নাহ্ তারা মরেও মরে না

হাজার হাজার বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা লড়াই করে আসছে। তাদেরকে নির্বিচারে মেরেও শেষ করে ফেলা যায় নি। যাবেও না বলা যায়, যতই ‘ডিটারমাইন্ড’ হোক নেতানিয়াহুগণ।

বর্তমান গাজা উপত্যকা, যেটি আরবি ভাষায় গাজ্জা ছিল, সেই প্রাচীন পালেস্তিনা রাজ্য। ছোট ঐ রাজ্যের সাথে নবী ও বাদশা সুলাইমানেরও (আ:) লড়াই হয়েছিল। প্রাচীন ফিলিস্তিন ভূখণ্ড বর্তমান লেবানন সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রাচীন ‘কিংডম অব ইসরাইল’ জন্ম নিয়েছিল প্রাচীন ফিলিস্তিনে। তারপর বহু বছর ইহুদিরা বিতাড়িত ছিল। বর্তমান ইসরাইলও ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে জন্ম নিয়েছে। এর জন্যে ফিলিস্তিনিদের বোকামি অস্বীকার করা যায় না। কাদের কাছে জমি বিক্রি করেছিল, বুঝতে পারেনি ফিলিস্তিনিরা। ওরা ছিল যায়নবাদি, যারা জমি কিনেছিল।

কিন্তু যায়নবাদি মানেই ইহুদী না। খৃস্টান যায়নবাদিও আছে। ইউরোপ আমেরিকার হাজার হাজার ইহুদি ইসরাইলকে সমর্থন করে না। বিশেষত ধর্মের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাতাগণ আর ওটাকে টিকিয়ে রাখবার জন্যে মরিয়া যারা, তারা ষড়যন্ত্র করাকেই পরিকল্পনা করা মনে করে আসছেন এবং এ পর্যন্ত রাষ্ট্রটি টিকিয়ে রাখতে যা করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে, তাতে এটা পরিস্কার- “Zionism justifies discrimination and oppression”। মানে যায়নবাদ তাদের প্রয়োজনে বৈষম্য ও অত্যাচার করা ঠিক মনে করে। শুধু এতেই শেষ না, প্রতিপক্ষকে নৃশংসভাবে হত্যা করাকেও অনুমোদন করে।

যায়নবাদের গোড়ার কথা একটু বলা যাক—
ম্যায়র আমশেল রথচাইল্ড নামের লোকটি, যিনি ১৭৪৪ খৃষ্টাব্দে জন্ম নিয়ে ১৮১২ খৃষ্টাব্দ মরে গিয়েছিলেন, যিনি ছিলেন একজন জার্মান ধনকুবের এবং তার ধর্মীয় পরিচয় ছিল অর্থডক্স ইহুদী, তিনি মনে করতেন জগতে ধন-দৌলতের ক্ষমতাই সবকিছুর উপরে। ইংরেজিতে রথচাইল্ড শব্দটির জর্মন ভাষার উচ্চারণ রশিল্ড। তার মতে ‘কোনো জাতিরাষ্ট্রের আইন কে বানায় আমি পরোয়া করি না, কেবল সে-জাতির অর্থ ব্যবস্থা আমার নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দাও।’ এই আমশেল রথচাইল্ড হলেন ইউরোপের ধনকুবের গোষ্ঠী ‘রথচাইল্ড ব্যাংকিং ডাইনেস্টি’র জনক। তার পাঁচ ছেলে পাঁচ মেয়ে। দ্বিতীয় সন্তান প্রথম পুত্র আমশেল ম্যায়র ভন রথচাইল্ড মারা যান সন্তানহীন থেকেই। তারা জার্মান রয়েল ফেমেলি বলে বিবেচিত। বাকি ভাইদের সন্তানেরা গোষ্ঠী বড় করে। তারা গোষ্ঠীর ভেতরেই চাচাত ভাই বোনের মধ্যে বিয়ে করে যাতে কন্যারাও প্রিন্সেস হয়ে থাকে। কারণ মেয়েরা সরাসরি উত্তরাধিকার হতে পারে না। ছেলেরা পারিস, লন্ডনে গিয়ে রয়েল পরিবারগুলোর সাথে মিলে ব্যাংক ব্যবসা প্রসার করে। ইউরোপে তারা অপ্রতিদ্বন্ধী ব্যাংকার গ্রুপ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়।

এই রথচাইল্ড গোষ্ঠী বিভিন্ন যুদ্ধে উভয় পক্ষে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে প্রচুর মুনাফা অর্জনের খ্যাতি আছে। তারা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে কোন্ পক্ষকে জয় দিলে তাদের জন্যে ভাল হবে তার ছকও বানায় এবং ‘সফল’ হয়।

সংক্ষেপে একটা বহু পঠিত ঘটনা: ১৮০৩ থেকে ১৮১৫ সময়খণ্ডে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যুদ্ধ করে করে বিভিন্ন দেশ দখল করছিলেন। এক পর্যায়ে তার নজর পড়ে বৃটেনের উপর। বৃটেন দখল করবেন তিনি। রথচাইল্ড ফেমেলির দুই ভাই চক্রান্ত করেন। প্যারিসে থাকা ভাই নেপোলিয়নকে উস্কে দেন যুদ্ধে যেতে এবং অর্থ ও অস্ত্র দেয়ার গ্যারান্টি দেন। লন্ডনের ভাই বৃটেনকে যুদ্ধে নামাতে রাজি করায়। যুদ্ধ চলাকালে তাদের ব্যবসা তো হচ্ছিলই কিন্তু তারা হিসাব করে দেখলেন বৃটেনকে জিতাতে পারলে বৃটিশ রাজপরিবার তাদের কাছে চিরকালের জন্যে ঋণী থাকবে। সেটা ভবিষ্যতে বিস্তর লাভের গ্যারান্টি হবে। সুতরাং প্যারিসের ভাই নেপোলিয়নকে অর্থ ও অস্ত্র যোগান কমিয়ে দিল। জয় পেল বৃটেন। রাণীর খুব প্রিয়ভাজন হয়ে গেল রথচাইল্ড পরিবার। ঐ পরিবার থেকে রাণীর উপদেষ্টাও রাখা হয়।

সেই রথচাইল্ড পরিবারের শত শত বিলিয়নের ধন-সম্পত্তি আছে এখন। এক হিসাবে ‘রথচাইল্ড ব্যাংক’র সম্পত্তি ৩৫০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। বিশ্বের স্বর্ণের বাজার কখনো প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তারা হিলারিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বানাতে চেয়েছিল। এজন্যে তারা ‘এক লাখ ডলার এক প্লেট খাবার’ শীর্ষক ফান্ড তোলার প্রোগ্রাম করে হিলারির জন্যে। এ হল, যায়নবাদীদের হিসাবের কথা।

কিন্তু সত্য হল, ফিলিস্তিনিরা মরতে মরতে, রক্তাক্ত হতে হতে টিকে আছে বংশ পরম্পরায়। ওরা সংশপ্তক—ওরা মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও লড়াই করে। ধ্বংসস্তুপে ফের ঘর বানাতে তাদের প্রজন্ম রয়ে যায়। চতুর্দিকে ধ্বংসস্তুপ ও রক্তের দাগ সত্ত্বেও গাজা শহরে এগার দিনের যুদ্ধ শেষে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করায় ২১ মে ভোররাতে প্রধান সড়কগুলোতে সাময়িক বিজয় মিছিলে অংশ নেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। বিজয় এ কারণে যে বিশ্বের সুপার পাওয়ার কয়েকটি দেশের সমর্থনপুষ্ট ইসরাইল যুদ্ধবিরতিতে আসতে বাধ্য হয়েছে। যদিও এ বিরতি শর্তহীন। অর্থাৎ পর্দার আড়ালের কথাটি ‘তুমি মারলে আমিও মারবো’ এমন সমান্তরাল অবস্থান রেখেই যুদ্ধবিরতি হল; অর্থাৎ মসজিদুল আকসায় ইসরাইলের সৈন্য ঢুকে বেয়াদবি করলে বা শেখ জারাহ এলাকা থেকে ফিলিস্তিনি উচ্ছেদ করা শুরু করলে চুপ থাকবে না হামাস। গাজা উপত্যকায় টানা ১১ দিন ভয়াবহ হামলা চালানোর পর অবশেষে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অফিস থেকে ফিলিস্তিনের গাজায় হামলা বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয় গত রাত ২টার দিকে। নেতানিয়াহুর অফিসের ঘোষণার আগে ২০ মে ইসরাইলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে তারা নিজেরা সম্মত হয়।

মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে বলা হয়, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে মিশর, তবে এই যুদ্ধবিরতি হবে ‘দ্বিপক্ষীয় ও শর্তহীন’। হামাস এবং ইসলামী জিহাদও যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। হামাস ও ইসরাইলের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ২০ মে স্থানীয় সময় দিবাগত রাত ২টা এবং বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। উল্লেখ্য, ইসরাইলি বিমান হামলায় এগার দিনের যুদ্ধে ২৪৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজার বিশাল এলাকা। অন্যদিকে হামাসের রকেট হামলায় প্রাণ গেছে ১৪ ইসরাইলিরও।

অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রসজ্জিত ষোলআনা নিবেদিতপ্রাণ বিশাল চৌকষ বাহিনী এবং আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্সের সমর্থনপুষ্ট যায়নবাদি বর্ণবাদি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে এক অবরুদ্ধ জনগোষ্ঠী ফিলিস্তিনিদের সাথে লড়াই বন্ধ করতে সম্মত হওয়া ফিলিস্তিনিদের বিজয়ই বটে। হ্যাঁ, এগার দিনের যুদ্ধে সংখ্যায় তারা বেশি মারা গেছেন ঠিক, কিন্তু তারা মরে যায় না, নিশ্চিহ্ন হয় না। তারা হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে এভাবেই।

সারওয়ার চৌধুরী

কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও অনুবাদক, কলামিস্ট।
প্রাক্তন সিলেট প্রেসক্লাব সদস্য। সহকারী সম্পাদক দৈনিক জালালাবাদ।

ভাষা জানেনঃ বাংলা, ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, উর্দু। তেইশ বছর ইউএই প্রবাসী ছিলেন।
বাড়িঃ আজব নূর মঞ্জিল, নিজামপুর, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেট।

প্রকাশিত বই:
একমুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা, উপন্যাস, ২০০৬, শুদ্ধস্বর।
অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প, উপন্যাস, ২০০৭, শুদ্ধস্বর।
বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে, প্রবন্ধ সংকলন, ২০১২, আদর্শ।
শিশির ও ধুলিকণা মায়া, গল্প সংকলন, ২০১৪, শুদ্ধস্বর।
হারুকি মুরাকামির গল্প ও বচনামৃত, [অনুবাদ গল্প], ২০১৫, চৈতন্য।
ভালবাসার চল্লিশ নিয়ম, অনুবাদ উপন্যাস, মূলঃ এলিফ সাফাক ২০১৬, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০২০, চৈতন্য। 
সাক্ষাৎকার, [অনুবাদ, পাওলো কোয়েলো, হারুকি মুরাকামি, থিক নাট হান],  
সংগীতশিল্পী, [অনুবাদ, মূলঃ কাজুও ইশিগুরো], ২০১৮ চৈতন্য।
লৌকিক মায়া অলৌকিক সুন্দর, প্রবন্ধ সংকলন, অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানী,  ২০১৯, তলস্তয় ও সোফিয়ার সম্পর্কের সৌন্দর্য উদ্ধার ও অন্যান্য, গবেষণা; অগ্রদূত অ্যাণ্ড কোম্পানি, ২০২০। অক্টোপাসের বউ, কাহিনীকাব্য, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, ২০২০     
Email: sarwarch@gmail.com 

ইংরেজি রচনার সাইটঃ
http://www.poetfreak.com/poet/sarwarchowdhury
http://www.poemhunter.com/sarwar-chowdhury/
http://www.completeclassics.com/sarwar-chowdhury/poet-535000/poems/page-1/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: