টিকটিকির লেজ খসে পড়ে কেন?

পৃথিবীতে অনেক অদ্ভুত কান্ড ঘটে। তার কিছু কিছু আমাদের অবাক করে, আর কিছু চোখ এড়িয়ে যায়। টিকটিকির লেজ খসে পড়ার ব্যাপারটা সেরকমই আজব। বাসার দেয়ালে বা সিলিংয়ে ঝুলে থাকতে দেখা যায় এদের। কখনো কখনো দেখা যায় এদের লেজের একাংশ খসে পড়ে আছে। আবার বাচ্চারা হাত দিয়ে ধরতে গেলেও খুব সহজে খসে পড়ে যায় টিকটিকির লেজ! কিন্তু এর কারণ কী? বিজ্ঞানীরা অনেক পর্যালোচনা করে এর একটি কারণ বের করেছেন। আসলে এটা শিকারের হাত থেকে বাঁচার কৌশল। ইংরেজিতে টিকটিকির (Hemidactzlus frenatus) লেজ নিয়ে একটা কৌতুক প্রচলিত আছে।

‘A lizard lost its tail
But it got one back from a retail shop!’

টিকটিকি (Lizard) সরীসৃপ শ্রেণির চতুষ্পদ প্রাণী। এরা Lacertilia বর্গের অন্তর্গত। এদের দেহ শুষ্ক আঁশ অথবা গুটিকা দ্বারা আবৃত। বেশিরভাগ টিকটিকিই নিশাচর। এদের দৈর্ঘ্য ৩-৬ ইঞ্চি হয় এবং প্রায় পাঁচ বছর বাঁচে। টিকটিকির লেজ খসে পড়ার দৃশ্য অনেক মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। দৃশ্যটা চমকপ্রদই বটে। ঝাড়ু দিয়ে দেয়াল পরিষ্কার করার সময় প্রায়ই ঘটে এটা। টিকটিকি তাদের লেজ খসায় যে কোনো শিকারি প্রাণীর খপ্পরে পড়লেই। এক্ষেত্রে তাদের প্রধান শত্রু পাখি আর বিড়াল।

টিকটিকি কেন লেজ খসায়- তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিস্তর গবেষণা করেছেন। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন- টিকটিকির শরীরের অন্যান্য অংশের চেয়ে লেজটা ভীষণ দুর্বল। ফলে এটা নিশ্চিত যে টিকটিকির লেজ খসে পড়ার বিষয়টি কোন দুর্ঘটনা নয়। বিপদে পড়ার পরও এদের লেজ শরীরের সঙ্গে লেগে থাকে। কিন্তু তখনই খসে পড়ে যখন লেজের ভেতরের কোষগুলো বিশেষ এক রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদন করে। এই রাসায়নিক পদার্থের প্রভাবেই ঘটে অদ্ভুত কা-টা। মজার ব্যাপার হলো খসে পড়ার পরও কিন্তু নড়াচড়া করতে থাকে। এর ফলে শিকারি প্রাণী কিছুক্ষণের জন্য হলেও বিভ্রান্ত হয়। টিকটিকি ধরবে, নাকি তার জ্যান্ত লেজ ধরবে। লেজ রেখে শত্রুকে ধোকা দিয়ে পালানোর এ কৌশলকে বলা হয় Caudal Autotom। লেজের এভাবে নড়াচড়ার কারণ হচ্ছে লেজে সৃষ্ট কিছু নার্ভ ইমপালস যেটা লেজের পেশিকে সংকেত দেয় অর্থাৎ সহজেই বুঝা যায় টিকটিকির কাছে লেজ খসানো প্রাণ বাঁচানোর অন্যতম অস্ত্র।

তবে টিকটিকি লেজ দিয়ে দেয়াল বেয়ে উপরে ওঠা, শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা ইত্যাদি কাজ করে থাকে। তাই লেজ খসানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি লেজ গজানোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

অধ্যাপক ম্যাথু ভিকারিয়াস লেজ গজানোর প্রসঙ্গটি এভাবে ব্যাখ্যা করেন – ‘আমরা জানি গেকোর স্নায়ুরজ্জুর পুনরুৎপাদন ঘটে, তবে আমরা জানতাম না কোন কোন কোষগুলো এর পেছনে অবদান রাখে। মানুষ স্নায়ুবিক আঘাত নিয়ন্ত্রণে খুবই আনাড়ি। তাই আমি আশা করছি গেকোর (টিকটিকি) কাছ থেকে এই বিষয়ে শিখতে পারবো, যার মাধ্যমে মানুষের স্নায়ু রজ্জুর আঘাত নিজে নিজে নিরাময় করা যাবে।’

বিজ্ঞানীরা শিকারির মতো আচরণ অনুকরণ করে গবেষণাগারে একটি গেকোর (টিকটিকি) লেজ খসিয়ে দেন এবং কোষীয় পর্যায়ে কী ঘটনা ঘটে তা পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দেখতে পান, গেকোর স্নায়ুরজ্জুতে রেডিয়াল গ্লিরা নামক এক বিশেষ ধরনের স্টেম কোষ থাকে। এই কোষগুলো সব মেরুদন্ডী প্রাণীর মধ্যে পাওয়া যায়। তবে যখন টিকটিকির লেজ খসে যায় তখন অন্য কিছুর প্রণোদনায় এরা আর নিশ্চুপ থাকে না বরং সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরা নতুন কিছু প্রোটিন তৈরি করে এবং দ্রুত সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়। ফলে এক পর্যায়ে গিয়ে স্নায়ু রজ্জু মেরামত হয়ে যায়। শুধু যে লেজের স্নায়ুতন্ত্রই মেরামত করতে পারে তা নয় বরং অন্যান্য অংশে এমন কি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র আঘাতপ্রাপ্ত হলেও তা মেরামত করতে পারে। এই কারণেই বিজ্ঞানীরা টিকটিকির লেজ খসানোর কারণ নিয়ে বেশি উৎসাহ বোধ করছেন। হয়তো ভবিষ্যতে তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।

উসমান গণি সুমন

জন্ম - নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার চল্লিশা বৈরাঠি।
পেশা- শিক্ষকতা (কলেজ শিক্ষক )
আগ্রহ – প্রবন্ধ ও ফিচার।
প্রকাশিত গ্রন্থ- প্রাণিজগৎ: জানা-অজানা বিস্ময় (২০২১ বইমেলা)
চেয়ারম্যান -  দিলরুবা হাবিব শিক্ষা ফাউন্ডেশন
ইমেইল – o.goni.sumon@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: