জল পতনের শব্দঃ নান্দনিক কবি আসাদ উল্লাহ-র শ্রেষ্ঠ ফসল

‘এ নগর অন্ধকারের
এ অন্ধকার নগরে ইল্যাক্ট্রিক খামে
আহা, ইল্যাক্ট্রিক খামের তারে ঝুলে থাকে চাঁদের কঙ্কাল
ঝুলে থাকে মৃত স্বপ্নের করোটি কালো কালো কপাল!’

এই নগরকেন্দ্রিক জীবনের এমন তীব্র ব্যবচ্ছেদ একজন কবির পক্ষেই সম্ভব। তিনি যে সে হলে চলবে না। তাকে হতে হবে শাণিত শব্দের সুদক্ষ ক্ষুরধার শিল্পী। আলোচ্য পঙক্তির দ্রষ্টা কবি আসাদ উল্লাহ এমনই এক সুদক্ষ শব্দ শিল্পী, ক্ষুরধার কবি। শব্দের বুননে যিনি আঁকেন মানুষের মন, চিত্রিত করেন অসংখ্য চাওয়া ও না পাওয়ার বেদনাকে। শব্দের আকরিক ভেঙে বের করে আনেন খাটি ও মূল্যবান ধাতু। তাইতো কত সহজেই না এ শহর, এ নগরের চরিত্র ও স্থিতি, স্বপ্ন ও যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের আর্তধ্বনি ও হাহাকার তুলে আনেন একের পর এক ছবি এঁকে। যেন শব্দ দিয়েই তিনি গড়েন, এই বিশ্বপাঠশালা। ফলে আমরা যা দেখি এবং যা দেখি না, দেখা ও না দেখাকে চমৎকার শিল্পিত করে তুলেন আনেন তিনি- এজন্য তাকে কী বলবো, কবি নাকি চিত্রকর? না, তাকে শব্দের জাদুকর বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করি। কেননা শব্দ দিয়ে এই যে কবিতার বুনন গড়ে তোলা, তা কবিতা না হয়ে- হয়ে যায় একটি জ্যান্ত ছবি। শব্দ দিয়ে যে শিবসুন্দর গড়ে তোলা, তা কবিতা না হয়ে- হয়ে উঠে বিশ্বজনীন যোগাযোগ ভাষা৷ এই যে দৃশ্যকল্প, এই যে জাদুবাস্তবতার জগতে কবিতার খেলাঘর, সমস্ত দৃশ্যপটের আড়ালে তা হয়ে উঠে এক উপাখ্যান। জীবন ও যাপনের এক সত্যিকার কাহিনী।

বলছিলাম ‘জল পতনের শব্দ’ কাব্যের কবি আসাদ উল্লাহ সম্পর্কে। কবি আসাদ উল্লাহ ৯০ দশকের অন্যতম শক্তিমান কবি, শব্দের জাদুকর। যাঁর কবিতার প্রধানতম শক্তি গ্রামীণ লোকজ শব্দ এবং তার চিত্রময় বর্ণনা। শব্দের শাণিত উচ্চারণে যিনি ব্যবচ্ছেদ করেন সময়কে। মানুষের মননভূমে তুলে আনেন শিল্পের ফসল। কবিতায় কথা বলেন ফেলে আসা অতীত ও বর্তমানের বৈপরীত্য নিয়ে। কথা বলেন মানুষের অধিকার, মানুষের চাওয়া পাওয়া নিয়ে। তিনি স্বপ্ন দেখেন এবং স্বপ্ন দেখান সুন্দর সমাজ

কবি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, তার দেখনেওয়ালা চোখ আমাদের নিয়ে যায় অধিকতর স্বপ্নজগতে- যেখানে শব্দ হচ্ছে সত্য এবং শব্দমালা হচ্ছে সত্যের বয়ান প্রতিষ্ঠার অস্ত্র। কবি সেই অস্ত্র হাতে পারঙ্গম এক শিল্পী। তিনি শব্দ দিয়ে আমাদের না বলা কথার জগতে একজন আধিকারিক হয়ে উঠেন। জায়গা করেন হৃদয়ের পলল ভূমিতে। তিনি প্রেমের কথা বলেন, দ্রোহের কথা বলেন, ভালোবাসার বেদনার কথা বলেন, আনন্দের অনুভবের কথা বলেন, তিনি সমাজ সঙ্গতি ও অসঙ্গতির চিত্র আঁকেন, তিনি ভূগোলের ভেতর গড়া উঠা অন্য এক ভূগোলের গল্প শুনান। আমরা শুনি, আমরা দেখি- আমরা যাপন করি যেই, তার সনে কথা বলি। কিন্তু সব কবিই কি তা পারেন? হয়তো হ্যা, কিংবা না। তবে আসাদ উল্লাহ তেমন এক কবি, যিনি তার পাঠককে সঙ্গতি এবং অসঙ্গতির মুখোমুখি দাঁড় করান তীব্র অথচ স্নিগ্ধ সরল শব্দের গাঁথুনীতে। তিনি পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করেন জীবন ও যাপনের নানা অনুসঙ্গের দৃশ্যকল্প এঁকে। সেখান থেকে এড়িয়ে যায় না জীবনের নিদারুণ বাস্তবতা। এড়িয়ে যায় না কঠিন কোমল চাওয়া। এজন্যই বোধহয় ৭০ দশকের অন্যতম শক্তিমান কবি মাহবুব হাসান বলেছিলেন- “আসাদ উল্লাহর কবিতায় একধরণের নতুন ইমেজারি দেখতে পাই, যা প্রচল নয়। কবির শক্তি বুঝা যায় তার কল্পনার বিস্তার দেখে।” কবি আসাদ উল্লাহ-এর কবিতায় সেই শক্তি রয়েছে। তাইতো তিনি বলতে পারেন-

“এই যে এতো বসন্ত বসন্ত খেলা
তবে কেন ফুল ফুটে না,
একদল যুবক আর একদল যুবতী
পার্কে গাছের আড়ালে এতো ফিসফাস করে
তবু টিনের চালে ছাদে জ্যোৎস্না নামে না।”

যাপিত জীবনের তিক্ত মধুর বয়ানের মাধ্যমে কবি আসাদ উল্লাহ আমাদের বোধের জগতকে নাড়িয়ে দেন, এটাই তাঁর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। অখন্ড জীবন কল্পনার মাঝে আমাদেরকে দুদন্ড ভাবার ফুরসত এনে দেন। করতলগত নগর জীবনে দাঁড়িয়ে তিনি গ্রামীণ জীবনের দ্বার উন্মোচন করে আমাদের বড় বেশি আপ্লত ও স্মৃতিকাতর করে তুলেন। ফলে আসাদ উল্লাহ’র কবিতায় নানান ফ্লেভারে বহুমুখী মিশ্র স্বাদ পাওয়া যায়। তিনি নগরে বসত করা সেই গ্রাম্য পাখি, যার স্মৃতিতে খেলা করে দুরন্ত শৈশব, উচ্ছল কৈশোর, উদ্দাম যৌবনের অবাধ তারুণ্য। তিনি সদা বিচরণ করেন- ‘দূর গাঁয়ে / আম জাম জামরুল কাঁঠালের ঘন ছায়ায় / শাপলা ফোটা বিলের জলে / লতা-গুল্মের প্রাচীন পুকুর ঘাটে’। যা কিছু অতীত, যা কিছু ফেলা আসা- তা তিনি কখনো ভুলতে পারেননি। তাইতো নগরবন্দী জীবনেও সমস্ত ব্যস্ততা এবং জঞ্জালের মাঝে কেঁদে উঠে তাঁর মন। আর তিনি খুব গোপনে চলে যান সেই স্বপ্নভূবনে। সেখানে- ‘কোন এক আষাঢ়ে মন বলে যাই ভাসানের দেশে / ডিঙি বেয়ে যায় একাকি বালক, তার সাথে বালিহাঁস / গলিয়ে গলিয়ে যায় ধানের ক্ষেত জলডোবা মাঠ’। কারণ তিনি সেখানে রেখে এসেছেন, ‘খুব ছোট একটি ঘাসফুল আর হলুদ প্রজাপতি’। যারা মুখভার করে পড়ে আছে খড়ের বিষন্ন পায়ের কাছে। কবি জানেন তারা তাঁর অপেক্ষা করছে। কারণ তিনি অনেকদিন হলো-

‘দিঘির জলে, আহা দিঘির জলে কতোকাল হাঁস দেখি না
মাছ দেখি না, মাছের সাঁতার দেখি না,
কেবল ঘন কচুর পাতার ফাঁকে শূন্যতা দেখি
ডাহুক দেখি না, ডাহুকের নরম গান শুনি না।’

প্রকৃতির সাথে কবিসত্তার এক গভীর মিতালি রয়েছে। প্রকৃতির উছল রূপ দেখে কবির মনে অজান্তি জেগে উঠে প্রেম। সেই প্রেম বহুমাত্রিক। কখনো বা প্রেমিক প্রেমিকার মিলনের তুমোল আহ্বান, কখনো বা প্রকৃতির কাছে বিলীন হবার প্রবল আকাক্সক্ষা। কখনোবা সেই প্রেমে মিশে থাকে জীবাত্মা ও পরমাত্মা মহামিলনের তুমোল সমারোহ। আবার নিমেষ পরে জৈবজাত প্রেম বিলীন হয়ে সেখানে লাগে প্লেটোনিক প্রেমের ছোঁয়াচ। সময়ের পরম্পরায় দেহলেশহীন প্রেমের কোলাজ মূর্তমান হয়ে উঠে। কবি আসাদ উল্লাহ-র কবিতায় তার সবই আছে। আছে নানামুখী ভাঙন ও গড়ন। তবে এখানে রোমান্টিসিজম বা রোমান্টিকতার উপস্থিতি পরিমাণে বেশি। আমরা জানি রোমান্টিকতার প্রতিপাদ্য হচ্ছে যুক্তিহীনতা, কল্পনা, স্বতঃস্ফূর্ততা, আবেগ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং লৌকিকতা বহির্ভূত সংজ্ঞা। কিন্তু কবি আসাদ উল্লাহ এখানেই ব্যতিক্রম। তার কবিতায় এর সব কিছুই রয়েছে, তবে পরিমিত। যার ফলে তাকে পুরোপুরি রোমান্টিক কবি হিসেবে আলাদা করতে পারবেন না। তিনি তার কবিতায় বিষয় ভাবনা বা উৎস হিসেবে চেতন এবং অবচেতন মনের সংশ্লেষণ করেছেন। যার ফলে তার অনেক কবিতাকে আপনার মনে হবে অনবদ্য নিটোল প্রেমের কবিতা। ইংরেজীতে একটি শব্দ আছে যাকে বলে sensitivity বা সংবেদনশীলতা। আসাদ উল্লাহর কবিতায় তার উপস্থিতি তীব্র। তিনি যখন উচ্চারণ করেন-

পাখির ডাকের সাথে উড়ে যায় মন
কী জানি কী করে পাখি এতো অনুভূতিপ্রবণ
কী করে জানে পাখি ভাসানের দেশে থাকে এক নারী
তার চোখে জল!
কী করে জানে পাখি কৃষ্ণলতা নাম তার
একা ঘরে খিল এঁটে প্রতিদিন পাঠ করে প্রেমের কবর!’

কবি আসাদ উল্লাহর কবিতায় এভাবেই প্রেম হয়ে উঠে প্রধানতম উপজীব্য। সেখানে বিরাজ করেন অচেনা, অজানা এক মাধবী। যেই মাধবীর বহুমাত্রিক রূপে কবির হৃদয় ঘোর বর্ষার প্রেমোনুত্ত বৃষ্টি ছটায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। ভালোবাসার আকুলতায় কবিতায় নামে বৃষ্টি, জাগিয়ে তুলে কবেকার কোন বিষাদ স্মৃতি। তাও অনুভাবে অন্যরকম এক ভালোলাগায় পরিণত হয়। চোখের সামনে ভাসে-

‘একদা খুব বৃষ্টি হয়েছিলো মাধবীদের বাড়ি
বৃষ্টিতে খুব ভিজেছিল মাধবী আর
সদ্য ফোটা কয়েকটি কদম ফুল। ’

কিংবা

‘মাধবী, তুমি কাশফুল হও
আমি উড়ি শুভ্র হাওয়ায়।
কতোদিন, আহা কতোদিন দেখি না
মেঘ কেটে গেলে পেখম ছড়ানো কোজাগরী চাঁদ’।
এরকম অনুভূতির দারুণ এক রিফ্লেকশন কবি আসাদ উল্লাহে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে।

আধুনিকতার নামে আজকের বিশ্বে মানুষ হয়ে গেছে পোষাকী মানুষ। তারা ভুলে গেছে মন ও মানুষ। ভুলে গেছে মানবিকতার পাঠ। ভুলে গেছে শেকড়, শৈশবের শপথ- ভুলে গেছে জীবনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য, সর্বোপরি সত্য ও মিথ্যার বৈপরীত্য। যে কারণে জীবনের নিত্য নতুন বিত্ত বৈভবের সাথে অঙ্গা-অঙ্গিভাবে অধঃপতনের ধারা যুক্ত হয়েছে। যা বিপর্যস্ত করছে আমাদের জীবন। সেসব কিছু এড়িয়ে যায়নি কবি আসাদ উল্লাহ চোখ থেকে। সঙ্গতই কবির উচ্চারণ-

“কি সুন্দর আলোকিত অন্ধকার!
মানুষ কাঁদে
যেনো কোথাও কিছু হয়নি
যেনো কোথাও কিছু হচ্ছে না!”

এই বাস্তবতায় কবি আসাদ উল্লাহর কবিতায় আমরা শুনতে পাই সেই গভীর সত্য, যে সত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা সভ্যতার নির্মম শিকারে পরিণত হচ্ছি। মনে করিয়ে দেয় আমাদের অনুভূতি প্রতিনিয়ত কেবল ভোতা হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে আমাদের মেধা ও মননের বিকাশ। আমরা যে যন্ত্রের মতো নিয়ত ধাবিত হচ্ছি, তার ফলে একদিন অস্তিত্বের সংকটে পড়তে হবে। তখন –

‘রাতকানাদের দেশে সবই হয়, হবে
রাজনীতির ফলন ভালো হয়, হবে
আজব গুজবের কুজপ হয়, হবে কেবল বাগান হবে না ফুলের
পথে পথে থাকবেই হাহাকার রেনুদের।’

কবির ব্যক্তিজীবন তার কবিতায় ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। ব্যক্তিজীবনের রুচিবোধ, চিন্তার গভীরতা এবং বুদ্ধির প্রখরতার ছাপ পাওয়া যায় তার কবিতায়। কবির ভাবনার জগত ধরেই হাজির হয় কবিতা। কেননা কবিতা হচ্ছে সূর্যের বুক চিরে বের হয়ে আসা প্রখর সত্য সূর্য কিরণ। কবিতা হচ্ছে মেঘের বুক চিরে নেমে আসা প্রবল সত্য বৃষ্টিধারা। কবিতা হচ্ছে রাতের শেষে বহুল প্রতিক্ষিত ভোরের আলোর মতো। কবিতা হচ্ছে কবির অমোঘ নিয়তি। যাকে কখনো লঙ্ঘন করা যায় না। যেই নিয়তিকে কখনো অস্বীকার করা সম্ভব না। এ যেন সত্য ও সুন্দরের আরাধনা। যে কারণে কবি হন আমাদের পথ প্রদর্শক। কবি হোন আমাদের আশার বাতিঘর। কবি আমাদের দেখান আলোর নহরী। তার দৃশ্যকল্প নির্মাণের পিছনে যে গভীর সত্য রয়েছে, তাই যেন আমাদের পাথেয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তি কবি আসাদ উল্লাহ তার কবিতায় ধরা দেন দারুণ রুচিবোধ, চিন্তার গভীরতা এবং বুদ্ধির প্রখরতায়। তিনি যখন উচ্চারণ করেন-

‘চাঁদও ফুটে থাকে, বাসনা সাবানে উজালা হয় গাঁও
মানুষ ফোটে না কেনো
মানুষ কী তবে শামুক অথবা কাঁকরা?’

একজন কবির প্রধানতম কৃতিত্ব হচ্ছে তার নিজস্ব বলার ভাষা। যাকে আমরা বলি কাব্য ভাষা। যা কবিকে সমকালীন কিংবা নিকট অতীত ও ভবিষ্যতের কবিদের থেকে আলাদা করে। যে কথাটি বলতে চাই- তার হাত ধরেই কবিতার জন্ম। সেই বলার মাঝে যদি কোন নতুনত্ব না থাকে, সেই বলার ভেতরে যদি কোন অভিনবত্ব না থাকে, তাহলে সেই পঙক্তি পাংশে মনে হয়। নব্বইয়ের দশক কিংবা সমকালীন অনেক কবির ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। কিন্তু ‘জল পতনের শব্দ’ খ্যাত কবি আসাদ উল্লাহ তার মাঝে ব্যতিক্রম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করেছেন তার নিজস্ব কাব্য ভাষা। সেই চমক হাজির করেছেন জল পতনের শব্দ কাব্যে। চিত্রকল্প নির্মাণ, অলংকারের ব্যবহার এবং বক্তব্য উপস্থাপনের অভিনবত্ব এই কাব্যের প্রধান শক্তি। ফলে এসব নিয়ে কথা বলা আবশ্যক।

কবিতায় শব্দবিন্যাসের প্যাটার্ন বা আকারকে ‘চিত্রকল্প’ বলা হয়। অর্থাৎ কবির ভাবানুতির ছবি বা চিত্রই ‘চিত্রকল্প’। যার মধ্য দিয়ে কবি তার মনের ভাবকে জীবন্ত করে তুলেন। যা উপমা উৎপ্রেক্ষা বা অন্যান্য অলংকার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। একারণে ইমেজ বা চিত্রকল্পের গুরুত্ব বুঝাতে, কালজয়ী মার্কিন কবি ও সমালোচক এজরা পাউন্ড বলেন, ‘ An image is that which presents an intellectual and emotional complex in an instant of time’ ফলে একথা বলা যায় যে, উপমা যদি একটি মাত্র গুণ অথবা শব্দের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে, ‘চিত্রকল্প’ সেখানে সবটুকু অভিজ্ঞতা বা বিষয়বস্তুকে তুলে নিয়ে আসে। এটি অনেকটা একটি চিত্র থেকে অধিক দূরসঞ্চারী ও গূঢ়গম্ভীর আরেকটি চিত্র পাওয়া। এই যে একটি চিত্র হতে আরেকটি অধিক দূরসঞ্চারী ও গূঢ়গম্ভীর চিত্র পাওয়া- এটি কবি আসাদ উল্লাহ এর কবিতার শক্তি।

কারণ তিনি তার কবিতায় চমৎকার মুন্সিয়ানায় মেপে মেপে চিত্রকল্প বা দৃশ্যকল্প নির্মাণ করেন। এই নির্মাণের ভেতর দিয়ে কবিতায় কথা বলেন। আর তাতে পাঠক মাত্রই মুগ্ধ হন। শিল্প-সুষমা মন্ডিত শব্দ নির্বাচনের মাধ্যমে কবিতায় যে ঝংকার তুলেন তা পাঠকের হৃদ মাঝারে সুর তুলে, ‘জল পতনের শব্দ’-এ তার প্রতিফলন দেখা যায়। একথা জোর দিয়ে বলা যায়, তিনি তার কবিতায় চিত্রকল্প তৈরিতে শব্দ ব্যবহারে যথেষ্ট সচেতন। এটাই তার মুন্সিয়ানা। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেখে নিতে পারি। তিনি যখন বলেন-

১. কোন এক আষাঢ়ে মন বলে যাই ভাসানের দেশে
ডিঙি বেয়ে যায় একাকি বালক, তার সাথে বালিহাঁস

কিংবা

২. নারী দেখলেই বাড়ি দেখা হয়ে যায়
বাড়ির পাশে জল টলমল শান্ত দিঘি দেখা হয়ে যায়

কিংবা

৩. মেঘেরা মুখ ভার করে বসে থাকে
মেঘেরা ইস্টিশনের মানুষের মতো শুয়ে থাকে!

চিত্রকল্প নির্মাণে শব্দ ব্যবহারের মুন্সিয়ানা যেমন রয়েছে, তেমনি মুন্সিয়ানা রয়েছে কবিতার নানান রসনার আয়োজনেও। এক্ষেত্রে কবি আসাদ উল্লাহ একজন নান্দনিক কবি। কবির শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটে তার ভাষায়। সেই ভাষাকে সুসংহত করে অলংকার। সাধারণত কবিতা তখনই পাঠককে ছুঁয়ে যায়, যখন কবিতায় মানুষের সংবেদনশীলতা ও আবেগের মূল্য এবং অনুভূতি ও স্বাদের প্রকাশ ঘটে। মানুষকে ঘিরেই কবিতা, কারণ কবিতা জুড়েই থাকে মানুষের আবেগ অনুভূতির প্রকাশ। ‘জল পতনের শব্দ’ কাব্যে পরতে পরতে রয়েছে সেই ছোঁয়া। যা কিছু ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায়, সেই অনুভবের অনুভূতি আসাদ উল্লাহর কবিতাকে করেছে জীবন দান। কবি যখন কবিতায় তার নিজের অনুভাব বর্ণনা করেন, তখন তা তার অনুভবে সীমাবদ্ধ না থাকে হয়ে উঠে সর্বজনীন। কবিতার ভাব ছুয়ে যায় পাঠকের হৃদয় অতল। এক্ষেত্রে কবিতার বহিরাঙ্গে অলংকারের মালা ঝলমল করে উঠে। শব্দ ধ্বনিকে কাব্যে শ্রুতি মধুর ও অর্থ ধ্বনিকে হৃদয়গ্রাহী করার খেলায় আসাদ উল্লাহ একজন দক্ষ ও পাকা খেলোয়াড়। ফলে তার কবিতায় শব্দাঙ্কার ও অর্থালঙ্কার দুটোর চমৎকার প্রয়োগ দেখা যায়।

বলা নেয়া ভালো, কবিতায় অলংকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই অলংকার অর্থাৎ প্রতীক-উপমা-রূপক-রূপকল্প ব্যবহার সবসময়ই যে অপরিহার্য, তা নয়। কবিতায় এসব না থাকলেও তা মহৎ কবিতা হতে পারে। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার-বিজয়ী অমর কাব্য ‘গীতাঞ্জলি’। তিনি এর ইংরেজি অনুবাদকালে অন্ত্যমিলসহ অনেক কিছুই ঠিক রাখেননি। তার মানে অলংকার ব্যবহার করা যাবে না বা মহৎ সাহিত্যে হয়নি তেমনটাও না।আদিকাল হতেই পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্যে এগুলোর ব্যবহার চলে আসছে। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদেও এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। মধ্যযুগের সাহিত্যে এসব দৃষ্টান্ত ভুরিভুরি। তার হাত ধরেই আধুনিক যুগেও অলংকারের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।
অলংকার সম্পর্কে আলংকারিক ভামহের অভিমত হলো-

‘রূপকাদিরলঙ্কারস্তথান্যৈর্বহুধোদিতঃ।
ন কান্তমপি নির্ভূষং বিভাতি বনিতাননম।।’

অর্থাৎ, রমণীর মুখমণ্ডলের রমণীয়তা যেমন অলংকারহীন অবস্থায় রমণীয় বলে মনে হয় না ঠিক তেমনি অলংকারহীন কাব্যও কাব্য বলে মনে হয় না। এরদ্বারা তিনি এটাই বুঝাতে চেয়েছেন, একজন রমণীর সৌন্দর্যকে আরো ফুটিয়ে তুলতে যেমন গয়না বা অলংকারের বিকল্প নেই, তেমনি কবিতার অঙ্গকেও শ্রীবৃদ্ধি করতে কাব্যালংকারের বিকল্প নেই৷

কারণ প্রতীক, উপমা, রূপক, রূপকল্প কবিতার ভাষাকে শাণিত করে, ভাব ও বিষয়কে সুস্পষ্ট করে ও অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা সৃষ্টির মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রগাঢ় অনুরণন সৃষ্টি করে। আধুনিক কবিতায় এসবের ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যিনি এসব অলংকার ব্যবহারে যত বেশি অভিনবত্ব ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন, তিনি তত বেশি উজ্জ্বলভাবে পাঠকের দৃষ্টিতে ধরা দেন। এটা কবি হিসেবে তার বৈশিষ্ট্য ও সাফল্যেরও মাপকাঠি রূপে গণ্য হয়ে থাকে। কবি আসাদ উল্লাহ এর কবিতাতেও অলংকারের চমৎকার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সেক্ষেত্রে তার কবিতায় উপমা উৎপ্রেক্ষা এবং অনুপ্রাসের ব্যবহার বিশেষ লক্ষণীয়।

উপমা সম্পর্কে সৈয়দ আলী আহসান তার ‘কবিতার রূপকল্প’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘কাব্য শব্দ বা বাক্য একটি বিশেষ সংহতি এবং ধ্বনিবৃত্তির সাহায্যে বক্তব্যকে মুক্ত করে। যে কৌশল অবলম্বন করে একজন কবি তার বক্তব্যকে বিশেষ বিশেষ পদ্ধতিতে প্রকাশ করেন তার মধ্যে উপমা একটি আশ্চর্য কৌশল।’ আধুনিক কবিতায় উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। যখন কোনো বাক্যে বিশেষ গুণ, ধর্ম বা ক্রিয়ার ভিত্তিতে ভিন্ন জাতীয় দুটি বস্তুর মধ্যে সাদৃশ্য বা তুলনা করা হয় তখন উপমা অলংকার তৈরি হয়।

উপমাকে কবি জীবনানন্দ দাশ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘উপমাই কবিতা’। উপমা কবিতার শরীর ও প্রাণও বটে। উপমাকে যথার্থরূপে প্রয়োগ করতে পারলে তা অত্যন্ত সুষমামন্ডিত ও ঋদ্ধ মনে হয়। এজন্যই কোলরিজ বলেছেন যে, কবিতা যদি ‘সুন্দরতম শব্দের সুষম বিন্যাস হয় তাহলে কবিতায় উপমা অপরিহার্য।’ কখনও কখনও কবিতায় উপমা এত ঋদ্ধ হয়ে ওঠে যে উপমাই যেন একটি কবিতা হয়ে ওঠে। কবি আসাদ উল্লাহর কবিতায় সেটাই দেখা যায়৷ কবিতার শরীর নির্মাণে কবি আসাদ উল্লাহ এর কবিতায় প্রতিটি উপমাই আলাদা এক কবিতার শরীর নির্মাণ করে। তবে একে কখনো আরোপিত মনে হয় না, মনে হয় না অতিশয়োক্তি। তিনি যখন উচ্চারণ করেন-

“তার গ্রিবা বেয়ে শিশুর আঙুলের মতো হাসে
আমলকি আর সফেদার শুভ্র ছায়া।”
(মন বলে যাই ভাসানের দেশে)

কিংবা

“অথচ সড়ক কেবলই পাথর
কালো কালো ফণা”
(সড়ক)

পাখিদের পালকে ঘন কালো ঘ্রাণ উড়ে
দশতলা বাড়ির ছাদে কালো রঙ খোলে নাচে
একদল কালো পরী,
(এ নগর অন্ধকারের )

উপমা প্রয়োগে আসাদ উল্লাহ যেমন মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তেমনি উৎপ্রেক্ষা প্রয়োগে। উৎপ্রেক্ষা শব্দের অর্থ উৎকট জ্ঞান। কখনও সংশয় বা মিথ্যা কল্পনা। কিংবা বলা যেতে পারে কল্পনাশ্রয়ী সুগভীর ভাবনা। উৎপ্রেক্ষা যেন অর্থালংকারের মাঝে এক দ্বৈত দ্যোতনা। উৎপ্রেক্ষায় উপমেয়কে কোনোভাবে তুচ্ছ জ্ঞান না করে তাকে বরং আপন করে উপমানকে কল্পলোকে অবিরত দোলায়িত করে এক জাতীয় তুলনা বা বিসদৃশ তুলনা করে অর্থালংকার তৈরি করা হয়। কবিতা হচ্ছে কবির হৃদয় মন্থিত কল্পনা, স্মৃতি, বাসনা, আকাঙ্ক্ষা ও প্রজ্ঞার সজ্ঞান ঢেউয়ে এক বিমূর্ত অনুভূতি তৈরির প্রচেষ্টা। কবি এখানে অবগুণ্ঠিত সৌন্দর্যকে বের করে নিতে প্রতিজ্ঞ। যা দিয়ে তিনি পাঠককে পুলকিত, আলোড়িত এবং উদ্দীপ্ত করে থাকেন। কবিতার শব্দ যদি হয় শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ; উপমা-উৎপ্রেক্ষা হচ্ছে এর হৃৎপিন্ডের মতো- যা তাকে সজীব ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
যেমন:-

জমে উঠে ঝুলে থাকে থোকা থোকা মানবিক ফল-
(বৃক্ষরাই আধুনিক)

আধুনিক কবিতা সচেতন শব্দ, চিত্রকল্প, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অর্থ, ছন্দ ও উপমা-উৎপ্রেক্ষার সংমিশ্রণে গঠিত একটি সুগঠিত রচনা। এখনকার কবিতা যতটা দেখা বা শোনার, তার চেয়েও বেশি উপলব্ধির। সেখানে উপস্থাপনা যত বেশি নান্দনিক হয়, পাঠকের কাছে তা ততবেশি উপভোগ্যকর হয়ে উঠে। শব্দের খেলা কবিতা, তা আরো বেশি রোমাঞ্চকর হয়ে উঠে যখন সেখানে শব্দালংকারগুলোর চমৎকার ব্যবহার হয়৷ শব্দের বহিরঙ্গ ধ্বনির আশ্রয়ে যে কাব্যসৌন্দর্য সৃষ্টি হয় তাকে শব্দালংকার বলে ৷ যেমনঃ অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ, বক্রোক্তি। কবি আসাদ উল্লাহ এর কবিতায় অনুপ্রাসের ব্যবহার বহুল এবং মাধুকরী। একটি বাক্যে একই ব্যঞ্জনধ্বনি একক ভাবে, একাধিক ব্যঞ্জনধ্বনির সংযুক্ত ভাবে অথবা একাধিক ব্যঞ্জনধ্বনি পাশাপাশি থেকে যে শ্রুতি মধুর সৌন্দর্য সৃষ্টি করে তাকে অনুপ্রাস অলংকার বলে৷ অনুপ্রাস কবিতার মধ্যে আলাদা এক স্বাদ নিয়ে হাজির হয়৷ ‘জল পতনের শব্দ’ কাব্যে এরকম অজস্র অনুপ্রাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যা এই কাব্যটিকে বিশেষ এক মাধুর্য দিয়েছে। কয়েকটা নমুনা দেখে আসি।

ধোপানীর ঘাট ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়, হায় প্রেম, হায় ভালোবাসা!
(মন বলে যাই ভাসানের দেশে)

আবার বর্ষা নামুক, ঘনঘোর আষাঢ়াষ্য বর্ষা
বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হেসে হেসে-
(আবার বর্ষা নামুক)

ঝুলে থাকে মৃত স্বপ্নের করোটি কালো কালো কপাল!
(এ নগর অন্ধকারের)

এছাড়াও কবি আসাদ উল্লাহর কবিতায় যমক ও শ্লেষের ব্যবহারও দেখা যায়। তবে কবি আসাদ উল্লাহ তার কবিতায় কবিতার কিছু আধুনিক কারিগরি ব্যবহার করেছেন। যেমন: একই বাক্যের পুনরুক্তি ব্যবহার। এই ধরনের পুনরুক্তি মূলত কাব্য কারিগরির অংশ। কবি আসাদ উল্লাহ তাঁর কবিতায় অনেক জায়গায় স্লোগানের মতো মূল অভিব্যক্তির পুনরাবৃত্তি করেছেন। এর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রিক ভাববস্তুর সঙ্গে সহগামী রূপে চয়িত কোনো ধ্রুবপদ বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হাজির করেছেন। তিনি উচ্চ-অনুচ্চ সকল মানবিক অনুভবকে একেবারে আটপৌরে যাপিত জীবনের ভাষায় বলার চেষ্টা করেছেন। এই শিল্প পশ্চিমা কবিদের থেকে সত্তুরের দশকের কবিদের ধার করা। তিনি এই শৈলি ও কারিগরিকে তাঁর কবিতায় নতুন মাত্রা দিয়েছেন। শৈলী ও কারিগরি রপ্ত করে তাকে ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপন করেছেন। একথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই শৈলি ও কারিগরি রপ্ত করেই বাংলা ভাষায় বেশ কিছু অমর কবিতা রচিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নাম আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী প্রমুখ। তাদের সারিতে নব্বই দশকের কবি আসাদ উল্লাহকেও রাখা যায় নির্দ্বিধায়। উদাহরণ দেখা যাক- ‘আটাশ বছর পর’ কবিতায় তিনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার ব্যবহার করেছেন ‘আটাশ বছর পর’।

‘আটাশ বছর পর বৃষ্টি হলো হঠাৎ
আটাশ বছর পর বৃষ্টিতে ফুটলো ফুল
ফুলের গোপনে লুকানো আগুন
কোথাও পড়ে আছে পোড়া ছাই
কোথাও নীল নীল ক্ষতের দাগ
আটাশ বছর পর বৃষ্টিতে ভিজলো এক নারী নির্জন পথে একা।’

কবি আসাদ উল্লাহ এর কবিতায় আরো একটি কারিগরি চোখে পড়ার মতো। তিনি তার কবিতার জার্নি বা সফরকে আরো বেশি আকষর্ণীয় ও চমকপ্রদ করতে, কখনো কখনো ফিরে গেছেন পূর্বতন কবি কিংবা ঐতিহ্যের কাছে। গ্রামীণ লোকজ জীবন এবং ঐতিহ্যের কাছে ঋণ করেছেন প্রাণবন্ত বাক্য কিংবা উক্তি। বহুল চর্চিত কবিতার বাণী কিংবা উক্তিকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন নতুন কোলাজে। ভিন্ন এক নাটকীয়তা তৈরির মাধ্যমে তিনি অধিকতর বেশি আমাদের সাথে কানেক্টেড হয়েছেন এসব উক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। এই ধরণের প্রকরণের ব্যবহার অনেকেই করছেন। কিন্তু সকলেই যে সফল হয়েছেন তা নয়। বরঞ্চ ব্যর্থদের তালিকা লম্বা হবে। কিন্তু জলপতনের শব্দ কাব্যে কবি আসাদ উল্লাহ সফলতার ফসল তুলেছেন। উদাহরণ দেখি আসি-

‘সুরবালা আমার কী না হইতে পারিত’
সুরবালা কিছুই হয়নি
একরাত্রির দুয়ার খুলে আহত অন্ধকারের বুকের ক্ষত
ডেটলে মুঁছে দেয় স্কুলের সেকেন্ড মাস্টার।
(এক রাত্রির সেকেন্ড মাস্টার)

কিংবা

নিদেন পক্ষে নক্সী-রুমাল উজ্জ্বল অক্ষরের দ্যুতি-
‘ভুলোনা আমায়’
(এক রাত্রির সেকেন্ড মাস্টার)

১০

কবিতা একটা সময়ের জার্নি বা সফর। তার আছে নিজস্ব গন্ডি। সে কোন না কোন ইজমের কথা বলে। তবে কবি ও কবিতার সৃষ্টিধারা কারো নিয়ন্ত্রণ মেনে চলে না। এজন্য সে বৈদগ্ধ্য বা এস্টাব্লিশমেন্টেরও ধার ধারে না। তাই কবিতায় যতবার ইজমের কথা আসে, দিনশেষে কবিতার রাজ্যে এসব অর্থহীন বুলি হিসেবে পরিগণিত হয়। আমরা যতোই আধুনিকতা, অনাধুনিকতা বা উত্তর-আধুনিকতার মতো শব্দ কবিতায় ব্যবহার করি; আপাত কবির সৃষ্টিজগতে তার কোন ভিত্তি বা মূল্য নেই। কবিতা অনুভূতির মাঝে প্রকাশ পায়, শৈল্পিক ক্যাথার্সিস ঘটিয়ে জন্ম নেয়। ফলে তাকে কোন ইজমে আটকিযে রাখা যায় না। এরপরেও কবির চৈতন্যে একটি শিল্পাদর্শ তো থাকেই, যা কবি থেকে কবিতে অর্থাৎ পরস্পর থেকে ভিন্ন। কবি আসাদ উল্লাহ সেসবে বিশ্বাস করেন না। তাঁর কবিতার জার্নি ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’। ফলে কোন রকমের ইজমের গ্যাঁড়াকলে ফেলা যাবে না ‘জল পতনের শব্দ’ কাব্যের কবিতাগুলোকে।

বলে রাখা ভালো, কবি সময়ের ধারাবাহিকতায় আধুনিকতার পরশে নিজেকে সাজিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন নতুনত্ব ও অভিনবত্বে। তাই বলাই যায় ‘আধুনিকতা’ শব্দটি সময়-নির্ভরতার বিচারে আপেক্ষিক। যুগে যুগে কালে কালে সব দেশেই এমনটি ঘটে। আধুনিকতার ক্ষেত্রে পরম বা চরম বলতে কিছু নেই। যেমন: রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়ের বিচারে আধুনিক। কাজী নজরুল ইসলামও তাই। আবার রবীন্দ্রবিরোধীদের ক্ষেত্রেও তাই। আধুনিক সাহিত্য, আধুনিক কবিতার চেহারা-চরিত্র পাল্টালেও ‘আধুনিকতা’ শব্দটি পাল্টায় না। সে যুগ থেকে যুগে আধুনিকতার শিরোপা ঠিকই ধরে রাখে, উত্তর-আধুনিকতার তত্ত্বও তাকে নির্বাসনে পাঠাতে পারেনা। একইরকমভাবে রোমান্টিকতা পেরিয়ে বস্তুবাদের প্রভাব সত্ত্বেও কবিতার ভুবন থেকে রোমান্টিকতার পরিপূর্ণ নির্বাসন কখনো ঘটেনি। কবিতার সূক্ষ্ম বিচারে এমনটিই দেখা যায়। কবিতায় সবচেয়ে বড় দ্বন্ধ বিষয় ও প্রকরণের দ্বন্ধ। এসব তাত্ত্বিক বিষয়। কবি আসাদ উল্লাহ তার ধার ধারেন না। তিনি কবিতা রচনার ব্রত নিয়েছেন। তাই পাত্তা দেন না এসব তাত্ত্বিক সমালোচনার। কবি মাত্রই আধুনিক। দিনশেষে এটাই চূড়ান্ত সত্য। কবি আসাদ উল্লাহ-ও তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর সৃষ্টি ‘জল পতনের শব্দ’ তাই আধুনিক কবিতার ঝান্ডা উড়িয়ে আমাদের মাঝে হাজির হয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সেই ঝান্ডা একজন মানবিক কবির বিজয়ের নিশান হয়েই পতপত করে উড়তে থাকবে বাংলা কবিতার অঙ্গনে।

শাহীন তাজ

জন্ম ২ জানুয়ারি, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। 
পেশায় কলেজ শিক্ষক। 
আগ্রহ কবিতা, গান, ছড়া ও কথা সাহিত্য। 

ওয়েবজিন সহজাতের উদ্যোক্তা ও নির্বাহী সম্পাদক। 

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ- 
আমার প্রথমা (২০১৪)

কবিতাগ্রন্থ- 
সেলাইকল (২০১৮) 
স্মৃতিগন্ধনগর (২০২০)

মোবাইল- ০১৮৭৮-৩৫৩৫৮৮
ইমেইল- mrshaheentaj@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: