ছফর আলী

পাড়ার দু-চারটি স্বচ্ছল পরিবারের মধ্যে ছফর আলীর পরিবারটি অন্যতম স্বচ্ছল পরিবার হিসেবেই পরিচিত। স্বচ্ছল হলে কি হবে, পরিবারটি শিক্ষার আলোহীন অশিক্ষিত এক পরিবার। তারপরেও আট ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে বারো সদস্যের পরিবারটি কখনো কোনো দুর্ভিক্ষের সময়ও একবেলা অনাহারে থেকেছে এমন প্রমাণ জন্মশত্রুও দিতে পারবে না। ছেলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অর্থের বিনিময়ে কাজের লোক দিয়ে কাজ করানোর প্রমাণও একেবারেই অল্প।

ধান ও তরিতরকারি চাষসহ গরু-ছাগল পালনই অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। ছফর আলীর সমস্ত শরীরে যেনো থোকা থোকা ক্রোধ। ক্রোধ আরো বেশি হতে পারতো যদি না হাতের কাছে থাকতো গরু-ছাগল ও সন্তান। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত ক্রোধগুলো কমিয়ে নেয় তাদেরকে প্রহার করে। একমাত্র ছোট ছেলে মানিক ব্যতীত অন্য সাত সন্তানের গায়ে রয়েছে প্রহারের অসংখ্য ক্ষত চিহ্ন। গরু ছাগলের গায়েও নেহায়েত কম নয়। ভিন্নতা শুধু স্ত্রীর বেলায়। প্রহারতো দূরের কথা জীবনে কোনোদিন স্ত্রীর সাথে চোখ রাঙিয়ে কথা বলেছে এমন প্রমাণও পাওয়া যায় না।

কাজের মানুষ কমে যাওয়ার ভয়ে বড় মেয়েটির বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে জেনেও না জানার ভান করে থাকে। এ বিষয়ে ছফর আলীর স্ত্রীও কোনো জোর আপত্তি তোলে না। কারণ, সে জানে স্বামী নামক নদীটির সকল বাঁক।

মাঝে মাঝে সম্মন্ধ আসে না তা নয়। কোনো না কোনো ভাবে বিয়ে ভেঙে দেয় ছফর আলী নিজেই। এই তো সেদিন সাত গ্রামের পরের গ্রাম থেকে সম্মন্ধ এসেছিলো। ছেলে নয় ক্লাশ পড়েছে। বাবা গ্রাম্য মাতাব্বর। ঘটক সাব ছেলে পক্ষ থেকে সাতজন নিয়ে এসেছে পাত্রী দেখানোর জন্য। ঘরের বারান্দায় বসতে দিয়েছে ছফর আলী। কিছুটা গালগল্প করার পর ছফর আলী বলে উঠলো, আগে ছেরি দেহানোর কামডা হাইরা হালাই পড়ে খাওয়াই। কি কইন?

ছেলের বাবা উত্তর করলো, সমস্যা নাই। যেই কামে আইছি হেই কাম আগে হারি। পড়ে খামুনি। মাতাব্বর সাহেব ছফর আলীর প্রস্তাবে রাজি হলো ঠিকই কিন্তু তার চোখ মুখ বলছিলো আগে খাবার চাই। যাইহোক, ছফর আলী মেয়েটাকে এনে সামনের চেয়ারে বসালো। লজ্জায় ঘোমটা টেনে বসে আছে মেয়ে ছালেহা। ছেলের বাবা বললো, মাথার কাপড়টা নামান। ছালেহার বড় ভাই মাথার কাপড়টা নামিয়ে দিলো। ঘটক এসে বললো, খাড়াওতো মা।

মেয়েটি দাঁড়াতেই ঘটক সাব শাড়ির আঁচল ধরে টান দিতেই পিছল শাড়ি কোমর পর্যন্ত পরে গেলো। মেয়েটি তাড়াহুড়ো করে শাড়িটি মাথা পর্যন্ত জড়িয়ে বসে পড়লো। ছফর আলীর অবশিষ্ট দাঁতগুলো যেনো ভেঙ্গে যাচ্ছিলো। নিজেকে সংযত করে বসে পড়লো ছফর আলী। ছেলের বাবা পাশের লোকের দিকে তাকিয়ে বললো, মেয়েতো মাশাল্লা অস্টেলিয়ান গাইয়ের বাছুর।

ছফর আলী হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়িয়ে ডান বাম তাকিয়ে বারান্দার কোনে রাখা গরু পেটানো লাঠি হাতে নিয়ে তেড়ে এলো তাদের দিকে।
ততক্ষণে ছেলে পক্ষ বুঝতে পেরে একেকজন একেক দিকে ছুটাছুটি শুরু করে দিলো। ছফর আলীর সামনে দিয়েই ছেলের বাবা দ্রুত গতিতে পালাচ্ছিলো, সুযোগ নিতে দেরি করলো না ছফর আলী। কষে একখান বারি দিলো পিছার মধ্যে এবং মুখে বললো, হালার ঘরের হালা, আমার বউ অস্টেলিয়ান তুই জানলি কেমনে? আমার বউ তুইলা কতা কইলি ক্যা? ঐ চুতমারানির পুলা।
দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিলো সাত জন যেনো দৌঁড়ের প্রতিযোগিতায় নামছে।

বিয়ের কথাতো দূরে থাক আর কোনো দিন কোনো অভিযোগ পর্যন্ত আসেনি ছফর আলীর বাড়িতে। সাত গ্রাম হেঁটে এসে না খেয়ে দৌঁড়ে পালানোর দৃশ্যটা সকলের চোখে আঠার মতো লেগে থাকলো। ছফর আলীর বৌ কাছে এসে বলে উঠলো, “এতো বাড়াবাড়ি করা বালো না, সম্মন্ধডা ভালই আছাল। এইটুকু কতার নিগা মানুষ এমুন করে?”

তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে ছফর আলী বললো, “তরে অস্টেলিয়ার গাই বানাইলো আর তুই কস এইটুকু কতা?”
স্ত্রী প্রতি উত্তর করলো, “মানুষ কতায় কতায় কতকিছু কয় তাই এমুন করা নাগবো?”
ছফর আলী বলে উঠলো, “আতের নাঠি কিন্তু ফালাইনাই। বৌ মারা কামডা বাহি আছে, বেশি কতা কবি অহনি কামডা কইরা হালামু।”

আর কোনো শব্দ না করে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো ছফর আলীর স্ত্রী। কেননা, সে ভালো করেই জানে তার স্বামী কথা মতোই কাজ করে।

মুজাহীদুল ইসলাম নাজিম

জন্ম - ১৯৮২ পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার শালদহ পাড়া গ্রামে।
বর্তমান ঠিকানা - বাউণ্ডারী রোড, ময়মনসিংহ।
সম্পাদনা - দশ মোহনা (যৌথ কাব্যগ্রন্থ) 
প্রকাশিত গ্রন্থ – পরিণতি, অতঃপর, কষ্টের জলছবি, বিশ্বাসের মরীচিকা, জীবনের খেরোখাতা (উপন্যাস)
এছাড়াও বিভিন্ন সময় ২৪টি যৌথ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা। 
ইমেইল - fahimmympublications@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: