“প্রেমপত্রের মেঘ” বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতার বই

মিজান হাওলাদার

ঢের অভিমানী এক কবির নাম সাজ্জাদ সাঈফ। যদিও কবিদের অভিমান সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি থাকে, এটাই স্বাভাবিক। তিনি অভিমানে কবিতার সতেজ জমিন জুড়ে নিরবে নিভৃতে লিখে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত তাড়িত মানব জীবনের কথকতা। স্বমহিমায় কবিতায় উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছেন।

তাঁর সদ্য প্রকাশিত “প্রেমপত্রের মেঘ” কবিতার বই পাঠে মুগ্ধতার আবেশ ছড়ায়। অনেকের কবিতা পাঠ করতে গেলে হোচট খেয়ে ফিরে আসতে হয়৷ এই বইয়ের কবিতার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। এই বইয়ের কবিতাগুলো আমাকে খুব কাছে টেনেছে।

নানা বোধের অনুষঙ্গ কখনো রঙিন কখনো ফিকে হয়ে ধরা দিয়েছে হৃদয়-গভীরে। প্রগাঢ় মমত্ববোধে তাঁর কবিতার ভাঁজে ভাঁজে প্রেমের সিম্ফনি অনুরণিত হয়েছে। গদ্যে লিখেছেন কিছু কবিতা, তাছাড়াও অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্তেও কিছু কবিতা লিখেছেন। প্রেমপত্রের মেঘ সাজাতে তিনি শুধু ভিন্নতার আশ্রয় নেননি, প্রকাশভঙ্গির মধ্যে যে রহস্যকুশলতা তাকেও প্রাধান্য দিয়েছেন। পাশাপাশি করেছেন শব্দালংকারে সহজ সাবলীলতা। যেমন—

“অবশেষে ভ্রমণ গিয়েছে হেঁটে
তুমি আমি ছায়া নিয়ে, ভুবনডাঙার ধারে
রয়ে গেছি, সয়ে গেছি মেঘ
স্বপ্নেরই প্রয়োজনে, আমাদের কাতরতা নিয়ে গেছে ধুলি
ক্ষয়ে গেছে পাতা,চোখের জোনাক হলে
স্বপ্নের সড়কে হাঁটি, বনফুলে মিঠা রোদ আঁকি!”

কল্পনা, উপমা উদ্দেশ্যময় ম্যাসেজ সহজ ভঙ্গিমায় কি চমৎকার উপস্থাপন করেছেন প্রতিটি পঙক্তিমালায়৷ মিথপ্রজতা নাম দেওয়া যেতে পারে কাব্যিক ভারসাম্য। মিতব্যয়িতা সহজ কাজ নয়, শ্রমসাধ্য, সংযমসাধ্য তা এই কবিতা পড়ে বুঝা যায়৷
কবিতার ভেতরে যে অপরিমেয় আবেগ সঞ্চিত থাকে, যাকে বলা যায় জীবনের নিগূঢ় তত্ত্ব- তাঁর কবিতায় তা অনুরণিত হতে দেখি। কবি যখন লিখেন —

এই বেলা সুর করে নিরালা বিকাল নামে
মাটি আর ইরিধানে, মৃদঙ্গ বর্ণনা;”

কী অমোঘ বাস্তবতার ছোঁয়ায় সুর তুলে তুলে বাজিয়েছেন মাটি আর ধানের পাখোয়াজ! নান্দনিক সৌন্দর্যে গড়েছেন এক বিচিত্র আবহ। আবার আর একটি কবিতায় লিখেছেন —

“বিষাদে কাঁকন বাজে, আরো কত যে বিষন্ন হয় মন
এখানে নীরব দিঘি, বুকে স্রোত, স্মৃতির মাতম”

উপমায়, প্রতীকে রাশি রাশি আবিরের মতো বিষাদ কল্পনা করেছেন। কিন্তু ক্লান্ত হয়ে স্মৃতির লাশ নিঃসার ঘুমিয়ে আছে। তাঁর প্রত্যেকটি পঙক্তি উপস্থাপনার ভঙ্গিটাই ভিন্ন রকম, ভিন্ন ধাচের৷ আমার মতো পাঠক তাঁর কবিতার কোমলভাব প্রাতিস্বিকতা ও প্রতিভার মৌলিকত্বকে অস্বীকার করতে পারবো না।

“প্রেমপত্রের মেঘ” কবিতার বইয়ের যে পঙক্তি গুলো আমার ভীষণ ভালো লেগেছে -তা থেকে কিছু তুলে ধরছি—

জবানবন্দি কবিতায়—
“নিজের জবানবন্দির কাছে এসে, বসে আছি আমি,চুপচাপ ;”

ভাষার চেহারা কবিতায়—
“একদিন মৃত্যুর কাছে গিয়ে বসি।”

জনজীবন কবিতায়—
অন্ধকার এক সাম্রাজ্যের নাম, বেঘোর, ক্রমে বৈরী;
গ্রীষ্মের ছুটিতে ব্যাবিলন শোভা পায় চিন্তায়”

মায়ের স্মৃতি কবিতায়—
“ধার করা আয়ু নিয়ে বলো, বাঁচা যায় নাকি মা?
এই যতোসব অসুখ-বিসুখে, তুমি যে কান্না”

যে কোনো ধসের আগে কবিতায়—
“যে কোনো ধসের আগে পাহাড়ের বুক ধড়ফড়
পাশ থেকে শোনে সমতল!”

বিষাদ বিপণী কবিতায়—
“তোমাকে অনুবাদ করি ঐশ্বর্য্যে
ধরো, এদিকে বল্লম গেঁথে কাতরাচ্ছে
স্মৃতির সাঁকোর নিচে একটি মাছ, আর তুমি ছিমছাম, বসবাস ঘর;”

এমন করে প্রত্যেকটি কবিতায় যা বলেছেন তা স্পষ্টতর দৃঢ়তা পেয়েছে কবির অনুপম পরিচর্যায়৷ হয়েছে জীবনবোধের সহজসরল ধ্বনির ব্যঞ্জনায় আবর্তিত। প্রত্যেকটি পঙক্তি ছায়ার মতো কাছে টানে, ছুঁয়ে দেয় মন, মিশে যায় মগজে। তাঁর কবিতায় সত্যিই এক ভিন্নতার স্বাদ পেয়েছি। কবিতার পরতে পরতে বয়ান করে “প্রেমপত্রের মেঘ” বইয়ের কবিতায় প্রাণসঞ্চার করার সাধনায় নিঃসন্দেহে সফল হয়েছেন কবি সাজ্জাদ সাঈফ। প্রত্যেকটি কবিতার বয়ান আবেগের সঙ্গে তাবৎ কলাকৌশলের আগ্রাসী আলিঙ্গনে ঋদ্ধ। উপলব্ধি, উচ্চারণ অতি নিজস্ব। আমি যতটুকু বুঝি ততটুকু থেকে মনে হচ্ছে- বর্তমান সময়ে “প্রেমপত্রের মেঘ” অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতার বই। আমার এই মনে করা একান্তই আমার নিজের- কাউকে তা মানতে হবে সে কথা কথা বলছি না৷

সাজ্জাদ সাঈফ কবি হিসেবে সমকালীন বাংলা ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ নাম, তিনি যেমন নিভৃতচারী তেমনই অনুসন্ধিৎসু দূরদর্শিতার অধিকারি। আড়াল যাপনের কথামালা তার কবিতাকে ব্যক্তিঘনিষ্ঠ করে, চিরচেনা করে তোলে। কবিতায় তিনি শুরু থেকে শেষ অব্দি একটা মগ্নতার আবহাওয়া বজায় রাখেন যা তাকে অন্যান্য কবি হতে আলাদা করে তোলে। সেই সাথে যাবতীয় ব্যক্তিক অনুভূতির শাস তুলে আনে একেকটা পংক্তি, সেখানে রাজনীতি-সমাজ-ইতিহাস-ধর্ম-অধর্ম নির্বিশেষে সত্য ও মিথ্যার চিরকালীন লড়াইকে পরিবেশিত হতে দেখি তার একান্ত নিজের ভঙ্গিমায়। বিশ্বকবিতার নিরিখেও এই সমস্ত কবিতা সমান প্রাসঙ্গিক এবং নতুনতর কথার বিন্যাসে আলোকিত।
যেমন-
‘এই সমস্ত ভ্যাপসা বাতাস চিনি। যে কোনো মান অভিমান চিনি।
আমাদের চোখের সামনে নদী, ঘাড় লটকে ধরে আছে তিস্তা ব্যারেজ!
মঙ্গার দিকে চেয়ে আছে সাম্রাজ্যবাদ, লোলুপ মদিরা চোখে’

কিংবা
‘কে পারে বলোতো মেঘা, সম্রাটও কি পেরেছে তাহার
মৃত্যুর তারিখ পেছাতে?’

কিংবা
‘বহুদূর গোধূলির গায় লাগে, ঘৃতকুমারির টোকা’

কিংবা
‘পুরুষের ধনুক গেঁথে গেলে মেঘে নামে
নারীধর্মের বৃষ্টিপাত’

প্রেম আর সমাজচিন্তার আবাদি জমিন সাজ্জাদ সাঈফের কবিতা, এইসব কবিতার স্বর এককভাবেই এই কবির নিজস্ব, ধ্যানী এই কবি সেই স্বর চর্চা করে চলেছেন পঠন পাঠন সংগোপনে। স্যাটায়ার তার সহজাত। প্রেম তার অন্তস্থঃ। সচেতন শ্রেণীচেতনা তার কবিতাকে সবার করে তোলে, সেই সাথে ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে বহুদূর ভেসে সর্বাঙ্গে মানবিকতার গান ক্যারি করে কবিতারা।
‘মহত্ত্ব অপেক্ষা মহত্ত্বের অভিনয়ে
তুমি সচ্ছল, ড্রামাটিক’

কিংবা
‘তির ছুড়ে দিয়ে মুখে চেয়ে আছে ধর্ম
কাঁটাতারে দেখি উন্মাদ যুদ্ধের বর্ম;

কিংবা
‘মাছি উড়ে উড়ে গিয়ে বসতেছে দেখো
রাষ্ট্রের ক্ষতের ওপর’

শব্দচয়ন নিয়ে কিইবা বলার থাকে আর, সুদৃশ্য পরিণতির দিকে অগ্রসর কবিতার কবি সাজ্জাদ সাঈফ বাংলা কবিতারই উল্লেখযোগ্য নাম, এটুকু নির্দ্বিধায় বলা যায়। “প্রেমপত্রের মেঘ” কবিতার বইয়ের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি এবং কবি সাজ্জাদ সাঈফ আপনার কবিতার আলো ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়। সময়ের খুব ঘনিষ্ঠ প্রবক্তা হয়ে জেগে থাকুন কবিতায়।

মিজান হাওলাদার

মিজান হাওলাদার 
জন্ম - ২০ জুন ১৯৯০, বরগুনা সদর, বরগুনা। 
আগ্রহ - কবিতা ও প্রবন্ধ
mmhowlader.7@ gmail.com

One thought on ““প্রেমপত্রের মেঘ” বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতার বই

  • May 11, 2021 at 1:23 pm
    Permalink

    সাজ্জাদ সাইফকে অভিনন্দন ও ভালোবাসা। ভালোবাসা আলোচকের প্রতিও।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: