কাব্যজুয়াড়ি, রডোডেন্ড্রন, ধূম্রট্রেন

ডেথ এন্ড লাভ, এভরিথিং ইজ নাথিং

একটি অন্ধকার রুমে— তোমার ছায়া কাঁদছে; সায়ানাইড রাত্রির বিষণ্ন ব্যাকুলতায়। আমি তখন ঝরে পড়া নক্ষত্রের মতো, স্পর্শ করতে চাই— ঠোঁট; ঠোঁটের কাঙ্ক্ষিত বরফ। তুমি ফিরিয়ে দাও একটি উপড়ে পড়া
শিকড়বিহীন গাছ।

আমি তবু আঁকছি অশ্রু আর জীবন সহবাস।

মেঘের মাঝেও হাঁটছে প্রজাপতি।
হাঁটছো তুমিও।
প্রজাপতিদের নির্বিশেষ গান— স্বয়ং তোমাকেও, তোমাকেও চায়, পতিব্রতা।

আমি নদীটির গহ্বরে চলে যেতে চাই। কখনও বৃক্ষের শাখা। – কখনও যুবতীর অন্তরে, রাবিন্দ্রীক ভালোবাসা পেতে, প্রতিশ্রুতির মতো চলে যেতে চাই।

I could’ve died for love—
I might’ve sunk and died.

দার্শনিক আকাশ

পুস্তকবীথিকার দিকে একা – একা নীরবে নিঃশ্বাস ফেলার মতো আশ্চর্য চাঁদ, আমার এই ভগ্ন-রুক্ষ প্রাণ; আলোহীন তুমুল গ্রহদের অভিশাপে আক্ষরিক
প্রেম ম্রিয়মাণ হয়ে গ্যাছে।

অ্যাবস্ট্রাক্ট নয়নে তাঁর পাতা ঝরা দেখি—
বৃক্ষের শাখাগুলি কারা য্যানো ছিনিয়ে নেয়, দ্রৌপদীর
শাড়ি।— আরহান্ত পেতে হবে।—
অশ্বরথ থামাও— ভ্রান্ত-ভিক্ষু জীবন আমার।
বিশ্বচোখ হতে দূরে, তবু বায়ুভুক দার্শনিক আকাশ।

সমীরবিলাসী জীবন, এই দ্যাখো হারিয়ে যায়— চর্যাপদ ক্রোড়পত্রে।

অধিদৈবিক দুঃখেরা

পক্ষাঘাতগ্রস্ত সমস্ত প্রাণীরা লুপ্তপ্রায় বল্মীকস্তূপের ন্যায়, মহাজাগতিক লাস্যময়ীতার টানে অথর্ব আশ্চর্যে দ্রুত লুপ্ত হয়ে যাবে। — আমি আরও অবসাদ হয়ে পড়ি,— জেনে, মৃত পাখিটির ভাষায় বহুবিধ নির্লিপ্ততার মতো দেখি;
সেই ক্লিষ্ট-হৃত এক নিভৃত মৎস্যের বেদনায়
পৃথিবী ধীরে ঘাসের অস্তিত্ব নিয়ে
ক্ষীণ হয়ে যাবে।
আমার কাছে প্রীত অন্ধকারেরা নগ্ন ঈশ্বরীর ন্যায়, ঘিরে থাকে— কে জানে, অধিদৈবিক দুঃখেরা হয়তোবা সবিস্মৃত ঘাসেদের হৃদয় থেকে— ক্রমাগত নিজস্ব প্রীত তারকাদের খুঁজে নিবে।
খুঁজে নিবে বিষণ্ন হৃষ্ট কোনো প্রাণ।

সতত প্রেম নগ্ন স্ত্রোত্র রচনা করে

শায়িত বৃক্ষের স্ফীত অবস্থার মতো, অন্যান্য বিষণ্ন দিন,
অন্যান্য সামগ্রিক দৃশ্যাবলি
যা কিছু আমার নিকটস্থ প্রাণ; অথবা, হিপোক্রিট ক্রিয়াকলাপ
চলে যায় অতীক্রান্ত নদীর মতো।
সতত এই অস্থির বৃক্ষের কামিনী বসন্ত— আমি আর পাই না,
সতত প্রেম,— নগ্ন স্ত্রোত্র রচনা করে
সতত আমি, মৃত্যু স্ত্রোত্র রচনা করি।—
য্যামোন কুহক রচনা করে-ক্ষত-অন্যান্য সমূহ দ্বৈতকার্যের-ভাষা।
সতত, আমাকে কেউ ধীর স্থির করে, এই প্রেম স্ত্রোত্র থেকে।

মৌরির শাশ্বত গান

এ-সকল বিরহ তবু থাক; আপন আলয় পূর্ণ করা, কিছু মৃত গন্ধর্বের ডাক, তবু থাক— এ-সকল বিরহ তবু থাক।

য্যানো, পৃথিবীর বিরাট দর্শনকে আজ পেতে বসেছি।— বিরহের মাঝে সেই এক বিস্তীর্ণতা। ঘুমহীন জড়তা, নৈকট্যের অসহনীয় যাতনার পর, পৃথিবী মলিন হলো। কিছুতেই নেই পরম— অথচ পরম অভিরুচি।
মৌরির শাশ্বত গান, আর অকস্মাৎ কান্না,— প্রজাপতি শুনে চলে যায় তার সমুদ্রবাগানে।
এসব শুনি।

সবাইকে যদি প্রেম, ভালোবাসা সমানুপাতিক দেয়া যেত
তাহলে বড় ভালো হতো— ভালো হতো। প্রজাপতি বেঁচে যেত, মেনে নিতো— গ্রহণে সক্ষম আমিও।

এরূপ বিরহ ভালো না।
অন্যকিছু নেয়া যেতে পারে। সব অবসাদ,- সব দ্রোহের ’পরে যারা মোর আশ্রয় ছিলো, একবার তৃণফুলও – সব
থেকে দূরের হয়, দূর বুঝে নেয়া নক্ষত্রের অমিলন ছায়া।

কার্যকারণহীন, হস্তগত আহার্যে বালিকাকে পূর্ণ করি। নিবেদিত প্রেমকে রাতের অন্ধকারে পিপীলিকাশ্রেনীতে
নির্জন থেকে, বালিকাকে পূর্ণ করি— যে পায়নি কখনও চুম্বন আস্বাদন— হ্যাঁ, এ-কথা সতত, জেনে নাও— মৃত পাখি, তাকেই পূর্ণ করি।

তোমাকে পরম ঈর্ষা করি— প্রকৃতির এই অভাবগুলি—
বুঝি তবু। প্রাপ্তির আশায়, যদি অন্য করো আশ্রয়ে চলে যাও— যেতে পারো; তবু প্রিয় মহাসখী আমি এই অভাব বুঝি; তুমি থেকে গেলে বড় ভালো হতো। প্রাপ্তিহীন হয়ে আজীবন— আজীবন ভালোবেসে গেলে বড় ভালো হত।

আমি চলে যাই, নির্জন নিশীথের অন্ধকারে।- আমাকে ক্ষমা করো।

এ-সকল বিরহ তবু থাক; আপন আলয় পূর্ণ করা, কিছু মৃত গন্ধর্বের ডাক, তবু থাক— এ-সকল বিরহ তবু থাক।

কীর্তিমান পাখিরা

সতত সত্যময় কবিতা এই যে, কীর্তিমান পাখিরা ভালোবাসা পেতে গিয়ে চূর্ণ হয়; চূর্ণ চূর্ণ হয়। অথচ— যেসকল প্রাণীরা বিগত পৃথিবীতে ভালোবাসার
স্মৃতি বিদীর্ণতা রেখে গ্যাছে, পরিতৃপ্ত গ্রহীতার মত
যারা ভালোবেসে গ্যাছে, তারা একদিন— চূর্ণ হয়;
চূর্ণ চূর্ণ হয়। মাটিতে লুপ্ত হয়, সম্পূরক মনোভাবগুলি।

যৌনহাঁস— সেই পাখিগুলির মন রক্ষার্থে কখনও
নিজেকেই নিজের ভেতর চূর্ণ করে।— হেসে—
মদ্যপানের ভেতর ভাসিয়ে তোলে লুপ্ত আপেলের
ঘ্রাণ।

কুমারীবৃন্তের ভেতর,— আর কোনো আকাঙ্ক্ষা—
যদি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ফিরে যেতে পারে,— ফিরে
যেতে পারে যেখানে প্রয়োজন ছিলো না ফেরার;
সেই রিক্ত বেদনার ফল আমি গ্রহণ করি, আমাকে
ক্ষমা করো প্রিয়— এই এক মর্মাহত বাসনা।

মদ্যপান

চূর্ণ কাব্যের মাঝে থেকে গেছি দ্বিধাহীন— আশ্বস্ত আর ধৃত হয়ে, মদ্যপানের কথা, বোলে গ্যাছে, কোকিল; এইরূপ বেদনার রক্তের সাথে গান গেয়ে ওঠে অনাবৃত নারীটি।

বিপন্ন-বিদগ্ধ-মরাল

পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে জেগে উঠি, যা কিছু আজ রচিত হলো, ফলে দুঃখ-তমোরস গাঢ় অঙ্কুরের অপেক্ষায়
নীল— শব্দের রঙ দেখে, আজন্ম বেঁচে থাকা— যায়
নাকি?

কুমারীরা এই বিস্মৃত কথা-গান-আর-অস্তন্য-ফুল
হীন, নারকীয় যাতনার—পরিণাম হয়ে গ্যালো; হয়েই
গ্যালো তাদের বাঞ্ছনায় কাব্যকাহিনীর তিক্ত অসার
শরীর আমার।

প্রাণপনে চাই,— বাঁচিতে, সুখ-লাবণ্যহীন,— অজস্র
বিকল কুকুর, ঈগলের সহিত; পরিশ্রান্ত
কাগজের চিঠির সমাদর— সব হতো— যদি আজ— অকপোটে বোলে যেতো, কোনো দিনও জীর্ণ আর
বৃদ্ধ হবে না, এই অনুভব থেকে—
এমনই বিপন্ন আমি— বিদগ্ধ মরাল। অসার, কপোট
জীবন এক।

অবতীর্ণ জঙ্গল হতে

“Until
death— there is nothing enough || Buddha “

*
অবতীর্ণ জঙ্গল হতে, চলে আসছে চূর্ণ চূর্ণ মাছি।—
ওহে হযরত, তবে এই কী শেষ আমার বেঁচে থাকা?

*
আর লুকিয়ে রাখো ঝড়প্রবন্ধের অভিশাপ। কিছুই
তো আজ লেখা হলোনা। মর্ত্যের কীর্তিগুলো ধ্বসে
যাচ্ছে দ্যাখো।

কাব্যজুয়াড়ি, রডোডেন্ড্রন, ধূম্রট্রেন

বৃক্ষের সেক্সট্যুরে শুয়ে আছি; ও আমার স্বপ্নকাকাতুয়া এই দেখো,— রডোডেন্ড্রন আর ঝুলে থাকা গ্রন্থদেবতা মৃগভঙ্গিতে কথা বলছে তাঁরা। ভ্রম হয়ে রবো আমি। এ-আমার এ্যালিনেট আকাঙ্ক্ষা। ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়নায় আজ আমি সর্পপতঙ্গের মত হাওয়ায় উড়ছি। আর থামিও না তোমার ধূম্রট্রেন। গ্রন্থের মাল্যবান যা-ই বলুক না কেন, হেঁটে যাও যৌনভায়োলিন হাতে নিয়ে ব্যাবিলনের কোনো অপ্সরীর দিকে দিকে, শৃঙ্খল পথে যেন প্রেম হতে হারিও না আর।

‘বৌদ্ধ পাখিটির কাহিনী ফুঁড়ে কী দেখছো আজকাল?’

মৃত্যুপুস্তক থেকে আমার অনন্তে কে যেন কাব্যভাষায় কথা বলছে। মায়াশাস্ত্র একবার রচনা করেই আমি তবু হাওয়ায় বিলীন হওয়ার মতো— একটি ড্রাফ্টপ্রবন্ধে হারিয়ে যাবো।

‘প্রেমকে অব্যাখ্যায় ছুঁড়ে দিলে, তার উত্তর কী হবে?’

মশলাপতঙ্গের— বেদবাক্য শুনে হাসি। কেউ তো লিখে দিতে পারে না তোমার সন্নিকটে দাঁড়িয়েছে ধূম্রবিড়াল। সবকিছু এমন অনায়াসে বিশ্বাস করে নিলে, শ্যামগঞ্জিকা পথে টলতে—টলতে জানি দৌড়ে বেড়াবে স্বপ্নলাঞ্ছিত কুকুর।

তুই আর কথা বলিস নারে হাবা ঐশ্বর্য!— এই কামতীর্থ হতে আমি সব শিখে নিবো। ঝড়ে পড়া হাওয়া ও পতঙ্গ দিয়ে আমাদের কে যেন তৈরি করে দিয়ে গেল যৌনঘর।
এসব দেখে দেখে তোমার ক্রন্দনজঙ্গলে হাঁটি।
আমার আর চূর্ণ কোনো দুঃখ নেই, গৈরেয়েত্রী, এই লীন হয়ে যাওয়া যদি কোনোদিন পেয়ে বসি।

(উৎসর্গ: জন্মদিনে, কবি মজনু শাহকে।)

অনিমেষ প্রাচ্য

জন্ম: ভোলা, উত্তরদিঘলদী
পেশা: লেখালেখি
সম্পাদনা: ক্রোনিকল অব সুইসাইড মঙ্কস সহ, বেশকিছু পিডিএফ বই।
প্রকাশিত গ্রন্থ: ক্রোনিকল অব সুইসাইড মঙ্কস (PDF)
ইমেইল: animeshpraccho@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: