জোনাকি পোকার আলো জ্বালার রহস্য

“সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ মুছে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন,
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল। ”

জোনাকির ঝিলমিল দেখে লাইনগুলো লিখেছিলেন কিনা জীবনানন্দ দাশ, তা আমরা জানি না। হয়তো জোনাকির ঝিলমিল আলোর মুগ্ধতায় কবি লিখেছেন এই চরণগুলি। জোনাকি পোকার (Firefly) আলো দেখে মুগ্ধ হননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাতের অন্ধকারে তাদের মিটিমিটি আলো দেখলে আপনার মনে হবে পৃথিবীতে বুঝি আকাশের তারাগুলো নেমে এসেছে।

ল্যামপিরিডি পতঙ্গ পরিবারের একটি গুবরে পোকা বর্গ হলো কালিওপ্টেরা। বাংলায় এর নাম তমোমনি। এরা মূলত পাখাওয়ালা গুবরে পোকা, যাদেরকে সাধারণভাবে জোনাকি পোকা বলা হয়। জোনাকিকে লাইটিং বাগ বলা হয়ে থাকে। আসলে এটি কোন বাগ বা মাছি প্রজাতির পোকা নয়। অন্যান্য পোকার মতই দুটি পাখা রয়েছে, যেগুলোকে ইলিট্রা বলে। এগুলো পিঠের উপর সোজাসুজি ভাবে থাকে। দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে, উড়ার কাজে ব্যবহার করে।

এরা সর্বভুক প্রাণী। এদের জীবনকাল সাধারণত ১-৩ সপ্তাহ হয়ে থাকে। তবে কিছু প্রজাতির গড় আয়ু ২ মাসও হয়ে থাকে। দেহ মস্তক, বক্ষ, উদরে বিভক্ত। মস্তকে দুটি অ্যান্টেনা, বক্ষে ৬টি পা ও ডানা থাকে। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট আলো প্রদানকারী জোনাকি পোকার দেহের পিছনের অংশ Luminescent Organ থাকে। এই Organ থেকে লুসিফারেজ (Luciferage) ও লুসিফারিন (Luciferin) নামে দুটি রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়। লুসিফারিন তাপ প্রতিরোধী, যা আলোকে ঠান্ডা রাখে। এ ধরনের আলো উৎপাদনকে বলা হয় বায়োলুমিনিসেন্স।

(জোনাকি পোকার আলোক শক্তি উৎপন্ন হয় রাসায়নিক শক্তি থেকে আর প্রায় পুরো রাসায়নিক শক্তিই আলোকশক্তি তৈরি করে। এক্ষেত্রে তাপ উৎপন্ন হয় না। তাই জোনাকির আলোকে বলা হয় ঠান্ডা আলো।)

লুসিফারেজ এনজাইম এর উপস্থিতিতে অক্সিজেন, ক্যালসিয়াম অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) ও লুসিফারিনের সাথে বিক্রিয়া করে আলো উৎপন্ন করে। আরেকটু খোলাসা করে বললে বলা যায়, জোনাকি পোকার উজ্জল এই দ্যুতি আসে লুসিফারিন অক্সিজেন ও এ.টি.পি.র সংমিশ্রণের লুসিফারেজ দ্বারা অনুঘটিত জারণ থেকে। তবে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকলে আলো কম হয়। আর বেশি থাকলে আলো বেশি উৎপন্ন হয়।

এ আলোয় উত্তাপ হিসেবে কোন শক্তি ব্যয়িত হয় না, তা নাহলে শক্তি খরচের ফলে জোনাকি পোকা মারা যেতো। অক্সিজেনের উপস্থিতিতে হালকা অঙ্গানুগুলো আলোকিত হয়ে ওঠে। এরা কোল্ডলাইট বা নীলাভ আলো উৎপন্ন করে কোন আলট্রা ভায়োলেট ছাড়া। এই আলোর রঙ হলুদ, সবুজ বা ফিকে লাল হতে পারে। আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ৫১০ থেকে ৬৭০ ন্যানোমিটার।

জোনাকি পোকার জীবনটাই শুরু হয় ডিমের ভেতর থেকে। বাস্তবিক অর্থে সব ডিম এবং শুককীটই আলো জ্বালানোর জন্য প্রস্তুত থাকে। পরবর্তীতে প্রাপ্ত বয়স্ক হলে তারা তাদের আলো জ্বালিয়ে সংকেত প্রদান করে। জোনাকির আলো খেলা তার প্রজননে ও শিকার ধরতে সাহায্য করে। কিছু প্রজাতির পুরুষ জোনাকি রাতের বেলা আলো জ্বেলে নারী জোনাকিদের প্রলুব্ধ করে। তবে কোন জোনাকি যদি কোন কারণে বিরক্ত হয়, তখন সে আলো জ্বালাতে পারে না। আমাদের দেশে শুধু মাত্র সবুজ আলোর জোনাকি পোকা দেখা যায়। কিন্তু অন্যান্য অনেক দেশে লাল আলো বিচ্ছুরণকারী জোনাকি পোকাও দেখা যায়।

উসমান গণি সুমন

জন্ম - নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার চল্লিশা বৈরাঠি।
পেশা- শিক্ষকতা (কলেজ শিক্ষক )
আগ্রহ – প্রবন্ধ ও ফিচার।
প্রকাশিত গ্রন্থ- প্রাণিজগৎ: জানা-অজানা বিস্ময় (২০২১ বইমেলা)
চেয়ারম্যান -  দিলরুবা হাবিব শিক্ষা ফাউন্ডেশন
ইমেইল – o.goni.sumon@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: