প্রকার // নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

মেঘের প্রকার

একটা উড়ালপঙ্খি সাপের পিঠে চড়ে আমাদের ভ্রমণ ছিলো না অলৌকিক। রক্তচন্দনের বনে তার চিহ্ন লেখা আছে হাওয়াচুর ঘ্রাণে। আমাদের কথা ছিলো রংধনু। কেউ আমাকে মেঘদূত বলে ডাকে!

আমি তো আসিনি কোনো যক্ষের করুণ মিনতিতে। আমি মেঘ—আমি আকাশের নিচে আর পৃথিবীর উপরে যে রাজ্য তার স্রষ্টা। এটাকে ওরা স্বর্গ বলে। স্বর্গে ধানের বদলে আমি চাষ করি অলকানন্দার তীরে সূর্যমুখী। দেবী আমাকে বলেছে ডেকে—সূর্যমুখীর বীজে জন্ম নেয় সুন্দরের সন্তান। ললিত-রক্তের ভাষায় পাঠায় কথার অমিয় ঘ্রাণ। দেবী মিথুনকে যে-শক্তি দেয়—তা সৃষ্টি করে ব্রহ্মাণ্ড। আমিই সেই শক্তি। প্রিয় নির্বাচন—তার শঙ্খচরণ। যখন সে প্রবহমান গঙ্গা—তার বুকে আমি ছায়া হয়ে ছাই। আর পবিত্র জল আর আগুনে সে একাকার।

আগুনের প্রকার

শিকল আর শকলের ছাপ এখনো লেগে আছে ত্বকে। ঘোর আর ঘোরের ভিতর নৃত্য এবং মৃত্যু নিশ্চিতপরম। হাড় ছুঁয়ে যে-যন্ত্রণা বিস্তারিত—তার ভিতর একটি পাখি, দুইটি পাপ, তিনটি নারী এবং ছয়টি বনের স্পষ্ট পটমঞ্জরী খুব নীরবে বলে যায়, নতজানু কাম এসো নখের সুতো ধরে। আমাদের রংহীন চেতনা যে নদী বাজায় আনমনে—অন্যদিন একটি রোদের সুড়ঙ্গে তাকে বইয়ে দেবো উড্ডীন পথের পারে। আমরা ভীষণ নিষাদ এসে নুয়ে পড়ি সেই নদতলে, আমাদের পদমূলে চিরচিন্ময় আগুন জ্বলে…

ধূলির প্রকার

এনেছি শজারুর কাঁটা বনময় ঘুরে। মাঝখানে একটি শয্যা পেতেছি ঘরের—আকণ্ঠ কণ্টকময়। শোবে? শোবে না জানি।

পৃথিবীর অনিশ্চিত বিষাদ আড়ম্বর বৈশাখে। উড্ডীন ঝরাপাতা বন্দীপাতাদের পাশ ছুঁয়ে উড়ে যায়—ওইখানে সকল আনন্দ ভীষণ ম্লান। কেনো আগুনের রূপ উপহাস করে ঝড়কে। তুমি ফিররে না জানি। শজারুর দুঃখ বুঝবে যেদিন—ফেরার পথ সকলই বন্ধ।

শব্দের নিজস্ব ভাষা পুড়ে গেছে বৃষ্টিপাতে। তুমি তবু বৃষ্টির ভাষা জানো না কিছু। তবে কেন এমন ব্যঘাত ভুলে পড়ে থাকো? এখন শূন্যতার রং ধূসর। প্রিয়তম ধূলিকণা শূন্যতারই যমজ। কে তবে কান্নার ভাই? সকল সুন্দর ওইখানে হয়ে আছে ছাই। শব্দের খোঁজে একাকী প্রহর খুঁজেছি পথ। একটি মেঠোপথ ঢেকে গেছে ঘাসে। আমি আবারও সিঁথি কেটেছি ওই মাঠের বুকে। আমার রক্তে ছিলো সিঁদুর। তবু সপ্তপদী আগুন জ্বলেনি।

সন্ন্যাসের প্রকার

যে-বাদক অবিশ্রাম বাজায়, যে-বাদক জন্মান্ধ—তার নখের আয়নায় কি জেগে থাকে কোনো দ্বীপদেশের আনোখা চিত্ররেখ? আমরা কাদার ভাষা জানি না। যে-কাদা মাছের গায়ে আঁশ হয়ে লেগে থাকে, তার প্রয়োজনীয়তা দুর্বোধ্য রোদের অক্ষরে খরার খবর বলেনি—এইকথা বলা যাবে না, কাদাখোঁচা পাখিও জানে তা।

সন্ন্যাসেরও প্রকার থাকে। যেমন কাদা ও মাছের পরস্পর সন্ন্যাস, একজন অন্যজনের সঙ্গে একা হয়ে থাকা। একজন জড়জীবন—অন্যে অবাধ সন্তরণ। যেমন ডোডোপাখির চোখের ভয়াল সন্ন্যাস।

সাঁওতাল পরগনায় ধুয়ে গেছে বিলাস আর বিদ্যুতের রাহিত্য, আদিকালে খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। বিষয়বিষাদ আমাদের শিকড়ের খোঁজে ছড়িয়ে পালক—কখনো অস্ট্রিক, নিষাদ, কখনো অনার্য দ্রাবিড় উপবন।

মৃত্যুর প্রকার

কোনো আগুন ছিলো না। ছিলো না আগুনের ধ্যান। শ্যামল রূপসীরা পাশ কেটে যাচ্ছিলো অরণ্য ও আরণ্যক সমাধি। দ্রিম দ্রিম শব্দে বজ্র আর বিজলি বেজে যাচ্ছিলো শূন্যে। আমি আঙুর আর নাশপাতির খাঁচা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। কে যেনো আমার কাঁধে হাত রাখলো। তার রূপ বর্ণনাতীত। আমি বললাম, তুই কে? কোনো উত্তর নাই। সুতরাং আমি তাকে স্বীকার করলাম না। আমি মনে মনে বললাম, ঝড়। ঝড় এসে উড়িয়ে নিয়ে গেলো আঙুরের বন, নাশপাতির বন। কেবল আমার কাছে কিছুটা সংরক্ষিত আছে। এইবার সে বললো, আমি সময়।

আর আমি তাকে স্বীকার করলাম। এবং আঙুর আর নাশপাতির বীজ তার হাতে দিলাম। সে আমাকে নতজানু হয়ে প্রণাম করলো। আর বয়ে চলে গেলো। তারপর আরিয়াদনে বলিলো, মিনোতর আমার ভ্রাতা। ইহাকে যদি তুমি বধ করিতে পারো—আমি তোমার সহিত যাইবো।

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

জন্ম - ২৪ আগস্ট ১৯৮১, চকরিয়া, কক্সবাজার, বাংলাদেশ। 
আগ্রহ - লেখালেখি, ছবি আঁকা 
পড়াশোনা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলা স্নাতকোত্তর
বইয়ের সংখ্যা: ১৬ টি। 

প্রকাশিত বই:
পাখি ও পাপ (২০১১, কবিতা) 
শোনো, এইখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয় (২০১১, মুক্তগদ্য) 
ডুবোজ্বর (২০১২, গল্প) 
কাপালিকের চোখের রং (২০১৩, কবিতা) 
পুরুষপাখি (২০১৪, মুক্তগদ্য) 
আরজ আলী : আলো-আঁধারির পরিব্রাজক (২০১৫, প্রব›ধ) 
মহিষের হাসি (২০১৫, কবিতা) 
রাজহাঁস যেভাবে মাছ হয় (২০১৬, গল্প) 
আকাশ ফুরিয়ে যায় (২০১৭, মুক্তগদ্য) 
হুহুপাখি আমার প্রাণরাক্ষস (২০১৭, কবিতা) 
উদ্ভিদ ও বৃন্দাবনী (২০১৯, কবিতা)
কুসুমকুমার (২০১৯, মুক্তগদ্য)
ফুলের অসুখ (২০২০, গল্প)
কবিতালেখকের জার্নাল (২০২০, মুক্তগদ্য) 
আমি ও গেওর্গে আব্বাস (২০২০, মুক্তগদ্য) 
বনভাঙা গান (২০২১, স্মৃতি-আখ্যান)

ইমেইল - nirzharnoishabdya@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: