তমা সিরিজ

দেখা হবে

কানের ধার ঘেঁষে একটা ট্রেনকে যেতে দিয়ে উচ্চারিত এই শহর থাকে টগরফুল বুকে নিয়ে রেল‌ওয়ে কলোনিতে!

এই মেঘনাদ ভরদুপুর ছাড়াও কোথাও দেখা হবে আমাদের; যেই গল্পে নাই কোনো হর্ন বা যানজট; চারদিকে রোদ, আল টপকানো হাওয়া;
তিতির পাখিরা হাঁটে!

মনে হয় বেণীফুলে মৌমাছি কবে যে বসেছে এসে, বারান্দাটব দেখি বসন্তে টগবগ;

আমাদের কথা হবে তমা, দাড়ি-কমাহীন!

গানের শেষে ফুল

একটি বাগান গিয়ে তোমার হৃদয়ে আজ ছুটি কাটাচ্ছে গ্রীষ্মের, যেন হাত থেকে ফুল পড়ে গিয়ে নদী!

চোখ থেকে এক এক করে দৃশ্যেরা আলগা হয়ে, নিশ্চুপ কবুতর। আর চারদিকে ফসল মাড়াই চলে গ্রাম বাংলায়
ধানের কোরাস তুলে!

একটি শহর তার কোলাহল বুকে নিয়ে একা
হেঁটে যাচ্ছে ক্রমে তোমার উঠানে আজ;
মনে সন্ধ্যার মালতী ফুল; উজ্জ্বল গানের শেষে ফুল।

যেন হাত থেকে পড়ে গিয়ে মন
চৌচির, অস্থির আর কাতরতা ঘরে ফিরে চুপ
চারিদিকে ভোটের ক্যাচাল বাড়ে!

সমুদ্র

নকশাকাটা বিউগল বাজে ঈগলের উড়ালপথে।
দাঁড় টানা বাকি বলে, জেলে-মাঝিদের হল্লা সমাগত হয়
পানশালার আলোয়।

এমনই দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি, তুমি সমুদ্র, তোমার ধারে হাওয়া!

যেভাবে ভাটফুলে চোখ যায়, ফুলের রঙে নিষ্ঠা এনে দেয় রোদ, তেমনই দাঁড়িয়ে ছিলাম এক জন্ম, সমুদ্র সাক্ষী রেখে!

স্বপ্ন

স্বপ্নে তুমি ঝুল বারান্দা আর পিছু নেয়া অথই মেঘ না?
অই গালফোলা উড়ু উড়ু মেঘ, যেখানে কালক্ষেপন করে আর ঝরে পড়ে কেওক্রাডং যত উচ্চাভিলাষ যত প্রেমময় ঈশারাচিহ্নসহ; তুমি তিসি ফুল, গ্রাম বাংলার ঝরঝরে খাল, আজ তাই গাঁও গেরামের কাচা রাস্তায় এসে থেমে গেছি দেখো, কই যাব আমি?

বলো কই যেতে পারি আমি, হাতে নিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা!

আমাদের সংসার

দেখি জামার সবুজ থেকে উকি দেয় কুল বড়ইয়ের পাতা, এই ছোট ঘরটাই আমাদের গয়নার বাকশো;
তুমি অলংকার, ভেবে আশ্চর্য হই, একদিন
স্মরণীয়তার কাছে ঘুরপাক দিয়ে ওঠে মানুষের নাম;

তুমিও কি সে-রকমই নও!

এতসব সৌন্দর্য
এতসব নদী ও সুবিল, সবই কি বধির?

স্থিরতা আমাকে ছায়া দেয়, মেঘ দেয়
সমস্ত দুনিয়াবি করাতে দাঁত ঠেকিয়ে
আন্দাজ করি ধার;

আর যে কেনো ঘরে ফিরে
চুপচাপ হয়ে যাই, বুঝতে পারো নাকি?

বিরল উজান

তোমার ক্ষতের পাশে একবার বসতে চেয়েছি আমি
যেভাবে খোড়ল পেয়ে ডানাভাঙা পাখি এসে থামে;
থাকতে চেয়েছি ঝরো আগুনের পাশে, ছাই-কুটার নিকটবর্তী;

যতদিন গান আছে ততদিন মহুয়া ছড়ায় নিশি
যেন তুমি ধানপাতা, মেথিগুল্মের বোনটি, নথবর্তুল তারাটিরও সই; আমাদের বিরল উজান থেকে আসে স্মরণীয় যত রোদের কণিকা;

তোমার হাসির কাছে হাত পেতে চেয়ে আছি দেখো উতল দখিনা ছুঁড়ে!

কাজল

তোমাকে দেখি আর তিতিরের গলা নামে খুদের ওপর!
তোমাকে টোল পড়া দেখি, ফটো হয়ে চুপ করে আছো,
কতোদিন সাঁকোর ওপর।

আর, ঢেকে আছে ধুলার বাগান মেঘের মাথালে শাদা; ঢেকে আছে অটোরিক্সার গ্লাস!

তোমাকে একবার দেখি, উড়ে যায় তুলার ফড়িং-
আমার যেদিকে ঘর, বিশ্বাসে ঢেঁকির আওয়াজ
সেইদিকে গানের বাঁধন হতে, স্রোত লেগে চিরচেনা
নৌকার কাঠে কত না বুদবুদ হলো মন;

তোমাকে হাওয়ার হিজাবে দেখি, ধোয়া ওড়ে মাঠের দিকে। যেন-বা হেমন্ত এক টানটান কাজলের ধ্বনি, তোমার চোখে!

চেনা

এক এক করে স্মৃতি হতে খসে পড়া তারাদের নিয়ে
ভারি হচ্ছে নোটবুক, আমাদের গান ভর্তি মৌসুমি হাওয়া এদিক সেদিক ঘুরে পুনরায় প্রবেশ করছে ঘরে।

অথচ শহরের দিক থেকে শেষ ট্রেন তার সাইরেন বুকে নিয়ে ঘোষণা করছে বিদায়, যেন মেঘমালা, যেন অবসাদ গাঢ় হচ্ছে কারো; তোমার জন্য কোনো কোনোদিন মেঘ জন্মায় চোখে, এইসব কাতরতা নীল।

আজ কেনো হৃদয়ে সীমিত আলো?
গানে ও গুঞ্জনে ঢাকা চলিত ভাষার মতো
আমরা দুজনে চেনা, চিরচেনা নই?

অবসাদ

কিছুদিন আমি একা, শ্রাবণে ছিলাম ধীর;
কিছুদিন ভীড় থেকে দূর, অঘ্রাণে অস্থির
কিছু কিছু কথা বলে শেষে দূরেই কেঁদেছিলাম;
কিছুটা গানেতে হই পুনশ্চঃ বধির-থির!

যেই আলো চোখে চোখে, আছিলো তুমুল সই
যে রীতি বন্ধনে ছিলো একাকার ফুটে জুঁই
সুরভী ছিলো না মোটে, হৃদয়ে সীমিত কারো;
তবু কেটে যায় প্রিয় সম্পর্কের গেরো!

নিথর তিমিরে ডুবে, ফ্যাকাসে মলিন মুখ;
আজকের গাঁথা ফুল তার কালই বিদীর্ণ বুক।

তবু কিনারায়-ধারে, গ্রহ তাক করে চাঁদ;
মানুষের গানে এসে, মানুষই অবসাদ।

[নতুন শব্দবন্ধের স্বত্ত্ব লেখখের]

সাজ্জাদ সাঈফ

জন্ম- জুন, ১৯৮৪, যাত্রাবাড়ি, ঢাকা।
পেশা- চিকিৎসক।
আগ্রহ মূলত কবিতা।
সম্পাদনা- নীহারিকা(রম্যপত্রিকা, ঢাকা, ২০০২, ঈক্ষণ(ছোট কাগজ, ২০০৭, বগুড়া), ক্ষেপচুরিয়াস ওয়েবজিন(সহ-সম্পাদক, ২০১১)

পুরষ্কার- বঙ্গভূমি সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক 'বর্ষসেরা কবি-২০১৯' সম্মাননা (কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা)

প্রকাশনা- কবিতাগ্রন্থ- কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা (২০১৭), মায়ার মলাট (২০১৯), ভাষার সি-বিচে (২০১৯)  বহুদিন ব্যাকফুটে এসে ( ২০২০), প্রেমপত্রের মেঘ ( ২০২১)

ইমেইল- dr.sazzadsarker@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: