দেহাতি গান // সারাজাত সৌম

দেহাতি গান

কানের পাশ দিয়ে উড়ে যায় কনকপাখি—
এবেলা শীত কুড়াব বলে
বেলি ফুটে আছে ব্রোথেলে—
কুয়াশার মাস্তানি।

দ্যাখো, সন্ধ্যার খালে দাঁড়িয়ে—
এখনো বকের শরীর,
মেলার গীত জানে
কিভাবে সুর ছড়িয়ে যায় যুবকের মনে।

আর অপেরার মেয়েগুলো—
জাদুকরী এক দ্বীপ।

চোখের ভূ-খণ্ডে যে পাখি উড়ে যায় রোজ
তার নামই তো নেশা—
পাশা এই হৃদয়।

দু-দিক থেকেই ছুটে আসে সেতু—
মানুষের মাড়ি থেকে ডেকে উঠে মাংস
আর উড়ন্ত পাখি সব—
প্রেমেরই খেয়াল।

চোখের উপর দাঁড়িয়ে থাকে—
পয়মন্ত দিন, গাভি গ্রাম!

গাজরের গ্রীবায় সন্ধ্যা নেমে এলে
তুমি চুল ছড়িয়ে দাও আকাশে—
আর এক পাগলা নক্ষত্র
চোখ মেরে লুকিয়ে যায় ধ্যানে!

জানোই তো—
স্কুল দিনে আমার বড্ড শীত লাগে।

শাদা মোজাদের কুচকাওয়াজ কষ্টকর—
অথচ সবুজ কার্ডিগানে যে ফুলগুলি
আরবি ভাষায় কথা বলে—
তার দিকে তাকিয়ে আমি এবার
মরেই যেতে পারি!

হে শীতকাল—
আমাকে একটা খরগোশ বানিয়ে দাও।

আমি ফুলকপির ওম নিয়ে ঘুমোতে চাই।

তোমার বৈভব থেকে উড়ে আসে—
আংশিক পাখি, কেয়ার কলরব!

কানের পাশেই তো শীতনিদ্রা—
প্রেমের চূড়ামণি।

দ্যাখো, গড়িয়ে যাচ্ছে
মার্বেলফুল—
শিশুতোষ খেলনা
এই বিকেল বেলায়!

গায়ের দিক থেকে—
লেজ উড়িয়ে আসছে বাতাস
নীল গাভির মতো।

জানি, যে কোনো সন্ধ্যায়—
তোমার টিপের নিচে
পড়ে থাকে খেলনার বাঘ—
মটরের সংগীত।

যাবতীয় অঙ্গ জানে—
জানুর সান্নিধ্যে গেলে
খুলে যায় সর্ষেবিতান!

তারপর—
প্যাঁচানো নদীটির কাছে
মানুষের যত শীৎকার।

কোথাও বের হলে আমি হারিয়ে যাব—
এই ভয়ে থাকি।

অথচ আম্মা সারাদিন ঘরে—
মেশিনে কত কী করেন!

এই যেমন, তিনি আমার মুখের উপর—
ফুল-পাখিদের ছবি এঁকে দেন
কখনো বা আব্বার—
সুদূর প্রেমের হাসি।

যেদিন তোমার ওড়না থেকে—
উড়ে এসেছিল মৌমাছি,
আমি সেদিন অঙ্ক করছিলাম—
বাতাসের চুল নিয়ে—
চোখ নিয়ে তামাশা
আর দিনারের দিনপঞ্জিগুলো
দুলে উঠছিল মৃদু আয়নায়।

জানি খেজুরবনেও খচ্চর থাকে—
থাকে প্রেমের কৌশল—
আর আঙুলের রেখা থেকে
ছিটকে যায় দেহ—
ও দেহাতি গান…

মাটিতে মিশে যাচ্ছি

আমার কথার অর্থ কি!

একটা বাঁশি, ভাঙা বাঁশি—
যে বাজাতো
আর যে কখনও বাজায়-নি

এই দৃশ্য—মন খারাপের ভেতর
জীবন যেন হাওয়াপুরী—
অদেখা ফুলের ঘ্রাণ
লুকিয়ে রাখা সমস্ত বসন্ত!

তবে আমাদের অর্থ কি—
এই মুহূর্তে তুমি কী জানো?

নিঃশ্বাস কেমন, এবার বলো দেখি—
আমাকে দেখার আগে
তার গতি কেমন ছিলো।

এই লাল—নীল—পাথরগুলো
স্থির, তবুও অস্থির কারও চোখে
কোন বালিতে—
কোন সমুদ্রে ছিলো তার গৃহ, আনন্দ
যেন তোমাকে দেখার পরই—
তারা জেগে উঠলো
আমাদের গৃহে, আর শুধুই হাতছানি—
আকাশে মড়কে।

তুমি যেও না, এই মুহূর্তে কোথাও
না কোন শব্দে—
না কোন শব্দের ভেতর—
গড় গড়িয়ে

আমি ফুটে ওঠা রাক্ষস তোমার—
দূরে চাঁদের আলো
যেন নির্বীকার পিণ্ড এক
মনে হয় মেয়েমানুষের কল্পিত স্তন—
হাত দিয়ে ঢেকে দিলেই
পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে

যারা তার ভাষা বুঝে—
যারা তার কিছুই বুঝে না
তবুও তারাই ভালোবাসে।

যেন একা এবং একরোখা—
আকাশ সমান চিৎকার তার
ঢেউয়ের ভেতর অসীম ঢেউ
দূরে, যেতে যেতে হাওয়া—
বাড়ির উঠোনে অবলীলায় কেউ ডাকে।

আজ কি বসন্ত—
আজ কি ছোট্ট দিন—

আমি নিথর, ছোট্ট গাছের নিচে
ছোট হতে হতে মাটিতে মিশে যাচ্ছি।

প্রশ্ন করো না

প্রশ্ন করো না কখনও—
যেমন আমি
নিজেকে কখনও প্রশ্ন করি না
কেমন আছি।

যদি বাতাসের খুব তাড়া থাকে—
তাহলে দ্রুত এসে নিয়ে যাক আমাকে
যেভাবে তুলাগুলো আলাদা হয়ে যায়
তার শরীর থেকে!

বহুদূরে—

ছোট্ট পাখির লগ্ন
যে ভাষা আমি বুঝিনি—
কখনও কানে এসে লাগেনি আমার

সে কি বলতে চায়?

ভাষার বাইরে কেবল কালো রঙ—
উৎকণ্ঠা আর আমার কম্পন
আকাশের গায়ে লেগে ফিরে আসে
বারবার—
তোমার গহনার শব্দের মতো

এই আমার ঘর কখনও সুরেলা
আবার কখনোবা উদলা আকাশ
আমি পাখি হয়ে উড়ে যাই—
দূরে, বহুদূরে

তোমার মুখের ঝনঝন শব্দে।

নিয়তি

আমি কাঁপছিলাম!
হারিকেনের ভেতর হঠাৎ
বাতাস ঢুকে গেলে যেমন—
আলো কেঁপে উঠে!

এই মুখ আমার—
অন্ধকার, তোমার দ্যুতি
আমাকে বাঁচিয়ে দিলো ।

কিভাবে বলবো, এই সত্য—
আমি ছাড়া আর কেউ নেই
পুড়ে যাওয়ায় এতো ব্যস্ত।

আলোর চেয়ে সে ভীষণ আলো—
আমাকে উগরে দিয়ে চলে গলো!

যেন তুমি একটি সোনার পাত্র—
ছোট্ট ধাতু আমি, বহু পুরনো
আর নোংরা মাটি দিয়ে ভরা—
আমাদের এই শরীর

তবু তুমি চুমু খাবে শিশুর মতো—
আমি পাঠিয়েছি তাকে—
আমার সমস্ত ঘ্রাণ দিয়ে।

জানি, নিয়তি বদলায়—
এবং তা বদলে গেছে।

যখন তোমার কপালের চাঁদ—
আমার ঠোঁটের কাছে এসে
তার কোটি কোটি বছরের—
গল্প বলছে।

সহজ নিয়ম

নিয়ম বানানো খুব সহজ।

তুমি বড় হচ্ছো, এবং বুড়িও যথেষ্ট—
বাতাস থেকে চুরি হচ্ছে সব, সব কিছু।
আমার শিরা—বিদ্রুপ ও ভয়ে কাঁপছে!
দূরে বৃষ্টি হবে এখন।

ঘাস, বক—

তার বক বক থেকে বাড়িয়ে দিচ্ছে গলা—
মাছরাঙা। যে কোনো ফসলের চেয়েও ভারি
এটা ভয়ংকর, আমি আর ফিরছি না।
মাটি হয়ে যাচ্ছে সব।

ধীর, বিলয়—

তোমার নখ কাটার সময়! আমাকে মেরে ফেলো—
অংশত দৃশ্যটা অন্য কোথাও। ছোট্ট বিড়ালের চোখ!
সে ঘুরছে পৃথিবী—ঘড়ির ডায়াল। ওর জন্য ক্ষুধা—
লেজ নাড়ছে ভীষণ রকম।

মনে হবে হতচ্ছাড়া—

পাউরুটি তুমি লুকিয়ে গেছো! আর বাচ্চারা দুষ্টু—
বোতাম হারিয়ে বোতাম খুঁজছে। কচু গাছের রং।
তার চারটা মাথা, আমাকে বহন করছে। এমনকি—
সে একটা নিখুঁত চোর।

যদি বারবার বানাও—

এমন কিছু, যা আমার জন্য নয়। তবে এটা সুন্দর—
দীর্ঘ পখির লেজ। সুর তুলতে তুলতে ভাববো মূঢ়!

এই তো দৃশ্য—
দেখো, ঠিক আড়ালে। হলুদ পাতা—
ছেড়ে যাচ্ছে সবুজ পাতাটিকে।

এটা খুব সহজ নিয়ম—
মাটিতে পড়েই মুখ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

তুমি তাকে ভালা পাও।

সারাজাত সৌম

জন্ম ২৫ এপ্রিল ১৯৮৪, ময়মনসিংহ। 

পেশা : চাকুরি।

আগ্রহ মূলত কবিতায়।

প্রকাশিত গ্রন্থ-
একাই হাঁটছি পাগল [কবিতা; জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]

ই-মেইল : showmo.sarajat@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: