যে গান শুনেনি কেউ

ভাস্কর্যশিল্পী

পরিমল একজন ভাস্কর্যশিল্পী
তিনি শব্দ দিয়ে নির্মাণ করেন সুখ
অস্ত্র দিয়ে নির্মাণ করেন হাত
মাটি দিয়ে নির্মাণ করেন বুক
প্রজাপতিরা বিশ্বগ্রামে জড়ো হয়
এবং ভাস্কর্যটির অপেক্ষায় থাকে।

একদিন পরিমল মারা যায়
ভাস্কর্য ফেটে বের হয়ে আসে রঙ
শব্দেরা কথা কয় অস্ত্রেরা ঝনঝনিয়ে ওঠে
পৃথিবীর আলোচনায় যোগ হয় নদী
সমুদ্র আকাশ শব্দের সুদ
অক্ষর যুদ্ধের ক্লান্তি নিয়ে
শত শত পরিমল আসে বিয়োগের বিশ্বগ্রামে।

বিধবা বাতাস

বুড়ো শালিকের ছোট্ট বাসায়
মাংসের মদ নিয়ে বসে আছে
অবাঞ্ছিত যুক্তাক্ষর
সদ্য সুখের সুতো ভিজিয়ে
কতো দিন তারা স্নানে যায়নি।
প্রগতির সোনালী চুলে
ট্রাকে ট্রাকে মুক্তো বিলিয়ে
বিছানা ভাসায় মিথুন রাশির মেয়ে
প্রান্তরে বসে কাঁদে চিকন চন্দ্রহাঁস
কতো কাল তোর কান্না শুনব
হায়রে বাতাস প্রান্তরের বিধবা বাতাস।

নদীর কথা

আমি এমন একটি নদীকে চিনি
যে মূহুর্তেই তোমার চোখ লাল করে দেয়
যার জলের ছোঁয়ায়
তুমি হয়ে উঠো পরিপূর্ণ মানুষ ।

আমি এমন একটি নদীকে জানি
যে রোজ রাতে
আলমারি থেকে তোলে নেয়
তোমার সবকটা শাড়ি
জলের জৈবিক স্পর্শে
তুমি হয়ে উঠো কামোচ্চ ঢেউ।

আমি এমন একটি নদীর জন্য কাতর
যার শীতল বুকে মুখ ধুয়ে যায়
আমার অতীত এবং ভবিষ্যত বংশধর।

যে গান শুনেনি কেউ

হে ক্লান্ত পাখি
একটি গান শুনিয়ে যাও
ফিলিস্তিনের রক্তাক্ত প্রান্তরে
যে রমণী কেঁদে ছিলো আকাশ ছুঁয়ে
যার আঁচল থেকে জন্মেছিল
জ্বলন্ত বারুদের রক্ত গোলাপ
ঢেউয়ে ঢেউয়ে উঠে ছিল বেদনার সুর
সেই বিষণ্ণ সুরে আমারে কাঁদাও।

হে ক্লান্ত পাখি
একটি গান শুনিয়ে যাও
যে গানের তরঙ্গে কেঁপে
পাহাড়ে পাহাড়ে খোদিত হয়েছিলো
পৃথিবীর প্রথম শিলালিপি
পর্বত প্রকোষ্ঠ ভেঙে
গলে গলে পড়ছিল রক্ষীতা নদী
সে নদীর মহামায়ায় আমারে ভাসাও।

হে ক্লান্ত পাখি
সুরের সন্ধ্যা হয়ে আমারে ভাসাও
যে গান শুনেনি কেউ কোনওদিন
সেই গান আমারে শোনাও ।

কতদিন তোমায় দেখি না

নিজেকে দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি
কতদিন, কতদিন তোমায় দেখি না
অপূর্ব আদরে আঁকা শান্ত দুধের জলে
মাছেদের লেজ ধরে কাটি না সাঁতার, আর কাটি না।

তুমি ও কী আমার মতো
কখনও সখনও আক্ষেপ কর
পলকের কল্পনায় সংসারে এনে
পালঙ্কে বিছিয়ে দাও অলস শরীর
হাসির ঝিলিকে খসে পড়ে রোদ
খসে পড়ে প্রথম অহঙ্কারে ঠাসা
দাঁতের মতো মুক্তোর দানা ।

কখনও কি সে প্রশ্ন করে
মিটমিটিয়ে হাসছো কেন ?
হাতের লাঙলে চাপ্টে ধর স্মৃতির জাবর
আমাদের সংসারে বেড়ে ওঠা হাইব্রিড শিশু
আর আমার মতো আঙুল তোলে
তুমিও কী দেখিয়ে দাও হাঁটু ছাড়া হাঁসের ছানা।

আমার ভাতের থালায়
আজও তোমার হাত ডুবে যায়
প্রিয় মুখের জলকেলিতে
দোল খেয়ে যায় কলমীলতা
লবণ সঠিক হলেই তোমাকে পাই ঠিক
হে আমার প্রিয়, প্রিয় স্বাধীনতা
নিজেকে দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি
কতদিন, কতদিন তোমায় দেখি না ।

অন্ধকার মুখ চেনা যায়

রাত হলেই ঢুকে যাই সিরামিকের কৌটার ভেতর
একটি হিমাঙ্গ হাত
আমাকে বের করে খাওয়ায় সকালের রোদ
আমি টনটন করে জেগে উঠি
কোন এক ধূলো পড়া হৃদয় বীণায়।
বস্তায় ভরা অভিযোগ নিয়ে প্রতিদিন যাই
জীবনের হাঁটে
সোনার তেলে ভেসে যায় ইজারাদারের মুখ
সস্তায় বিক্রি করি অনাহূত সকাল-বিকাল।
সন্ধ্যা সময়টা প্রার্থনার
দাদু বলতেন এ সময় পৃথিবীর দেয়াল ফেটে
নির্গত হয় অন্ধকার অশ্রু
এসময় মানুষের মুখ চেনা যায়।

তুমি কাঁদলেই কাঁদে বাংলাদেশ

জলের কাগজে ওড়ে আসে
আশ্চর্য ধরনের ডেথ সার্টিফিকেট
বিষন্ন অক্ষরগুলো কাঁদতে কাঁদতে
শহীদ মিনার হয়
অতিক্রম করে যায় ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।
বাতাসের মতো জীবন্ত নদীতে বয়ে যায় ঝড়
মা কাঁদে, আমি কাঁদি এবং বলি
মা পৃথিবীর বুকে তুমি আমার চেনা
সবচেয়ে বড় অচেনার নাম।
শায়িত জননীর আঙুল ছিঁড়ে
ঝরে পরে রুপধ্বনি রোদনধ্বনির রঙ অশেষ
শান্তনার শ্রাবণে তবুও বলি কেঁদো না মা
মা, মাগো- তুমি কাঁদলেই কাঁদে বাংলাদেশ।

দালান জাহান

দালান জাহান


জন্ম- ২০ অক্টোবর ১৯৮১, ময়মনসিংহ।

পেশায় চাকুরিজীবী

আগ্রহ মূলত কবিতা গান ও কথাশিল্প ।

সম্পাদনা- সাহিত্য সিঁড়ি  (শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক)

প্রকাশিত গ্রন্থ- পেয়ারি (একুশে বইমেলা ২০১৩) ঝলসে যাওয়া শহর (একুশে বইমেলা ২০১৬)
ঘুমাও কামনার সুখ (একুশে বইমেলা ২০১৮)
ব্লাড ফায়ার (একুশে বইমেলা ২০১৮)

কাব্য- নদীর কথা, ভাস্কর্যশিল্পী, অজ্ঞাত, অন্ধকারে মুখ চেনা যায়, তুমি কাঁদলেই কাঁদে বাংলাদেশ।

ই-মেইল: dalanjahan001@gmail.com

One thought on “যে গান শুনেনি কেউ

  • Avatar
    October 28, 2019 at 2:12 pm
    Permalink

    অসাধারন কথামালার লিখনি প্রিয় কবি দালান জাহান ভাইয়ের।শুভ কামনা অবিরাম।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: