তাদের প্রিয় কোনও বর্তমান // শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

১২

সারামাগো সাবধান করেছিলেন লেখায় যেন মতবাদ না আসে
আমি দেখেছিলাম রঙের উপরে পৃথিবীর
শান্ত বীজ হিংস্র দেহ খোঁজা
জিভ, যোনি, জ্বর সুদূর কোনও অভ্যাস ভাঙার শব্দে ঘুম
গ্রীষ্ম বা প্রখর নয়
খর কোনও আলো মেলে দেওয়া তালুর উপরে পাথুরে নদীর কলস্বর
খয়েরি উপলখন্ড, ভাসা শ্যাওলা আসলে প্রাচীন একটা চিৎকার
ক্রমশ ছোট হয়ে আসে বিস্তার এমনকি আঙুলও বর্ণহীন

সমস্ত দৃষ্টি আসলে রেখা, ছুরির দাগ
আমাদের জানা পৃথিবীকে টুকরো করে দিয়েছে
ধারণাচূর্ণের উপর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে বাতাসের গোলক

ভারি পুরনো স্বপ্নের উপর তাদের প্রিয় কোনও বর্তমান
জ্যোৎস্নার শিকড়

১৩

তোকে কখনও গ্রীষ্মজ গ্রামের মাঠ দেখাতে পারিনি
ধুলো, একক সর্বেশ্বর
নৈঃশব্দ্য নামক অভ্যাসে হালকা ঢেউ
আমাদের পায়ের ধাক্কায় ঠিকরে উঠলো শুকনো ডাল
বন্ধুরা ও তাদের প্রিয় কোনও বর্তমান
এই হলুদ অ্যাসিডরঙা ছায়া
জাগিয়ে তুলছে সবকিছু
সদ্য গজানো চারা গাছ ও তার ফণা
আমরা নজর রাখছি পাতার তলায় জমা
তুলোর মত গরল
চামড়ায় লাগলেই আর রক্ষা নেই
শুধু বুঝি সমীহ-দূরত্ব ভালো
যেমন উপদ্রুত পানকৌড়ি, গোসাপ ও বাক্যবিন্যাস

১৪

কেন আচমকা বালকেরা
তাদের প্রিয় কোনও বর্তমান
কি আসলে একটা পালক বসানো তীর?
আগুন চিরে আমাদের ক্ষত সারাবে?
সময়ের ফুল মরসুমের ফল হবার আগেই
দৈনন্দিন হারাবে দিন

দহনের মাতৃভাষার মধ্যে পড়ে আছে শৈশবের বিকেলের অস্থিরং

১৫

শুধু সাচ্ছন্দের জন্য পালিয়েছি? হিংসে হয় সেই সব লেখকদের
যাদের শহর আছে, তাদের প্রিয় কোনও বর্তমান
সমর্থ গাছের মত রৌদ্রপরায়ন

ফেরা মানে অনর্থক স্থান কালের দ্বিমাত্রিক কাটাকুটি
পরপর ছায়া দহনের শব্দ
পরপর জ্যামিতি পুড়ে নির্মাণ করছে
মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির দূরত্ব

১৬

প্রতিটা ধাপের গায়ে বড় হয়ে উঠেছে বাক্যজটিলগুল্ম ঝোপ
যেন অহং লালিত স্বপ্ন গভীর জ্বরের রাতে সমূহ ভয় হয়ে উঠে আসবে
অধুনালুপ্ত কোনও পতঙ্গের রং নিয়ে
তাদের প্রিয় কোনও বর্তমান
টুকরো হয়ে পড়ে থাকবে চিরদূরত্ব
এখনও প্রতিপাদ্য কোনও গাণিতিক সংকেত  

১৭

ঐতিহাসিক সময়ে না জন্মালে জীবনী অর্থহীন
ছায়াপাথর ও তার উপরে বসে আমাদের সম্ভাবনা দোল খায়
সন্ধানী পাখি চেনে পতঙ্গের বাসায় পড়া আগুন ও কেরোসিনের গন্ধ
আমরা তলিয়ে যাচ্ছি ভুল মাংস আঁচড়াতে গিয়ে খুবলেনিচ্ছি
নিজেদের চোখ ও তাদের প্রিয় কোনও বর্তমান

১৮

ছোট শহরের লোকেদের বাড়ি ফেরার তাড়া থাকে
যেমন বিকেলের আকাশ তাসের মত জুলাই
আসলে দ্রুত সিঁড়ি ভাঙা ফুসফুসের পুষ্পল বিন্যাসে ঢাকা রক্ত চলাচল
তোকে সাবধান করেছে
বন্ধুরা ও তাদের তাদের প্রিয় কোনও বর্তমান
ক্যালন্ডারে চাঁদমারি হয়ে উঠছে
প্রতিটা মাসেই বেঁধা তীর
বার্তাগুলো কিছুতেই কথা হয়ে উঠছে না

১৯

সমস্ত রাত্রি যন্ত্রণা ছিঁড়ে পেশি বের করে আনতে চাইছে
প্রকান্ড কোনও জৃম্ভনসর্বাঙ্গে টের পাচ্ছি তার দাঁত
এখনও জ্বরের ঘুম ভেঙে গেলে জল স্বাদু লাগে
বনপথমনহরিনী জাতীয় শব্দ অনায়াস হয়
যেমন বৃষ্টিতে মিলিয়ে যাওয়া কমবয়সীদের
সাইকেলের তাড়াহুড়ো তাদের প্রিয় কোনও বর্তমান

২০

ভিতরে শুধু রাগ জমা হয়
পারা চটে যাওয়া আয়নায় যেভাবে দুপুরের আলো
যেন পাখিরা পড়লে আটকে যাবে এমন থকথকে
তাদের প্রিয় কোনও বর্তমান
অথচ আমাদের ডাকনামগুলো সহজ ছিল
তখনও সময় ছিল
শুধু ছিটকে যাওয়া অনর্থক ভেবে নিয়ে
আজ এই পিঠ ঠেকাবার দেয়াল
উঠোনহীন বাড়ি
পায়রা এসে ঘেন্না রেখে গেছে

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম ১৯৭৮, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতায়।
কবি, স্প্যানিশ ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষক। 
প্রকাশিত বই: বাংলায় প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। 
ইউরোপের স্পেন থেকেও তাঁর তিনটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে।
সম্মাননা: বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার এবং মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কার। ইউরোপের স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব, মেহিকোর গুয়াদালাহারা বইমেলা ও স্পেনে এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিটসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে। অংশ নিয়েছেন Poetry connections India-Wales প্রকল্পে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: