কলহ নিনাদ

‘কলহনিনাদ’ কবি সাগর শর্মার দ্বিতীয় বই। নামের ভেতর কলহ থাকলেও তার কবিতার বহিরাঙ্গে নেই কলহের ছিটেফোটা। বরং প্রেম প্রীতি ও ভালোবাসার গীতল স্পর্শে সাগর শর্মার কলহনিনাদ শেষ পর্যন্ত প্রেমের কাব্য হয়ে ধরা দেয়। প্রেম কবিতার প্রধান উপকরণ, তবে তার বিস্তিতি নারীতে থেমে না থেকে বিশ্বপ্রকৃতিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। একথা কবি স্বীকার করে নেন অকপট। তাইতো তিনি বলেন, ‘আমার কবিতার বেশির ভাগই প্রেমের কবিতা। এখানে যেমন নারীর সাথে প্রেম আছে তেমনি প্রকৃতির সাথেও নিবিড় প্রেমের একটা আলিঙ্গনে নিজেকে গাঁথতে চেয়েছি। তাই কবিতায়, সহজেই—নারী, নদী, পাখি, ঈশ্বর, মৃত্যু, কাম, সমুদ্র, পাহাড়, ঝরনার অবিকল একটা স্রোত এসে মিশে গেছে যেন। নদী, নারী, সমুদ্র-পাহাড়-পাখির ইত্যাকার কনটেক্সটগুলো কবিতায়ও নানাভাবেই এসেছে।’


কলহনিনাদের কবিতাগুলো —নারী, নদী, পাখি, ঈশ্বর, মৃত্যু, কাম, সমুদ্র, পাহাড়, ঝরনার অধিক মানবিকও। কারণ কবিতার প্রধান উপকরণ তো মানুষ। সাগর শর্মা সেই মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, টানাপোড়েন আঁকেন সুনিবিড় দক্ষতায়। মানব জীবনের চড়াই-উৎরাইয়ের বিম্বটাই কবি ধরতে চান তার কবিতায়। তখন তিনি বলতে পারেন, ‘কতটা ব্যর্থ হলে মানুষ, / কেঁদে ওঠে ভায়োলিনের অঝোর-বিষাদে! / প্রভুভক্ত কুকুরের মতো / জেগে আছি সতেরো বছর ধরে! / কার পাহারাদার হয়ে? জানি না কিছু তার।’ সাগর শর্মা কবিতায় এভাবেই সৃষ্টি করেন ইমেজ। কবিতা রচনা করতে গিয়ে একের পর এক ইমেজ সামনে তুলে ধরে দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজান। তার ভাষায় বললে, ‘কবিতায় আমি নির্দিষ্ট কোনো থিমকে মাথায় রেখে কবিতা লেখিনা! কবিতা চয়ন করতে গিয়ে যে থিমে কবিতা পড়ে যায় তাকে সেভাবেই গুরুত্ব দিই। এতে করে কবিতার যে একটা ইমেজ দাঁড় হয়, একটা দৃশ্যকল্প, চিত্রকল্পে নদীর আবহমান-বহমানতার দিকে দৃশ্যের পর দৃশ্য ধাবিত হতে দেখি… এবং এটাই আমার কবিতাকে সম্পূর্ণতা এনে দেয়।’

শাহীন তাজ
সম্পাদক, সহজাত

যাত্রা

এসো সন্ধ্যা, এসো—
এই নির্মীলিত স্তব্ধ অন্ধকারে
আমাদের অন্তহীন যাত্রার
পরিসমাপ্তি অবধি এসো

স্তব্ধ অন্ধকারে মাথা নিচু করে এসো—
সীমাহীন এই ধু-ধু দুঃখের
অবিনাশী বিন্যস্ত তারার উজ্জ্বল
আলোকচিত্র ধরে ধরে, এসো

এসো আরও গভীরের গুহাপথে—
আমাদের এই নশ্বর অভিযাত্রায়
যেখানে চিরটা-কাল মানুষ
মুখাপেক্ষী গুহামুখের—এসো

এসো সুন্দর, এসো—
যিশুর ক্রুশচিহ্ন ধরে, এসো
এসো এই অবিনশ্বর যাত্রায়
খানিক জিরিয়ে বোধিবৃক্ষতলে

ধ্যানস্থ করি নির্বাণতত্ত্বপাঠ
পুতঃ হয়ে পাঠ করি পাঁচ ওয়াক্ত
করি ‘তোমার’ নাম সংকীর্তন—

হেরা পর্বতে মাথা নিচু করে এসো
মাথা উঁচু করে এসো কৈলাশ পর্বতে
সিনা টানটান রেখে এসো হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে—

মাথা নত করলেই দেখো,
অহংকার চুরচুর ভেঙে পড়ছে!
দেখো, এভাবেই নত মস্তকের পাশে
একে একে ভেঙে পড়ছে ষড়রিপু!

তারপর তোমার চূড়ান্ত যাত্রা—
এ নশ্বর পৃথিবীতে…

মুনিয়া

এই নিশুতি রাতে—জানালার ধারে,
উড়ে আসে নিসিন্দা পাতার ঘ্রাণ…

রেলিংয়ে কথা কয়, কার সাথে একা—
এক মুনিয়া!

সুর তুলে শিস বাজায়—সে কি পাখি?
তারও কি রয়েছে গোপন সুর?
না বলা কথা—কোমল হৃদয়?
এই ভোরের আলোয়,
কোথায় সে উড়ে যায়—একা একা?

এমন আলস্য ঘুম শেষে,
তারে এড়াতে পারি না কিছুতেই—

সারাদিনমান গুনগুনিয়ে বাজে সে সুর!

বহুকাল আগে সেই সুর বয়ে যেত
বাঁকখালি নদীর হাওয়ায়—
তার কিছু স্রোত এখনও ভেসে আসে মনে;
আছড়ে পড়ে ভেঙে যায়—হৃদয়ের এপাড়-ওপাড়!

মানুষ-জীবন

মাঘীপূর্ণিমার রাত জানে,
কতটা বিতৃষ্ণার গ্লানি বয়ে বেড়াই আমি!

একটা ধূসর সাদা-কালো জীবন
মানুষ বয়ে বেড়ায় কার জন্য!
কার জন্যই-বা ফুটে ঐ সন্ধ্যামালতী!

নক্ষত্রখচিত রাতে—ধু-ধু নৈঃশব্দ্যে
কেন কেঁপে ওঠে হৃদয়ের গোপন আর্তনাদ!

কতটা ব্যর্থ হলে মানুষ,
কেঁদে ওঠে ভায়োলিনের অঝোর-বিষাদে!

প্রভুভক্ত কুকুরের মতো
জেগে আছি সতেরো বছর ধরে!
কার পাহারাদার হয়ে? জানি না কিছু তার।

কুকুর হলে বুঝতে,
কী অপরিসীম বেদনার এই মানুষ-জীবন!

ঝরাপাতা

এ রাঙা সন্ধ্যাবেলায়
মান্দারে ফুটে আছে মনখালি মাঠ—

বসন্ত কি জানে,
শাখার বিচ্ছেদে কতটুকু মর্মরিত ঝরাপাতা?

তবু পাতাকুড়ানি যত্নে তুলে নেয় সমস্ত মর্মর!

হে ঝরাপাতা, ঝরে পড়ার কালে
কেন এত বিভোর-রঙিন হয়ে উঠো?

পথের ধুলোয় পড়ে থাকা মান্দার
ভোরের শিশিরে স্নাত হলে,
পৃথিবীকে স্বর্গের গালিচা বলে ভ্রম হয়!
তখন বৃক্ষপত্রের শাখায়—
কুহু-কুহু রবের আর্তনাদে ফেটে পড়ে কোকিল!

কারে চায়, এমন ব্যাকুল হয়ে? ডাকে তুমুল!

সাইকেল

শৈশবের জংধরা সেই পুরোনো সাইকেল
বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ম্লান—
যে রোজ বেজে উঠতো পথে—ক্রিং ক্রিং ক্রিং…

লাউলতাগাছের ডগায় জড়িয়ে থাকার পরও
কতটা মর্মর পুরোনো সাইকেল!

পথ ফেলে চলে যায়—যেন পঙ্খীরাজ ডানা!
বাজে না কতদিন বিষণ্ন বেল—ক্রিং ক্রিং ক্রিং…

মনে পড়ে, সেই হেমন্তসন্ধ্যা
সেই ঘন-কুয়াশাকাতর, এলোমেলো রাস্তার মাতাল ঝাঁকুনি!

আহ্! ঘাড়ের নিচে উষ্ণশ্বাস—
কোমরে আলতো পরশ, এখনও লেগে আছে…

শুধু সাইকেলটি পড়ে আছে—
ম্লান, বিষণ্ন বারান্দার পাশে একা!

রাত

একটা শস্য দানার রাত
কী করে চোখের সম্মুখে
ফুটে উঠলো আচানক!

একটা ঘুঘুর ডাক, শুধু
উড়ে এলো একবার
তারপর সুনসান ডুবে গেল জলে—

জীবনের অবিমিশ্র এ অন্ধকার
তবু গেল না কিছুতেই!

ঢেউ

আকাশ স্তব্ধতা থেকেও নীল—

ডানা ভাঙা ময়ূর কাঁপছে ধীরে—একা;
বিস্মৃতির ভেতর নিভছে জোনাক
—এইমাত্র বৃষ্টি থামলো বন-মল্লিকায়!

এইসব ঘনসন্ধ্যা দ্রুত মিলিয়ে যায়
রাতের করিডোরে;
কিছু বিচ্ছিন্ন ঢেউ আছড়ে পড়ে কূলে
কেমন শিহরণ জাগায়!
হৃদয় মোচড়ে দিয়ে যায় হাওয়া—

ক্লাউন

হাঁসের শান্ত ডানার অবিকল
হাসছে কোথাও নম্র দুপুর!
অতি ধীর বয়ে চলা বায়ুর কুহক—

বটের বল্কলে বসে ঝিমায় ক্লান্ত ক্লাউন—
স্কুলফেরত বালক ক্লাউনের কানে
সুড়সুড়ি দিয়ে রোজ পালিয়ে যায়…

ক্লাউন কখনও স্কুলে পড়েনি—
তবু স্কুলফেরত বালকের কাছে
শিখে নেয় ছলবিদ্যা!

ভোর

ভোরের সান্নিধ্যে এসে
যে পাখি শিস দিয়ে ওঠে
দূরে—সমুদ্দুরে

সেই সুরারোপিত
কলহনিনাদ ঢেউ

ঘুম ভেঙে যাওয়া আচানক
সেই সুর—কী মধুর!

কলপাড়ে গতরে—ঢালে জল
নয়াযুবতী!

রজঃস্রাবে ধুয়ে দেবে
এই রাঙা ভোর!

সাগর শর্মা

সাগর শর্মা

জন্ম: ৪ জুন ১৯৮১, কক্সবাজার 
পেশা: উন্নয়ন কর্মী 

প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ: ঝাউপাতার ভায়োলিন (২০১৮)

প্রকাশিতব্য কবিতাগ্রন্থ: কলহনিনাদ (২০২১, বেহুলাবাংলা প্রকাশন)

ই-মেল:sagarsharma.cox@gmail.com

2 thoughts on “কলহ নিনাদ

  • Avatar
    April 5, 2021 at 10:23 am
    Permalink

    ভালো লাগলো কবিতাগুলো

    Reply
    • Sagar Sharma
      April 8, 2021 at 4:47 pm
      Permalink

      ধন্যবাদ, কবি।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *