অসাড়লিপি

যখন গানের মধ্যে ঈশ্বর তৈরি হচ্ছিল তখন কল্পনা কিসে ভয় পেত? যখন আমাদের ফসলে ও খামারে মড়ক, তখন কোথায় ছিল কল্পনা? যখন প্রতিটা সুরের উৎসে ছিল তাড়না, সমস্ত দেবদারু ও সুপারির, চৈত্র বাতাস লেগে, আকাশের দিকে বেড়ে ওঠাকে মনে হত ঈশ্বরপ্রকাশ, তখন আমাদের কল্পনা কোন দিকে বাঁকছিল? আমরা তৈরি করে নিচ্ছিলাম আমাদের মত স্বদেশ, আমাদের মত বিভাজন রেখা বরাবর তৈরি হচ্ছিল সাংকেতিক ব্যকরণ, আমরা বুঝতে শিখছিলাম বাংলা আসলে আমাদের। মানে আমরা যারা পালাগান, আমরা যারা তাঁতি ও ধীবর — রাজার ভাষার সঙ্গে দূরত্ব ছিল ঠিক বিশ্বাসের সঙ্গে নদীর যতটা। কবে থেকে রাজার লোক আমাদের ভাষা বলতে শুরু করল? কেন জিভের মধ্যে মিশতে শুরু করল বালি? আমরা যারা মুখে জোনাকির আলো নিয়ে গান রচনা করেছি, আমরা যারা জ্যোৎস্নার নদীতটে মিশিয়ে দিয়েছি তাঁতের নকশা, তারা তো বাতাস বোনা রাজশিল্পীদের থেকে দূরে ছিলাম — তবে কেন গান পুড়ে যায়? কেন সুর শুধুমাত্র ঈশ্বরকল্পনায় মাতে বারবার? আমাদের শরীর থেকে ছাই গিলে নদী কেন বারবার ফুলে উঠে গিলে নেয় গ্রাম? মুখের শব্দ যখন কেবল স্মৃতি, বলার মত শুধু কয়েকটা বাজার — তখন আমাদের সামনে হাতির মত উঁচু হয়ে উঠেছিল ধর্ম যাকে ব্যাকরণ বলে জেনেছি; যতিচিহ্ন তৈরি হয়েছে মন্দির বা মসজিদের আদলে, এখন তাকে কি উপড়ে ফেলা যাবে?

ভাষা রক্ষা করে যাও, ভাষা ও সৌন্দর্য নিয়ে ভেবে যাও, সুন্দরের শরীর জুড়ে টানটান মেলে রাখো ঘরে ফেরার অনন্ত রাস্তা — তার বেশি নয়

লেখো তোমার ভাষার আরোপিত ব্যাকরণ আসলে শাসকের আরোপিত ধর্মের বিরুদ্ধে নিজেদের ধর্মের চোরাগোপ্তা ছুরি। লিখোনা বর্জনের শতাব্দিগুলো, কীভাবে তারা জমিয়ে রাখছিল প্রতিহিংসার পুরনো ছুরি। পরপর মুখের কথাগুলো অভিধান থেকে কেটে বাদ দেওয়া। পরপর সাদা টুকরো উড়ছে বৃষ্টি আসার আগের হাওয়ায়, পাখিদের দুর্বল পায়ে ভর দিয়ে ছাপ রাখছে কাদায়। প্রতিক্রিয়ার পর প্রতিক্রিয়া। ক্রিয়া ও বিশেষ্য। তোমার শুকনো কবিতা ভরে উঠুক বিশেষণে।

মাটি পায়ে চলার ভিজে ছাপ অথচ কোথাও কোনও চইচই শোনা যাচ্ছে না, সুরের আবহে এই বুঝি তোমার ঘরে দপ করে জ্বলে উঠবে হংসধ্বনি — জলের দাগ মিল্যে যাবে না এমন আদ্রতা, এই মধ্যে জ্বলে উঠবে সন্ধে, যাবতীয় সান্ধ্য মাঙ্গলিকতা > কোথাও কি নিজের বাইরে কল্পনা করা যায়? এই তারিখ উপচে পড়া বছরে কল্পনা কতটা গুরুত্ব রাখে?

সমস্ত রাগ ও বন্দিশ ভরে আছে রক্তের ছিটেয়
সমস্ত রাস্তা ও পাথর নির্দেশিত ঘরে ফেরা
রক্ত ও ভিনভাষা
চলন ও অভ্যাসে
সম্পূর্ণ অন্য ভাষা মিশে যায়
শুরু হয়ে যায় মিলন সন্ধান
শুরু হয়ে যায় যুবতির কলহাস্যের মত
ব্যাকরণ মিলিয়ে দেখতে চাওয়া
কল্পনার নির্মাণে বড় হয়ে ওঠে
ভাষা পরিবার নামক মাইল ফলক

আর এভাবেই পরপর হাসি শুরু হয় আমাদের
শুকনো এপ্রিলের জঙ্গলে
ভিজে ভাষা পরিবারের শ্রাবণে
মেঘ-টকটকে সূর্যাস্তের কম্পমান ধুলোয়
মিশে যেতে থাকে আমাদের মেয়েদের অকারণ হাসির পর্দা
মিলে যায় বৃষ্টি-রঙা পুরাতন হৃদয়ে
কেন চাইবো না আমরা সিনেমায় নাচা-গানা চলতেই থাকুক?
কেন চাইবো না আমরা দমবন্ধ করা পরিবেশে
ক্রমাগত অপচয়ের ঘাম জমে উঠুক সমস্ত প্রার্থনায়?
প্রার্থনা কী?

আমাদের ক্রমশ অ্যাসিডের ঝাপটা লাগা হাজার বছরের অস্তিত্ব হাত-পা মেললো একটা কাল্পনিক চারিত্র্যে — যাকে কৃষ্ণ বলে ডেকেছি আমরা সেটাই প্রার্থনা! ধাপে ধাপে নির্মিত হল নতুন কল্পনা যাকে ব্রজবুলি বলে ডাকা। ধাপের গায়ে চিহ্নিত হল অন্য প্রভাবের ভয় খাড়া হল দেয়ালের কথা, অধর্ম বোঝার ছাঁকনি ব্যাকরণ!

তুমি বলছো নিজের কথা, তুমি দেখেছো কীভাবে কুমারী বুকে ফুটে ওঠা দুধের শিহরণ তোমাকে টেনেছে, তুমি জানো কীভাবে যৌনতাহীন বিবাহ বাক্যের গঠন বদলে দেয়। তুমি জানো কী সম্ভাবনা থেকে তোমার বা তোমাদের ভাষায় প্রেম বলতে শুধু পরকীয়া!

যাত্রাটা ধ্বংসের ভিতর দিয়েই হোক
যে শরীর নিদ্রাসর্বস্ব, বাকপটু
যে শরীর শোক ও কাতরতা
কোথাও কোনও কোষের অকষ্মাত ফুলে ওঠা

আমরা খুঁজে চলি নতুন ভাষার সম্ভাবনা
অথচ আমল দিইনা কখন বৈষ্ণবের কোটরের ওম
বদলে গেছে তান্ত্রিকের হ্রিং-এ

আমরা অভ্যাসের সামনে বলি মুক্তি হোক
বলি আবহাওয়া দপ্তরের সামনে উল্টে যাক
সমস্ত শুষ্কতার পূর্বাভাস
বলি লোদি বাগানের গায়ে ফিরে আসুক ১৪ শতক
বলি আমার আদি গঙ্গা ফের নাদ্য হয়ে যাক
স্পষ্ট এক আলা হয়ে উঠুক তার নৌ-চলাচল

সূর্যাস্তের চাপে ধেবড়ে গেছে রং
তবুও চেনা যাচ্ছে আমার চাহিদা
কোথাও বাড়ি নেই শুধু রং —
চাপা গঁদরঙা পাড়া
নিঃশ্বাস ও আকাশ ভরা ফসল
চকিতে লিখে ফেলা যায় এমন উড়ানে
ভর করে পাখি-কর্কশ কিছু দিন
তোমার শরীর বলে কিছু নেই শুধু মন
কুসুমের মত কিছু উপমায় নতুন ভাষা
একটা সাদা দেওয়াল তার গায়ে প্রতিবিম্বিত

পোস্টারগুলো উপড়ে আসছিল যেভাবে সমস্ত পুরনো দলিল> প্লাস্টার রং বদলানো> “অল ওয়াল” তারপর লেখা রাজনৈতিক দলের নাম যা বদলে যায় সরকার বদলাতে পারলে। তুমি জানো কবিতায় এসব কথা লেখা অনর্থক। সেখানে সমগ্রতার অর্থ নিঃশ্বাসের অভাব, যেখানে অন্ধকার এক স্থায়ী মানচিত্র। সেখানেই সাদা অক্ষরের একটা অক্ষ তৈরি হয়, তুমি তাতে ভয় করে ঘুরপাক খাও শহরান্তরে। তার প্রতিবিম্বময় দীর্ঘ জলাশয়ে সব পথ খালি হয়ে হয়ে গেছে। সব চৌকিদার শীতাপ্লুত। পরপর উঁচু হয়ে উঠছে অক্ষ। শব্দ তৈরি হচ্ছে আর ভাষাহীনতায় ভোগা অভিধান জড়ো হচ্ছে। অক্ষ জাপটে ধরে সত্যের জয় হবে মার্কা হিন্দি সিনেমা ছড়িয়ে যাচ্ছে, গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে রঙিন গানের টুকরো। আমাদের মাথার নাম বিচ্ছিন্ন স্বদেশ। এইখানে ঘর হিসেবে জেগে ওঠা গানের দিকে ছুটে যাচ্ছে সবাই। ফসলহীন মাঠগুলো জুড়ে পড়ে থাকছে অসমাপ্ত নাচের টুকরো। তাদের কুড়িয়ে নেবার নামই হোক, আচমকা রোদ ঝলসে ওঠা পৌষ ও বিশ্বাস।

প্রতিটা সূর্য ওঠায় তুমি খুঁজে নিয়েছো ইউরোপের শান্তি। প্রতিটা সূর্যাস্তে তুমি চিহ্নিত করেছো ফার্সি কারুকাজ। ধুলো ও প্রান্তর ঘেঁষে জেগে উঠেছে গবাদি পশুর মত ঘরে ফেরা।

বিশ্বাস শুধু শান্ত হতে শেখায়। এই প্রতিনিয়ত উদাস ভিন্তার দেশে অসাড়ের ছিন্ন ভিন্ন রশ্মি বুকের ভিতর পাঠিয়ে দেবার আকুলতায় জন্ম হয় শুধু নতুন রকমের শান্ত হতে শেখা। যে গাছ নিষ্পত্র গোধূলির গায়ে সিল্যুয়েৎ তৈরি করছে তার শিকড়ে গিয়ে ছটফটানি পুঁতে আসো তুমি আর বিবাহবার্ষিকিহীন নারী-পুরুষের দীর্ঘ ছায়া সন্নিকটস্থ জলাশয়ে বিকেলকে আরও বেশি ছায়াময় করে তোলে। তুমি শান্ত হতে থাকো, তুমি শান্ততর হতে শেখো বিশ্বাসের এই উদাত্ত জঙ্গলে।

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম ১৯৭৮, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতায়।
কবি, স্প্যানিশ ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষক। 
প্রকাশিত বই: বাংলায় প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। 
ইউরোপের স্পেন থেকেও তাঁর তিনটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে।
সম্মাননা: বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার এবং মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কার। ইউরোপের স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব, মেহিকোর গুয়াদালাহারা বইমেলা ও স্পেনে এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিটসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে। অংশ নিয়েছেন Poetry connections India-Wales প্রকল্পে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: