কীর্তনিয়া ও জংলি জবা // বদরুজ্জামান আলমগীর

অন্তর্লোক

বানের জলে ভেসে গেছে মানুষ ও মহিষ
পানির নিচে মুখ লুকালো উত্তরীয়া সহিস।

কাজল ভোমরার মরমিয়া ধুয়ে গেল জলে
আমার বিধি ধূলায় মাখা হাওয়া ধরার কলে।

ভেসে ওঠে ঢেউয়ের আগায় নাম চিতলের পেট
বাথানের ঘ্রাণ স্তব্ধ পরাণ গবাদির সংকেত।

আমার কবর হারিয়ে যায় বানের জলে ভাসে
কেন চাহ দুধের বাটি শঙখচিলের কাছে?

ধরে রাখো আমার কবর চোখের অতল কোণে
আমিই তোমার সহিস ছিলাম উদাম গায়ের পণে।

আমার দেহ ডোবে ডোবে আব্বাসউদ্দিনের গান
আমার দেহ ভেসে ওঠে শাহ মখদুমের টান।।

কীর্তনিয়া ও জংলি জবা

ইলোরার মন্ত্রে যায় সংকীর্তনী পাখি
পাখা ঝাড়ে ঝড়জলে পানোখী নাকী!

সংসারীর গৃহে ঢোকে কী-যে সন্ন্যাস
ডুবসাঁতারে প্রতিকূল শঙখের আভাস।

মোরগ ধ্যানে পণ করে বায়োলজি বন
খুদকুড়া নাজিরশালে ফুলার্ত কানন।

মেন্দিপাতা সবুজাভ লাল তার গুণ
আদিঅন্ত মিলে যেথা ফুলব্রাইট মুন।

ঝিনুকের ঘরে ফোটে মেঘের প্রভা
সচকিত গোপনে বসে বৃক্ষ সভা।

নৃতত্ত্বের কড়ি কোমল জরি ভাবনায়
লতাপাতা তারাফল জংলি জবায়।।

সুন্দরের সুইসুতা

যা- কিছু সুন্দর, তা সবসময় কিছুটা ব্যথিত।

দিনান্তের সূর্য, শিশুর অনাবিল হাসি,গাছের খোঁপাখোলা চুলে হাওয়ার বিলোড়ন এতোটা চিত্তহর, কেননা তার মধ্যে চলে যাবার একটা পোঁচ লাগানো আছে; আকাশে নির্লিপ্ত গৃহীত চাঁদ কোন দিগন্তে ছড়িয়ে দেয় কেমন এক ছায়া- তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মনরে আমার! দা ভিঞ্চির মোনালিসা এতো মন টানে, কারণ আমরা দেওয়ালে টাঙানো মোনালিসার নামে আসলে দেখি ওই মোনালিসার আনন্দব্যথিত উৎকন্ঠাবিহ্বল ছবি যে চলে গ্যাছে দূর, বহুদূর!
কাঁচাপাকা ধানের গোছা বাতাসে হেলেদুলে তোলা ভরতনাট্যম কৃষকের চোখে এক সুতীব্র জঙ্গম সুন্দর, কেননা ওখানে প্রোথিত তার জীবন সংগ্রাম আর ধানের ন্যায্য দাম না পাবার আহাজারি ।
গাছের ডালে বসে থাকা একটা ময়না পাখি অপরূপ সুরের বর্ণেবর্ণেরচিত- খানিকক্ষণবাদেই সে উড়ে চলে যাবে দূর অজানার অসীমে।

জীবনের নানা কোটা আর পর্বের মধ্যে শৈশব সবচেয়ে রঙিন, যেহেতু সে চলে যায় দূরে ; বার্ধক্য আমাদের অতোটা টানে না- সে-যে চলে যায় তা দেখার সুযোগ আমরা পাই না।

যারাই নিজের হাতে ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করে তাদের সবার হাসি অসম্ভব সুন্দর।

যা-কিছু সুন্দর, তাতে সবসময়ই কিছু না কিছু ব্যথার পোঁচ লেগে থাকে!

একটি সুরের রেসিপি

কালো রঙের একটি সবুজ গাড়ি
কালো,অন্তর্লোকে সবুজ- দুই মিলে সহমরণের রঙ।
সকালে রাস্তায় বেরুবার মুখেই স্টপ সাইন
আগে থেকেই জানা ছিল বাঁয়ে যাবে
গাড়ি বাঁয়ে মোড় নেয়;
একব্লক পরেই মূল রাস্তায় এসে নামে।

রাস্তা বড়সড়, রাস্তা মার্টিন লুথার কিং
রাস্তা লাল সবুজ ও হলুদ বাতি
রাস্তা আই হেভ এ ড্রিম!

সবাই তো যায়, সব গাড়ি ছোটে
কালোরঙ সবুজ গাড়ি রাস্তার পাশে থামে,
৭৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় তার বুঝি স্যুয়েটার লাগে!

যাবার গন্তব্য ভুলে গ্যাছে না-কী!
ইউরেকা, ইউরেকা! কথা ছিল ঝিলপাড়ে যাবার
চোখের ভিতর স্টিফেন হকিং ছিল
আপেল বাড়ি পাবার- হুড়মুড় মাড়িয়ে যায়
লাল বাতিসব- পুলিশের নিষেধ- ভয়াল বাতি!

এতো আলো, নির্লিপ্ত মাকাল ফল-
রামদা’র তীক্ষ্ণতায় সুনসান বধির প্রাসাদ, তার
পা ঘেঁষে কতো লম্বা সড়ক,বাঈজির কোমরের বিছা শুকিয়ে যাওয়া সর্পিল বুড়িগঙ্গা নদী!

এপাশে ভ্যাম্পায়ার ওদিকে ড্রাকুলা
তাদের পাশ ঘেঁষে উপকথার খানে দজ্জাল!

জলদি যায়, জরুরি হাঁকায়- সময় তো নাই
আর ভাইরে; কৃষ্ণবর্ণ সবুজ গাড়ি হর্ণ বাজায়,
পাথর, পাথর অদৃশ্য পাথর- সরে না,
অদৃশ্য মনিব, মালিক, লর্ড- না সাদা, না কালো
না বাদামী, না নারী না পুরুষ!

সরে না।

গাড়ির মেইনটেনেন্স সাইন দেখায়!
ফলে রাস্তা ছেড়ে উইপিং উইলোর নিচে এসে থামে।
কেউ তো গাছে ঝাঁকি দেয় নি-
তা-ও মনে হয়, বোশেখ মাসে বুঝি জামগাছ থেকে
টপাটপ পাকা জাম পড়ে, জাম পড়ে বুঝি!
কিন্তু না, আসলে পড়ে উইলোর স্নেহ থেকে জল
জল,জল- টুপটাপ জলের ফোঁটা পড়ে!

নানুর হাতে বোনা স্যুয়েটারের নিচে
সময় কীভাবে এমন একচক্ষু দানব হলো?

কালোরঙ সবুজ গাড়ির ভিতর একটি মানুষ-
সে দানবকে দেখে না; দানব তাকে, তাহাকে, তাদের
সবাইকে দ্যাখে!

দেখা হোক, দেখা হোক,
অদৃশ্য, ভার্চুয়াল যা কিছু হোক- একটা দানবের
সাথে তবু দেখা হোক।

কালো গাড়ি, ধুলাপড়া ক্লান্ত বাহন এক
বড় সড়কে এসে পড়ে-
যেতে হবে দূর দানবের মুখোমুখি
সামনে খাড়া মার্সিডিজ, লেম্বারঘিনি-

মুভ!

কালোরঙ সবুজ আটপৌরে একটি গাড়ি,
স্নেহের আমপাতা: একটি ভাটিয়ালি,
হেলানো ভাওয়াইয়া গানের সুরের রেসিপি হাতে
অদৃশ্য দানবের সামনে দাঁড়াবে-

আই গডা গো, ফাকিং মুভ বিচ!

সঞ্জীব দাস

নীরবতা নীরবতা সঞ্জীব দাস,
ঘোড়াউত্রা খলবল ভাঙা রাজহাঁস।
হাওয়া থরোথর ওই কাল মহাকাল,
গাঙ বয় পায়ে পায়ে মায়ের কপাল।
বুক পেতে কেন হও নিরাশ নিরাশ,
নীরবতা নীরবতা সঞ্জীব দাস।

ঘোর লাগে মেঘে মেঘে চিতার পাশে,
দেবতা বরুণ নাচে পানির ত্রাসে।
ঘর ভাসে দোর ভাসে শাবাশ শাবাশ,
নীরবতা নীরবতা সঞ্জীব দাস।।

বদরুজ্জামান আলমগীর

জন্ম - ভাটি অঞ্চল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে। পড়াশোনা বাজিতপুরে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বহুদিন দেশের বাইরে- যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় থাকেন।
আগ্রহ – কবিতা, নাটক ও অনুবাদ।
বাঙলাদেশে নাটকের দল- গল্প থিয়েটার- এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; নাট্যপত্রের সম্পাদক। নানা পর্যায়ে আরও সম্পাদনা করেছেন- সমাজ ও রাজনীতি, দ্বিতীয়বার, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্ণপথিক, মর্মের বাণী শুনি, অখণ্ডিত।

প্যানসিলভেনিয়ায় কবিতার প্রতিষ্ঠান- সংবেদের বাগান-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

প্রকাশিত বই- 
আখ্যান নাট্য : নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে, আবের পাঙখা লৈয়া।
কবিতা : পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর, নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো, দূরত্বের সুফিয়ানা।
প্যারাবল : হৃদপেয়ারার সুবাস।
অনুদিত কবিতা : ঢেউগুলো যমজ বোন।
ছিন্নগদ্য : সঙ্গে প্রাণের খেলা।
প্রকাশিতব্য নিবন্ধ : আশ্চর্য বতুয়া শাক ও কাঁচা দুধের ডিসকোর্স।
ইমেইল- ecattor@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: