অভিন্ন সময়ে ভিন্ন উপস্থাপন : কবি জীবনানন্দ দাশ ও কবি জসীম উদ্‌দীন

উল্লিখিত দু’জনই প্রায় একই সময়ের জাতক। একজন ১৮৯৯ সালে; আরেকজন জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৩ সালে। জন্মস্থান-পাশাপাশি জেলা : জীবনানন্দ দাশের জেলা বরিশাল এবং জসীম উদ্‌দীনের জেলা ফরিদপুর। দু’জনই পেশাগত জীবনে অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দু’জনেরই নামের আদ্যক্ষর র্বোগো ‘জ’। অন্যদিকে-জীবনানন্দ ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২১ সালে। জসীম উদ্‌দীন একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩১ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম এ ডিগ্রি লাভ করেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল, নিকানো উঠোনে অভিষেক হলো উভয়েরই ১৯২৭ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। কাব্যগ্রন্থের নাম-যথাক্রমে ঝরাপালক (জীবনানন্দ দাশ), রাখালী (জসীম উদদীন) যে বছর তাঁদের সাহিত্যে অভিষেক হলো- সে বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন রবীন্দ্র সমসাময়িক লেখক- ফ্রান্সের দার্শনিক লেখক নামে খ্যাত আঁবি বার্গাস (১৮৫৯-১৯৪১)। এ বছরেই উল্লেখ করার মতো আরেকটি ঘটনা ঘটে তা হলো-ঢাকা থেকে বুদ্ধদেব বসু ও অজিতকুমার দত্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রগতি’। যা কল্লোল (১৯২৩) পত্রিকার ন্যায় সাহিত্য-আঙিনায় বেশ আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছিল।

অপরদিকে দুই কবির প্রকাশিত দুটি গ্রন্থেরই বিশেষত্ব হলো-নাম দুটি শহুরে নয়; গ্রামীণ এবং ইতঃপূর্বে প্রকাশিত উত্তররৈবিক কাব্যগ্রন্থের নাম থেকে প্রকাশ্য পার্থক্য নিয়ে উপস্থিত। কিন্তু ঝরাপালক যেন নগরগন্ধী পল্লিভাবালুতায় কাতর নাম আর রাখালী আগাগোড়াই পল্লিগন্ধী মেঠো নাম। উল্লেখ করার বিষয় হচ্ছে-একজনের বেড়ে ওঠা পূর্ববঙ্গে-সর্বশেষ স্থিতি পশ্চিমবঙ্গে; আরেকজন পূর্ববঙ্গে বেড়ে উঠলেও উত্থানপর্বে পশ্চিমবঙ্গের আনুকূল্যপুষ্ট-সর্বশেষ আমৃত্যু স্থিতি পূর্ববঙ্গে। ঝরাপালক লিখে জীবনানন্দ রবীন্দ্রনাথের নিকট এককপি পাঠিয়েছিলেন-তাঁর প্রতিক্রিয়া জানার মানসে। প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ জানালেন তিরস্কারমিশ্রিত আশীর্বচন: ‘কল্যাণীয়েষু, তোমার কবিত্বশক্তি আছে তাতে সন্দেহমাত্র নাই। কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারি নে। কাব্যের মুদ্রাদোষটা ওস্তাদীকে পরিহাসিত করে। বড়ো জাতের রচনার মধ্যে একটা শান্তি আছে, যেখানে তার ব্যাঘাত দেখি সেখানে স্থায়িত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জন্মে। জোর দেখানো যে জোরের প্রমাণ তা নয় বরঞ্চ উলটো। ইতি, শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ আর জসীমউদ্দীন আত্মবয়ানে এ বিষয়ে লিখেন তাঁর-‘রবীন্দ্র-স্মৃতি’ প্রবন্ধে এভাবে : […] সালাম জানাইয়া কম্পিতহস্তে আমি ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ আর ‘রাখালী’ পুস্তক দুইখানি কবিকে উপহার দিলাম। কবি বই দুইখানি নাড়িয়া চাড়িয়া আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে তুমি বাংলাদেশের চাষী মুসলমানদের বিষয়ে লিখেছ। তোমার বই আমি পড়ব।’ […] ইহার দুই-তিন দিন পরে দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের মধ্যম ছেলে অধ্যাপক অরুণ সেন আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘তুমি কবিকে বই দিয়ে এসেছিলে। আজ দুপুরে আমাদের সামনে কবি অনেকক্ষণ ধরে তোমার কবিতার প্রশংসা করলেন। এমন উচ্ছ্বসিতভাবে কারো প্রশংসা করতে কবিকে কমই দেখা যায়। […]

কবিদ্বয় উৎসর্গপত্রেও ভিন্নতার স্বাক্ষর রাখলেন। জীবনানন্দ দাশ অতিমাত্রায় রোমান্টিক ভাবাবেগে কিছুটা কম্পিত, শঙ্কিত এবং রহস্যময়তার আশ্রয় নিলেন; লিখলেন- ‘কল্যাণীয়াসুকে’। কে এই কল্যাণীয়াসু তা খোঁজতে এবং পাঠকের গোচরিভূত হতে সময় লেগেছে বেশ। জসীমউদ্দীন অবশ্য রাখঢাকহীনভাবে গুরুর চরণে তাঁর উৎসর্গপত্র নিবেদন করলেন এভাবে : ‘আমার জীবনের সকল গৌরবে সকল সাফল্যে/স্নেহে মমতায় উৎসাহে/ সকল হইতে আপনার / শ্রীদীনেশচন্দ্র সেন/ শ্রীচরণারবিন্দে।’

জীবনানন্দ দাশ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাতেই ঘোষণা দিলেন: ‘আমি কবি,- সেই কবি-/ আকাশের পানে আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি! […] এই কাব্যগ্রন্থে গ্রন্থিত কবিতার মধ্যে- নীলিমা, ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার কুমার, একদিন খুঁজেছিনু যারে-, কবি, সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়- কবিতাগুলো শিরোনাম বিচারে যেমন, তেমনি বয়ন ও বয়ানকৌশলেও সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্রের স্বাক্ষর বহন করে। তার মানে- পাঠকপ্রিয়তা বেড়ে গেলো এমন নয়; তবে বোদ্ধা পাঠক (বিশেষত তরুণরা) একটু নড়েচড়ে বসলো। নীলিমা কবিতাটি গ্রন্থিত হওয়ার আগে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কবিতাটির বিষয়ে স্মৃতিচারণ করেন এভাবে : ‘হঠাৎ কল্লোলে একটা কবিতা এসে পড়ল-“নীলিমা”। ঠিক এক টুকরো নীল আকাশের সারল্যের মতো। মন অপরিমিত খুশি হয়ে উঠলো। […] ’

কিন্তু আমরা দেখলাম-কাব্যগ্রন্থটি কবির খ্যাতির দ্যোতক হয়ে উঠলো না। সেখানে জসীমউদ্দীনের কাব্যলক্ষ্মী যেন একটু বেশিই পক্ষপাতিত্ব করলো। তাঁর এ কাব্যগ্রন্থের গ্রন্থিত কবিতার মধ্যে- রাখালী, রাখাল ছেলে, কবর, পল্লীজননী অস্বাভাবিক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করলো। রাখালী কাব্যের নায়িকা রাখালী হয়ে উঠলো পূর্ববাংলার ভূমিজ মানুষের অতি চেনা রূপের একটি শৈল্পিকবর্ণনাঋদ্ধ আদরীয়া কেউ; আবার একই সঙ্গে হয়ে উঠলো চিরায়ত বাংলার বিরহিণী বাঙালি নারীর প্রতিরূপ। কবর কবিতা তো বাংলা কবিতায় প্রথম দীর্ঘ এলিজি এবং ড্রামাটিক মনোলগ-এ রচিত নতুন কাব্যরূপ। কবির খ্যাতির স্মারক হয়ে উঠলো এই কবিতা (যা কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগেই ১৯২৫ সালে কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে মানুষের মুখে মুখে ফিরে) তাঁর কবিতার বিষয়ে ড. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় লিখলেন: […] বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তা (বাংলা কবিতা) যখন সাধারণ পাঠক-চিত্তে আবেদন সৃষ্টির স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছিল, দেশের বৃহত্তর জনমানস থেকে তা যখন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছিল, তখন ‘দূরাগত রাখালের বংশীধ্বনীর’ ন্যায় জসীমউদ্দীনের কবিতা আমাদের পল্লীর মাধুর্যময় রূপের দিকে আকর্ষণ করার প্রয়াস পেয়েছিল। […]

১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল। দুই বছর অতিক্রান্ত। জীবনানন্দের কোনো বই বেরোলো না। কিন্তু পত্র-পত্রিকায় বের হতে থাকলো তাঁর অসাধারণ কিছু কবিতা। ‘বোধ’ ও ‘ক্যাম্পে’ শিরোনামের কবিতা দুটো তার মধ্যে অন্যতম। আর লিখে চললেন গোপনে গল্প, গদ্য, আত্মকথন (ডায়েরি)। জসীমউদ্দীন প্রকাশ করলেন নকসী কাঁথার মাঠ (১৯২৯)। ১৯৩৯ সালে তা ইংরেজিতে অনুবাদ হলো Field of the Embroidered Quilt নামে। অনুবাদ করলেন মিসেস ই এম মিলফোর্ড নামের একজন বিদেশিনী (যাঁকে কবি তাঁর ১৯৫১ সালে প্রকাশিত মাটির কান্না কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করতে গিয়ে লিখেন: মেরি মিলফোর্ড, জয়যুক্তাসু)। অনুবাদ হলো অন্যভাষাতেও। আর দীর্ঘ নয় বছর পর জীবনানন্দ দাশ প্রকাশ করলেন তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পান্ডুলিপি (১৯৩৬)। এবারও যথারীতি গুরুঠাকুরের আশীর্বচন চাইলেন। পাঠালেন এক কপি রবীন্দ্রনাথের নিকট। সঙ্গে লিখলেন ভক্তিপূর্ণ একটি দীর্ঘ চিঠি। রবীন্দ্রনাথ প্রত্যুত্তরে লিখলেন চিরকুট টাইপের একটি চিঠি : ‘কল্যাণীয়েষু, তোমার কবিতা পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে। ইতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৪৪৩’ । খুবই সঙ্গত কারণেই জীবনানন্দের আনন্দিত হওয়ার মতো কিছুই ছিলো না এ চিঠিতেও। তাকিয়ে দেখার আনন্দ বলতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন-তা আজো এক বড় প্রশ্ন। আর জসীমউদ্দীনের নকসী কাঁথার মাঠ কাব্যগ্রন্থের সমালোচনায় ড. দীনেশচন্দ্র সেন বললেন: […] নকসী কাঁথার মাঠে এমন অনেক কথা আছে-যা বাংলার আর কোন কবি এভাবে লিখিতে পারিতেন কিনা সন্দেহ।…নকসী কাঁথার মাঠে কবি দেশের পুরাতন রত্নভান্ডারকে নতুনভাবে উদ্ধার করিয়াছেন, সঙ্গে সঙ্গে আগত রাজ্যের বার্তা বহিয়া আনিয়াছেন। […]

পরম্পরা ও ফারাক :

জীবনানন্দের জীবদ্দশায় (১৮৯৯-১৯৫৪) প্রকাশিত হয় (জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা-সংকলনসহ) মোট সাতটি কাব্যগ্রন্থ। জসীমউদ্দীনের জীবদ্দশায় (১৯০৩-১৯৭৬) কাব্য, কাহিনিকাব্য, উপন্যাস, গীতীনাট্য, আত্মজীবনী, সঙ্গীত, অনুবাদ, ভ্রমণকাহিনি, শিশুতোষগ্রন্থ, সম্পাদিতগ্রন্থসহ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ঊনচল্লিশের অধিক। কবিতায় মূলত জীবনানন্দ ছিলেন নাগরিকবোধ সম্পন্ন নিসর্গ প্রেমিক । আর জসীমউদ্দীন ছিলেন প্রাকৃতবোধ সম্পন্ন প্রকৃতিপ্রেমিক। উভয়জনই কবিতায় নতুনের আমদানি করেছিলেন-যা পাঠকচিত্তকে দোলা দিয়েছে তাতে কোনো বির্তক নেই; তবে একজন পাশ্চাত্য শিক্ষা ও বীক্ষা উভয়কে কবিতায় স্থান দিলেন-রাবীন্দ্রিক ভাব-চেতনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। আরেকজন তথা জসীমউদ্দীন পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করেও পাশ্চাত্যবীক্ষণকে মননে ধারণ না করে-সোজা হাঁটলেন গ্রামের মেঠোপথে; তবে তাতেও থাকলো রবীন্দ্রবিমুখতা- এই ছিলো মিল। উভয়ের কাব্যভঙ্গিমা একটু ধরা যাক :

ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল,-
ডালিম ফুলের মতো ঠোঁট যার,-রাঙা আপেলের মতো লাল যার গাল,
চুল যার শাঙনের মেঘ,- আর আঁখি গোধূলির মতো গোলাপী রঙিন,
আমি দেখিয়াছি তারে ঘুমপথে,- স্বপ্নে-কতদিন। […] (ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল, ঝরাপালক; জীবনানন্দ দাশ)

[…] মুখখানি তার কাঁচা কাঁচা, না সে সোনার, না সে আবীর,
না সে ঈষৎ ঊষার ঠোঁটে আধ-আলো রঙিন রবির!
কেমন যেন গাল দুখানি মাঝে রাঙা ঠোঁটটি তাহার,
মাঠে- ফোটা কলমি ফুলে কতটা তার খেলে বাহার!
গালটি তাহার এমন পাতল ফুঁয়েই যেন যাবে উড়ে
দু একটি চুল এলিয়ে পড়ে মাথায় সাথে রাখছে ধরে। […] (রাখালী কাব্যের নাম কবিতা; জসীমউদ্দীন)

… গেয়ে যায়; সুপ্ত পল্লী-তটিনীর তীরে
ডাহুকীর প্রতিধ্বনি-ব্যথা যায় ফিরে।
-পল্লবে নিস্তব্ধ পিক,-দিক হ’ল ম্লান,
ফুরায় না তবু হায় হুতাশীর গান! […] (ডাহুকী, ঝরাপালক; জীবনানন্দ দাশ)

[…] গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেত ঝরে,
ফালগুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।
পথ দিয়ে যেতে গেঁয়ো পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ,
চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক। […] (কবর, রাখালী; জসীমউদ্দীন)

এখানে বলে রাখি, ১৯২৯ সালে (১৩৩৬ বঙ্গাব্দে) প্রগতি’র ভাদ্র সংখ্যায় জীবনানন্দের পূর্বাপর সব কবিতাকে ছাপিয়ে একটি কবিতা ছাপা হয় (পরে যা তাঁর ‘ধূসর পান্ডুলিপি’তে গ্রন্থাকারে অন্তর্ভুক্ত হয়)। কবিতাটিতে দৃশ্যমান হয় তাঁর জৈবনিক নৈরাশ্য-আত্মগ্লানি; না প্রাপ্তির অব্যাখ্যাত শিল্পিত তৃষা। তিনি বলেন :

[…] ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
অবহেলা ক’রে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,
ঘৃণা ক’রে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে;

আমারে সে ভালোবাসিয়াছে,

আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা করে চ’লে গেছে-যখন ডেকেছি বারে-বারে
ভালোবেসে তারে; […]

আর ১৯৩০ সালে প্রকাশিত জসীমউদ্দীনের বালুচর কাব্যগ্রন্থের ‘কাল সে আসিবে’ এবং ‘কাল সে আসিয়াছিল’ শিরোনামের কবিতাদ্বয়ে কবি উচ্চারণ করেন জীবনানন্দের উল্টো চিত্র :

[…] কাল সে আসিবে, মুখখানি তার নতুন চরের মতো,
চখা আর চখী নরম ডানায় মুছায়ে দিয়েছে কত।

এই বালুচরে আসিবে সে কাল, তরে রাঙা মুখে ভরি,
অফুট ঊষার সোনার-কমল আসিবে সোহাগে ধরি।…(কাল সে আসিবে)

কাল সে আসিয়াছিল ওপারের বালুচরে,
এতখানি পথ হেঁটে এসেছিল কি জানি কি মনে করে!

আজো বসে আছি এই বালুচরে, দুহাত বাড়ায়ে ডাকি-
কাল যে আসিল এই বালুচরে, আর সে আসিবে নাকি? (কাল সে আসিয়াছিল)।

তারপর জীবনানন্দ দাশ তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ পর্যন্ত নগরমানসতাকে প্রশ্রয় দিয়ে যেভাবে প্রকৃতিমগ্নতার ধ্যান করেছেন-জসীমউদ্দীন ঠিক সেভাবে করেননি। জসীমউদ্দীন তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘মাগো জ্বালায়ে রাখিস আলো (১৯৭৬)’ পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিলেন। সে জন্যই হয়তো সে সময়ের তরুণ কবিযশঃপ্রার্থী শামসুর রাহমানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎপর্বে জসীমউদ্দীন বলেছিলেন- I am the last poet of the world.

মূলত- আমি মনে করি, তিনি যে ধারায় বাংলা কবিতাকে আধুনিকায়নের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সমুদ্যত হয়েছিলেন- সে ধারায় সত্যিকার অর্থেই আর কেউ অগ্রসর হয়নি। সে অর্থে তিনি যথার্থই পৃথিবীর শেষ কবি। অপরদিকে জীবনানন্দ তাঁর কাব্যচৈতন্যকে ঠিক যে প্রেক্ষণসীমায় নিয়ে যেতে কৃতপ্রতিজ্ঞ ছিলেন- তা আজো অনেকের কাছে অনুসরণ্যই শুধু নয় অনিবার্যও কোনো কোনো ক্ষেত্রে। কিন্তু তাই বলে জসীমউদ্দীন অপাঠ্য হয়ে ওঠেননি। উঠবেনও না এই প্রতীতি রাখতে পারি।

উভয় কবি সম্পর্কে বিশিষ্ট তাত্ত্বিক ও শিক্ষাবিদ ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দুটি প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে সমাপ্তি টানতে চাই :


জীবনানন্দ সম্পর্কে তিনি বলেন : […] জীবনানন্দ অবশ্যই চিত্রের কবি। সেই চিত্রের মধ্যে বাংলাদেশই প্রধান, যে বাংলার নাম দিয়েছেন তিনি রূপসী বাংলা। রূপসী, কিন্তু সোনালি নয়, সোনার নয় আদৌ। এই বাংলা জাতীয়তাবাদী নয়, অর্থাৎ আত্মসন্তুষ্ট, সঙ্কীর্ণ ও আস্ফালনকারী বাংলা নয় কোনো মতেই। এ বাংলা বরং নম্রতার, কৃষিকার্যের এবং বলা যায় অবক্ষয়েরও, যেখানে পচা শসা আছে, আছে হোগলা, আছে আঁশটের ও পেঁচার ঘ্রাণ, অথচ যার মুখ মায়ের মুখের মতো, যার সঙ্গে আমাদের যোগ প্রাণের, যোগ আবহমান কালের। জীবনানন্দ দাশ অনেক দূর দূর দেশে গেছেন, তাঁর আমি হাজার বছর ধরে হাঁটছেন, কাল পার হয়ে, পার হয়ে স্থান, পার হয়ে মিশর, ব্যাবিলন, নিনেভ, কাবেরী, জাভা, ইন্দোচীন। কিন্তু সেইসব দেশ ও কাল যেন বাংলাদেশেরই সম্প্রসারণ। যেন চিরকালেরর বাংলাদেশই বিস্তৃত হয়ে, ব্যাপক হয়ে, সম্প্রসারিত হয়ে গেছে নানান বিন্দুতে নানান নাম ধরে। […] (জীবনানন্দ দাশের কবিতা, উত্তরাধিকার, জীবনানন্দ জন্মশতবর্ষ সংখ্যা; এপ্রিল-ডিসেম্বর ১৯৯৯)।


জসীমউদ্দীন সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন : […] তুলনায় কম শিক্ষিত পাঠক যাঁরা, যাঁদের চিত্তভূমির ভিত প্রোত্থিত গ্রামে, আধুনিক কবিতা পাঠে যাঁরা স্বস্তি পান না, দেখেন সেখানে অপরিচিত অনুভব, কৌশল দক্ষ হাতের, সংশয় ও বক্রোক্তি নানা প্রকারের, তাঁরা প্রভূত আনন্দ পান জসীমউদ্দীনের কবিতা পড়ে। একদিকে তাঁরা ফিরে পান এই কবিতায় তাঁদের লুপ্ত অথবা অপসৃয়মাণ ছেলেবেলাকে, অন্যদিকে স্বস্তি পান এর পরিচিত ও বিশ্বস্ত ভঙ্গিতে। মনে করেন গভীর কিছু, নির্ভরযোগ্য কিছু পেলেন। অর্থাৎ শহরের যে মধ্যবিত্ত পুঁজিবাদী সভ্যতার অনুরাগী, উদারনীতির সেবক, তিনিও পড়েন জসীমউদ্দীন, কম পড়েন যদিও; আবার শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত, সামন্তবাদশাসিত মানুষও পড়েন, অধিক পরিমাণে, অধিকতর আনন্দের সঙ্গে। তুলনায় কম শিক্ষিত গ্রামের মানুষ তো পড়েনই। শুধু পড়া নয়, শোনাও যায় জসীমউদ্দীনের কবিতা, একজনে পড়লে অনেকে মিলে শোনা যায়, যেন সকলের মিলিত সম্পত্তি এই কবিতা। […] (কবি এবং প্রতিনিধি, সংস্কৃতির : রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির সামাজিকতা, পৃষ্ঠা-১৯৩)।

আল মাকসুদ

আল মাকসুদ

জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬, শৈলের কান্দা, জামালপুর। 

পেশায় সরকারি কলেজে অধ্যাপনা (সহকারী অধ্যাপক, বাংলা, আনন্দমোহন কলেজ)  

আগ্রহ গবেষণা, গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ।

প্রকাশিত গ্রন্থ-
কাব্য- এই নাও শঙ্খচাঁদ (২০১৬), এবং তার জন্য এ পঙক্তিমালা (২০১৭), কুমারী রাতের আশীর্বাদ (২০১৯)

প্রবন্ধ- কবিতা অকবিতা-কাব্যপাপ ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১৮) 

সম্মাননা- স্বতন্ত্র (শিল্প-সাহিত্যবান্ধব) লিটল ম্যাগ

মোবাইল: ০১৭১১-০৬০২৪২
ই-মেইল: almaksud12@gmail.com 

2 thoughts on “অভিন্ন সময়ে ভিন্ন উপস্থাপন : কবি জীবনানন্দ দাশ ও কবি জসীম উদ্‌দীন

  • আল মাকসুদ
    April 12, 2019 at 10:13 am
    Permalink

    অনেক ধন্যবাদ, লেখাটি প্রকাশের জন্য। তবে কিছু বানানে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি ছিলো।
    জসীমউদদিন বানানটি কবি নিজে এভাবেই লিখতেন। তবে দ-এর নিচে হসন্ত আছে। কিন্তু ইউনিকোডে হসন্ত প্রয়োগ করলে পরবর্তী বর্ণের সঙ্গে তা যুক্ত হয়ে যায়।
    ভালোবাসা নিরন্তর💖

    Reply
    • Avatar
      April 12, 2019 at 10:51 am
      Permalink

      আশাকরি জসীম উদদীনের নামের বানান সমস্যা কাটিয়ে উঠবো শীঘ্রই। ধন্যবাদ আপনাকে চমৎকার লেখনীর জন্য।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: