পাল্লেকেলে টেস্টে হারের চোখ রাঙানি, কি বলছেন ডমিঙ্গো?

হারের বৃত্ত ছেড়ে আগের টেস্টেই ড্র’র মুখ দেখেছে বাংলাদেশ, সেই সাথে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপে পয়েন্টের খাতাও খুলেছে। কিন্তু তার ঠিক পরের ম্যাচেই আবার হারার চোখ রাঙানির মুখে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল৷ টেস্ট স্ট্যাটাস লাভের পর থেকে বরাবরই টেস্ট ম্যাচ বাংলাদেশের জন্য বিমাতাসুলভ আচরণ করে যাচ্ছে। পাল্লেকেল্লে টেস্ট যেন তারই প্রদর্শনী। নাহলে নির্বিষ মরা পিচে শ্রীলঙ্কা দুই দিনে ৪৯৩/৭ রানে ডিক্লেয়ার্ড দেয়ার পর একদিনেই কেন অল আউট হবে বাংলাদেশ? তাও আবার ৩৭ রানে শেষ ৭ উইকেট হারিয়ে ২৫১ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। এতে স্বাগতিকরা পায় ২৪২ রানের লিড। দিনশেষে ১৭ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ২৫৯ রানে এগিয়ে আছে শ্রীলঙ্কা।

অথচ শ্রীলঙ্কার বোলিং আক্রমণের সেই সুদিন আজ নেই। মুত্তিয়া মুরালিধরন, রঙ্গনা হেরাথ, দিলরুয়ান পেরেরা মিলে ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কাকে অনেক ম্যাচ জিতিয়েছেন। এখন তাদের কেউই নেই। মুরালি খেলা ছেড়েছেন অনেক আগে, হেরাথ খেলা ছেড়েছেন বেশ কিছুদিন হলো। দিলরুয়ান পেরেরা ফর্মহীনতা ও চোটের সঙ্গে লড়ছেন। শ্রীলঙ্কান স্পিন বোলিংয়ের এমন দুর্বল অবস্থা গত দুই দশকেও ছিল না। এখন শ্রীলঙ্কার এক নম্বর স্পিনার ধরা হয় ১১ টেস্ট খেলা বাঁহাতি স্পিনার লাসিথ এম্বুলডেনিয়াকে। চোটের কারণে তিনিও খেলছেন না বাংলাদেশের বিপক্ষে চলমান টেস্ট সিরিজে। বাধ্য হয়ে এই ম্যাচে নামিয়েছে আনকোরা, অপরীক্ষিত স্পিনার প্রবীণ জয়াবিক্রমাকে। কিন্তু ২২ বছর বয়সী এই তরুণ বাঁহাতি স্পিনারের সামনেই আজ তাসের ঘরের মতো ভাঙল বাংলাদেশ দল। একাই যেন শেষ করে দিলেন বাংলাদেশের ব্যাটিং মেরুদণ্ড।

শ্রীলঙ্কা সকালের সেশনে ব্যাটিংয়ে নেমে তাসকিন আহমেদের বাউন্সারে রমেশ মেন্ডিস আউট হলেই ইনিংস ঘোষণা করে শ্রীলঙ্কা। ১৫ মিনিট ব্যাট করে ৭ উইকেটে ৪৯৩ রানকেই এই উইকেটে যথেষ্ট মনে করে স্বাগতিকরা। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নেমে ওপেনিং জুটিতে ৯৮ রান করে তামিম ও সাইফের কল্যাণে। তামিম ইকবালের ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল তিনি নিজের ব্যাটিংয়ের জন্য আলাদা উইকেট নিয়ে এসেছেন। প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসের মতোই সাবলীল ব্যাটিংয়ে বাউন্ডারি খুঁজে নিচ্ছিলেন তিনি। অন্যদিকে রানের জন্য লড়তে হচ্ছিল গত টেস্টের দুই ইনিংসে ব্যর্থ হওয়া ওপেনার সাইফ হাসানকে। তবে তামিমের সঙ্গে সাইফ উইকেটে টিকে ছিলেন প্রথম সেশনের শেষ পর্যন্ত। শুধু আর কিছু বল খেললেই হতো। লাঞ্চের ঠিক আগেই সাইফ স্লিপে ক্যাচ তোলেন জয়াবিক্রমার বলে। সাইফ ৬২ বলে ২৫ রান করে প্যাভিলিয়নে ফিরেন।

পরের ওভারে অফ স্পিনার রমেশ মেন্ডিসের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে আগের টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান শান্ত ৪ বলে শূন্য রানে ফিরলে অধিনায়ক মুমিনুল এসে হাল ধরেন। একপ্রান্তে দারুণ আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পসরা সাজিয়ে দুর্দান্ত ব্যাট করতে থাকেন ওপেনার তামিম ইকবাল। কাঙ্ক্ষিত দশম টেস্ট সেঞ্চুরির দিকে এগোতে থাকা তামিম ৯২ রানে থাকা অবস্থায় জয়াবিক্রমা ইনিংসে প্রথমবারের মতো ওভার দ্য উইকেটে এসে বল করে। এতে তামিম স্লিপে ক্যাচ দিয়ে মাঠ ছাড়েন। টেস্টে এ নিয়ে ৮০ রান থেকে ৯৯ রানের মধ্যে ৮ বার আউট হলেন তামিম।

অভিজ্ঞ মুশফিক এসে অধিনায়কের সাথে ইনিংস মেরামতে নামলে এক পর্যায়ে ২১৩ রানের সময়ও ছিল ৩ উইকেট। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে বড় ধাক্কাটা লাগে মুশফিকের আউটে। লঙ্কান স্পিনকে সাবলীল ব্যাটিংয়ে শাসন করছিলেন এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। উইকেটের কঠিন আচরণ যেন তাঁকে স্পর্শই করছিল না। মুমিনুলের সঙ্গে আরেকটি পঞ্চাশ রানের জুটি গড়ে তিনিও আউট হন জয়াবিক্রমার চতুর বোলিংয়ে। ৬২ বলে চোখের পলকে ৪০ রান যোগ করে মাঠ ছাড়তে হয় মুশফিককে। ছয় ব্যাটসম্যানের বাংলাদেশ দল তখন মুমিনুল ও লিটনের ব্যাটে তাকিয়ে। ফলো অন এড়াতে হলে দুজনকেই অতিমানবীয় কিছু করতে হতো। কিন্তু আজ দিনটা ছিল জয়াবিক্রমার। বাঁ হাতি মুমিনুলকে ফুলটসে লেগ বিফোর করে যেন বাংলাদেশি ব্যাটিংয়ে ধস নামানোর দায়িত্বটা জয়াবিক্রমার হাতেই তুলে দিলেন রমেশ। লিটন, মিরাজ, তাসকিনকে চোখের পলকে আউট করে রেকর্ড বইয়ে নাম লেখান তিনি। পেসার সুরাঙ্গা লাকমল এসে নতুন বলে ২ উইকেট নিলে বাংলাদেশ অলআউট হয় ২৫১ রানে।

অর্থাৎ ২১৩ থেকে এক ধাক্কায় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থামে ২৫১ রানে, ৩৭ রানে হারায় শেষ ৭ উইকেট। শেষ বিকেলে নেমে ২ উইকেটে ১৭ করে দিনশেষ করলে শ্রীলঙ্কা তাদের মোয় লিড দাঁড়ায় ২৫৯, হাতে রয়েছে আরো ৮ উইকেট। এই অবস্থায় বড়সড় একটি টার্গেট লক্ষ্য নিয়েই ৪র্থ দিন মাঠে নামবে তারা।

অথচ তৃতীয় দিন শেষে ২৫৯ রানে এগিয়ে থাকা শ্রীলঙ্কাকে এমন অবস্থা থেকেও হারানোর স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। আজ দিনের খেলা শেষে কোচ রাসেল ডমিঙ্গো ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের উদাহরণ দেখিয়েছেন।

বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গো অবশ্য আত্মবিশ্বাসী। ক্লান্তি ও উইকেটের আচরণকে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসের কারণ বলছেন তিনি। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে বোলিং ও ব্যাটিং দিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ, এমন আশা প্রধান কোচের। আজ দিনের খেলা শেষে তিনি বলেছেন, ‘আমরা কয়েক মাস আগেই অবিশ্বাস্য এক টেস্ট ম্যাচের অংশ ছিলাম। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩৮৭ রান তাড়া করে জিতেছিল আমাদের বিপক্ষে। আমরা এখন পিছিয়ে আছি। অনেক চাপের মধ্যে আছি। তবে আমরা যদি কাল দ্রুত উইকেট নিতে পারি, তাদের ড্রেসিংরুমে যদি কিছু অস্বস্তি এনে দিতে পারি, তাহলে যেকোনো কিছুই হতে পারে। কেউ অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলে ফেলতে পারে। আমাদের ইতিবাচক থাকতে হবে।’

তৃতীয় দিনেই পাল্লেকেল্লে স্পিন স্বর্গই বলা চলে। লঙ্কান স্পিনারদের পর সেই সুবিধাটা নিয়ে দেখিয়েছে বাংলাদেশ দল। দ্রুত ওপেনার লাহিরু থিরিমান্নেকে আউট করে উইকেটের খাতা খোলেন মিরাজ। তাইজুলও হাত ঘুরিয়ে পেয়ে যান ওসাদা ফার্নান্দোর উইকেট। তারপরেও বাংলাদেশকে যে চতুর্থ ইনিংসে পাল্লেকেলের মাইনফিল্ডে বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে হবে, তৃতীয় দিনের খেলা শেষেই আঁচ করা যাচ্ছে। এ অবস্থায় ডমিঙ্গোর আশাবাদকে নিচক স্বপ্নই মনে হতে পারে। তারপরেও লক্ষ কোটি টাইগার্স সমর্থকদের চোখ থাকবে পাল্লেকেলের দিকে।

সম্পাদক

শাহীন তাজ 
ইমেইল- mrshaheentaj@gmail.com, sohojat2019@gmail.com
মোবাইল- ০১৮৭৮-৩৫৩৫৮৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: