বিপরীত মুখি জাহাজের মাস্তুল

এই নিরবতা ভালো

এসেছি এমন নিরালায় যেখানে হাওয়া ভালো
লতার পরে ছড়িয়ে থাকা লাজুক রোদ ভালো
হরিৎ পাতার রিডে গান—সৃজন বনবীথি ছাওয়া—
এখানে কেউ নেই তবু হৃদয়ের আসা-যাওয়া
অবিরাম আছে—দূরে, তবু কার মুখ এতো কাছে
রয়ে গেছে আজো—ওগো মথুরা, তুমি কেনো
ডাকার ভানে বিরহী ভঙ্গিতে বাজো—সঙ্গ নিরোধ!
হিংসা নেই বিদ্বেষ নেই—যুদ্ধ ও ঘৃণার বর্ম ফেলে
এসেছি এমন মায়ায় যেখানে গল্পেরা ভালো।

এসেছি এমন নির্জনে যেখানে পাহাড় ও মেঘের
মধ্যিখানে কোন শূন্যস্থান নেই—এতো মাখামাখি—
ঝর্ণার জলে কার ভিজে যাচ্ছে ঘন-বিজন আঁখি
কারো নাম ধরে ডাকলে সেই ডাক ফিরে এসে ঢের
দিচ্ছে চমকিয়ে—কী সব রহস্য ঘিরে আছে গহীন বনে
আদিম পৃথিবীর মতো অনাবিষ্কৃত—এসেছি এমন নির্জনে!

এসেছি এমন প্রাচীনে যেখানে জীবন ভালো।
পূর্বেও ছিলাম— মায়া ও মহুয়াতে— সেই সুধা ঢালো।
সেখানে থেকে যাবার ইচ্ছে আরো বহুকাল—
কোলাহল ছেড়ে, সভ্যতার সাথে ছিন্ন করে বন্ধন
এসেছি এখানে— এই অদ্ভুত অলৌকিক সকাল
দু’চোখে মেখে মুছে ফেলছি মস্তিষ্কের যতো কালো
এখানে অপার্থিব দিন— চতুরতাহীন—
গৌতম ধ্যানের মতো এই নীরবতা ভালো।

ফুল বিষয়ক

এসব ফুল ভাতের বিকল্প হতে পারতো
পাপড়িগুলো হতে পারতো পাস্তা
হতে পারতো ফ্লাওয়ার চিপস
মচমচে হতে পারতো, মজাদার হতে পারতো
ক্ষুধা পেলে তুলে খেতে পারতো বুভুক্ষু
বিস্কুট হলে চায়ে চুবিয়ে খেতে পারতো সবাই

অথচ ফুল এসবের কিছুই হলো না—
স্মৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি হলো;
কপট মন্ত্রীর গলায় মাল্য হলো;
নব বর-বধূর বাসর সজ্জা হলো;

ম্লান হলো শুধু ম্লান হলো—

আর ঝরে পড়ার আগে
তোমার খোঁপায় টুপ করে গুঁজে পরা ছাড়া
ওরা আর কোনো নির্মাণ শিখলো না—

বুলেটের বিকল্প হতে পারতো এসব ফুল—
দু-দশ রাউন্ড বুকে গেঁথে দিলেও বিরূপ যন্ত্রণা হতো না!

আস্থাহীনতা

হাওয়া ফুঁসছে অবিশ্বাসের ঢেউ
আলোর দাঁতে গোপনীয় আঁধার—
হঠাৎ দেখি প্রেমের মতো কেউ
বুকের দিকে তুলছে তলোয়ার!

দ্য লাইট

অন্ধকারের ওপার থেকে যে ডাক দ্যায়
প্রকৃত তাকেই ভাবি আলো—
ঐ যে দূরে নক্ষত্রের ভেতরে দেখা যায় হাতছানি!

হয়েছে জানাজানি আলো একটি ধারনা মাত্র—
দেহ ভর্তি চোট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি প্রতিক্ষায়;
মধ্যে অজস্র কুসুম তার সৌরভ নিয়ে স্মৃতিস্তব্ধ
তবুও স্বপ্ন এবং সত্তাকে চির সাহসী মানি!

যদিও প্রতিক্ষা একটি সুদীর্ঘ ও সন্দেহ বাচক শব্দ!

হাওয়ারও সুনির্দিষ্ট শব্দ আছে;
রোদের আছে বর্ণ পরিচয়—
পাখিকুল যে সুরে হয় আকুল
তারও অর্থবোধক ভাষা আছে;
নিরব বৃক্ষদের শুনেছি আছে গভীর আজান
ঝরা পাতারও থাকে নিজস্ব সঙ্গীত অভিধান!

মূলত মানুষের ভাষাতেই তেলোয়াত হচ্ছে কোরআন—

এবং কোরআন সেই দ্যুতিময় আলোক—
অন্ধকারের ওপার থেকে—হে মাখলুক,
তোমাকে ডাক দেয়—চিরন্তন সত্যের দিকে!

আফসোস

মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়—
ঈশ্বরের সাথে বদলে ফেলি প্রেমিকা
আর দীর্ঘ চুম্বনে তাঁকে হারিয়ে দেই

জলে নেমে দেখি কার কত দম
কে কতদূর দিতে পারে সাঁতার—মাতাল দরিয়ার
দাঁড় কত জোরে কে বাইতে পারে!

প্রায়ই ইচ্ছে করে—
ঈশ্বরের সাথে বদলে ফেলি প্রেমিকা
আর প্রেমের বাজিতে তাঁকে হারিয়ে দেই—

আফসোস, পরমেশ্বরের কোন প্রেমিকা নেই!

পা

পায়েরা জুতোর দোকান দেখলেই চেয়ে থাকে!

আর কে না জানে—
পা নয়, মূলত পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় জুতো;

যাদের কোন পা নাই—

তাদের বুকের ভেতরেও অসংখ্য পা
বহুদূর হেঁটে যায়;

বিপরীত মুখি জাহাজের মাস্তুল

আড়ম্বর মেঘ উড়ে যাচ্ছে ইস্টিশনের দিকে
আর লোকাল ট্রেন ঢুকে পড়ছে মেঘের মুলুক—
যেদিকে জাফরানি আকাশ—রেল লাইন
সেই বরাবর বিঁধে গ্যাছে;

এরপর তুমি পরের ইস্টিশনে নেমে যাবে;
এরপর আমি চলে যাবো আরো বহুদূর…

ওয়াক্ত আসে ওয়াক্ত চলে যায় চেনা-জানার
পৃথিবীর ঋতু বদলায়—পালক-পলকেও ঘটে বদল
হাওয়া যেমন যাচ্ছে তেমনই চলে যায়
জীবন পড়ে চলে করুণ ধারাপাত—
বাজে হুইসেল—সমুখে পরপার—
হয়তো আবার মুখোমুখি ইস্টিশনে
দু’জনের হবে দেখা—হয়তো হবে না আর!

দেখো, বিপরীত মুখি যাত্রার দুটি জাহাজের মাস্তুল
তার ওপর ভাঁজ হয়ে বসে থাকা রঙচটা অল্প বিকেল
হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে হাত নেড়ে জানাচ্ছে বিদায়!

সমুদ্র দেখা

আমার মা কখনো সমুদ্র দেখে নাই—

দেখে নাই বহুদূর থেকে বড় বৈপ্লবিক ঢেউগুলো
কুলে এসে কীভাবে আছড়ে পড়ে আবার
দূর সমুদ্রেই মিশে যায়!
আর কী বিশাল জাহাজ তাতে ভাসে—
ভেসে ভেসে কত ভিনদেশ যায়; চেনামুখ আপন কিনারায়।
প্রায়শই ডলফিন লাফ মেরে শূন্যে সার্কাস দেখায়।
আর একটা দ্বিপের মতো করে ভেসে থাকে
কোন মা তিমি—শিশু তিমির পাশে।
আরো দূরে জেলে নৌকাগুলো কাঁপতে থাকে তির তির
দোদুল্যমান জলের সকাশে।
আকাশ ও জল যেথা চির-সঙ্গমে একাকার এবং স্থির;
সেখানে অনন্ত বিরহ, শুধু জমাট শূন্যতা—
মা জানে না, সমুদ্রের ওপারে কেবলই সমুদ্র; ঘর-বাড়ি নাই।
দেখে নাই বিচে, ভেজা বালুতটে কেমন হুল্লোর করে
লাল কাঁকড়ার ঝাঁক—পায়ের শব্দে দ্রুত গর্তে লুকায়;
সফেদ শঙ্খের ঠোঁটে হাওয়া এসে কম্পোজ করে শিষ—
বুকে বালির ব্যথা নিয়ে বিপন্ন ঝিনুকেরা ঘুমায়।

মা দেখে নাই সমুদ্রের যে পাঁজর থেকে সূর্য ওঠে
আবার সেই পাঁজরেই পুনশ্চঃ ডুবে যায়—সন্ধ্যায়।

আমার মা কখনো সমুদ্র দেখে নাই—
অথচ তার বুকের ভেতর বিশাল সমুদ্র মস্ত ঢেউ নিয়ে
কী ভীষণ তড়পায়—দুঃখ পেলে আরো উত্তাল হয়;
আর লবনাক্ত জলে সমুদ্র নিজেই নিজেকে ভিজায়!

আমাদের সমুদ্র দেখার ইচ্ছে হলেই মাকে দুঃখ দেই—
আর বাবা ‘সমুদ্র ভালোবাসে’ বলে কাছে ঢেউ গুনতে বসে;

মেরি

এক গ্রাম্য বালিকা সে—ফুলতলি সাকিন
সে তখন দুধ-আলতা বর্ণের ষোড়শী
খরগোস ছানার রকম চিত্ত চঞ্চল—
পায়ে নূপুর বেঁধে হাঁটে—ঘাসে—তা ধিন ধিন

—হে আমার ভুল বসন্তের ভাঁটফুল,
কোথায়, কার শাখে অনুক্ত ফুটে আছো!

আমার স্বল্পায়ু-সম্পর্কের হে হলুদ পাখি,
তোমার মাটিগন্ধা সুর শুনিনা বহুদিন
কতদিন দাওনি কোন কমলালেবু-চিঠি
একবার নাম ধরে ডাকো, ওগো সুয়াচান—
নরম পালকে পত্রলিখে জানাও কুশল তোমার।
রুপালী ডানার ওম আর রাঙা চঞ্চুর আদর
যদি দেখা হয় আবার হিজলের ছায়ায় —আমাকে দিও।

তোমার হরিৎ গর্ভে আমি বুনে দেবো পবিত্র ইসা-মসিহ!

পাতার পাঁপড়

যেনো পাঁপড়—
কেউ শুকাতে দিয়েছে রোদে
খানিক বাদে তুলে নিয়ে ভাজা হবে ডুবো তেলে
তারপর পাড়ায় পাড়ায় ‘এই পাঁপড়’ বলে বিক্রি হবে;

দৌড়ে এসে শিশুরা কিনে নেবে খুচরো পয়সায়
দাঁতে ভেঙে ভেঙে খাবে কড়কড়—

এতোটা শুকনো হয়ে আছে পাতা
পা দিলেই মর্মর—
এতোটা গভীর ওঠে ধ্বনি
কোন আড়াল থেকে কে যেনো বলে ওঠে, শুনি—

‘ঝরে গেলেও পাতার আর্তনাদ শেষ হয় না!’

মেঘের রাখাল

একদা হতে চেয়েছিলাম মেঘেদের রাখাল
ভেড়ার পালের মতো সফেদ মেঘের রাখাল
আমি হতে চেয়েছিলাম
কাশফুলের মতো মেঘের রাখাল আমি হতে চেয়েছিলাম।

তাদের নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম বিস্তীর্ণ পারে
তাদের নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম নদীর চর—
রুপালি জলের ধারে—
সমুদ্র পারের দেশে সোওয়ারির বেশে তাদের
নিয়ে আমি বেড়াতে চেয়েছিলাম—লু হাওয়ায়।

পৃথিবীর সবটুকু আসমান সঙ্গে ভ্রমণ করতে চেয়েছিলাম।

গাছের ছায়ায় বসে সুনীল ঘাসের ভেতর তাদের
নিমগ্ন দেখতে চেয়েছিলাম—দুপুর—
পরাণ খুঁড়ে তুলে আনতে চেয়েছিলাম গভীর সুরের শালুক।

কখনো দলছুট বা বিশৃঙ্খল হয়ে গেলে
রাখালের মতো ঠিক ‘হেট হেট হুররে’ বলে
পুনরায় তাদের করতে চেয়েছিলাম সুসংগঠিত

অতঃপর সন্ধ্যা ঘনাবার আগে মেঘের বাতান নিয়ে
ফিরতে চেয়েছিলাম বাড়ি আর মেঘের বরফ দিয়ে
বানাতে চেয়েছিলাম আশ্চর্য মিনার—সেখানে
মুয়াজ্জিন হয়ে দিতে চেয়েছিলাম আজান আল্লাহুআকবার!

যখন চৈত্রের খরায় গ্রীষ্মবাতাসের ঘর হাহাকার করে—
যখন চিতাগ্নির ন্যায় লেলিহান ছড়ায় রোদ-সন্ত্রাস
ভেতরে সারিবদ্ধ শরীর যেনো রয়েছে সৎকারে
কী যে পোড়ায় আর দরদর ঘামে জামা ভিজে যায় তবু—
পানি পানি চিৎকারে মূর্ছায় প্রকৃতি, পাখি-সম্প্রদায়
অকালে হয়ে যায় ফুলের এ্যাবোর্শন যন্ত্রণা-হানায়
বিশুষ্ক হয় ফুসফুস ও ফসলের প্রাণ—কারবালা সমান।
তখন ব্যক্তিগত সংগ্রহ খুলে ঘনীভূত জলে চেয়েছিলাম দিতে বরিষণ—
আওড়ানো পাতা, মৃত্তিকার চৌচির আত্মাকে ভেজাতে চেয়েছিলাম;

একদা হতে চেয়েছিলাম মেঘেদের রাখাল
শিমুল তুলোর মতো সফেদ মেঘের রাখাল
আমি হতে চেয়েছিলাম—
ভিজতে চাইলেই তোমাকে থৈথৈ বৃষ্টি দিতে চেয়েছিলাম।
তাদের নিয়ে উঠে যেতে চেয়েছিলাম অমল পাহাড়
তাদের নিয়ে উঠে যেতে চেয়েছিলাম শততলা ছাদ
ভরাপূর্ণিমায় ঘন দুঃখের রাত—দিতে চেয়েছিলাম পারি মহাকাল!

আমি আর মেঘেদের রাখাল হতে পারিনি!

জীবন আমাকে বানিয়ে দিয়েছে তুচ্ছ লজেন্সের হকার
এখন প্রতিদিন আপন ব্যর্থতা ফেরি করছি পথে পথে—
পায়ে পায়ে—বিপন্ন বুড়িগঙ্গার তীরে—

আর খুচরা পয়সায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছি রোজ!

নোমান নজরবী

জন্ম: ৫ নভেম্বর ১৯৮৮, রাজবাড়ী
আগ্রহ - কবিতা
প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ: শরমবাহার (২০২০) পেন্ডুলাম পাবলিশার্স।
প্রিয় রাজহাঁস (২০২১) অনুপ্রাণন প্রকাশন।
ইমেইল-nomannazrabi69@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: