ঐতিহ্যের পরম্পরায় মুক্তাগাছার মন্ডা

ভোজনপ্রিয় মানুষের পছন্দেরে খাবারের তালিকায় প্রধান স্থান দখল করে আছে বিভিন্ন ধরণের মিষ্টান্ন। এসব মিষ্টান্নে মিশে আছে আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, কিংবদন্তি ও উপকথা। স্বাদে সুস্বাদু, রসে টসটসে, দেখতে আকর্ষণীয় এসব মিষ্টান্ন দেখলেই জিবে জল আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি মিষ্টান্নের বিভিন্ন প্রকারভেদ তৈরির উপাদান, প্রক্রিয়া এবং পরিবেশনের বৈচিত্র্যে মুগ্ধ করে ভোজনরসিককেদর। মিষ্টান্নের স্বাদের ভিন্নতা এবং তৈরির প্রক্রিয়া, ঐতিহ্যের কারণে একেক মিষ্টান্ন একেক এলাকায় জনপ্রিয়। তবে রসনার গুণ ও মানে মুক্তাগাছার মন্ডা সবার থেকে যোজন যোজন এগিয়ে। যে কারণে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার নাম নিলেই চলে আসে মণ্ডার কথা। এখানকার মণ্ডার সুখ্যাতি শোনেননি, এমন মানুষ বোধ হয় কম পাওয়া যাবে। একারণেই এই এলাকায় ভ্রমণরত মানুষ মণ্ডার নাম শুনে কিনতে দেরি করেন না একমুহূর্ত। মন্ডার খ্যাতি এবং স্বাদের কারণে এই মন্ডার কথা শুনলেই যে কারো জিভে জল এসে যায় নিমেষে।

মন্ডার কিংবদন্তি

মুক্তাগাছার মন্ডার আবিষ্কারক গোপাল পালের এ মন্ডা দেশের সীমানা পেরিয়ে ভোজন রসিকদের হাত ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে নিজের অবস্থানের শীর্ষে ধরে রেখেছে। কিংবদন্তি এ মন্ডার সঙ্গে বর্তমানে জড়িয়ে আছে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার ইতিহাস। মুক্তাগাছার জমিদারি ইতিহাসের সাথে মন্ডার কিংবদন্তি যুক্ত হয়ে এ এলাকাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। প্রায় ২শ বছর ধরে মাথা উঁচু করে আপন অবস্থানে থেকে স্বাদে গুণেমানে সমৃদ্ধ এ মন্ডা আজও কদর ধরে রেখেছে। বিয়ে, জন্মদিন, আকিকা, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা যেকোন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে মুক্তাগাছার মন্ডা ছাড়া পূর্ণতা আসে না। প্রসিদ্ধ এই মিষ্টান্নের কদর রয়েছে সব বয়সী মানুষের কাছে।

মুক্তাগাছার ঐতিহ্যবাহী মন্ডা আসলে এক প্রকার সন্দেশ। এটি দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে অত্যন্ত গোপন এক প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়। মন্ডা যারা তৈরি করেন কেবল সেই কারিগররাই জানেন এর স্বাদের রহস্য। জানা যায়, প্রায় ২শ বছর আগে এই মন্ডার আবিস্কারক রাম গোপাল পাল ওরফে গোপাল পাল এ মন্ডা প্রস্তুত করেন। তিনি মূলত জমিদার পরিবারকে তুষ্ট করার জন্য অত্যন্ত সুস্বাদু এই মন্ডা তৈরি করেন।

সেই সময়ের মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীকে সেই মন্ডা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। মহারাজা সূর্যকান্ত মিষ্টান্ন খেয়ে এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেই থেকেই তার প্রিয় খাবার এই মন্ডা। আর খ্যাতি ও সুস্বাদের কথা প্রচারিত হলে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও বেড়ে যায় এর চাহিদা। তবে সে এক লম্বা ইতিহাস।

ময়মনসিংহ জেলা শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে মুক্তাগাছার পৌর শহরে জমিদার বাড়ির কাছেই পূর্ব দিকে রাম গোপাল পাল ওরফে গোপাল চন্দ্র পালের মন্ডার দোকান। জানা যায় ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে গোপাল পাল এই মন্ডা তৈরি করেছিলেন। মন্ডা তৈরির এই অলৌকিক কিংবদন্তি কাহিনী এখনো লোকমুখে ঘুরে ফিরে। এ বিষয়ে গোপাল পালের মন্ডার দোকানের বর্তমান মালিক, গোপাল পালের পঞ্চম বংশধর শ্রী রবীন্দ্র নাথ পাল সত্যতা স্বীকার করে জানান, মন্ডা তৈরির পেছনে রয়েছে অলৌকিক ঘটনা। মন্ডার স্বাপ্নিক গোপাল পাল খুবই ঈশ্বর ভক্ত ছিলেন। পরপর কয়েক রাতে স্বপ্নে এক সন্ন্যাসী তাকে মন্ডা তৈরির পদ্ধতি শেখান। সেই সন্ন্যাসী তাকে বলেন, ‘কাল থেকে তুই (গোপাল পাল) মন্ডা বানানো শুরু কর।’ পরে ওই সন্ন্যাসীর নির্দেশে মন্ডা তৈরি শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটে। মন্ডা তৈরি পর দেখলেন স্বপ্নে দেখা সেই সন্ন্যাসী সশরীরে উপস্থিত হয়ে মন্ডা তৈরির উনুনে হাত বুলাচ্ছেন। তখন সন্ন্যাসীকে ভক্তি করায় সঙ্গে সঙ্গে গোপালের মাথায় হাত রেখে বলেন, তোর হাতের মন্ডা মিঠাই একদিন জগত বিখ্যাত হবে। এ আশীর্বাদ করে সন্ন্যাসী অদৃশ্য হয়ে যায়।’

সেই সময়ের জমিদারদের খুবই পছন্দের মিষ্টান্ন ছিল এ মন্ডা। তাদের হাত ধরে ক্রমশ উপমহাদেশের সবখানে ছড়িয়ে পড়ে এ মন্ডার খ্যাতি। দেশ-বিদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ মুক্তাগাছার মন্ডা খেয়েছেন। এ মন্ডা খেয়ে তৎকালীন রাজা-জমিদাররা নানাভাবে গোপাল পালকে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত করেছেন।

মন্ডার ইতিহাসে ঐতিহ্যের পরম্পরা

মুক্তাগাছার মন্ডার ইতিহাস নিয়ে মন্ডার দোকানে একটি পুস্তিকা রয়েছে। এই পুস্তিকা থেকে জানা যায়, মুক্তাগাছার মন্ডার স্বাপ্নিক গোপাল চন্দ্র পাল ১৭৯৯ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘ ১০৮ বছর ইহলোকে থেকে মারা গেছেন ১৯০৭ সালে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর পালিয়ে গোপাল পালের বাবা রামরাম পাল ও তার বাবা শিবরাম পাল মুর্শিদাবাদ ছেড়ে মালদহ হয়ে রাজশাহী আসেন। এরপর চলে আসেন মুক্তাগাছার তারাটি গ্রামে। গোপাল পালের মৃত্যুর পর তার ছেলে রাধানাথ পাল, রাধানাথের ছেলে কেদার নাথ পাল, কেদার নাথের ছেলে দ্বারিকনাথ পাল এবং দ্বারিকনাথের ছেলে রমেন্দ্র নাথ পাল এবং তার ভাইয়েরা মন্ডা তৈরি করে বিক্রি করছেন। রমেন্দ্র নাথ পাল মৃত্যুবরণ করায় তার ছোট ভাই হিসেবে শ্রী রবীন্দ্র নাথ পাল এবং তার ভাইয়েরা মন্ডার দোকানের তত্বাবধানে রয়েছেন। মন্ডার দোকানটি ১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গোপাল পাল। এরপর কেটে গেছে প্রায় ২০০ বছর। মণ্ডা তৈরির ব্যবসা চলছে বংশানুক্রমে। এক পুরুষ থেকে আরেক পুরুষে। সে হিসাবে এখন পঞ্চম পুরুষের ব্যবসা চলছে। রবীন্দ্রনাথ পাল স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘মণ্ডা তৈরির আসল রেসিপিটা আমাদের পারিবারিক। গোপনীয় এই কৌশলটা শুধু আমরাই জানি। এটি আমাদের পরিবারের বাইরে আর কারো জানা সম্ভব না। ফলে মণ্ডার নামে এখানে-সেখানে যা বিক্রি হয়, তা কোনোভাবেই আসল রেসিপির তৈরি না। ময়মনসিংহ, ঢাকাসহ দেশের কোথাও আমাদের কোনো শাখা, এজেন্ট, শোরুম, বিক্রয়কেন্দ্র বা বিক্রয় প্রতিনিধি নেই। আসল মণ্ডার স্বাদ পেতে হলে আমাদের কাছে মুক্তাগাছায় আসতে হবে। শুধুমাত্র আমাদের এই দোকানেই পাবেন আসল মন্ডা।

উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সেতার বাদক ও সুর সম্রাট ওস্তাদ আলা উদ্দিন খাঁ, বিখ্যাত চিকিৎসক ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ ব্যাক্তিদেরকে মুক্তাগাছার জমিদার বাড়িতে আপ্যায়ন করা হয়েছিল এই মণ্ডা দিয়ে। মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত মহারাজপুত্র শশিকান্ত আচার্য চৌধুরীর রাশিয়ার জোসেফ স্তালিনকে মণ্ডা পাঠালে তিনি মুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করেন। এবং পাকিস্তানের কুখ্যাত আইয়ুব খান একে ‘পূর্ব পাকিস্তানকা মেওয়া’ বলতেন।

আবদুল হামিদ খান ভাসানী মণ্ডার স্বাদে বিমুগ্ধ হয়ে তিনি চীনের মাও সে-তুং এর জন্যও নিয়ে গিয়েছিলেন। মাও-সে-তুং এর স্বাদের প্রশংসা করেন।সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও এর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধী, দ্বিতীয় এলিজাবেথকেও এই মণ্ডা দিয়ে আপ্যায়ন করেছিলেন।তারাও মন্ডার প্রশংসা করেছিলেন। সাবেক সেনা শাসক জিয়াউর রহমান, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও কামাল হোসেন এর প্রিয় খাবারের তালিকায় ছিলো মণ্ডা।

মন্ডার দোকানে রাখা পরিদর্শন বইয়ে বিভিন্ন সময় দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভূয়সী প্রশংসা ও স্বাক্ষর রয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কমিশনার শ্রীমতি বীনা সিকরী ২০০৬ সালের ৯ এপ্রিল মুক্তাগাছা এসে দোকান পরিদর্শন করে মন্ডার ভূয়সী প্রশংসা করে পরিদর্শন বইয়ে মন্তব্য লিখে যান। এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর হুয়াদু ২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মন্ডার দোকান পরিদর্শনে এসে মন্ডা খেয়ে তৃপ্তি লাভ করে দোকানের পরিদর্শন বইয়ে মন্তব্য লিখে যান।

মন্ডা নিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও ঘটে মজার ঘটনা। নবম জাতীয় সংসদের তৎকালীন মাননীয় স্পীকার ও বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ ২০০৯ সালের ১৭ জুন সংসদে মজা করে মুক্তাগাছার স্থানীয় সংসদ সদস্য খালিদ বাবুকে মুক্তাগাছার মন্ডা খাওয়ানোর কথা বলেন। খালিদ বাবু পরদিন তিনি ৭২০টি মন্ডা নিয়ে হাজির হন। মাগরিবের নামাজের বিরতির আগে মাননীয় স্পীকার অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ সাংসদদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যগণ, মুক্তাগাছার মন্ডা এসে গেছে, সরকারি ও বিরোধী দলের লবিতে দেওয়া আছে। তবে দুটির বেশি কেউ খাবেন না।’

মন্ডার দাম ও প্রাপ্তিস্থান

মুক্তাগাছার মন্ডা ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। এটির আদি ও আসল রেসিপি মুক্তাগাছার উৎপত্তিস্থান ছাড়া দেশের আর কোথাও পাওয়া যায় না। দেশের আর কোথাও এ প্রতিষ্ঠানের কোন শোরুম নেই। এখানে চিনির মন্ডা প্রতি পিস ২৫ টাকা ও প্রতি কেজি ৫৬০ টাকা এবং গুড়ের মন্ডা প্রতি পিস ৩০টাকা ও প্রতি কেজি ৬৬০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।

মন্ডার বর্তমানে মুক্তাগাছা ও ময়মনসিংহে অনেকেই এই মন্ডা তৈরি করছেন। মন্ডার খ্যাতি ছড়িয়ে গেছে দেশ-বিদেশে। তাই ভীড় করেই কিনতে হয় গোপাল পালের মন্ডা। গোপাল পাল না থাকলেও তার মন্ডা আজও জয় করে যাচ্ছে মিষ্টান্ন প্রেমিক হাজার হাজার মানুষের মন। তার এই কীর্তি প্রজন্ম পরম্পরা চলতে থাকুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

শাহীন তাজ

জন্ম ২ জানুয়ারি, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। 
পেশায় কলেজ শিক্ষক। 
আগ্রহ কবিতা, গান, ছড়া ও কথা সাহিত্য। 

ওয়েবজিন সহজাতের উদ্যোক্তা ও নির্বাহী সম্পাদক। 

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ- 
আমার প্রথমা (২০১৪)

কবিতাগ্রন্থ- 
সেলাইকল (২০১৮) 
স্মৃতিগন্ধনগর (২০২০)

মোবাইল- ০১৮৭৮-৩৫৩৫৮৮
ইমেইল- mrshaheentaj@gmail.com 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: