বাবার স্টেশন // অসীম আচার্য্য

জলজ

তুমি কেন এমন ডুবে থাকো মৎস্যগন্ধা জলের গভীরে?
নরোম মাটিতে বিলাও শঙ্খের আদর,
আমি তোমায় খুঁজে দেখি বিষন্ন পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশে
শ্বেত ভল্লুক মৃগের উষ্ণ রক্ত করে পান
দেখি পাথরের মেঘ খুঁজে নেবে আত্মহননের পথ
দেখি কাঠফাটা রোদ খুলে নেবে লাজুক জানালার উঁকি

তুমি পদ্মপাতার উপর রেখে দিয়ে নক্ষত্রের আলো
হতে পারতে রঙিন হাওয়ার গান
কুসুমিত রাতের উঠোনে দাঁড়িয়ে আমার করতলে
রেখে দিতে পারতে সমস্ত চাঁদের আদর।

তোমার পলাতকা জীবনের সংবাদ পাঠ করে
জোছনার সুঁতো কেটে দিয়েছে বৈশ্বিক পৃথিবীর রাত
গাঢ়তর অন্ধকার নেমে এসে
চোখের ভেতর বেঁধেছে নিঃশব্দ নিপীড়ন,
তুমি শুয়ে আছো করুণ ঘুমে ঢেউয়ের বিছানা পেতে
ডাঙার প্রেম হয়ে আছে মৃত কিছু বলাকার নাম!

বাবার স্টেশন

বাবা স্টেশনের খুব কাছাকাছি ছিলেন
পৌষের ভোরে কুয়াশার চাদরে জড়িয়ে হাঁটতেন
ট্রেনের ভেজা আলো দেখা যেতো মৃদু।
বাবা থেকে এই মাঠ, অশ্বত্থ বৃক্ষ খুব কাছাকাছি ছিল
ব্রহ্মপুত্রের জলে ভাসমান ডিঙায় বসে থাকত পানকৌড়ি
শ্যাওলায় পিচ্ছিল কালো বৈঠার গায়ে
লেগে আছে আজও বাবার উষ্ণ হাতের ছাপ

আমরা অনেকদিন ট্রেনের হাওয়া ভাগ করে নিয়েছি
পশ্চিমের জানালা দিয়ে বেরিয়ে যেতো
গ্রাম্যবাজার, মাটির ঘর, পুকুরের হাঁস
সাইকেলে চড়া মানুষগুলো আমাকে দেখত
মাঠের কৃষক আমার দিকে তাকিয়ে হাসত
একঝাঁক শালিক উড়ে আসত অনেকটা দূর
ট্রেন আর দুজন মানুষকে ভালোবেসে
সূর্যের কিরণ পড়তেই বলাকার পাখা
হয়ে উঠত ঝলমলে এক রাজার মুকুট

একদিন বাবার কালো চশমার ফ্রেমে
ঝুলে থাকত তার কণিষ্ঠ ছেলে
ছেলের হাতের শাদা আইসক্রিম বেয়ে
ফোটা ফোটা ঝরে পড়ত আনন্দ শতদল
নেমে এলে হঠাৎ রাতের নিরবতা
জোছনার ছাদে দ্রুত পায়ে হেঁটে
বাবা আর ছেলে পৌঁছে যেতো বাড়ি

এখনও ব্যস্ত থাকে সেদিনের মতো এই প্ল্যাটফরম
ট্রেন আসে ট্রেন যায়
দিনের চড়াই গিলে খায় রাতের অন্ধকার
যাত্রিদের পানের পিকে পাথরের রং বদলে যায়,
বাবা আজ একা, ব্যস্ততা নেই তার
শুয়ে থাকেন অদৃশ্য ট্রেনের জানালার পাশে।

সন্ধ্যা

এইযে সন্ধ্যা
কালো শুকরের ছায়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
না দেখে অন্ধ-কূয়ার ভেতর জলের আবরণ
বুক পেতে ধারণ করেছে ঝরা লালচে জলপাই,
তার সাথে আমার মৌনতা এখন
নরোম পাটকাঠির মতো ভেঙে পড়ি শিশুতোষ চাপে
অন্ধকারে পথে রাখব পা তবে কোন ভরসায়?

শরতের সন্ধ্যা হেমন্তে গাঢ় হয়ে উঠে
নাগরদোলার মেলায় সে কথা জেনেছি আগেই
কালো এবং যতোটা ছোট টিপের মতো
এ সন্ধ্যা হাসবে না আর কোনদিন
আসবে না চোখের কাজল হেঁটে হেঁটে সন্নিকটে
আমার গায়ের কালো শার্টের সাথে
মিশবে না তার একাকিত্বের আনন্দ-সঙ্গম

এ সন্ধ্যা সওয়ার হয়েছে দূরত্বের চাকার ওপর
এ সন্ধ্যা অমাবস্যার খামে রেখেছে ক্লান্ত পা।

পাতা

হিজলে ডুবাও চোখ, কাজলে ডুবিও না
জলপাই উড়ুক মেঘের ছায়ায়
সেখানে রাখো হৃদয়
চৈত্রের নরম বাতাস করঞ্চায় দেবে ডুব

সব সুখ ভোগ করো একা, একাই বেহালা ধরো সুরে
সবুজ অরণ্য থেকে বেসুরো গান বিতাড়িত আজ
অসুখের কিরিচে তাই কেটো না হাতের রেখা

জলের উপর চোখ মেলুক পদ্মপাতা
সব পাতা প্রেম বোঝে না
সব পাতা গান বোঝে না
কিছু পাতার অসুখ এমন
তমালের মতো কাঁপে কাজল বাতাসে

অশোকের মতো যে কবিতা

প্রেমের মতো, খরা আর প্লাবনের মতো
শব্দের লাইনে পড়ে থাকে বিচ্ছেদ-মায়া
সারাদিন, সারাবেলা আহত স্মৃতির বাক্সে
আমাদের উঁকি-ঝুঁকি চলে চিরকাল

একদা তোমার চোখ শাদা-কালো টিভির পর্দায়
করুণ যুবকের কবিতার ঘ্রাণ পেতো
অসুখহীন অশোকের ছায়ায় কাটাত রাত
গরমে গলে যাওয়া পাথরের নদী
বরফের চেয়েও উচ্চতা পেতো
এখন নির্বোধ পৃথিবী চারদিকে বেড়ে উঠা
সুউচ্চ দালানের ছাদে ঘুম যায় শিশুটির মতো

আমাদের খয়েরি বিকেল, ঘুড়ির মতো হারিয়েছে ঠিকানা
শরতের মেঘ সরে গেছে তেতালার বারান্দা থেকে
এখন পাখি আসে না, কেবল ফেরিওয়ালার হাঁক
কেবল রিক্সার আমোদ প্রমোদ
ফুটপাত এড়িয়ে জেগেথাকা ক্লান্ত দুই চোখ।

অসীম আচার্য্য

জন্ম ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৮৪ পাথরাইল, দেলদুয়ার, টাঙ্গাইল। 

পেশায় কলেজে শিক্ষকতা (ধলা স্কুল এন্ড কলেজ, ত্রিশাল)

আগ্রহ কবিতা ও গানে।

সম্পাদনা- বৈঠক

প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থ-
চোখে তার দাঁড়কাক বেঁধেছে বাসা(২০১৮)
শব্দপাঠ কিংবা সমুদ্র আবাহন(২০১৫)
ঢেউয়ের ভিতর আমাদের প্রণয়(২০১৩)

ইমেইল- asimacharjee1984@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: