ডুব – অসীম আচার্য্য

মগ্নতার বিপরীতে

দু হাত ভরে রেখে যাও কেন ঝিনুকের খোল-
চকচকে মুক্তোর নিবিড় আবাদ!
আঁচলে বাঁধো ভাঙা ভাঙা বোল
কথার উঠোন পেরিয়ে গাঁ বদল করো
জলের ওপরে জল শুকোতে দিলে
মগ্ন রোদের পাটি আস্তিনে তার বৃষ্টিই রাখে

এপার ওপার শস্যের সাঁকো ধরে
পার করে নাও জীবনের দীর্ঘ মিছিল
কোথাও কোনভাবেই আমাকে রেখো না
একা হতে দাও
হারানোর শোকে পাথর হতে দাও!

জড় হতে দাও প্রাণহীন ভীড়ে
জীবনের প্রতি কোন দায় রেখে যেতে অপারগ আমি।
মৃত কচ্ছপের খোলে জল পান করে
যে পাখি গেছে আশ্চর্য উড়ালে
তাকে কেন জীবনের ধ্রুবতারা মানো
সোনার খাঁচায় পরিপাটি বিছানা বসাও!

ঝিনুকের শক্ত খোলসে তাকে বাঁধা যাবে না
মুক্তোর শাদা দানা ভ্রম তার কাছে
সে গেছে, চিরতরে গেছে…

কালো উড়াল

এইযে আমি তোমার স্বপ্ন মুঠো মুঠো পাঠ করি
অন্ধকারে দু চোখে ছড়াই ঘন ধুতুরার বিষ
কি আছে মানে! কি আছে মানে!

কতকাল স্থির হয়ে আছে
মৃত ওয়াগনের অস্বচ্ছ কাঁচের কিরিচে
গতকাল তবু তোমার মুখের লাবণ্য হাসি
আমার স্বপ্নের বৃত্ত ভরে দিয়ে গেছে

বিড়ালের লোমের মতো পেলব বিছানায়
সমস্ত গন্তব্যহীনতার ঠিক মাঝামাঝি
শেষরাতে নুয়ে পড়ে দ্বাদশীর চাঁদ
ঘটনার ডুগডুগি ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যায় পাখি

চৈত্রের বসন্ত দিলে কালো কালো উড়াল
ও পাখি কোনদিন কোনকালে দেখিনি আবার!

বসন্তঘুড়ি

বসন্তের রোদ, পানকৌড়ির পিঠে গোল হয়ে বসো
নমনীয় হও মনপুরার নির্জন প্রান্তরে
ডিঙিনৌকোয় রোদ ধরি রোদ ছাড়ি
বিকোই কিছু জনহীন ভীড়ে
রোদের কারবারি আলো মেখে চশমার ফ্রেমে
রঙিন ফুলের নায়রীর হাত ধরে
রবিশস্যের মৃতসংবাদ দেখি

বসন্ত একদা ছিল দূরতম দ্বীপ
নাবালিকা প্রেমিকার মতো
অনেক কিছু অবুঝের কাছে গচ্ছিত রেখে
শুকনো খড়ের ঝঞ্জাটে হেঁটে গেছি পথ
হিসেবের রশি ধরে টানাটানি করে
ছিঁড়েছি এক দীর্ঘ কথার মালা
তার কিছু পড়ে আছে পথে, কিছু গেছে শীতের প্রকোপে

বসন্ত, তোমার গিলাফে আটকে রাখো সুখ
মাতাল সুখের তরল গেলাসে
স্মৃতির আকাশ খেকো ঈগলের মৃতচোখ রেখে
ভালোলাগার ত্রিকোণ কিছু ঘুড়ি উড়াই।

ভালোবাসলে

ভালোবাসলে শুভ্র কপোত উড়াও
মেঘের পাহাড় আগুনের সঙ্গমে-
জ্বালিয়ে দিয়ে ঢেউয়ের সমান হাঁটো,
পিপাসার নদী একটু যদি কমে।

ফাগুন এখন বৃন্তচ্যুত ফুল
পাখির মতো চলন বিলের পালা
উত্তরে যতো রেখে যাবে অভিনয়
নিভৃত মনে বাড়বে ততোই জ্বালা

তোমার প্রেমের উত্তাপে আমি বাঁচি
হৃদয়ের ঘাসে তবুও চালাও কাঁচি!

ব্যর্থতা

ঝরাপাতার ওপর দিয়ে হেঁটে যায় সাপ
শূন্য-রিক্ত গাছের ছায়া ঢেকে দেয় বৈষ্ণবী-চাঁদ
মাঘের জমিনে ভেজা বিষন্নতার রূপালি বাদাম
খড়ের চালায় শুকোতে দেয়া শিশিরের গান
বসন্তের ব্যর্থতার দায় নেবে না কাঁধে।
জমে ওঠে না তাই শামুকের সঙ্গম
পাতাবাহার মেশে না রূপকথার ভেজা আগুনে
গত হতে হতে এই চোখে ভীড় করে পাথরের ব্যাধি

রাতের অন্ধকারে যে পথ হেঁটেছে পথিক
মাথায় রেখেছে ধরে কুয়াশার ধূসর জগৎ
তার প্রাত্যহিকতার শেষে ডাকে না ফাগুন
আসে না কোকিল সহজিয়া গানের কোলাজে

এখন পৃথিবী অমিমাংসিত রিক্ততায় কাঁপে
বসন্ত আটকে থাকে ওপারের বনে
মনের থেকেও দূরে পাহাড়ের উচ্চতর সীমাবদ্ধতায়।

ডুব

এখানে এই জলের মায়ায় দাঁড়িয়ে থেকে
মধুমতিকে একদিন ডুবে যেতে দেখেছি
আহা নদী! তোমারও ডুবসাঁতার থাকে
থাকে ডুবে যাবার তাড়া…

ঝরাপাতার সন্ধানে নেমে এসে চাঁদ
ডাহুকের পাখার ওমে ঘুমিয়ে গেলে
পৃথিবীর প্রেমিক-প্রবর কবি
শব্দের অন্ধকারে খুঁজে পায়নি বেহুলার ভাসান

তুলসীবেদির সামনে বসে অনেক সন্ধ্যা
নিজেরই মাথায় তোলে নিয়েছে আঁচলের ধূলো
সিঁথির সিঁদুর তার মনসার অভিশাপে
ধুতুরার বিষে দেখেছি বিবর্ণ হতে।
কি জানি লিখতে এসে তালপাতার অক্ষরে
নিজেরই নাম ভুলেছে যে কবি
আমি তার প্রেমের পেয়ালায় চুমুক মারি
ব্রহ্মপুত্রের ঘোলাস্রোতে উজান টানি।

আড়াল

ও নামের সাথে কী অদ্ভুত মিল তোমার
কি সকাল কি বিকেল কাছে এসে বসো
পান-সুপারির আড্ডায় হলদে শাড়ি বাতাসে উড়াও।

তালের সারিতে ঢাকা এই পথ বেঁকে গেছে বলে
দোয়েলের-ভোর ফিরে আসবে না বলেছিল যারা
সূর্যোদয়ের দেশে আমি তাদের নামে উড়িয়েছি শুভ্র কপোত
তাদের চোখের থেকে ডেকে এনে ঘুম
ঝর্ণার জলে ধুয়ে দিয়েছি

তুমি এমন সমন্বয় কী করে করো?
কী করে বাঁধো প্রাণ দূর প্রবাস থেকে?
সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপাড়ের দেশে
কি করে জমাও এমন বর্ণমালার প্রেম
ভালোবাসো কাকচক্ষুর আড়ালে বসে!

অসীম আচার্য্য

অসীম আচার্য্য

জন্ম ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৮৪ পাথরাইল, দেলদুয়ার, টাঙ্গাইল। 

পেশায় কলেজে শিক্ষকতা (ধলা স্কুল এন্ড কলেজ, ত্রিশাল)

আগ্রহ কবিতা ও গানে।

সম্পাদনা- বৈঠক

প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থ-
চোখে তার দাঁড়কাক বেঁধেছে বাসা(২০১৮)
শব্দপাঠ কিংবা সমুদ্র আবাহন(২০১৫)
ঢেউয়ের ভিতর আমাদের প্রণয়(২০১৩)

ইমেইল- asimacharjee1984@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: