কবিতা নিয়ে অপ্রিয় কথা

কবিতা নিয়ে আমি বরাবরই অপ্রিয় কথাই বলি। এইখানেও দুয়েকটা কথা বলার অবকাশ পেলাম তাই বলে রাখলাম। হয়ত নিজের জন্যেই বলা। কারণ আমি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পাই না।

কবিতার নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নাই। সুতরাং কবিতা কী কেউ জিজ্ঞেস করলে হয় প্রশ্নকারীকে বেকুব মনে হয়, নয়ত নিজেকে বেকুব মনে হয়। আমার কাছে কবিতাকে প্রতিদিন এক একটা কিছু মনে হয় যেমন ছোটোবেলায় আমার একবার কামরাঙা ফল খেতে খেতে বোধোদয় হলো এই ভেবে যে এই ফলের সঙ্গে যেহেতু কাম শব্দটা রাঙা হয়ে আছে ফলত এই ফলটাই একটা কবিতা। খেতে খেতে আমার খানিকটা লজ্জা লাগলো, আমিও ঈষৎ রাঙা হয়ে খানিকটা আড়ালে চলে গেলাম।

সুফি কবিগণ মূলত কবি নন, তারা মূলত সুফি। কবিতা তাদের কাছে পরমের সকাশে যাওয়ার একটা সুতামাত্র। আত্তার, তাবরিজি বা রুমি নিছক কবিতায় নিমজ্জিত ছিলেন না, কবিতাকে ব্যবহার করেছেন। সুতরাং তাদের কবিতাকে মূলস্রোতের কবিতার সঙ্গে ফেলে বিচার করা সমীচীন নয়। তারা নিছক কবিতা রচনার জন্যে কবিতা লিখেননি। তাদের কবিতা মূলত প্রার্থনার ভাষা। যে প্রার্থনায় আল্লাকে পাওয়া যায় বলে তারা মনে করতেন। আপনি যদি রুমির ৫ খণ্ড মসনবি বা আত্তারের মানতিকুত তোয়ায়ের পড়েন বিষয়টা বুঝতে পারবেন।

একার্থে জগতের সবই মায়া। মানুষ মূলত কিছুর জন্যে কবিতা লেখে না। খেয়ালে লেখে। মানে এমনি এমনি লেখে। তারপর তার উপর নানাবিধ কারণ আরোপিত হয়। একার্থে কবির চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারেন। কারণ কবিদের কোনো লক্ষ্য উদ্দেশ্য থাকে না। সুফিদের থাকে। সাংঘর্ষিক নয়, তবে একও নয়।

রুমি আর রবীন্দ্রনাথের কথাই ধরা যাক। রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্মদর্শন তাওহিদের কথাই বলে। রুমিরও তাই। মিল এইটুকুই। রুমির দর্শনে আর্ট হচ্ছে বাহন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের আর্টে দর্শন হলো বাহন। এটা কিন্তু ব্যাপক পার্থক্য।

কবিতা হয়ে উঠলে তো ভালোই। কিন্তু আপনি যদি কবিতায় বলে বসেন যে শ্রীকৃষ্ণের উপরে আর কেউ নাই বা যিশুই ত্রাতা, বা অমুকের লেজের পাওয়ার হচ্ছে ভুবনব্যাপী যেহেতু, সুতরাং তার লেজই চুষতে হবে। তাহলে সেইটা হচ্ছে একটা মিশনারি কাজ। ধর্মের মিশনারিদের ‘মিশনারি-আসন’ ছাড়া তাদের আর কিছুই কখনো কবিতা হয়ে ওঠে নাই। ধরেন, যিশু আর মেরি ম্যাগদালিনের প্রেম নিয়ে দারুণ কবিতা হতে পারে। সং অব সংস যেমন।

বিনয় মজুমদার খুব সম্ভবত ১৪/১৫ হাজার কবিতা লিখেছিলেন। আর ওইখান থেকে আমরা আমাদের কবিতার জন্যে ভুট্টা ছাড়া কিছু নিতে পারি নাই। সেই যে মুঠোর মধ্যে নিয়ে বসে আছি, আর ছাড়ি নাই। ভুট্টা তো আর লোহা নয়, লোহারও আছে সমূহ ক্ষয়।

বিয়াত্রিচকে দান্তে একটা বাজারে মনে হয় কয়েক চুমুক দেখেছিলেন। দান্তে ডিভাইন কমেডি বানিয়েছিলেন। গায়ত্রীও বিনয়ের কাছে তেমনই। আর কোনো কাহিনি নাই, পথিমধ্যে বা কোনো অনুষ্ঠানে কয়েক চুমুক দেখার বাহিরে। সেই গায়ত্রী হয়ে গেলো ঈশ্বরী। ঠিকই আছে, বিয়াত্রিচ বা গায়ত্রী দুজনেই মূলত কবির সরস্বতী ছাড়া আর কিছু নয়।

কবির ধ্যান আর সন্ন্যাসীর ধ্যানের মধ্যে ভেদ বেশ দীর্ঘ। কবি নির্বিশেষ হতে পারেন না, তাই তিনি কবি। সন্ন্যাসীকে নির্বিশেষ হয়ে যেতে হয় অনেকটা।

‘তুমি আমার মুক্তি হয়ে এলে বাঁধনরূপে…’। বাঁধন হলো সংসার, বাঁধন মানে শৃঙ্খলা এইখানে। এইখানে তিনি স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারিতার ভেদ টেনেছেন। শৃঙ্খলার বাঁধন কবি বা সন্ন্যাসী, সবার আছে। সেই বাঁধন আছে বলেই মুক্তি আছে। তবে সন্ন্যাস আর সংসারের শৃঙ্খলার মধ্যেও ভেদ আছে। সংসারের শৃঙ্খলা সন্ন্যাসের শৃঙ্খলার চেয়ে কঠিন। কিন্তু সংসারই সকলে মেনে নিতে চায়—সন্ন্যাসের শৃঙ্খলাকে নিতে চায় না। মানুষ তো আসলে সর্বংসহা নয়। সংসারের শৃঙ্খলা না বুঝেই মানুষ সংসার গ্রহণ করে। আর সন্ন্যাস সবাই গ্রহণ করলে প্রকৃতির যে শৃঙ্খলা সেইটে ব্যাহত হবে। সন্ন্যাস গ্রহণের দরকারও নেই সকলের। সংসারের শৃঙ্খলা নিয়েই শেষের কবিতায় স্বপ্ন আঁকা হয়েছিল। সেই স্বপ্ন রবিনাথ সফল করতে দেন নাই। সেটা সফল হলে তো সংসারেরও সমাধান হয়ে গেল। স্বপ্নকে স্বপের ভিতর রেখেই দিয়েই সংসারকে নিরন্তর করে গেলেন।

রবিনাথ একই সঙ্গে সংসারী ও সন্ন্যাসী ছিলেন। সংসার আর সন্ন্যাসের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন। তিনি খানিকটা পেরেছিলেন। তার এই পারার পেছনে অনেক সহায়ক শক্তি ছিল। তার মধ্যে একটা হচ্ছে পিতৃভক্তি ও ভয়। তবে আসল সহায়ক ছিল তাঁর মুক্তি আর সুন্দরের ক্ষুধা, দুটো একসঙ্গে থাকা। মানুষ যদি একটা পর্যায়ে চলে যায় সৃজনশীল কর্মের কারণে তখন তার ব্যক্তিগত ছোটখাটো ভুল-ভ্রান্তি ঢেকে যায় এবং গৌণ হয়ে পড়ে। সুতরাং রবিনাথের ব্যক্তিগত জীবন আমরা ততোটাই জানি যতটা তিনি জানাতে চেয়েছেন। আর সবটা জানা গুরুত্বপূর্ণও নয়।

৮.

কবিতা মূলত দুই প্রকার। বানানো কবিতা আর স্বতঃস্ফূর্ত কবিতা। বানানো কবিতার মধ্যে পরিকল্পিত কবিতা, নিবেদিত কবিতা ইত্যাদি। সবই কিন্তু কবিতা। এমন কবিতা পৃথিবীকে অনেক লেখা হয়েছে, হচ্ছে, আগামীতেও হবে।

অনেকে আছেন নিয়ম করে প্রতিদিন কবিতা লিখতে বসেন। দৃশ্যের পর দৃশ্য বুনে চলেন। বানানো কবিতা বোঝার উপায় হলো এই জাতীয় কবিতায় অনেক ডেকোরেশন থাকে। সুন্দর বিন্যাস থাকে, কাহিনি থাকে। পৃথিবীতে অনেক বড় বড় কবি বানিয়ে বানিয়ে কবিতা লিখেছেন। যেমন জসীম উদদীনের অনেক কবিতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও অনেক বানানো কবিতা আছে যেমন বিদায় অভিশাপ ইত্যাদি। কিংবা কোলরিজের রাইম অব অ্যানশিয়েন্ট মেরিনার।

আর স্বতঃস্ফূর্ত কবিতাও পড়লেই বোঝা যেমন নজরুল বা জীবনদাশের বেশিরভাগ কবিতা। ব্যাপার হচ্ছে একটা ঘোর থেকে বের হয়, অন্যটা অয়োজন করে তৈরি হয়। কোনোটাই ফেলনা নয়। সবই কবিতা। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমাকে টানে স্বতঃস্ফূর্ত কবিতা। যেইটার একলাইন ঠাস করে মাথার ভিতর আসে। সেই লাইনের নির্যাসরূপে পরবর্তী শব্দদল কলকল করে ক্ষরিত হয়।

যেইসব কবিতা হঠাৎ-সময়ের প্রতিক্রিয়া থেকে তাৎক্ষণিক লেখা হয় সেইসময়টা পার হয়ে গেলে সেইসব কবিতার রস শুকিয়ে যায় ধীরে ধীরে। ফলে অনেকদিন মানে অনেক বছর পর সেইখান থেকে চিপে রস বের করতে হলে কবিতার তলায় ফুটা করতে হয় মানে ফুটনোট দিয়ে আবার প্রকট করতে হয় পাঠকসকাশে।

যেইসব কবিতা কোনো দলের উদ্দেশে বা তাদের রুহরঞ্জনের জন্যে লেখা হয় সেইসব কবিতা সেই দলের মাঝারে বা তাদের ঘিরে যে-বাউন্ডারি তার ভিতরই চক্রমিত হয় কিছুদিন, তার বাহিরে যেতে পারে না কখনোই।

ধরা যাক, জীবনদাশের ‘হাওয়ার রাত’ বা অ্যালান পোর ‘দ্য র‌্যাভেন’। এই জাতীয় কবিতা কিন্তু চিরদিনই পড়া যায়। মানে ইহাদের রস সকল সময় বর্তমান থাকে। এই জাতীয় কবিতাই বাউন্ডারিলেস কবিতা। দশদিগন্তে এই জাতীয় কবিতার কোনো বাউন্ডারি নাই। দেশ-কাল-পাত্রের উর্ধ্বে গিয়ে এই জাতীয় কবিতা রচিত হয়।

৯.

কবি অরুণ বসু তার সম্পাদিত ছোট কাগজ অজ্ঞাতবাস, জানুয়ারি ১৯৭৬ সালে, ১৬ নম্বর সংকলনের সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, ‘আমরা দুঃখিত, যাঁরা যেকোনো পুরস্কারের গন্ধ পেলেই উলঙ্গ হয়ে ছুটে যান, তাদের প্রতি। আমরা দুঃখিত, যেহেতু যেকোনো পুরস্কারই জানি দুর্ভিসন্ধিমূলক। হায়! এই সমস্ত নষ্ট, পচা-গলা, গোলমেলে পুরস্কার-প্রথার পোঁদে লাথি মেরে, কবে যে লেখকেরা দুঃসাহসী যুবকের মতো বলে উঠবে—’অ্যাই শূয়ার, আমি কি তোর পুরস্কার প্রত্যাশী?…’ ইত্যাদি।

অরুণ বসু সম্পর্কে একটুখানি না বলে পারছি না, তিনি সেই দুঃসাহসী কবি, যুবক বয়সের একটা পর্যায়ে যিনি তার পূর্বের লেখা সকল পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ছাই করে ফেলেছিলেন। তারপর বিরতি দিয়ে আবার লেখালেখি শুরু করেছিলেন।

১০

ইশকুলে থাকতে কোনো কবিতা ভালো লাগলে সেই কবিতার অনুকরণে একই তালে আর ছন্দে, একদম মাত্রা গুনে আরেকটা কবিতা লিখতাম। সাধু ভাষা হলে সাধু ভাষায়, চলিত হলে চলিত। তখন বাংলা দ্বিতীয়পত্রে প্রতিশব্দ নামে একটা ব্যাপার ছিলো। ধরে ধরে প্রতিশব্দ মুখস্থ করতাম। ধরা যাক মেঘ। মেঘের কয়টা প্রতিশব্দ আছে যথা মেঘ, অভ্র, জলদ, বারিদ, জলধর, নীরদ, ঘন, জীমূত, অম্বুবাহী, পয়োধর, পয়োদ, বারিবাহ, অম্বুধর, কাদম্বিনী, নীরধর ইত্যাদি। তখনকার কবিতায় ভারি ভারি সব প্রতিশব্দ ব্যবহার করতাম। এবং লেখার পর নিজেকে খুবই রূপবান মনে হতো। নিজের কবিতাকে মনে হতো খুবই রূপবতী। মনে মনে নিজের পিঠের পেখমে হাত বুলিয়ে নিজেকেই বাহবা দিতাম। আহা কী সুন্দর লিখতে পারি আমি! তখন এইভাবে জীবনদাশ, নজরুল, শামসুর রাহমান, হেলাল হাফিজ, পুর্ণেন্দু পত্রী, তারাপদ রায়, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, সুনীল এমন অনেকের কবিতাই সাবাড় করে দিয়েছিলাম।

কলেজে উঠে সেইসব কবিতা ছিঁড়েটিরে ফেলে দিতে থাকি। লজ্জা লাগে। ছি! এইসব কী লিখেছিলাম, আমি তো কাক, ময়ূরপেখম পরলেও কাক। আমাকে তো আমার স্বরেই ডাকতে হবে কা কা কা কা…। তারপর নিজের স্বরে কিছুকাল ডাকাডাকি রপ্ত করার চেষ্টা নিলাম কা কা কা কা….। কিন্তু কাকা সাড়া দিলো না। কাকু হয়েই রইলো। এখন ভাবি আমার কবিতাকাল মূলত বয়ঃসন্ধির আনরেস্ট টাইমের মতো, পাহাড়পর্বতকে যেইসময় মাঠপ্রান্তর মনে হয়, পেয়ারা দেখলে কুমারীস্তনের কথা মনে হয়।

ইদানীং মাঝে মাঝে যখন আমাদের কতিপয় কবিকে দেখি সেই ইশকুলপর্বের মতো প্রিয় কবিতার অনুকরণে কবিতা লিখে নাম কামাতে বা পোস্ট করতে তখন আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি মনে পড়ে যায়।

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

জন্ম - ২৪ আগস্ট ১৯৮১, চকরিয়া, কক্সবাজার, বাংলাদেশ। 
আগ্রহ - লেখালেখি, ছবি আঁকা 
পড়াশোনা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলা স্নাতকোত্তর
বইয়ের সংখ্যা: ১৬ টি। 

প্রকাশিত বই:
পাখি ও পাপ (২০১১, কবিতা) 
শোনো, এইখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয় (২০১১, মুক্তগদ্য) 
ডুবোজ্বর (২০১২, গল্প) 
কাপালিকের চোখের রং (২০১৩, কবিতা) 
পুরুষপাখি (২০১৪, মুক্তগদ্য) 
আরজ আলী : আলো-আঁধারির পরিব্রাজক (২০১৫, প্রব›ধ) 
মহিষের হাসি (২০১৫, কবিতা) 
রাজহাঁস যেভাবে মাছ হয় (২০১৬, গল্প) 
আকাশ ফুরিয়ে যায় (২০১৭, মুক্তগদ্য) 
হুহুপাখি আমার প্রাণরাক্ষস (২০১৭, কবিতা) 
উদ্ভিদ ও বৃন্দাবনী (২০১৯, কবিতা)
কুসুমকুমার (২০১৯, মুক্তগদ্য)
ফুলের অসুখ (২০২০, গল্প)
কবিতালেখকের জার্নাল (২০২০, মুক্তগদ্য) 
আমি ও গেওর্গে আব্বাস (২০২০, মুক্তগদ্য) 
বনভাঙা গান (২০২১, স্মৃতি-আখ্যান)

ইমেইল - nirzharnoishabdya@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: