পশ্চিমা বৈশ্বিক সাম্প্রদায়িকতা, প্রসঙ্গ ইজরায়েল

খ্রিস্টান ও ইহুদী রাষ্ট্রগুলো আন্তদেশীয় সামাজিক আচার ও রাজনীতি থেকে ধর্মকে অনেকটা আলাদা করতে পেরেছে- কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব তারা একবিন্দুও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তারা সেটা কাটিয়ে উঠতে চায়ও না। সে কারণেই সারা পৃথিবীর খ্রিস্টান ও ইহুদী রাষ্ট্রগুলো ধর্মীয় বিবেচনা প্রসূত হয়েই রসুনের গুটির মতো ঐক্যবদ্ধ। সেদিক থেকে তারা নিজ নিজ দেশে সেক্যুলার হলেও, বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তারা চরম সাম্প্রদায়িক।

পক্ষান্তরে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো আন্তদেশীয় আচার থেকে ধর্মকে আলাদা করবে তো দূরের কথা, সেটা তারা ভাবছেও না। অথচ বৈশ্বিক রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব তারা একবিন্দুও কাজে লাগাতে পারছে না। সে কারণে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক ধর্মীয় বিবেচনা প্রসূত না হওয়ায় তারা সদা বিচ্ছিন্ন ।

শুধু তো ফিলিস্তিনে নয়! কাশ্মিরে, ভারতে, চীনে, মিয়ানমারসহ আরও যে-সকল রাষ্ট্রে মুসলিম নিধনের পাকাপোক্ত প্রস্তুতি ও কার্যক্রম চলেছে ও চলছে, তার একমাত্র কারণ হলো অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ঐক্য ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর অনৈক্য! এতে করে বৈশ্বিক রাজনীতিতে চরমভাবে ভারসাম্যহীনতা কায়েম হয়ে আছে বহুকাল ধরে। তার ফলাফল- ফিলিস্তিনের চলমান হত্যাযজ্ঞও…

ইসরায়েল রাষ্ট্রটির নিজেরই রয়েছে অনেক শক্তিশালী সামরিক সামর্থ। তার সঙ্গে রয়েছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সকল সামরিক আয়োজন। ফলে এই মহাশক্তির সঙ্গে ফিলিস্তিনের কোনোভাবেই যুদ্ধে পারবার কথা না। এ সত্য ইসরায়েল যেমন জানে, একইভাবে ফিলিস্তিনও জানে। তা সত্ত্বেও যখন ফিলিস্তিনি নাগরিকরা চোখের সামনে দেখতে পান, নিজের সন্তান রকেটের গুলিতে রক্তাক্ত হয়ে ঝাঝরা হয়ে দাপিয়ে মারা যাচ্ছে কিংবা বুড়ো বাপ অথবা কোনো বন্ধুকে ধরে নিয়ে তৎক্ষণাৎ গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে- তখন মোটেও ঠিক থাকতে পারেন না ফিলিস্তিনি সেই সব না্গরিক।

এমতাবস্থায় ফিলিস্তিনের নারী-শিশুসহ নিরীহ-অসহায় মানুষের দিক থেকে হত্যার জবাবে গাজা থেকে রকেট ছোড়া হলে, সেটাকে লাগাতার বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে বলে ফলাও করে প্রকাশ করে পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু মহা শক্তিধর ইসরায়েলের অনেক বেশি নির্মমতা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর চোখেই পড়ে না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন যেগুলোর অধিকর্তা পশ্চিমারা, সেই মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে পৃথিবীর নানা বিষয়ে দেখা যায় তাদের মতামত দিতে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আন্তঃসমস্যাদি নিয়েও দেখা যায় তাদেরকে নাক গলাতে। অনেক সময় এই মানবাধিকার সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রেখে থাকে। কিন্তু বহুকাল ধরে ফিলিস্তিনি মুসলিম সাধারণ নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলি ইহুদী সরকার যে চরম অমানবিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে পশ্চিমা এই সব মানবাধিকার সংগঠনগুলোও একেবারে নিশ্চুপ। যার মূল কারণও পশ্চিমা দেশগুলোর বৈশ্বিক-সাম্প্রদায়িকতা।

এই সব মানবাধিকার সংগঠনে যে সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন করে থাকে, সে সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর পশ্চিমা সরকারগুলোর কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকে, সে কারণে এই সব সংগঠন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোনোভাবেই কাজ না করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তিত হয়, প্রেসিডেন্টও পরিবর্তিত হয়। পরিবর্তিত প্রেসিডেন্টদের মধ্যে অনেক কিছুরই ভিন্নতা থাকে। কিন্তু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরায়েলের পক্ষে কথা বলার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সকল দলের সকল প্রেসিডেন্টই থাকেন অভিন্ন অবস্থানে। ফিলিস্তিনিদের জমি ক্রমাগতভাবে দখল করে অবৈধ বসতি গড়ে যাচ্ছে ইসরায়েল; তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গেলে নারী-শিশু-বৃদ্ধ-যুবা সবাইকে লাশ হতে হয় আর এই প্রক্রিয়াকে মার্কিন প্রশাসন ঘোষণা করে থাকে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার অধিকার বলে!

ফলে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও আক্রমণের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গী এমন যে, তাতে পশ্চিমাদের কথিত সভ্যতা সম্পূর্ণরূপে উলঙ্গ হয়ে পড়ে।

সার কথা হলো, ফিলিস্তিনে এই নরহত্যা কেন চালানো হচ্ছে- তার যেমন কোনো জবাব বিশ্বসভ্যতার কাছে নেই, একইভাবে কাশ্মিরে কেন ভারত এই নির্মমতা চালিয়ে যাচ্ছে তারও সঠিক জবাব নেই কারও কাছে। ভারতে এনআরসি করে কেন লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে দেশছাড়া করবার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ খুঁজছে ভারত তারও বিশেষ জবাব নেই কোথাও। একইভাবে জবাব নেই কেন চীনের উইঘুরে মুসলমানদের ওপর এতো নির্মম আচরণ করছে চীনা সরকার। মিয়ানমারে লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের কেন এভাবে নিজের ভিটে ছাড়া করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হলো, নেই তারও কোনো জবাব কোথাও।

এই যখন বাস্তব অবস্থা, তখন কোনো কোনো গবেষকের মত হলো, বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ওপর এবং বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের ওপর অন্যায্য এই নির্যাতন দেখে দেখে অন্যান্য দেশের মুসলিমরা বিশেষ করে ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে তথা ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই পর্যায়ক্রমে তারা জঙ্গি হয়ে ওঠে।

সে দিক থেকে বিশ্বসভ্যতার সামনে এখন প্রশ্ন হলো, যে জঙ্গীবাদকে নির্মূল করবার জন্য পশ্চিমাদের এই যে ব্যাপক আয়োজন, তাহলে কি সেই জঙ্গীবাদের স্রষ্টা তারা নিজেরাই?

যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে কোনো কোনো গবেষকের নিরঙ্কুশ সিদ্ধান্ত হলো, জঙ্গীবাদকে নির্মূল করতে হলে অবশ্যই ফিস্তিনীদের ওপর ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও আক্রমণের ক্ষেত্রে পশ্চিমা বৈশ্বিক-সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে এবং সেটি করা গেলেই ফিলিস্তিনিদের ওপর এই চরম অন্যায্যতা বন্ধ হবে এবং তাতে করে জঙ্গীবাদ সৃষ্টিও পর্যায়ক্রমে থেমে যাবে।

শওকত হোসেন

কবি ও লেখক। 
সম্পাদক, ত্রৈমাসিক হালখাতা ও গোলাঘর পত্রিকা। 
সাধারণ সম্পাদক, লেখক আড্ডা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: