শেষ রাতের তারা

ঝড়ের ভেতর গিয়ে এগিয়ে চলেছে নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস। আমরা দু’জন যাত্রী পুরো একটি ফাষ্ট ক্লাস কমপার্টমেন্ট দখল করে আছি। কিছুক্ষন আগে আমরা চুপ মেরেছি জীবনের একটি জটিল সমস্যায় জড়িয়ে গিয়ে। শুভ্র শাড়ির ভেতর আমার সঙ্গিনীর মুখটা পদ্মফুলের মত স্নিগ্ধ। কিন্তু চোখের তারায় তিরতির করে কাপঁছে যন্ত্রনার হাহুতাশ। আমি অনুভব করতে চাইলাম রাত্রির গভীরতা। রাত্রি বহুদূর। আমার সঙ্গিনী কাছের সম্পর্কের এক আত্মীয়। মাত্র কয়দিন হলো তিনি বিধবা হয়েছেন। তাকে নিয়ে বাপের বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। কিন্তু হঠাৎ আজ যা বলছেন সবই আমার কাছে এক অপ্রত্যাশিত দুশ্চিন্তা। জীবনের এক জটিল সমস্যা।

-তুমি কিছুই বলবে না? আমার কাছে তার প্রশ্ন।
-আমাদের ট্রেন এখন ভীষণ ঝড়ের ভিতর দিয়ে এগুচ্ছে।
-তুমি কি আমায় সান্তনা দিচ্ছ? কবিত্ব কি তোমার পছন্দ নয়?
-না, কবিরা বাস্তব নিয়ে কথা বলেনা। তারা আবেগের পঙ্খিরাজে দিগন্ত পাড়ি দেয়।
-তুমি কি বাস্তবতার খুব কাছা কাছি দাঁড়িয়ে আছ?
-না থাকলেও দাঁড়াতে চাই।
-আমি আমার জীবনের অতৃপ্ত ক্ষুধা নিয়ে তোমাকে উপভোগ করবো।
-আমি ভাবছি।
-তোমাকে ভাববার সময় যদি না দেই? আমার আকাঙ্ক্ষার ইচ্ছা দিয়ে বরণ করে নেই তোমাকে? আসো আমরা আদিম খেলায় নিজেদেরকে উপভোগ করি। স্রষ্টার কাছে তুমি দুরাচারী হবে আমি তা চাই।

এরপর নিস্তদ্ধ রাত্রির আঁধার ভেঙে এগিয়ে চলছে ট্রেন। ত্রিশ বছরের এই বিধবা নারীর সাথী হয়ে আমি যাত্রা করছি তার বাপের বাড়িতে। বয়সের এবং সম্পর্কে তিনি আমার শ্রদ্বেয়া। আমি জানালার কাঁচের ভেতর দিয়ে রাত্রির গভীরতাকে আবার অনুভব করতে চাইলাম । চাইলাম একজন নারীর জীবনের ব্যর্থতার কাহিনী শুনতে। যে নারীর সামাজিক মর্যাদা আছে, তবু কেন এত হাহুতাশ তার বক্ষ জুড়ে? এটাই কি নারী ধর্মের অভিশাপ?

রতি আর রমনের দারুণ ইচ্ছায় সে আমার বাহু লগ্না হলো। শিথিল হয়ে খসে পড়লো তার দেহের শেষ আচ্ছাদন। সেই রাতটা যুগ যুগ ধরে রাত হয়ে থাকতো না যদি আমি তাকে পেতাম। আমি যেন এক মাটির পুতুল তার খেলার সাথী হয়ে ধীর ও স্থির। অচল এক অপদার্থ যৌবন পুষ্ট মানুষ।

-তুমি আমায় নিয়ে কি চিন্তা কর? রানী ভাবীর হঠাৎ প্রশ্ন। যদি বলি তুমি ভুল পথে এগোচ্ছ। আজ যদি আমার পেটে জন্ম নেয় তোমার কোন সন্তান? খিল্ খিল্ করে হাসিতে ভেঙ্গে পড়ে সে। আমি এখনও এতোদূর ভাবিনি। তা হলে আমি তোমাকে অপদার্থই বলবো, একটি নির্জন কক্ষে পঁচিশ বছরের একজন যৌবন চঞ্চল মানুষ এক যুবতী নারীর কাছাকাছি বসার পরও নারীর হৃদয়ের স্পন্দন শুনতে পায়না। আমি তাকেও অপদার্থ বললেও অন্যায় হবে না। রানী ভাবী অজান্তার স্থির চিত্রের মত তখনো আমার সামনে দন্ডায়মান। বিবস্ত্র দেহে তখনো বন্ত্র তুলে নেয়ার কোন ইচ্ছা মনে নাই। একটা রাক্ষুসে ইচ্ছায় কখনো লৈহন করে যাচ্ছে আমার যৌবন চঞ্চল দেহের সমস্ত আঙ্গিনা।

-তুমি কি জ্ঞান হারিয়েছো?
-না আমি ঝড়ের মত দুরন্ত হয়েছি।
যৌবনের প্রথম উত্তাপ দিয়ে আমি রানী ভাবীর দেহ লগ্ন হলাম, উপভোগ করলাম তাকে। সমুদ্র মন্থন করে অমৃত ভক্ষণের স্বাদ পেলাম।
-নয়ন কিছু বলতে চাও? আমার সাথে তোমার রাখী বন্ধন হলে কেমন হয়?
-এতদূর এগিয়ে এ প্রশ্ন কেন?
-আমি তোমায় প্রাণভরে ভালবাসবো বলে।

ট্রেন জাহাজ ঘাটে ভিড়লো। রানী ভাবীর ভেতর স্বাভাবিকতা ফিরে এলো। অবিন্যস্ত দেহবাস অঙ্গে জড়িয়ে নিল। আমার গন্ডে ছোট্ট একটি চুম্বন এঁকে দিয়ে ট্রেন থেকে নামার প্রস্তুতি নিল। ততক্ষণে নিশা অবসান হয়েছে। হেমন্তের আকাশের দিকে তাকিয়ে সে আবার হাসলো। কারণ এতটুকু অধিকার নিয়ে তার মুখের দিকে তাকাইনি আমি। এই প্রথম সেই অধিকারের পাওনা পেলাম।

রানী ভাবীকে তার বাপের বাড়িতে পৌছে দিলাম। রানী ভাবীকে আমার জীবনে গ্রহণ করার অঙ্গিকার নিয়ে আমি আমার ঠিকানায় যাত্রা করেছি। রানী ভাবী আমার গন্ডে তার শেষ চুম্বনটি অংকন করে আমায় বিদায় দিলো। আমার বিদায়ের মুহুর্তটুকু জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে অতিকষ্টে অতিক্রম করলো। অশ্রু সজল চোখে হাত নেড়ে বললো, “মনে রেখো, ভুলনা আমায়।”

সারাপথ আমি তাকে নিয়েই ভেবেছি। আমার বাহন শকটটি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ঢাকার কাছা-কাছি একটি ট্রাকের সাথে মুখোমুখি হয়ে বিধ্বস্থ হয়ে গেল। এর পরের ঘটনা আমার জানা নাই।

যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো তখন আমার দেহ থেকে একটি পা বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘ দিন পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে বাড়ি ফিরলাম। এই ছিল আমার জীবনের করুণ ইতিহাস। খবর শুনেও রানী ভাবী আমার শয্যা পাশে এসে দাঁড়ালো না। এক টুকরো চিঠি দিয়েও খোঁজ নিলো না। আমি আশ্চর্য হয়ে শুধু আমার ভাগ্য নিয়ন্তার পানে তাকালাম।

শুনলাম রানী ভাবি আর গায়ে ফিরবে না। সমস্ত সম্পতি বিক্রি করে দিয়ে বাপের বাড়িতে আশ্রয় নিলো। আমি শুধু শুনলাম দূরে বসে বসে। আমি আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলাম, একজন নারীর উপকার সাধনে আমার সম্ভাবনাময় জীবনটা ধ্বংশ হয়ে গেল। তবুও সাহস হারালাম না। সমাজে মানুষের মত বেঁচে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে ক্র্যাচে ভর দিয়ে আবার ইউনিভারসিটির ক্যাম্পাসে এলাম। বিধাতা আমাকে নিরাশ করলেন না। রাষ্ট্র বিজ্ঞানে ফার্স্ট ক্লাস পেলাম। সরকারি খরচে লন্ডনে গিয়ে ডক্টরেট নিলাম। জীবন আবার নতুন স্রোতে এগিয়ে চললো।

আজ জীবনের সকল পাওনা পেয়েছি। কিন্তু নারীর প্রতি আর শ্রদ্ধাশীল হতে পারলাম না। এই শ্রদ্ধা হারানোর জন্য আমি রানী ভাবীকেই দায়ী করব। তাই কোন নারীকে জীবন সঙ্গিনী করতে পারলাম না। এভাবে অতিক্রান্ত হলো জীবনের চল্লিশ বছর। কয়েক দিনের ছুটি পেয়ে ঐতিহাসিক স্থান গুলো ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে রাজশাহীতে চলেছি। পদ্মা এক্সেপ্রেসের বিলাস বহুল কামরায় শুয়ে একটা উপন্যাসের পাতায় চোখ রেখেছি। রাত অনেক। দারুণ নির্জনতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলছে দূর পাল্লার ট্রেনটি। চা দিয়ে গেল বুফেকারের ছেলেটি। চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়েই চমকে উঠলাম। একটি ষ্টেশানে ট্রেন থামার জন্য গতিমন্থর হয়ে আসলো।

কিছুক্ষনের মধ্যে থেমে পড়বে। কয়েক জন যাত্রী নামার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে দরজার কাছে। একজোড়া চোখ আমার উপর স্থির হলো। আমি কিছু বলতে চাইলাম। দ্রুত সে আমার আসন অতিক্রম করে চলে গেলো। ভাবছি এগিয়ে যাবো। ততক্ষণে সে প্লাটফর্মে নেমে গেল। দ্রুত জানালার কাঁচ তুললাম। দেখলাম রাজ হংসীর মতো এগিয়ে চলছে রানী ভাবী। ট্রেন ছেড়ে দিলো। ষ্টেশন অতিক্রম করল। আমার দৃষ্টি সীমায় দেখলাম শেষ রাতের তারা আকাশের গায় জ্বল জ্বল করে জ্বলছে।

Avatar

মুহাম্মদ ফারুক


জন্ম:- জানুয়ারি ১৯৪০, দিঘীরপাড়, গফরগাঁও। 

আগ্রহ- কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ 

প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ-
বাউলমন, মুখীর ভালোবাসা, মানুষ 
আমার কষ্টের দিন, বকুল, যুদ্ধ করে বিজয় এনেছি

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ -
শেষ রাতের তারা 

প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ-
পাঁচবাগী নিয়া কথা 
মাওলানা হযরত শামসুল হুদা পাচবাগী 
গফরগাঁওয়ের ইতিহাস
গফরগাও রাজনীতিতে আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ

ইমেইল- muhammadfaruk1940@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: