ফিলিস্তিন: ইতিহাসের চার হাজার বছর

অনুবাদকের অভিব্যক্তি: ইতিহাস ও রাজনীতি হাতে হাত রেখেই চলে। সময় চলে যায়, শাসকের পতন হয়, থেকে যায় তার কর্ম। হতে পারে এশিয়ার গ্রাম, আফ্রিকার বিস্তীর্ণ বন বা ইউরোপের কোন নগররাষ্ট্র; পৃথিবীর একটি ধূলিকণাও শোষকের শকুন চক্ষু থেকে রেহায় পায় না। জেরুজালেম, ফিলিস্তিন বা কুদসের মাটি সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে সেই উত্তপ্ত লাভার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যেখানে বয়ানমাত্রই পুরুষতান্ত্রিক, ইতিহাস মাত্রই ফেব্রিকেটেড বাইবেল, সীমানা মানেই রক্তের পিচ্ছিল সম্প্রসারণবাদ। প্রতিনিয়ত প্রচারণা যেখানে একপাক্ষিক, ভূমিপুত্রদের নিয়তি যেখানে উদ্বাস্তু, ভবিষ্যৎ যেখানে মুহাজিরের পথ সেই ভূমির ইতিহাস লিখেছেন নূর মাসালেহ। প্রাকৃতজনের মুখে বঞ্চনার ইতিহাসের বিপরীতে জায়োনিজমের ইউরোপীয় বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করেছেন নূর।

২০১৮ – তে এমাজন বেস্ট সেলার হবার পর থেকেই বইটি দৃষ্টি কাড়ে বোদ্ধা পাঠকসহ সকল মহলে। বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য তাই ফিলিস্তিন-ইসরাইলের এই ইতিহাস পাঠ জরুরি বিবেচনা থেকেই বইটির অনুবাদে হাত দেয়া। অনুবাদ কতটা হৃদয়কে তাড়িত করে তা দিয়ে হয়তো ইতিহাস লেখা হয় না, তবে ইতিহাস কিভাবে সত্যকে উন্মোচন করে সে ভাষাকেই অনুবাদে রূপ দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছি- অবশিষ্ট যা বলার পাঠকই বলবেন।

শহুরে অভিজাতদের ইতিহাস বনাম প্রকৃত ইতিহাস: নতুন নেতৃত্ব, শিল্পবিপ্লব ও ফিলিস্তিনের বস্ত্র ব্যাবসা

অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফিলিস্তিনের বন্দর থেকে গম ও বস্ত্রের রপ্তানি একর, ইতালি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করে। ইংরেজদের শিল্পবিপ্লবও ইউরোপে পুঁজিবাদের উত্থানকে সাহায্য করে। এ ব্যবস্থা ফিলিস্তিনকে স্থানীয়ভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থানের সহায়তা করার পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে রপ্তানিমুখিতা সৃষ্টি করে, যা ধীরে ধীরে একটি লাভজনক বাজারে পরিণত হয়। আঠারো শতকে গৃহীত পদক্ষেপটি ফিলিস্তিনের কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে । বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় শহর ও নগরের শত শত গ্রামের মানুষের সাথে ফিলিস্তিনের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। অটোমানদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রচলিত ঐতিহাসিক জ্ঞান এবং উনিশ শতকের ইউরোপীয় মিশনারি এবং বাইবেলীয় দখলকারীরা ইউরোপীয়দের স্কুল ও বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা-প্রসার করে। ইউরোপীয় মুদ্রণ জগতের শিক্ষাবিপ্লব উনিশ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত ফিলিস্তিনে কোনো প্রভাব ফেলেনি। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংলিশ শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপীয় পুঁজিবাদের উত্থান ফিলিস্তিনের অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও গভীর প্রভাব ফেলে। এই নতুন চিন্তাগুলো ফিলিস্তিনকে ইউরোপ নিয়ে ভাবতে শেখায়। আঠারো শতকের মাঝামাঝি নতুন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্র গঠন নিয়ে চিন্তা করতে শেখায়। উসমানীয় সাম্রাজ্যের দুর্বলতম রাষ্ট্র থেকে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের দিকে এগিয়ে নেয়। যার হাত ধরে এই নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তিনি ছিলেন ‘দাহের আল উমার আল জায়েদানি’।

আধুনিক যুগে সার্বভৌম ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ইতিহাসের স্বাধীন শাসক থেকে উদ্ভূত হয় আধুনিক জাতিসত্তার আঞ্চলিক ধারণা। ক্ষমতা, বৈধতা সবকিছুর কেন্দ্র হয়ে গড়ে ওঠে রাষ্ট্র। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ওমরের সার্বভৌম ধারণাটি আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র থেকে সৃষ্টি হয়নি বরং ফিলিস্তিনকে শাসন করার ক্ষমতা থেকেই তার সৃষ্টি।

ফিলিস্তিনের এ নাটকীয় ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে ভেতর এবং বাহির থেকে ফিলিস্তিনকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফিলিস্তিনের নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠলে ইউরোপীয় মিশনারি এবং অটোমান সাম্রাজ্যের কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে আল উমরকে সহজেই আধুনিক ফিলিস্তিনের সামাজিকীকরণের প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়। তিনি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ফিলিস্তিনের আধুনিক পুনর্গঠন করে নতুন যুগের সূচনা করেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ জনসংখ্যা, প্রধানত মুসলমান কৃষকরা গ্রামকেন্দ্রিক ছোটো ছোটো শহরে বাস করত আর কয়েকটি বড় শহর ছিল তাদের বাণিজ্যকেন্দ্র। ১৮ শতকেই জাদিদ বা নবযুগের সূচনা হয়। স্থানীয় আদিবাসীদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি নতুন রাষ্ট্র, যার বিস্তৃতি লেবানন থেকে গাজা। নতুন রাষ্ট্রটির আধুনিক রাজধানী একর। ফিলিস্তিনের এই রাষ্ট্রব্যবস্থা একরকে ছোট্ট একটি গ্রাম থেকে সমৃদ্ধ মহানগরে রুপান্তর করে।। অষ্টবিংশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরোটা জুড়েই একরকে বাস্তবিকপক্ষে আধুনিক ফিলিস্তিনের দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফ্রান্স ও ব্রিটেন ফিলিস্তিন থেকে তুলা আমদানি করে। শিল্পবিপ্লবের সাথে সাথে ক্রমেই বেড়ে যায় তুলার আমদানি। সেইসাথে ফিলিস্তিনের জলপাই তেল, রেশমের রপ্তানিও বাড়তে থাকে। বাণিজ্যের আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ফিলিস্তিন কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও এ অঞ্চলের বেশির ভাগ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়, তৈরি হয় নতুন নতুন নগরকেন্দ্র। কেবল বাণিজ্যকেন্দ্রই নয়, ছিল বৃহত্তম ধনভান্ডার হিসেবে গড়ে উঠার সকল উপাদান।
ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লব অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ফিলিস্তিনকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে উত্থানের পেছনে অবদান রেখেছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গালিলি ভিত্তিক একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠেনি, বরং এটি অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সামরিক প্রতিরোধের চিহ্ন হিসেবেই গড়ে উঠেছে। ফিলিস্তিনের কিছু কথক এবং অটোমান সাম্রাজ্যের সমর্থক অভিজাত শ্রেণি এর বিরোধিতা করে। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে অষ্টবিংশ শতাব্দীতে নতুন বাণিজ্যিক উন্নয়ন এবং প্রকৃত অধিবাসীদের স্বায়ত্তশাসনের জন্য শুরু হয় সংগ্রাম। পরবর্তীতে ইউরোপের অসাধারণ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে ফিলিস্তিনে স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরো জোরদার হয়।

উপকূলীয় বন্দরনগরী একর ছিল খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের বিখ্যাত দুর্গ। এ অঞ্চল থেকে ক্রুসেডাররা বিতাড়িত হওয়ার পর লোকজন নামটিই প্রায় ভুলে গিয়েছিল। বিশাল নগরটি পরিণত হয় ছোট্ট মাছ ধরার গ্রামে। পরবর্তীতে মামলুক এবং আইয়ুবীয় শাসনামলে একর আবার নতুন গতিতে ঘুরে দাঁড়ায়। বন্দরনগরী হিসেবে তার যাত্রা শুরু হলেও ১৮৭৫ সালে হয়ে ওঠে ফিলিস্তিনের বৃহত্তম এবং আল শাম অঞ্চলের তৃতীয় বৃহত্তম নগর (ফিলিপ ২০০১:১)।

মাহমুদ দারবিশের কবিতায় 'ফিলিস্তিনি হয়ে জন্ম নেওয়া' এবং 'ফিলিস্তিনি হয়ে উঠা'র গল্প

ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ মাতৃভূমির ঐতিহ্য ও সমাজ থেকে অবিশ্বাস্যভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তার কবিতায় ফিলিস্তিনি পরিচয়, ব্যক্তিত্ব ও প্রতিনিয়ত বাঁকবদলের স্বাদ পাওয়া যায়। বহু আরব জাতীয়তাবাদী নিজেকে স্বতন্ত্র ও ব্যতিক্রম হিসেবে প্রমাণের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে, অন্যদিকে দারবিশ ফিলিস্তিনের ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়কে আঁকড়ে ধরেছেন। তিনি এই আবছায়া, বহু মানুষের মিশ্র ঐতিহ্যকে লালন করেন। ফিলিস্তিনের সূক্ষ্ম ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য যেন কাপড়ে বোনা জাতীয় পরিচয় যার অনেকটাই তৈরি হয়েছে দারবিশের হাতে। ১৯৪৮ সালে তার গ্রাম ‘আল বিরওয়া’ ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ধ্বংস হলে জীবনের বাকি অংশ নির্বাসনেই কাটিয়ে দেন। আধুনিক ফিলিস্তিনি বুদ্ধিজীবীদের মতো মহানগরের অভিজাত পরিবার থেকে দারবিশ উঠে আসেননি, এসেছেন ফিলিস্তিনের প্রত্যন্ত গ্রাম গালিলি থেকে। দারবিশ বাস্তবিক বিবেচনায় ফিলিস্তিনের বিচিত্র সংস্কৃতির মূর্ত প্রতীক। তার ভাষা ও সংস্কৃতি ফিলিস্তিনকে তুলে ধরেছে অনন্য উচ্চতায়। দারবিশের এ বিচিত্র উপস্থিতি ফিলিস্তিনের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি-ইতিহাসকে বয়ে বেড়ায় যেখানে হেলেনীয়, পার্শিয়ান, রোমান, বাইজেন্টাইন, আরমাইক, আরব, ইহুদি, মুসলিম, আরব ইহুদি ও ব্রিটিশ ইতিহাস মিশ্রিত। দারবিশের কবিতায় ফিলিস্তিনের লোককাহিনি ও মানুষের দেখা ইতিহাস নানা ভঙ্গিমায় সচিত্র হয়েছে। তার কাছে ফিলিস্তিনের জাতীয় পরিচয় মানেই ঐতিহাসিক আরবের মূলে প্রোথিত পরিচয়, ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক ও নান্দনিক জাজ্বল্যমান সীমানা।

আধুনিক ফিলিস্তিনের কথা বলতে গেলে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পুঁজিবাদের কথাও বলতে হয়। পুঁজিবাদ বিকাশের সাথে সাথে ফিলিস্তিনের আধুনিক শিক্ষা, ভাষা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ইতিহাস, প্রমিত আরবি, ফিলিস্তিনি কথোপকথনের ভাষা সবকিছুই নতুন করে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পেয়েছে। আরেকটি বিষয়, যদিও অনেকে অবাক হতে পারেন, ফিলিস্তিনিদের কাছে সাধারণ একটি ঘটনাই বটে। আধুনিক যুগে ফিলিস্তিনের সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রিকার একটি, ‘ফেলাস্তিন’, ‘ফিলাস্তিন’ নয়। উচ্চারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় আরবি উচ্চারণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

ফিলিস্তিনের আধুনিক জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের পাশাপাশি তার ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও ধর্মীয় পরিচয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বহু শতাব্দী ধরে ইসলামি শাসনাধীন ফিলিস্তিনের অন্যতম পরিচয় নির্ধারক হয়ে উঠেছে আরবি। ১৯০৯ সালে ফিলিস্তিনি শিক্ষাবিদ খলিল সাককিনি (১৮৭৮-১৯৫৩) জেরুসালেমে আরবি শিক্ষার একটি আধুনিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ফলে তুর্কির পরিবর্তে আরবি শিক্ষার পাশাপাশি সহজ পদ্ধতিতে আরবি ব্যাকরণ ও ভাষার নিয়মগুলো জানার সুযোগ হয়েছে (তামারি ২০০৩)।

পরবর্তীতে দেখা যায়, আরবি ভাষার সরলীকরণ ও আধুনিকায়ন মাহমুদ দারবিশের কবিতাতেও অব্যাহত রয়েছে। দারবিশের মতে ফিলিস্তিনি হয়ে উঠার ধারণাটি প্রতিনিয়ত অভিজ্ঞতা, চাক্ষুষ প্রমাণ এবং পুনর্গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফিলিস্তিনের জাতীয় পরিচয়কে বিকাশ করতে হলে অবশ্যই আরবি ভাষা, কবিতা ও ফিলিস্তিনি মানুষের সংস্কৃতিকে বিবেচনায় আনতে হবে।

ফিলিস্তিনের আরবি কবিতার ছন্দগুলো সমুদ্র (বহুর) নামে পরিচিত। দারবিশের কবিতাগুলোতে ফিলিস্তিনকে সমুদ্র এবং মরুভূমির মধ্যবর্তী অঞ্চল হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এ ধারণাটি ফিলিস্তিনি মানুষের স্মৃতিতে সদা জাগ্রত থাকে। তবে দারবিশের কাছে ‘ফিলিস্তিন দেশ’ ও ‘ফিলিস্তিনের সমুদ্র’ ভূমধ্যসাগর এবং আরবের মরুভুমির রূপক। ভাবনাগুলো অভ্যন্তরীণ চেতনা, অবচেতনা ও সচেতনতা, ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিচয়ের বার্তাবাহক ।

ফিলিস্তিন থেকে ইসরায়েলি ভূমি: ফিলিস্তিনের কমিউনিস্ট পার্টি

১৯৩৩ সালে সম্পূর্ণ ইহুদি আসকানজি দল হিসেবে ইসরায়েলে কমিউনিস্ট পার্টির যাত্রা শুরু হয়। আক্ষরিকভাবেই পূর্ব ইউরোপীয় ইহুদিরা আসকানজিদের মাতৃভাষা ব্যবহার করত । কমিউনিস্ট পার্টিকে ‘প্যালিস্তেনিস কমুনিস্টিশ পারতেই’ নামে ডাকা হতো। হিব্রু ভাষার ব্যবহার শুরু হওয়ার সাথে সাথে দলটি হিব্রু ভাষাতে পরিচিতি লাভ করে। ইহুদিবাদী দল হিসেবে যাত্রা শুরু করে ফিলিস্তিনের কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ব ইউরোপীয় ইহুদিদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। (ইউনিস ২০০ : ১১৭)।

ব্রিটিশ শাসনের সময় ফিলিস্তিনের কমিউনিস্ট পার্টিতে ছিল স্টালিনের আধিপত্য। ১৯৪৭ সালে পার্টিশন রেজুলেশনের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থনের পর থেকে দলটি জায়োনিস্ট উপাধি ‘এরেতেজ ইসরায়েল’ গ্রহণ করে। দলটি ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলের পক্ষে চেকোস্লোভাকিয়া থেকে সামরিক সহায়তা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া দলটির নেতা মির ভিলনার ইসরায়েলিদের স্বাধীনতা সনদে স্বাক্ষর করেন এবং দেশটিকে ইসরায়েলের ভূমি হিসেবে বর্ণনা করেন। নাকাব পরবর্তী সময়ে দলটি ফিলিস্তিনের সম্মিলিত ঐতিহাসিক স্মৃতিকে পুনর্জাগরণের নামে তথাকথিত ইসরায়েলি আরব টার্মটিকে পুনর্জাগরণে অবদান রাখে। একই সময়ে ফিলিস্তিনি আরবরা একটি শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলে এবং ফিলিস্তিনি আরব ওয়ার্কার্স সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করে। এটি সে সময়ে ফিলিস্তিনিদের সর্ববৃহৎ আরব শ্রমিক সংগঠন। ১৯২৫ সালে হাইফাতে সংগঠনটির সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। জাফা, নাজরাত ও মাজদালেও শাখা সৃষ্টি করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি, ১৯৪৩ সালে, স্টালিনের মধ্যপ্রাচ্যনীতি অবলম্বন করার ফলে দলটি ফিলিস্তিনের জাতীয় আন্দোলনের মূল লক্ষ্যগুলোর সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।

১৯৪৪ সালে ন্যাশনাল লিবারেশন লিগ গঠিত হলে দলটি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী নেতাদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। জায়োনিস্ট বামপন্থিদের অধীনে সোভিয়েত সমর্থনকারীরা একটি জাতীয় বুর্জোয়া দল গঠন করে। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের পার্টিশন রেজুলেশনের সমর্থন করে ইহুদিবাদী চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। দলটি তার নাম পরিবর্তন করে MAKEY, ইসরায়েল ভূখণ্ডের কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে নামকরণ করে। এবং প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনের কমিউনিস্ট দলটি Ertz Yisrael বা ‘ইসরায়েলের ভূমি’ শব্দটি ব্যবহার করে। এ ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টি-প্রধানের স্বাক্ষরিত দলিলটি ছিল জায়োনিজমের প্রতিষ্ঠিত পুরাণের পুনঃনির্মাণ প্রচেষ্টার অংশ। ফিলিস্তিনকেই ইহুদিদের জন্ম, আধ্যাত্মিকতা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানেই প্রথম রাষ্ট্র অর্জনের কথা বলা হয়। তাদের জাতীয় এবং সর্বজনীন তাৎপর্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা হয়। এ ছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা যায়, দলটি চেকোস্লোভাকিয়া থেকে ১৯৮৮ – ১৯৯৯ সালে ইহুদিদের সামিরক অস্ত্র সংগ্রহের সাথে জড়িত ছিল। ইসরায়েলিদের অই অস্ত্র সংগ্রহ ফিলিস্তিনের মাটিতে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সামরিক ভারসাম্যকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ১৯৪৮ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন শুরু করে। দলটি একের পর এক পরস্পরবিরোধী প্রবণতায় লিপ্ত হয় এবং ১৯৪৮ সালের পর ইসরায়েলের সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ নিয়ে ধীরে ধীরে মেকি নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৫ সালে আন্তঃবিরোধের ফলে মূল সংসদীয় দলটি রাকাহ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৪৮ সালের পর দলটি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সমতা ও নাগরিক অধিকারের দিকে মনোনিবেশ করে। তারা মূলত দ্বি-রাষ্ট্রিক সমাধান চায়। বর্তমানে দলটি ‘হাদাস’ নামে পরিচিত ।

সাঈদ ইসলাম

জন্ম - ৩১ জুলাই ১৯৮৯, ময়মনসিংহ সদর
আগ্রহ – কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ
পেশা - প্রভাষক (ইংরেজি, বিজিবি কলেজ ময়মনসিংহ)
সম্পাদনা - লিটলম্যাগ ঋজু
ইমেইল - ononyosayeed91@gmail.com

One thought on “ফিলিস্তিন: ইতিহাসের চার হাজার বছর

  • July 4, 2021 at 9:33 am
    Permalink

    ধন্যবাদ সহজাতকে। একটি সুন্দর সংখ্যা উপহার দেয়ার জন্য।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: