প্যালেস্টাইনের মেয়ে – সাইয়েদ জামিল

রওছা আমার বন্ধু। ও প্যালেস্টাইনের
মেয়ে। অন্তর্জালে আমাদের পরিচয়। পরিচয়ের
প্রথম দিনেই ও আমাকে বলে, ‘ইশ! আমি যদি
তোমার কবিতা হতাম!’ এরপর একরাশ হতাশা
আর দীর্ঘ নিস্তব্ধতা! রওছা আবার বলে,
‘আমাকে বিয়ে করবে? তুমি তো কবি, জানি তুমি
ভালোবাসো সুন্দর। হে কবি, আমাকে উদ্ধার
করো। আমিও তো সুন্দর। ভালোবাসো
আমাকে। আমি এই প্যালেস্টাইন ছেড়ে যেতে
চাই। এই যুদ্ধবিধ্বস্ত মানচিত্র থেকে আমি মুক্তি
চাই। এই হত্যা এই ধ্বংসযজ্ঞ আমাকে ক্রমশ
বিকারগ্রস্ত ক’রে দিচ্ছে। আমি একটি নতুন
মানচিত্র চাই। দোহাই কবি, আমাকে একটি
মানচিত্র দাও। যেখানে রক্তপাত নেই। যুদ্ধের
বীভৎসতা নেই। আমাকে এই নরক থেকে নিয়ে
যাও তোমার বাংলায়। শান্তির কসম, কবি,
আমি তোমার চিরকালের দাসী হবো।’
যেহেতু আমি প্যালেস্টানের ইতিহাস জানি
আর যেহেতু আমি মুসলমান,
আমি রওছাকে বললাম, ‘বোন, আমি তোমাকে
ভালোবাসি। শোনো, সারা পৃথিবীই আজ
যুদ্ধবিধ্বস্ত। কোথাও শান্তি নেই। যে প্যালেস্টাইন
থেকে তুমি বের হ’তে চাইছো, সেই অপহৃত
মানচিত্র থেকে তুমি কোন্ মানচিত্রে যেতে
চাও! পুব থেকে পশ্চিম আমাদের সকল
মানচিত্র আজ বেদখল হ’য়ে গেছে। দ্যাখো,
যে বাঙলায় আমি আছি, এখানেও
মুক্তির জন্যে যুদ্ধ হয়েছিলো। আমরা লড়েছিলাম
কিন্তু, বোন আমার, আমার উপলদ্ধি হ’লো
মুক্তির যুদ্ধ কখনও থেমে যায় না। যুদ্ধ থামে নি
এই জনপদেও। এখানেও আমরা
শান্তিতে নেই। সংবাদপত্র খুললে রোজই
খুন আর ধর্ষণের খবর। শান্তির ধর্মকে এখানে
পণ্য বানিয়ে বাণিজ্যের পসরা সাজিয়েছে
লোভী আর চতুর রাজনীতিক। ফলে, ভাইয়ের
বিরুদ্ধে ভাই হাতে তুলে নিয়েছে অস্ত্র। ভাইয়ের
বিরুদ্ধে ভাই ঘৃণা বর্ষণ করছে। আর সকলেই
ইতিহাস ভুলে গেছে। ইতিহাস ভুলে যাওয়া জাতি
মুখ থুবড়ে প’ড়ে থাকে নর্দমায়। চিরকাল
এ-রকমই দেখেছি আমরা।’
মন্ত্র-মুগ্ধের মতো কথাগুলো শুনলো
রওছা। অন্তর্জালের এপার থেকেও
আমি বুঝতে পারলাম রওছা মনোযোগী
শ্রোতা। আমি বুঝতে পারলাম,
বিষাদের কালো অক্ষরগুলি ওর হৃদয়কে
নাড়া দিলো। যেনো ও সঙ্গীবিহীন
শাদা এক কবুতর। উড়ছে নীড়হীন
আকাশের প্রচ্ছদে।
‘আমরা কি আমাদের ইতিহাসের দিকে
আবার কখনও ফিরে যেতে
পারবো?’— প্রশ্ন করলো রওছা
‘নিশ্চই আমরা পারবো’— বললাম আমি,
‘ইতিহাস আমাদেরই দিকে
তাকিয়ে আছে। এই পৃথিবীর প্রতিটি
জনপদে আবার উড়বে শান্তির পতাকা
বিপর্যস্ত সময়ের পরে শান্তি অনিবার্য হ’য়ে
ওঠে। সাম্যবাদ অনিবার্য হ’য়ে ওঠে
মনে রেখো,
অনিবার্যতাই ইসলামের আবির্ভাব ঘটিয়েছিলো
মানুষকে মুক্তি দিতেই নবী মহমমদ
আল্লার বাণী ছড়িয়ে দিয়েছিলো মানুষের অন্তরে
ক্রীতদাসকে মুক্তি দিয়েছিলো
সুন্দরের দিকে মানুষকে ডেকেছিলো
ভাবো,
সেই সুন্দরের ডাক
সেই আহ্বান
সেই আজান
সেই সত্য স্বর
যা শুনলে এখনও কী রক্তে দোলা দিয়ে ওঠে না
মনে রেখো, আমরা মুসলমান
আমাদের কোনো দেশ নেই
পৃথিবীই আমাদের দেশ
পৃথিবীকে ভালোবেসে এখানেই
রচনা করতে হবে আমাদের
আগামীর নতুন ইতিহাস।’
এরপর, রওছার সঙ্গে প্রায়শই দীর্ঘ
আলাপ হ’তো
ও হিজাব পরতো। আমি ওকে ঢাকার
জামদানি পাঠিয়েছিলাম। ক্যানোনা নেট সার্চ
ক’রে ও বাঙালি নারীদের দেখেছিলো। আর
আমার কাছে শাড়ি পরার তীব্র ইচ্ছা
ব্যক্ত করেছিলো।
রওছা যখন মেডিকেল থার্ড ইয়ারে
পড়তো, তখন ওর নিরপরাধ ভাই
বর্বর ইসরাইলি সেনার গুলিতে
মারা যায়। ওই সময়টাতেই, ওর বাবা
চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করেন। আর
ওর মা অসুস্থ হ’য়ে শয্যাশায়ী হন। পারিবারিক
ও রাষ্ট্রিক ওই ভয়াল বিপর্যয়ের ভেতর রওছাকে
ঘুরে দাঁড়াতে হয়। রওছা আমার কাছে এক
অগ্নিকন্যার ইতিহাস।
রওছা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো
ভদ্র আর নম্র মেয়ে। আমি ওকে
জানিয়েছিলাম, ‘আমি হলাম এমন মুসলমান,
যে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে না’
শুনে রওছা বলে, ‘তুমি কবি, আল্লা তোমাকে
মাফ কোরে দেবেন। শোনো, আমি শেখ সাদীর
গল্প জানি। আমি জানি, আল্লা কবিদের
ভালোবাসেন। আমাদের নবীও কবিদের
সম্মান করতেন’—
ব’লে ও হাসির ইমো পাঠায়।
আমিও হাসি। আমার হাসির শব্দ
দিগন্ত পেরিয়ে চ’লে যায় অন্য শতাব্দীর দিকে।
সেই দূরের শতাব্দীতে রওছা আমাকে বলে,
‘প্যালেস্টাইন হ’লো শান্তির পয়মন্ত ভূমি
কবি, তোমাকে দাওয়াত। তুমি এই
শান্তির পয়মন্ত ভূমিতে কবিতা পড়তে এসো
শোনো, আমি এখানেই সংসার পেতেছি
আমার দুটো বাচ্চা এখন। স্বামী সংসার নিয়ে
সুখেই আছি। তুমি সত্য বলেছিলে কবি, প্যালেস্টাইন
পৃথিবীর সব শান্তিপ্রিয় মানুষের হৃদয়ের ভেতর
বহু শতাব্দী ধ’রে জেগেছিলো কবিতা আর
সংগীত হ’য়ে, যা বুঝতে আমাদের দীর্ঘ সময়
লেগেছে। আমাদের অনেক প্রাণ ঝ’রে গেছে। প্রাণের
পবিত্র বেদি এই রক্তিম ভূমি। এই প্যালেস্টাইন।’

সম্পাদক

শাহীন তাজ 
ইমেইল- mrshaheentaj@gmail.com, sohojat2019@gmail.com
মোবাইল- ০১৮৭৮-৩৫৩৫৮৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: