দূরবাসী শহীদ কাদরী, দূরে নন কবিতা থেকে

উত্তররৈবিক আধুনিক বাংলা কবিতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল ফসল ফলেছিল ত্রিশের দশকে। দশক ওয়ারী বিভাজনে ত্রিশের দশকের পরেই নতুন কবিতার যাত্রা শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে। সেই যাত্রায় সৃষ্টি প্রাচুর্যে এবং ধারাবাহিকতায় অনন্য আলোকিত হয়ে আছে ষাটের দশক। শুধু কবিতা নয় সে সময়ে বাংলা সাহিত্যের পাঁচটি ধারাতেই ফলেছে প্রচুর ফসল। দেশ বিভাগ এবং বিশ্ব যুদ্ধোত্তর নাগরিক হতাশা, বৈকল্য আর টানপোড়েনের চিত্র ফুটে ওঠে তখনকার কবিদের কবিতার ছত্রে ছত্রে। জীবনানন্দ দাশের কাব্যেই প্রথম ধরা পড়ে নাগরিক যন্ত্রণা, গ্লানি আর তিমির বিদারী আর্তচিৎকার। নাগরিক চাকচিক্য জীবনের বিপরীতে যে নিঃস্বতা, অপ্রাপ্তি আর নিঃসঙ্গতার প্রেমোময় অনুভবের পরিচয় ফুঠে উঠে ষাটের দশকের কবিদের কবিতায়। একটি সময় ছিল যখন শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন, হাসান হাফিজুর রহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী এই নামগুলো একই সাথে উচ্চারিত হতো। সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভাবের প্রথম থেকেই যিনি নাগরিক চেতনা ধারণ করে আছেন তিনি বিরলপ্রজ কবি শহীদ কাদরী। তিনি স্বদেশ ত্যাগী হয়ে বিভুঁইয়ে বসবাস করেছেন। শুধু দেশান্তরিই হোননি, কবিতার কাব্যময় প্রান্তর থেকেও বহুদূরে বসবাস করেছেন।

নাগরিকতা, শহুরে চাকচিক্যময় জৌলুস, উপমা ছন্দ আর শুদ্ধতম শব্দে সাজিয়েছেন কবিতার পংক্তিমালা কিন্তু তাঁর এই দূরে সরে যাওয়া আমাদের মনে বেদনার জন্ম দেয়। কিন্তু তার যে কাব্যগ্রন্থগুলো আমাদের হাতে আছে সেগুলো আজও আশান্বিত করে। অনেকটা নিঃশব্দেই যেন বলে দেয় একজন শহীদ কাদরী ছিল, আজো উজ্জ্বল হয়েই টিকে আছে বাংলা কবিতার প্রান্তরে। একদা কবিতাকে যে কবি সোনালী আভরণ দিয়ে কবিতার স্বরূপ বদলে দিয়েছিলেন, তার স্বাক্ষর এখনো ছড়িয়ে আছে তার ‘উত্তরাধিকার’ ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ ‘কোথাও কোন ক্রন্দন নেই’ ‘আমার চুম্বনগুলো পৌছে দাও’ সর্বসাকুল্যে চারটি কাব্যগ্রন্থ। একজন কবি তার কবিতায় বরাবরই কালের সাক্ষ্য প্রদান করেন। শহীদ কাদরী নিজেও কালের প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে হতাশা, ক্ষয়, অশান্তি, নৈরাজ্যকে তাঁর কবিতায় এঁকেছেন। নাগরিক চাকচিক্যময় জীবন তিনি কাব্যের উপজীব্য করলেও শেষ পর্যন্ত স্বদেশ, সমকাল, ছিন্নমূল আর হৃদয়বান মানুষের অপূর্ণতার ধ্বনিই তার কবিতায় ঝংকৃত হয়ে ওঠেছে।

তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার নাম ‘বৃষ্টি । বৃষ্টিকে কবি হঠাৎ সন্ত্রাস কল্পনা করে তন্দ্রালস মানুষগুলোকে তাড়িয়ে দিয়েছেন দিগ্বিদিক। শহরে ঘন্টা বাজিয়ে কেউ একজন যেন বলে গেল শহর উজার হবে। সত্যিকার অর্থে শহর কি উজার হবে? নাকি শহর থেকে শহরে শঠ, প্রবঞ্চক, আর ধূর্ত বিলীন হবে। সত্যিকার যারা বাস্তুহারা, ছন্নছাড়া, উন্মাদ হয়ে ঘুরে বেড়ায় কবি তাদেরকে রাজত্ব করবার ভার দিয়েছেন এই বৃষ্টিতে। কবির ভাষায়- “রাজত্ব, রাজত্ব শুধু আজ রাতে, রাজপথে পথে/ বাউন্ডুলে আর লক্ষীছাড়াদের , উন্মুল উদ্বাস্তু / বালকের, আজীবন ভিক্ষুকের , চোর আর অর্ধ উম্মাদের / বৃষ্টিতে রাজত্ব আজ।”

মানুষ আজ নক্ষত্রের সোনালী আলোর বিচ্ছুরণ দেখে মুগ্ধ হয় না। মানুষ মানুষের সাফল্যে বাহবা দেয় না। বরং বন্ধু অথবা প্রিয়জনদের সাফল্যে কেউ কেউ বিমুখ ও ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ে।

মনে হয় সীমাহীন জনারণ্যেও মানুষ অদ্ভুত শূন্যতা নিয়ে বসবাস করছে। কোথাও স্বস্তি নেই, শান্তি নেই, মানুষ হতাশায় উধ্বর্কাশে কেবলি ছুটছে। বিভ্রান্ত হয়ে কেন মানুষ ছুটছে? বহুমিশ্র সমাজ সংসার আর উদার পরিবেশে এ আজ কিসের ইঙ্গিত? এ ছুটে চলা যেন কবির একচক্ষু আশার বুক ফাটা চিৎকার নিয়ে কষ্টের সীমাহীন আর্তনাদ-

‘‘আতর লোবান আর আগরবাতির অতিমর্ত্য গন্ধময়
দেবতার স্পর্শ পাওয়া পবিত্র গ্রন্থের
উচ্চারণ প্রতিধ্বনিময় শবজি ক্ষেতের উদার
পরিবেশে
সুপ্রচুর বিমুক্ত হাওয়া কেন তবে কষ্টশ্বাস?”

কবি আজ যে উত্তরাধিকারের সাথে পরিচিত হয়েছেন, সেটি কোন ক্রমেই কবির কাম্য ছিল না, যেখানে হিরন্ময় রৌদ্রে জ্বলে ওঠে গম্ভীর কামান, সচকিত পদশব্দ আর বিউগলে বারবার কেঁপে ওঠে রণাঙ্গন। এমন ভয়াল পরিবেশে জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে নির্ঘুম চোখে মধ্যরাতে কবি কি খুঁজে ফেরেন? হতাশা আর ক্ষোভে নিঃসঙ্গ কবি অস্তিত্বের সীমারেখা টেনে দিতে চান, আর দীর্ঘশ্বাসের ঝরা ফুলে সাজাতে চান স্মৃতির বাসর ।

‘‘নিঃসঙ্গতাকে যৌবনের পরম সুহৃদ জেনে
তার সহোদরা কান্নার বাহুবন্ধে সঁপে দেবো
স্বপ্নের সত্য আর সত্তার সার।’’

সন্ধ্যা রাত থেকে ভোর অবধি কবির ছুটে চলা শুভ সুন্দর ও কল্যাণের দিকে। কিন্তু সুন্দর নামক স্বপ্নময় সোনার হরিণ কবির কাছে চিরকালেই অধরা থেকে গেছে। সুন্দর কেবল দেখিয়ে যায় ম্লান গহ্বর পান্ডুরোগীর শীতার্ত শয্যা। তাইতো মূলবোধহীন অস্থির সময়ের ভেতরে কবি একজন সাদা ফেরেশতার আগমন প্রত্যাশা করেন। যে মানুষের কাছে শান্তির দূত হয়ে ধরা দেবেন। কিন্তু কবি সীমাহীন আশা নিয়ে চোখ মেলে কী দেখতে পান? শান্তির দূত কী কখনো পার্থিব বলয়ে নেমে আসে? নাকি চোখ মেলে অবশেষে ভদ্র বেশি শয়তানের বিকৃত মুখের চিত্রই দেখতে পান।

‘ ‘সুন্দর সূর্যাস্ত থেকে ভোরবেলাকার সুর্যোদয়
পর্যন্ত হেটেছি। আর অসীম অধৈর্যভাবে ঘেটে
সেই চঞ্চল, পিচ্ছিল জরায়নে সভয়ে দেখেছি
শয়তানের ধবল মুখ।”

প্রেমিক কবি তার প্রিয়তমা ছাড়া আর কিছুই চান না। তাকে পাওয়ার জন্য উম্মুখ হয়ে আছেন। স্বপ্নে জাগরণে অন্ধকারের ভেতর চোখে স্বপ্নের আলো জ্বেলে কবি প্রতিক্ষা করছেন প্রেয়সীর জন্য। কবি তাঁর প্রেমিকার খোঁপায় পড়াবেন সোনালী তারা। সুবাসিত গোলাপের মালা গেঁথে অধীর অপেক্ষায় অনড় বিশ্বাসে প্রতীক্ষা করছেন। কবির বিশ্বাস তাঁর প্রত্যাশা পূরণ হবেই। কারণ পৃথিবীর কাছে তার খুব বেশী চাওয়া নেই। শত শত সুন্দরী কবি কামনা করেন না, তিনি চান না অন্তহীন রাজ্যপট। কখন প্রিয় মানুষটিকে দেখতে পাবেন? কখন প্রিয়তমাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করবেন? শুধু তার জন্যই কবি অধীর আগ্রহে চোখ মেলে তাকিয়ে আছেন। কবির ভাষায়:-

“আমি ত’ চাইনি পাঁচ সুন্দরী কিংবা হারেম
ক্রীতদাস দাসী মনোরম রাজ্যপাট গোপন বাগান
প্রোজ্জ্বল গালিচা আর মুক্তাখচিত কোন মখমল লেবাস
নেকাব সরিয়ে কোন ইহুদী রমণীর মুখ, দামী আসবাব।”

নাগরিক চেতনায় প্রেম একটি প্রিয় অনুষঙ্গ হলেও, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। হত্যায়, রক্তপাতে আর মানুষের আর্তনাদে বাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তর শিউরে ওঠেছে, কেউ বা বৈরি পরিবেশ থেকে গা ঢাকা দিয়ে হয়েছে দেশান্তরী। যে যুদ্ধে গেছে অথবা দেশান্তরী হয়েছে তাদের ভেতর আবার ফিরে আসবার ব্যাকুল বাসনাও বারবার তাড়িত করছে। দেশের সাহসী সন্তানেরা শৃঙ্খলিত পতাকাকে উপরে রেখে তিমির অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে ফিরিয়ে আনে মুক্তির আলো। কবি নিজেও অবশেষে আবিস্কার করেন পূর্ণিমার আলোর ভেতর নিজেদের ঘর।

“আমরা সবাই ফিরছি আবার
নিজস্ব উঠোন পার হয়ে নিজেদের ঘরে।”

স্বাধীনতা উত্তর রাষ্ট্রের ব্যর্থতা জনমানুষের মনে হাহাকার ও ক্রোধের যে বাসা বেঁধেছিল তার নিরুপম চিত্র কবির কবিতায় ফুটে ওঠেছে। যেখানে নিজস্ব সম্পত্তি ভেবে অপরের স্বপ্নকেও ছিঁড়েখুঁড়ে মানুষ। তবে কি মানুষের যাত্রা ভুল গন্তব্যের দিকে?
ভুল পথে? কবি যাকে নিবিড় আলিঙ্গনে বাহুবন্ধ করেন, চুম্বনে চুম্বনে রাঙিয়ে দেন গোলাপী অধর, একদা তিনি কত জায়গায় যে প্রেয়সীকে নিয়ে ঘুরেছেন তার ইয়ত্তা নেই । অথচ এমনি অস্থির সময় আজ কবি তার প্রিয়তমাকেও চিনতে পারছেন না।
রৌদ্র ঝলমল বসন্তের প্রথম দিনে শাণিত ছুরি হাতে প্রেমিকা যেন হয়ে ওঠেন নিপুণ জল্লাদ। কবির ভাষায়,

“শিউরে উঠছে আত্মার সখ্যতা/বসন্তের প্রথম
দিনেই হত্যা করেছিলে/ আমাকে তোমার নিপুণ নিরিখে।”

সকালের সফেদ আলোয় সব কিছু উজ্জ্বল হলেও রাদের চাঁদের মায়াবী আলোর ইন্দ্রজালে সবকিছু বদলে যায়। দেয়ালে চাঁদের আলোয় যখন মানুষের দীর্ঘ ছায়া পড়ে তখন মানুষের মুখগুলোকে মুখোশের মত মনে হয়, সেই রাতের আলোয় গায়ে হাওয়া লাগিয়ে কেউ পার্কে, কেউ শুড়িখানায় কেউবা স্বপ্নের অন্দরে ঢুকে পড়ে। তখন মায়াময় জ্যোৎস্নালোকিত রাতটি কারো কাছে উৎসবের মতো মনে হয়। ধীরে ধীরে চাঁদের আলোয় প্রকৃতির সবকিছুই বদলে যেতে থাকে। তখন কেউ বা নকল স্বর্গলোকের রাজা হয়ে বসেন। যারা এ ত্রিভুবনে মূল্যহীন অস্পৃশ্য তারাই বরং সেই কল্পলোকের রাজার কাছে উজ্জ্বল ঘরনীর সম্মানী পান। সত্যিকার কবির চোখে কোনকিছুই ফেলনা নয়। সবকিছুই আদরের ধন। লতাগুল্ম থেকে শুরু করে কাক, শালিখ, চড়ুই, অস্পৃশ্য গণিকা, এমন কী গর্তের প্রতিটি জীবনের প্রতি তার পক্ষপাত। প্রেমিক কবি শুধু প্রাণের প্রতিমা আর কবিতার সাথেই নয় বরং রাস্তার কুকুরটির সাথেও আত্মার সখ্যতা গড়ে তুলতে চান। স্বজন বন্ধু অথবা প্রিয়তমা ছাড়া কি করে মানুষ বাঁচে? তিমিরাক্রান্ত সময়ের ভেতর প্রত্যেকে পাশাপাশি থেকেও অনেক দূরত্বে অবস্থান করেন। প্রকৃতির সব কিছুই যেন নিঃস্ব রিক্ত। এমনি এক দুঃসময়ের মুখোমুখি কবি হৃদয়ের উষ্ণতায় মৃত্যুগামী মানুষকে আশ্লেষে বুকে জড়াতে চান। কিন্তু নিঃস্বপ্ন আকাশে কবি যে স্বপ্নের চাঁদ খোঁজে ফেরেন, শেষ পর্যন্ত তিনি কী তা দেখতে পাবেন? নাকি উজ্জ্বল স্বপ্নাকাঙক্ষার পটভুমিতে আরো মুমূর্ষু হবেন? অপেক্ষা যদিও যন্ত্রণার তবু মৃত্যুর মুর্হূত পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করবেন। যে কণ্ঠস্বর শোনার জন্য কবি উদগ্রীব ছিলেন, যে কন্ঠস্বর শোনে কবির স্তব্দতা ভেঙেছিল, অবিন্যস্ত চুলের মাদকতায় যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন অথবা চোখের মণিতে যিনি স্বপ্ন আঁকেন এবং যাকে কেন্দ্র করে আজো কবির বুকে উজ্জ্বল পঙক্তির জন্ম হয়, সেই মানুষটি যদি অগম্যে চলে যায় তাহলে স্বপ্নবান মানুষটির বুকে শুধু শীতল স্মৃতি আর নিঃসঙ্গতা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। থাকে না প্রতিদিনকার উৎসবে তার সরব উপস্থিতি। স্বপ্নবান মানুষটির নিষ্করুণ চোখে আজ আর কোন স্বপ্ন খেলা করে না, পুরো স্বাপ্নিক আকাশটাই আজ কালিমায় ঢেকে গেছে

“দুর্মুখ, নীচু মেঘার্দ্র আকাশ, চারদিকে তাকালো সে
তামাটে মুখে বিরক্তি আর বয়সের রেখা।”
অথবা,
“লোকটা ফতুর হয়ে বসে আছে চুপচাপ একা
যেন কোন ভয়ংকর কয়েদখানার সর্তক প্রহরী।”

ছন্নছাড়া প্রেমিক উদ্ধাস্তুর মতো শহরময় ঘুরে বেড়ান এবং হেঁটে অবলীলায় পৌঁছে যান প্রেমিকার বাড়ির কিন্নরণ্ঠ নদীর কাছে। তিনি সেখানে আবিস্কার করেন প্রেম, স্মৃতি আর শস্যের ভান্ডার। কিন্তু কেন প্রেমিকার বাড়ি গিয়েও দরজায় কড়া নাড়তে ইচ্ছে করে না প্রেমিকের? অথবা কোন দন্ডে প্রেমিককে হাতকড়া পরিয়ে শৃঙ্খলিত করে লাল কৃষ্ণচূড়া? প্রকৃতি তাকে কেন বলে ‘তুমি অপরাধী’। কেন প্রেমিক হয়েও অসহায় হয়ে পড়েন সুরভিত গোলাপের কাছে। মানুষ পশুপাখি এবং প্রকৃতির সবকিছুই যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত তখন ‘আমি তোমাদের দিকে যেতে চাই’ এই অঙ্গীকার নিয়েই প্রেমিক স্বপ্নের পথে ধরে হাঁটতে থাকেন।

নিজের ঘরদোর আর স্বদেশকে বুকে লালিত স্বপ্নে সাজাবেন বলেই প্রেমিকার বাহুবন্ধন ত্যাগ করে প্রেমিক যোগদান করেছিলেন মিছিলে। কোমল হৃদয়ের মানুষটি নক্ষত্রোজ্জ্বল চোখে দেখতে চেয়েছিলেন সমৃদ্ধি, নিরাপদ আবাস আর প্রতীক্ষিত প্রেমিকা। তাই তো তিনি হাতে সঙীন তুলে নিয়েছিলেন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ পেয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ হলো। কিন্তু কবির হৃদয়ের সবটুকু চাওয়া কি পূর্ণ হলো? নাকি স্বপ্ন গুলো জতুগৃহের মত ভেঙে খান খান হলো। ‘আজীবন রয়ে যাবো বিদীর্ণ স্বদেশে, স্বজনের লাশের আশে পাশে।’এই প্রত্যয় বুকে নিয়ে অনেক রক্তের বিনিময়ে হলেও প্রেমিক কবি স্বাধীনতা নিয়ে রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসেন।

পরবর্তীতে অনেক রক্তে পাওয়া সেই স্বাধীনতাকে যদি সেই সংশপ্তক মানুষগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখেন, তখন তাদের বুকের ভেতরটা যেন কঠিন শিলার আঘাতে ভেঙে টুকরো টুকুরো হয়ে যায়। চারদিকে ছড়ানো ধ্বংসাবশেষ আর স্বপ্নকে রক্তাক্ত হতে দেখে নিজের নিয়তিকে দায়ী করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।

‘‘তবে কি এই আমার নিয়তি
আমাদের এই হিরন্মোয় ধ্বংশাবশেষ
এই রক্তপ্লুত শাট আজীবন
এই বাঁকাচোরা ভাঙা ভায়োলিন?”
অথবা,
“রাষ্ট্র মানেই রাষ্ট্র সংঘের ব্যর্থতা
রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা
লেফট রাইট, লেফট রাইট, লেফট…।”

কবির মতো হাজার মানুষের মনে হয়তো এই প্রশ্ন উঁকি দেবে। তাহলে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের আর্তনাদ কি শুধুই বৃথা? অথবা স্বাধীনতা আর কত রক্ত চাই তোমার , আর কত! যতই প্রতিকূলতা আসুক তবুও অন্ধকার রাত্রি মারিয়ে সফেদ অশ্বারোহী হয়ে কবি ফিরে যাবেন মানুষের দিকে, মানবতার দিকে, প্রতিক্ষারত প্রেয়সীর দিকে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি হৃদয়ের ঔদার্য দিয়ে প্রেমানুভবের গান গেয়ে যাবেন।

“ আমার ঘর রেকর্ড-প্লেয়ারবিহীন বটে
কিন্তু আমার অস্তিত্ব গান শূন্য নয়।”

অস্তিত্বে যে গান মিশে আছে সেই গান আর প্রেয়সীকে হৃদয়ে ধারণ করেই তো প্রতিটি কবির অন্তহীন পথ চলা । তাইতো দুঃসাহসী প্রেমিক কবি রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাব করেন পরাষ্ট্রনীতির বদলে প্রেমকে স্থলাভিষিক্ত করতে। কবিতার লাবণ্য দিয়ে তিনি ঘটাতে চান কবিতার বিস্তার । নির্ভীক কবি প্রেমিকাকে বারবার অভয় দিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন হেন ব্যবস্থা নেই যা তিনি প্রেয়সীর জন্য ঠিক রাখেননি। সবগুলো গণভোট যাতে পেয়ে যায় প্রেমিক প্রবর সেই ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছেন। পৃথিবী থেকে ভালোবাসা ছাড়া সবকিছুকে তিনি নিষিদ্ধ করতে চান। পার্থিব বলয়ে কারো কোন ক্রন্দন থাকবে না, হতাশা থাকবে না, ক্ষোভ থাকবে না।

সবকিছুর আয়োজন যখন চূড়ান্ত করছেন তখন বিপরীত দিক থেকে বৈরি সময়ের তিক্ততা কবিকে গ্রাস করতে থাকে মর্মে মর্মে। কবি যখন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান তখন ‘মৃতের উল্টে যাওয়া চোখ’ কবির পথ রোধ করে দাঁড়ায় । এরকম অস্থির তমাসাচ্ছন্ন পরিবেশে কোন প্রেমিক তার প্রেমিকাকে অস্তিত্বের সংলগ্নে পেলেও সেই আরাধ্য শান্তি আর স্বস্তি খুঁজে পান না।

“প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না
পাবে না, পাবে না…।”

হতাশা, ব্যর্থতা, ক্ষোভ আর অশান্তির ভেতরও কবি যখন বলেন, কবিতা আমার আরাধ্য অথবা বৈরি পরিবেশের ভেতরও ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ বলে বলে প্রেয়সীর আসার পথে বিছিয়ে দেন লাল গালিচা, তখন যুদ্ধ ক্ষয় আর রক্তের রঙ ম্লান হয়ে পড়ে সুরভিত গোলাপের কাছে। মগ্নচৈতন্য ও সৃষ্টিশীল কর্ম দিয়েই কবি তার কবিতার কাঙিক্ষত অবয়বটি গড়ে তোলেন। প্রতিনিয়ত অনেক ভাঙা গড়ার ভেতর দিয়ে নিজের অজান্তে নিজকে ছাড়িয়ে যান। তাইতো সরল একরৈখিক পথে না গিয়ে নানা পথে বাঁক নেয় তাঁর কবিতা। পাঠক হিসেবে আমরাও আনন্দ ও সুখাবেশে আচ্ছন্ন হই। যে প্রেমিক প্রেমিকাকে বুকে টেনে নিলেও শান্তি পান না সেই আবার ব্যাকুলতা নিয়ে বলে উঠেন:-

‘‘দাঁড়াও আামি আসছি
তোমাকে চাই ভাসতে ভাসতে
ডুবতে ডুবতে
ডুবে যেতে যেতে তোমাকে চাই।’’

তখন অপেক্ষায় থাকা ছাড়া আর উপায় থাকে না। যে কবি ফিরে আসেন ভাসতে ভাসতে, ডুবতে ডুবতে, ডুবে যেতে যেতে সেই কবি আজ কবিতার প্রান্তর থেকে দূরবাসী হলেও- বাংলা কবিতা থেকে তিনি কখনো নির্বাসিত হবেন না। বরং মানুষের ভালোবাসা পেয়ে অনাগত কালেও বাংলা কবিতার প্রান্তরে কবি শহীদ কাদরী সগৌরবেই বেঁচে থাকবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

সারোয়ার জাহান

সারোয়ার জাহান

জন্ম ২০ জানুয়ারি ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ, চারিপাড়া, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ।

পেশা- অধ্যাপনা। 

আগ্রহ- কবিতা ও প্রবন্ধ।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ-
অধরার কাছে চিঠি
তবুও আঁধারে জ্বলে ওঠে প্রিয় নাম
নিস্তব্ধতার গোধূলি

মোবাইল- ০১৭৭৬১৯৮১৯৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: