নিঃসঙ্গ ঘোড়া // নোমান নজরবি

নিঃসঙ্গ ঘোড়া

নীল জলাশয়ের পাশে নিঃসঙ্গ ঘোড়াটির মতো দাঁড়িয়ে আছি;
জলের দিকে নতমুখী সন্ধ্যা-ছায়ার পাশে—

কোন হ্রেষা নেই, নেই কেশের আস্ফালন এমন অবসাদে!

জলও স্থির— যেনো হাওয়া বইছে না পৃথিবীতে
দূরে কম্পনহীন ধূসর ঝাউবনের জলরঙের ছবি
কাশফুলের ঢংয়ে ফ্যাকাশে মেঘ ফুটে আছে—
গ্রহের সকল নির্জনতা নিয়ে ওরা পড়ে আছে এখানে
দূরে জেগে আছে অচেনা আদিম পাহাড়;

হৃদয়ের জীর্ণতা নিয়ে একজন দুঃখ আছে আর—

তারপর কেউ নেই—
তবু পাড়ের দিকে মানুষের পায়ের চিহ্ন রয়ে গেছে;
আর কিছু বুদবুদ তখনো লেগে আছে কিনারে—
সন্ধ্যার মিনারে চড়ে বিরহ গাইছে আজান—
যাদের ঘর আছে তারা ঘরে ফিরে গেছে

নীল জলাশয়ের পাশে নিঃসঙ্গ ঘোড়াটির মতো দাঁড়িয়ে আছি;
অনন্ত অপেক্ষা নিয়ে যার খুর আটকে আছে শ্লথ বালিতে!

রসুন

ছাড়াচ্ছি মচমচে সফেদ পর্দা
ক্রমশ প্রকাশমান সদস্যবৃন্দ— সংঘবদ্ধ
ছোট-বড়-মাঝারি—সারি সারি
দিয়ে আছে বেড়া যেনো ট্রয়ের প্রাচীর—ভীষণ দূর্ভেদ্য!

আজ ঈদ মাংস রান্না হবে আমাদের বাড়ি—

আঙুল যেনো সেই কাঠের ঘোড়া—শত্রুর শয়তানি
নিদ্রামগ্ন শান্তিময় শহরে দিয়েছি অকস্মাৎ হানা
একে একে যখন খসিয়ে নিচ্ছি কোয়া, মনে হলো
আলাদা করে দিলাম সঙ্গ—ভাঙিলাম যৌথখামার—
মনে হলো, ছারখার দিলাম করে সুসজ্জিত প্রাচীন শহর
আমি যেনো আধুনিক সময়ের ব্রোকেন সর্দার—খুনির ফলক
রাজা প্রিয়ামের চোখে পুনরায় দিলাম তুলে পুত্রহারা শোক!

এভাবে যায় না থাকা ভালো তবু স্বার্থান্ধ পৃথক হয়ে আছি;
ওদেরও করছি ফারাক স্বজনের সংযোগ থেকে—অথচ
ওদের সাধ পরস্পর আলিঙ্গনে ও চুম্বনে গেঁথে থাকার—

রসুনকে দেখলে মনে পড়ে যৌথ পরিবারের স্মৃতি—
আহা একদা মানুষেরও ছিলো এমন যুক্তবর্ণ ঐক্যের সংসার!

সরিষা ক্ষেত

একটা সরিষা ক্ষেত হলেও পারতাম—

শীতকালে—হলুদাভ ফুটে থাকতাম দিগন্ত জোড়া মাঠে
কুয়াশায় ভিজে থাকতাম, রোদ উঠলে শুকাতাম আবার।
ভোরে হিম-আল ধরে হেঁটে যেতো কৃষক—কুশল সুধাতো।
মধ্যাহ্নে কৃষাণী আসতো জল ও খাদ্য সমেত— মৃদু ইর্ষা করতো
অথবা আহ্লাদে কানে গুঁজে নিতো হলুদগুচ্ছ!

একটা সরিষা ক্ষেত হলেও পারতাম—
মাঠের সৌন্দর্য হয়ে ফুটে থাকতাম প্রসন্ন চোখে;

রঙিন শাড়ি তুমি সুসজ্জায় দেখতে আসতে দূর থেকে;
আর খিলখিল নিঃশঙ্কোচ ঠুকে পড়তে আমার ভেতর—
নানা ভঙ্গিতে দাঁড়াতে, বসতে, এলিয়ে পড়তে নিয়ে
সমস্ত রুপ সম্ভার, বাহারি আঁচল— চিবুক ও ওষ্ঠ নিয়ে
ঝুকে পড়তে আমার রেণুতে—দড়ি খোলা
ধেনুর মতো সারা ক্ষেত তছনছ করে দিতে।

তুমিও হয়ে উঠতে যেনো প্রজাপতি, মৌমাছি কোন—
ফুটে থাকা আমাতে বসতে অভিভূত—মধু চুষে নিতে।
মিলনের প্রণালীতে ভরে দিতে পাতলা দেহো—
তিরতির আমাকে কাঁপাতে!

একটা সরিষা ক্ষেত হলেও পারতাম—
মাতাল গন্ধে মিঠাই করে তুলতাম হাওয়া
রোদের সাথে আরো রোদ হয়ে ফুটে থাকতাম সারা মাঠে—
শীতকালে—তোমার উজ্জ্বল আনন্দ হতাম!

পথ

পথ আমাকে কাঁধে তুলে নেয়।
আমি পথের কাঁধে চরে বের হই পৃথিবী ভ্রমণ।
দেশ থেকে দেশ। মহাদেশ থেকে মহাদেশে যাই৷
বিশ্ব-মানচিত্রের শিরা-উপশিরায় ঘুরিয়া বেড়াই।

ঘুরে ঘুরে দেখি আশ্চর্য যত সবুজ ও সুন্দর।
বিচিত্র মানুষ দেখি। মাধুর্য দেখি।
লাবণ্যময় নারীদের দেখি প্রেমিকের অন্তরে।
তাদের দেহের মতো প্রাচীন স্থাপত্য দেখি। অবাক বিস্ময়ে দেখি
আদিম সভ্যতার ভগ্নস্তূপ। দেখতে দেখতে
আশ্চর্য ঘোরের ভেতর হারিয়ে যাই—

তারপর আমাকে হঠাৎ আবিষ্কার করি নীলজল
ফোরাতের তীরে। আজো হায় কারবালা ক্রন্দন করে—কেঁদে ওঠে
সিমারের ছুরিও! আজো তৃষ্ণার্ত প্রাণ—পানির জন্যই যুদ্ধ হয়!
আরবি উর্বর বালিকারা শাতাল আরবের ধারার মতো বয়ে যায়!
সেখানে রয়েছি ধ্যানের ভঙ্গিতে। হাওয়াদল বাজনা তোলে জলের সেতার—
যেনো চোখ বুঁজে প্রার্থনা বাজিয়ে চলেছেন পন্ডিত রবিশংকর।

পথ আমাকে কাঁধে তুলে নেয়।
যেমন শৈশবে কাঁধে তুলে নিতেন পিতা।
পিতার কাঁধে চড়েই প্রথম দেখা পালেদের আড়ং।
আমি পথের কাঁধে চড়ে বের হই বিশ্ব ভ্রমণ।
পাহাড়ে-পর্বতে যাই। ভেসে বেড়াই সমুদ্রে সমুদ্রে।
উলের মোজা ও গামবুট পরে ঢুকে যাই আইসল্যান্ড।
প্রবল তুষার ঝরে যায়—ঢেকে যায় শীতল-সাদায়।
আমি আগুন জ্বালিয়ে মাংস পুড়াই। বরফ মিশাই ভদকায়।

ঘোরগ্রস্থতা শেষে পুনরায় পথ আমাকে কাঁধে তুলে নিলে
তখন ঘরের দিকে পত্যাবর্তন। গ্রামের দিকে ফেরা।
সোনালি ধান ও জোনাকি-গন্ধের কাছে আসা—দোয়েলের ভালোবাসা।
চির অপেক্ষায় বড় চাতকিনির মতো বসে থাকে যে উজ্জ্বল নারী—
ঢুকতে থাকি বুকে তারই প্রকৃত ভূগোলে— খুব আনন্দ হয়;

স্থাপত্যকলা

মরে যাই সবুজ বিষে—
শিরার সড়ক ধরে হিসহিসে চলে যায় চন্দ্রবোড়া

শরীরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নাই; —
আর ভেতরে উপুড় হই, পড়ে থাকি
ভরে থাকি পৌরাণিক গোলকধাঁধায়—

প্রশ্নতাত্ত্বিকের মতো তল খুড়ে তুলে আনি ইতিহাস

তার পাশে চিত হয়ে দেখি গ্লোরিয়াস আকাশ
ডানায় মেঘ কেটে কেটে সোনালি এক চিল উড়ে যায়—

মরে যাই সবুজ বিষে—
হাওয়া যেমন গমের শিষে চুড়মুড় ভেঙে পড়ে যায়;

শাহীন তাজ

জন্ম ২ জানুয়ারি, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। 
পেশায় কলেজ শিক্ষক। 
আগ্রহ কবিতা, গান, ছড়া ও কথা সাহিত্য। 

ওয়েবজিন সহজাতের উদ্যোক্তা ও নির্বাহী সম্পাদক। 

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ- 
আমার প্রথমা (২০১৪)

কবিতাগ্রন্থ- 
সেলাইকল (২০১৮) 
স্মৃতিগন্ধনগর (২০২০)

মোবাইল- ০১৮৭৮-৩৫৩৫৮৮
ইমেইল- mrshaheentaj@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: