কপালের কৌতুক – শোয়াইব শাহরিয়ার

কবিতা হচ্ছে অনুভূতির শিল্পিত প্রকাশ। কবি অক্ষরের খোদাই লিপিতে যাপিত জীবনের অনুভূতিকে সম্বল করে মনুমেন্ট গড়েন। সেই মনুমেন্টে কবি নিজেকে রাখেন উহ্য, কিন্তু তার বিস্তার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখেন সর্বত্র। এটিই হয়তো কবি সত্তা। থাকেন বাস্তবতায়, নিজেকে বিস্তার করেন ভাবের জগতে। সৃজনের খেলায় মাতেন ভেতরে বাহিরে।

শোয়াইব শাহরিয়ার বয়সে তরুণ। একুশের মেলায় আসতে যাচ্ছে তার প্রথম কবিতার বই। কিন্তু পান্ডুলিপির কবিতায় কবি সত্তার বিস্তার লক্ষ্য করলে ধরা পড়বে তার প্রভাব জাগানিয়া বিচরণ। সংযত উপস্থিতিতে শোয়াইব শাহরিয়ার সমৃদ্ধ আগামীর জানান দিচ্ছেন সন্তর্পণে।

সম্ভাবনা আছে, লক্ষ্য আছে- গন্তব্যের পথ বহুদূর। তাতে কী? যে লক্ষ্য জানে, যার নিজস্ব চলৎশক্তি আছে, তাকে কে রুখবে? শোয়াইবের পথ মসৃণ হোক, উজ্জ্বল হোক কবিতা যাত্রা। শুভকামনা রইলো।

-শাহীন তাজ
সম্পাদক, সহজাত ওয়েবজিন

উপাখ্যান

দেখি আশ্চর্য এক সাঁকো। টগবগে জল নিচে। তবুও যাই সন্তর্পণে। যেন পথহারা মাছের বাচ্চা! যেন আগুনে ঝলসে যাওয়া…

শহরে পরিযায়ী পাখির মতো আসে
বনচারী হাওয়া; সবুজাভ হয়ে। সুদীর্ঘ ছায়া নিয়ে—আটকে যায় আয়ু।

…হাতের দশ আঙুলে লিখে যাই কপালের কৌতুক।

বোধ

কুয়াশার চাদরে ঢুকে যাচ্ছে নদী। নদীর ভেতর ঢুকে যাচ্ছে দেহ। দেহের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে নারী। নারীর ভেতর ঢুকে যাচ্ছে পুরুষ। পুরুষের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে লোভ।

একটু ভেবে দেখো— তোমার কারণে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি তুমি নিজেও শেষ হয়ে যাচ্ছো। পুরুষ, ভাবো। তুমি বরং ভাবতে শেখো। তুমি বরং ভালোবাসতে শেখো।

তুমি আজ—
এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে জ্বালাও মোমের আগুন
ভালোবাসা হয়ে গলতে গলতে পৃথিবী হবে বৈষম্যহীন।

অভিলাষ

হৃদয় ছাড়া ছুঁয়ে দাও আপাদমস্তক; হৃদয় ছুঁতে গেলে—
আগুনমাখা অবহেলারা গোগ্রাসে গিলবে তোমায়।
…আগুনে পুড়তে চাও?
বাড়িয়ে দাও উড়নচণ্ডী দুটি হাত, স্পর্শ করো তন্দ্রালু শরীর;
তোমার স্পর্শে গলতে থাকবে সফেদ হিমালয়।
শহরে নেমে আসবে বেরসিক বন্যা!
বানের জলে হাবুডুবু খেতে খেতে অবশেষে পৌঁছে যাবো—
তোমার বুকে প্রবাহিত নদীতে।

আমার আজন্ম অভিলাষ—
ভালোবাসার জলে নিঃশ্বাস নিতে নিতে যেন মৃত্যু হয়।

চাহিদা

যেতে বললে যাবো। তার আগে একবার তোমায় ছুঁয়ে দেবো। তার আগে একবার তোমার শহরে বৃষ্টি নামাবো। শুষ্ক মাঠে জন্মাবে ফল আর ফুল। সৌরভে তুমি পাগল হয়ে উঠবে।

বলো, এই জন্মে আমরা ভালোবাসা ছাড়া আর কী-বা চাইতে পারি?

মিলনলিপি
এক.

জান্নাত ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে তোমার আততায়ী স্তন।
জুয়ার আসর ডিঙিয়ে—
পাখির চোখ নিয়ে এগিয়ে আসছে ভিসুভিয়াস।

দুই.

হাওয়ার ঠোঁটে চড়ে–
পৌছে যাচ্ছি এন্টার্কটিকায়।

তিন.

একটা মহাদেশ। চারদিকে সাদা কোমলের পাহাড়।
আমরা সামনাসামনি
তারপর—
তোমার স্পর্শে জ্বলে উঠলো জনপদ।
বরফগলা সাগরে তলিয়ে গেলো পৃথিবী।

চার.

তবুও দাঁড়িয়ে….
একে-অপরের ভেতর
হাওয়ার উপর ভর দিয়ে, শূন্যে…

কল্পলতা
এক.

ভালোবেসে কেটে দিয়েছিলাম আঙুল, তুমি চুষতে চুষতে এমন করলে যে দাঁড়াতেও পারছি না! —বিরাজ করছে শূন্যতা। তার পাশেই বয়ে চলেছে একটি অন্তঃসারশূন্য নদী জাহাজের প্রতীক্ষায়…

দুই.

ঠোঁটের অবিনাশী স্পর্শে—জলভরা কলস তোমার উড়ছে আকাশে…আর শুনি, ট্রেনের শব্দ। —গ্রহণ করো হৃদয়, ট্রেনের শব্দে উড়ছে যৌবন; বুকের ভেতর গড়ে উঠছে ভালোবাসার সমাধি!

ভ্রমণ

আজানের মধুর সুর শুনে শুনে—
আমার আপাদমস্তক দেখে ফেললেন, আরমিন।
দুর্ভাগ্য, কেবল হৃদয় দেখেননি!

এই একটি ভুলের জন্যে—
আপনার চিরায়ত প্রেমিকা মনটি ভালোবাসাহীন মরে যাবে বেমালুম!
আরমিন, তবু কোনো দুঃখ নেই।
আপনার প্রতিটি স্পর্শ—
জান্নাতের প্রতিটি দরজা খুলে দিয়েছে!

কোনো একদিন—
আপনাকে জান্নাতে নিয়ে যাবো,
অনন্তকাল সাঁতার কাটবো একে-অপরের ভেতর।

ছারপোকার সংসারে

দূরে, কোথাও কোনো মেঘ দেখলে
দৌড়ে যাই
যেন বৃষ্টি হবে
যেন মুহূর্তের উল্লাসে—
সংসার ভরে উঠবে প্রেমে;
দৌড়ে যাই
দৌড়ে দৌড়ে যাই
দৌড়াতে দৌড়াতে গাছের নিচে থামি
গাছের নিচে ছায়া
গাছের নিচে স্মৃতি
শুনি করুণ আর্তনাদ
—দেখি দুটি হাত
নিয়ে যাচ্ছে
ছারপোকার সংসারে;
ক্রমশ আড়াল হই
দেখি, কোথাও কোনো মেঘ নাই
দেখি, কোথাও কোনো বৃষ্টি নাই
দেখি, কোথাও কোনো অভ্যুত্থান নাই
এদিকে—
মানুষ পালাচ্ছে
সংসার ছেড়ে
ছায়ার দিকে;
ছায়ায় ভীষণ
বিলাসী বৃষ্টিপাত
ছায়ায় ভীষণ
মুহূর্তের অভ্যুত্থান
সবাই দৌড়াচ্ছে
দৌড়াতে দৌড়াতে
ছায়ার আশ্রয়ে—
মানুষ হাসছে
কেবলি হাসছে
কবরের ভেতর!

আর আমি?
ছারপোকার সংসারে…

প্রবেশ

রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান প্রয়োজন;
ফৌজিয়া,
সরাও ধর্মের পোশাক;
রোদ হয়ে ঢুকে পড়বো আমার কাবায়!

জলধারা

কালো একটি ছায়া রক্তিম কুণ্ডলী আঁকে
জলজ পাখিগুলো রক্তগর্ভা হয়ে উড়ে যায়
বিষণ্ণতার ড্রিংক্সে পতিত্ব
বুকের ভেতর বয়ে যায় অমীমাংসিত সুন্দরী।

নিম্নবিত্ততা গ্রাস করে নিচ্ছে পরম সৌভাগ্যগুলি
মাঝপথে থেমে যায় ট্রেন, আধমরা কঙ্কালসার
ভোর আসে আর বলে—”কেমন আছেন?”

…তারপর কালো একটি ছায়া আলিঙ্গন করে
কালো একটি ট্রেন এসে—
নিয়ে যায় ফুরাতের প্রকাণ্ড বালুচরে।

পানি…পানি… বলে চিৎকার করি।
জলজ রূপসী এনে দেয় জলধারা;

…চুমু দেই, দেখি ফৌজিয়ার বিষণ্ণ স্তন!

স্পর্শ

জলের উপর ধূসর রঙে ভাসে সবুজ দ্বীপ
অলকের আঘাতে বাজে করুণ ভায়োলিন
স্মৃতির ঘোলাটে জলে প্রেমের পরাগ মাখি;
আর চুপিসারে বলি—হে সবুজ দ্বীপের জলকল্লোল,
তোমার স্পর্শে গলে যাচ্ছে জান্নাতের বাহাত্তর রমণী!

শোয়াইব শাহরিয়ার

শোয়াইব শাহরিয়ার
২৮শে এপ্রিল, ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার অন্তর্গত পূর্ব ইলশা গ্রামে জন্ম।
পেশায় ছাত্র। আগ্রহ কবিতায়।
প্রকাশিতব্য কবিতাগ্রন্থ – কপালের কৌতুক (২০২১)
ইমেইল - shoaibshahriar99@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: