছোট ভাই থিও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ফলে গগ্যাঁর সংকট আরো বেড়ে যায়। থিও শুধু ভাই ভ্যানগঘকেই টাকা দিতেন না। পল গগ্যাঁকেও দিতেন। স্থির করলেন নগর সভ্যতা থেকে দূরে চলে যাবেন। নগর সভ্যতা তাকে অনেক বেশি ক্লিষ্ট করেছে। চলে গেলেন দূর প্রশান্ত সাগরের কোলে তাহিতি দ্বীপে।

তাহিতির মানুষজন তার নামের সাথে আগেই পরিচিত। পত্রিকায় তাকে ও তার ছবির প্রদর্শনী নিয়ে লেখা ছাপা হয়েছে। সেখানে তার বেশ কদর হলো। দাওয়াত পেলেন লাট সাহেবের বাড়িতেও। তাহিতির সমাজ অনেকাংশেই বিকৃত স্বভাবের। তাহিতিতে কোন পুরুষ স্ত্রীলোক ছাড়া রাত্রি যাপন করে না। এটিই নিয়ম। রাজার নির্দেশে তাকেও একটি মেয়ে দেয়া হলো। নাম তিতি। তিতিকে পেয়ে গগ্যাঁ আহ্লাদে আটখানা।

টাকা-পয়সা হাতে যা ছিলো ফুরিয়ে গেছে। শহরে থাকা কঠিন। চলে গেলেন গ্রামে। নাম মাতাইয়া। তিতি সাথেই আছে। কয়েকদিনের মধ্যে গ্রামে থাকার আগ্রহ তিতি হারিয়ে ফেলে। তিতির প্রতি গগ্যাঁরও মোহ কেটে যায়। তিতি শহরে চলে আসে। গগ্যাঁ গ্রামে থেকে যায় একা। গ্রামের মানুষ তাকে বেশ ভালোবাসে। বাড়ির ভাড়া দিতে পারেন না। এ নিয়ে বাড়িওয়ালার বিরক্তি নেই। উপরন্তু তার খাওয়ারও যোগান দেন। প্রতি রাতে তার সম্ভোগে আসে একজন করে যুবতী। তাহিতির মেয়েরা ইউরোপীয় কিংবা ফরাসী পুরুষের দেহসঙ্গ পেলে নিজেদের ধন্য মনে করে। মনে মনে পছন্দের মেয়েও খোঁজে। পেয়েও যান তেমন মেয়ে। নাম তেহুরা। তেহুরা গগ্যাঁকে দেহ দিবে, এতে তেহুরার মা খুব খুশি। তেহুরাকে মডেল করে ছবি আঁকা শুরু করলেন পুরো উদ্যমে। আঁকলেন অনেকগুলো ছবি।

গগ্যাঁর ছবির কদর বাড়ছে। বিক্রি হচ্ছে ভালোই। মেৎ এর কাছে কিছু ছবি ছিলো। সেসব সে বিক্রি করে পায় নয় হাজার ফ্রাঁ। মেৎ বুঝতে পারে তার স্বামী একজন বড় শিল্পী। গগ্যাঁকে চিঠি লিখে জানায় তাহিতিতে আঁকা সব ছবি যেনো তার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। স্ত্রীর নতুন আত্মোদ্বোধনে গগ্যাঁ খুব খুশি।

গগ্যাঁ বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন দেহগত দিকে। তেহুরাকে আগের মতো সঙ্গ দিতে পারেন না। তবে সৃষ্টির জন্য নারী সঙ্গ জরুরি, এমনটিই তার মনে হয়। ফ্রয়েডের মতো তারও বিশ্বাস দৈহিক সম্পর্কের মধ্যেই প্রকৃত ভালোবাসা। ভালোবাসাই মৌলিক সৃষ্টির প্রকৃত প্রেরণা। মেৎ কোপেনহেগেনে ছবি প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছে। গগ্যাঁ ব্যাখ্যাসহ ছবি পাঠিয়ে দেন। দুবছর কাটে তাহিতিতে। এবার ফিরতে চান প্যারি। তেহুরার গর্ভে তখন গগ্যাঁর সন্তান। তেহুরা খুব খুশি। সমাজে তার সম্মান বাড়বে। ফরাসীকে সঙ্গ দিয়ে সে তার কুমারীত্ব সফল করেছে। গগ্যাঁ প্যারির উদ্দেশে জাহাজে উঠেন। জাহাজ ঘাটে দাঁড়িয়ে তেহুরা তাকে বিদায় জানায়। এসময় তেহুরার চোখে-মুখে এক অনাবিল আনন্দ ফোটে উঠে।

প্যারি এসে যখন গগ্যাঁ পৌঁছেন তখন তার হাতে কোন টাকা-পয়সা নেই। উঠলেন মঁফ্রেইর স্টুডিওতে। মেৎ তার ছবি নিয়ে বিক্রি করলেও তাকে এক টাকা দিতে রাজি নয়। ছেলে-মেয়েদেরও বাবার কাছে যেতে দেন না।

এরই ভেতর চাচা জিজি মারা যায়। চাচার জমি বিক্রির কিছু টাকা সেও পেলো। দশ হাজার ফ্রাঁ। এই টাকা পেয়ে বিশাল এক বাড়ি ভাড়া নিলেন। যেনো তিনি কোটিপতি। মেৎকে আসতে বল্লেন ছেলে-মেয়ে নিয়ে। মেৎ আসলেন না। জুলিয়েৎকে নিয়ে আসলেন। বেশ ফুর্তি করে টাকা ওড়ান। কেউ ধার চাইলে বিমুখ করেন না। ছবি আঁকার মডেল হিসেবে আনলেন আরেক নারী। নাম তার আনা। জুলিয়েৎ আনাকে সহ্য করতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত নিজেই চলে গেলেন। প্রতি বুধবার সন্ধ্যায় আড্ডা বসে। আড্ডার প্রধান আকর্ষণ অর্ধ বিবসনা আনা। আনাকে নিয়ে একদিন সমুদ্রে বেড়াতে যান। আনার খোলামেলা পোশাকে জেলেদের ছেলেরা ফাজলামো করে। এতে চটে যান গগ্যাঁ। লিপ্ত হন মারামারিতে। হঠাৎ গর্তে পড়ে তার একটি পা ভেঙে যায়। জেলেরা তাকে মেরে অজ্ঞান করে ফেলে। সুযোগ কাজে লাগায় আনা। বাড়ির সব জিনিসপত্র নিয়ে সে উধাও হয়ে যায়। পা ভাঙার ব্যথার চেয়ে এ ব্যথাও কম নয়। একটা বাজে মেয়ে তাকে ঠকালো। মেৎও জানিয়ে দিয়েছে এমন অপদার্থ স্বামীর সাথে সে আর ঘর করবে না। গগ্যাঁ আবার তাহিতি চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। সাথে এক পতিতা। ভাঙা পা, ভাঙা মন। তার সাথে যোগ হয়েছে সিফিলিস।

তাহিতি এসে সমুদ্রের ধারে নির্জন জায়গা বেছে নিলেন। নারিকেল পাতার ছাউনি দিয়ে বানিয়ে নিলেন এক কুটীর। খোঁজ করলেন আবার তেহুরাকে। তেহুরা তখন অন্যের স্ত্রী। তবুও মাঝে মাঝে এসে গগ্যাঁকে সঙ্গ দেন। মেয়েরা আবার তার কাছে এসে ভিড় করে। এক সাথে তিন চারজনও আসে। একজনকে তিনি বেছেও নিলেন। নাম পহুরা। পহুরাকে মডেল করে ছবিও আঁকলেন। শরীর দিনে দিনে দুর্বল হতে থাকে। টাকা-পয়সাও নেই তেমন। জীবন যুদ্ধে ক্রমশ তিনি হেরে যাচ্ছেন। দৃষ্টিও কমে গেছে চোখের। নুন-ভাত খেয়েই চলছে জীবন। তবুও ছবি আঁকছেন। এক পর্যায়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। হাসপাতালেই আঁকেন ‘তে আরাই বহীন’ নামের বিখ্যাত ছবি। বিস্ময়কর বিষয়। প্রচন্ড যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি ছবি আঁকায় মত্ত থাকেন। ছবি আঁকার সময় যেনো তিনি সমস্ত দুঃখ-কষ্ট-বেদনা ভুলে যান। চিকিৎসায় তিনি বেশ সুস্থ হয়ে উঠেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি আবার দুর্দমনীয় উৎসাহে ছবি আঁকায় মেতে উঠেন। ছবি পাঠিয়ে দেন প্যারিতে। ভাবলেন ছবি বিক্রির টাকায় ভালো করে আবার চিকিৎসা নিবেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ছবি বিক্রির একটি টাকাও তাকে দেয়া হয়নি। সব আত্মসাৎ করেন মেৎ। মেৎ এর সাথে তার হয়তো আর ঘর করা হবে না। তবে সন্তানদের কথা খুব মনে পড়ে তার। বিশেষ করে কন্যা আলীনের জন্যে খুব খারাপ লাগে। আলীন তার বড় বেশি আদরের। অনেক কিছুই ভাবে গগ্যাঁ। আলীন বড় হয়ে বাবাকে নিয়ে গর্ব করবে। তার বাবা উঁচু মাপের শিল্পী। নানার বাড়িতে বাবাকে অনেক অপমান করা হয়েছে- এসব আলীন বড় হয়ে মেনে নিবে না। কোপেনহেগেন থেকে হঠাৎই খবর আসে আলীন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে। কন্যার মৃত্যু সংবাদে অনেক বেশি ভেঙে পড়েন তিনি।

শরীর ক্রমশ অবনতির দিকে যায়। মাঝে মাঝে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। রক্ত বমিও হয়। তবু বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছাশক্তি জাগিয়ে তুলেন। তার মনে হয় এখনো মহৎ শিল্পকর্মটি আঁকা হয়নি। সেই শিল্প আঁকলেনও। ‘কোথায় ছিলাম, কোথায় এলাম, কোথায় যাবো, নাই ঠিকানা’। এই ছবিতেই জীবনের গভীর উপলব্ধি যেনো অঙ্কিত হয়ে আছে। দ্য মাফ্রেঁইর নামে ছবিটি পাঠিয়ে দিলেন। তারপর নিতে চান মৃত্যুর হিম-শীতল স্বাদ। সন্ধ্যায় সন্তর্পণে প্রবেশ করেন গভীর জঙ্গলে। পান করেন আর্সেনিক, কিন্তু আত্মহনন হলো না। বিস্ময়কর বিষয়, আর্সেনিক তার শরীরে কাজ করেনি। তবে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে ভোরবেলা কুটীরে এসে পৌঁছলেন। পৃথিবী বিখ্যাত এই চিত্রশিল্পী শেষ পর্যন্ত হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এবং প্রিয়জনদের ভালোবাসা আর কমল কোমল কোন হস্তস্পর্শ ছাড়াই। ভালোবাসার আকুল এই শিল্পী বোধ হয় পরপারে দেবতা এপোলোর হাত থেকেই গ্রহণ করেছেন অখন্ড ভালোবাসার বরমাল্য।

আসাদ উল্লাহ

জন্ম- ৩রা মার্চ ১৯৬৯, উথুরী, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। 
পেশায় কলেজ শিক্ষক।
আগ্রহ মূলত কবিতা ও প্রবন্ধ।
সম্পাদনা- আমাদের কাগজ, দেয়াল (শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক)
প্রকাশিত গ্রন্থ-
কাব্য- মেয়েটিকে দেখি না, বারবার মন বলে যাই, জলপতনের শব্দ
ই-মেইল: asad.deyal@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: