নারীর হাত যতোবার বাঁধবে খোঁপা

কালো বিড়াল

বিষমাখা গম চাল ডাল খুদ
কতো লোক কতো কী রেখে গিয়েছিলো
গর্তের কাছে

ভুলেও ছুঁয়ে দেখিনি
কৃষকের কতো ফাঁদ পেরিয়ে গেছি
কখনো কোনো ভুল হয়নি
এবার বুঝি প্রথমবার বোকামি হলো
তুমি এসে ভালোবাসা নিয়ে ডাক দিলে
চু চু শব্দ করে নিরাপদ গর্ত থেকে
আনন্দে বেরিয়ে এলাম
ধানক্ষেত আলপথ বাঁশঝাড় ঘরবাড়ি
অনেক দূর পথ চু চু শব্দ করে
এক সাথে হেঁটে এসে দেখি

যে আমাকে
ভালোবাসা নিয়ে ডাক দিয়েছিলো
সে একটি কালো বিড়াল।

ঝরাপাতার রোদন

হলুদ হবার আগেই
আমার সবুজ জীবন
চৈত্রের একলা বাতাসে
একলা ঘুরে ঘুরে
মাটির খুব নিকটে এসেছে।

তাতে গাছটার এক তিল কষ্ট হলো না
ছিটেফোঁটা অনুতাপ হলো না
আমাকে ঝরিয়ে দিয়ে
মগডালের খোঁপা খুলে
উত্তুরে হাওয়ায় ঠাঁই আগের মতো দাঁড়িয়ে আছে

পত্রের সমারোহে
একটি পত্র ঝরে গেলে
দুঃখ করার যদিও কিছু নেই
তোমার পাদদেশে পড়ে থেকে, তবু বলি হে প্রিয়ো-

জীবন্ত গাছের কাঠে যেহেতু ঘুণ ধরে না
একদিন শিকড় মরে গেলে আমাকে বুঝবে…

যাতনা

ঝগড়াঝাঁটির আগুনে পুড়ুক বিহঙ্গসম্প্রদায়
আয়না ধরে কাড়াকাড়ি করুক
শালিক দোয়েল ময়না টিয়ে;- কার আগে
কে দেখবে মুখ, তা নিয়ে গাছে গাছে
চেঁচামিচি হোক;- স্বরূপ দর্শনে ব্যথিত হবো
আমি উটপাখি তাই দর্পণে তাকাবো না কখনো।

বাগদত্তা

গতকাল আমার একটি
বৃক্ষের সাথে পরিচয় হয়েছে
যার কোনো শাখাপ্রশাখা নেই
সে না-বড়ো-না-ছোট।

বৃক্ষটি মূলত
একটি আঙুল: তোমার অনামিকা।
যার চূড়ায় আফ্রোদিতির নাভির মতো
মনোরম পুষ্প ফুটে আছে: তোমার শুভ্র নখ।

আঙুলের ছদ্মবেশে
আমাদের ব্রহ্মান্ডে
একটাই বৃক্ষ আছে
আর তাতে একটাই ফুল।

গতকাল আমি এই বৃক্ষে আংটি পরিয়ে
তার ফুলটিতে চোখ বন্ধ করে চুমু দিয়েছি।

আমরা দু’জন এক জোড়া পাখি

মনে হচ্ছে- আমি ছোট দুটি ডানায়
মানুষের দেহের চেয়েও বেশি শক্তি নিয়ে উড়ছি।
ব্যস্ততার আদি-অন্ত নেই। এ গ্রাম ও গ্রাম থেকে
জোগাড় করছি উপযুক্ত খড়কুটো।

সূর্যের সাথে আমার কোনো শত্রুতা নেই
সে তবু এতো দ্রুত ডুবে যায় কেনো?
ও আরেকটু দেরিতে অস্ত গেলে
নীড় বুননের আরোকিছু উপাদান
সংগ্রহ করা যেতো। আনন্দ আর অস্থিরতায়
গাছের কোনো ডালপালাতে

আমি এক মুহূর্তের জন্যে স্থির দাঁড়াতে পারছি না
তুমি শিস বাজিয়ে জানিয়ে দিয়েছো- তোমার ভেতরে ডিম এসেছে।

পাড়ানি

বলেছিলে-
আগে নদী পাড় করো
তারপর দেবো আলিঙ্গন।

কড়ির বদলে স্পর্শ পাবো
এমন শর্তে তোমাকে
ওপারে পৌঁছে দিয়েছি
আর তুমি কি-না ওটা না দিয়েই
বড় বড় পা ফেলে
চলে যাচ্ছো? আমি হাসছি- ‘হা হা’

কৃষ্ণের ফাঁদ পেরিয়ে যাবে রাধিকা
তা কী করে হয়! দৌড়ের অনুরূপ হেঁটে
ক্লান্তি চলে আসার পর
শীতল হবার জন্যে তুমি যার নিচেই দাঁড়াবে
প্রতিটি গাছের ছায়া হবে আমার গভীর চুম্বন।

নিজেকে উপদেশ

আমি ঘুরেফিরে বারংবার নিজেকে বলেছি
মৌন বৃক্ষের মতো ধৈর্য ধরো
পশ্চিমে ডুবে যাওয়া সূর্য
ফের পুবের আকাশে ফিরে আসে
সব পাতা ঝরে গেছে, যাক।
পুষ্পহীন হাড়ের মতো ডালপালা নিয়ে
দুঃখ করো না, বসন্তের প্রত্যাবর্তন আছে
আবারো তুমি সজ্জিত হবে
ফুল ও পাতায়, আমি ঘুরেফিরে নিজেকে বলেছি

সমুদ্রের গর্জন শোনার আগে একবার নদীতে সাঁতার দাও…

ক্রুশ

মেঠো পৃথিবীর কোমল পিঠ
যতোকাল বয়ে বেড়াবে মানুষের পায়ের ছাপ
নারীর হাত যতোবার বাঁধবে খোঁপা
যতোবার গোলাপ হাতে দাঁড়াবে পুরুষ
দুই দেহে বাঁধিবে ফুল-ভ্রমরের প্রেম
যুগ ও যুগান্তর ধরে যতোকাল এইসব রবে
-ভোরের আকাশের পূর্বকোণে উদিত চিরন্তন সত্যের মতো,
সন্ধ্যার আকাশের পশ্চিমে নিভে যাওয়া চিরন্তন সত্যের মতো-
ততোকাল ধরে জানবে মানুষ:
আমার হৃদয় একজন নির্লোভ যিশু
যার ভেতর তুমি ক্রুশ হয়ে বিঁধে আছো…

উঠোনে চন্দ্রোদয়

মেঘের আক্রোশে মুহূর্তে আকাশে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্যুতের শিকড়
মেঠো উঠোনে বৃষ্টি নামে নূপুর কিংবা ঘুঙুরের শব্দের মতন,
পাপড়ি ধুয়ে নেয় বাগানের ফুল
পাখি ধুয়ে নেয় পালক
বৃক্ষেরা ফিরে পায় সজীবতা
আর বারান্দার পিঁড়ি থেকে নেমে এসে চাঁদ ভিজে বৃষ্টিতে,
তাহার লাবণ্য-ঝড়ে মোচড় দিয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে চারপাশ-

আমি জেনে যাই, চাঁদ শুধু আকাশেয় নয়, মাটিতেও থাকে।
এই চাঁদের চিরল পাতার মত ঠৌঁট আছে
অভিমান আছে… টানাটানা চোখ আছে…

এই চাঁদ খোঁপায় গাঁথা ফুল নিয়ে একাকী উঠোনে ভিজে।

শিকার

আমার দু চোখ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দুজন চিত্রশিল্পী।
তোমার কথা মনে পড়লে আমার নরম গালে
অশ্রু দিয়ে তারা অঙ্কন করে নারীর নিষ্পাপ মুখ।

আমি হাত দিয়ে জলের অঙ্কিত চিত্র মুছে দিই
মানুষের কাছে এই মহৎ শিল্পটি গোপন থাকুক
মানুষ না জানুক- এই শিল্পের আড়ালে
কে আছে…
কে থাকে…

আদিম মানুষের বলগাহরিণ শিকারের কায়দায়
দশ আঙুলের বল্লমে তোমার মুখটিকে তাই
আমার গালে নিরুপায় শিকার করে ফেলি।

স্বাভাবিক দুর্ঘটনা

এবার ঘরের মেঝে পরিষ্কার করার পালা-

আমি তার
হাত ফসেকে পড়ে
ভেঙে যাওয়া মাটির ফুলদানি।

জীবনানন্দ দাশ

কবি হতে গিয়ে নিজেকে
দুভাগ করে ফেলেছিলেন
কবি জীবনানন্দ দাশ-

তার একভাগ থেকে জন্ম নিয়েছিলো
অরণ্য, অসংখ্য ঘুঘু আর নিস্তব্ধতা
বাকি আরেক ভাগ থেকে জন্মেছে
তীর, ধনুক ও কয়েকজন শিকারি…

নদীপুরাণ

স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস পুষে রাখি
ডানামেলে নেমে আসে হিংস্র রাত।
তুমি বলেছিলে- দহনে পূণ্য হয়
আমি সেই থেকে পূণ্যবান।
স্মৃতির তসবি নিয়ে খেলা করে আঙুল
আমাকে পেরিয়ে চলে গেছো
আমি পেরুতে পারিনি আজো
রয়ে গেছো- থেকে গেছো-
নিরীহ উটের গলায়
ধারালো ছুরি।

যে নদী ড্রয়িংরুমে হাঁটে
যে নদী নদ ভুলে
পুরুষের সাথে শোয়
যে নদী নদের হাত ছেড়ে
অনায়াসে কলকল হেসে-ভেসে যায়
দহনে পূণ্য হলে
এ নদীর পাপ আছে আজ।

বুনোফুল

আড়ালে জন্ম আড়ালে বিনাশ
পাপড়িতে আমার বাহার ছিলো না
সৌরভ-সুরভিও ছিলো না তেমন

বনের ভেতরে ফুটে বনের ভেতরে ঝরেছি
তবে আমি বুনোফুল ফুটেছিলাম, ওটা সত্য!

তামীম চৌধুরী

তামীম চৌধুরী


জন্ম: ০৮ জুন, ১৯৯৫। দিলালপুর, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ।

আগ্রহ: কবিতা।

প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থ- আঙুলের হৈচৈ (২০১৮)

ইমেইল- tamim.ch92@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: