অখিলেশ

দশমিক

আমি, অখিলেশ ও আমাদের মৃত বন্ধু শমীক
তিনজন—তিন রঙ—তিনটি দশমিক!

আমি—সংসারী রাত, বিবাহিত
অখিলেশ—আজন্ম সঙ্গহীন, মিথ্যেবাদী, পাগল ও কবি
শমীক—অকৃতদার, অভিমানী, মৃত…

আমরা বরাবরই গণিতের কাছে পরাজিত!

ভূগোল জানি না, ছন্দে নেই, ইতিহাসে নেই—
ফেরারী—বিবাগী—চাকরিচ্যুত;

আমারা সেলাইমেশিন, আমরা নীল রুমাল, সুই-সুতো।

তিনটি দশমিক… বিব্রত—বিষণ্ন—স্বপ্নাহত—
মেষ—মিথুন ও মীণ…

আমরা—ইতিহাসে ডুবে যাওয়া তিনটি কফিন!

পর সমাচার এই যে…

ব্যাংক তোকে রাখলো না—
হাসপাতালও ছেড়ে দিলো তোকে;

আজীবনের মতো
আলো যেইভাবে ছেড়ে যায় অন্ধকে!

তোকে নিচ্ছে না কার্নিভাল,
কথোপকথন—ঠাট্টা ও হাসি!
ফিরিয়ে দিচ্ছে মাঝি; বাস কন্ডাক্টর; রোগা চাষী…

পিথাগোরাসের সূত্র তোকে ভুলে গেছে।
তাড়িয়ে দিয়েছে ত্রিভূজ,
রম্বস ও বৃত্ত—
গণিতের রাশিফলে আজীবন ভাগশেষ তুই, শুধু উদ্বৃত্ত!

আরো কত দুঃখ তোর, পত্রযোগে পাই…
দুঃখেরও দুঃখ এই— আমি, তুই স্বপ্ন পোড়া ছাই!

এই শেষ পত্র নয়, অখিলেশ— তোকে আমি পত্র দেবো আরো,
চুপচাপ পড়ে থাক, মরে থাক— উত্তর দিস না এবারও।

অখিলেশকে, মহামারীর রাতে

আমাদের সমস্ত সুই শেষ হয়ে গেছে অখিলেশ—
সেলাইয়ের সমস্ত সুতো;
আমাদের নীল-সাদা জুতো;
ইস্কাপনের তের তাস,
আমাদের সবটুকু জোৎস্না, কচি ঘাস
সবকিছু নাই হয়ে গ্যাছে…

সবগুলো রঙ আজ ফিকে;—
আমাদের দুঃখ লিখে লিখে
মরে গেছে পেন্সিলও, ক্যানভাস নিজেকে গুটিয়ে
চলে গেছে অন্য কারো কাছে,

অখিলেশ, যদিও আমাদের দুঃখ আরো আছে,
তবু থাক—
এই যে, নিয়মিত ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে
খণ্ড হই, টুকরো হয়ে যাই,
সেলাই জরূরী তবু, আমাদের সুই সুতো নাই…

মুখোমুখি অখিলেশ

শোন অখিলেশ, আমাদের মেরুদন্ড থেকে
কশেরুকা খুলে নিয়ে বেচেছে অনেকে—

আমাদের রক্ত করেছে পান
অহিংস মানুষের হিজড়ে সন্তান,

আমরা কিছুই বলিনি—

বলবার মতো কিছু ছিলো কি না!—জানা নেই…

উড়তে চেয়েছি, বলেছিস—ডানা নেই
আমাদের;
আমাদের নারী নেই, মদ নেই, রুটি নেই
মধ্যম আঙুলে নেই আংটি

আমরা এখনও ঋণগ্রস্থ, আস্তিনের প্রান্তে পড়ে
খুচরো পয়সা

তামাশার মতো কিছু ভাঙতি!

হাত ধর অখিলেশ, নরকে যাবো

আমার একটা প্রেম হয়েছে অখিলেশ—
আজব এক নারী…
নখে লাল, কানে দুল, নীল শিফনের শাড়ি
হলুদ রিবনে বাঁধা চুল
গোলাপী নাভী, চওড়া পিঠ—লতানো আঙুল!

আশ্চর্য পুতুল যেন এক—

শুধু…চোখ—ভিনভাষী, অচেনা, আদিম
আর সেই মিথ্যে বলা ঠোঁট!
যতখানি প্রতারণা পুষে রাখে ভোটের ব্যালট
তারও বেশি
অভিনয় জানে।

তার সাথে দেখা হয় দুপুরের ঠিক মাঝখানে!

অখিলেশ তোরও
এমন আশ্চর্য মিথ্যের সাথে যোগাযোগ হোক,
নাহয় একটা ঋতু একসাথে হেসেখেলে দেখবো নরক…

সুইসাইড নোট

এসেছে—কাঠ, পেরেক ও হাতুড়ি…
সমস্ত মিথ্যে সান্ত্বনা, ছল ও চাতুরির
লেনাদেনা শেষ;
কফিন বানাচ্ছি অখিলেশ—

মানুষের রেখে যাওয়া কথা
প্রেমিকার চিঠি, নাকফুল-টিপ, চুড়ি
লালনীল বাহানা ও ছুরির
আঘাত
শহরের নর্দমা, কোলাহল, সাদা জোৎস্নারাত
রেখে যাচ্ছি সব,

আমার বিদায়ে হোক হাসি-উল্লাস-উৎসব।

কফিন ভাসিয়ে দিস
জানি এক কীর্তনখোলা আছে—
মানুষ পায়নি যারে—তার পালকিটি বয়ে নিক
কাঁকড়া শামুক ও মাছে।

মোহাম্মদ জসিম

জন্মঃ ৩ এপ্রিল, ১৯৮৭, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল।
পেশাঃ চাকুরি
সম্পাদনাঃ পৃষ্ঠা, কফিন
প্রকাশিত গ্রন্থঃ 
১. ত্রয়োদশ দুঃস্বপ্ন, কবিতা, ২০১২
২. অসম্পাদিত মানুষের মিথ, কবিতা, ২০১৮
৩. মিথ্যেরা সাত বোন, কবিতা, ২০১৯
৪. তামাশামণ্ডপ, অণুগল্প, ২০২০
৫. কোলাহল চিহ্নিত, কবিতা, ২০২০
৬. অশ্বখুর ও অন্যান্য টগবগ, কবিতা, ২০২০
মেইলঃ m.jasim79@gmail.com

One thought on “অখিলেশ

  • May 19, 2021 at 6:51 am
    Permalink

    অসাধারণ

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: